‘নিকাব খুলতে বলিনি’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঘটনায় শিক্ষকের ভিডিও বার্তা

· Prothom Alo

নিজের অবস্থান জানাতে ভিডিও বার্তা দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব। এক ছাত্রীকে শ্রেণিকক্ষে নিকাব পরা নিয়ে কথা বলায় শিক্ষার্থীরা তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। পরে তাসনীম সিরাজ মাহবুব যতগুলো কোর্সে পড়াতেন, সেগুলো থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় ইংরেজি বিভাগ কর্তৃপক্ষ। তাঁর পড়ানো কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

Visit freshyourfeel.org for more information.

৭ অক্টোবর ঘটনাটি ঘটেছিল। এরপর তাসনীম সিরাজ মাহবুব অনেকটা নীরবই ছিলেন। আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় মাস্টার্স ফাইনাল সেমিস্টারের ক্লাসে ঘটে যাওয়া ঘটনা ও পরবর্তী বিভাগীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি।

ভিডিও বার্তায় নারী শিক্ষক তাসনীম সিরাজ মাহবুব ৭ অক্টোবরের ঘটনা সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, শ্রেণিকক্ষে নিকাব পরা এক শিক্ষার্থীকে পোশাক পরিবর্তন করতে, নিকাব খুলতে কিংবা ক্লাস ত্যাগ করতে তিনি নির্দেশ দেননি। বরং শিক্ষার্থীর চোখ দেখতে না পাওয়ায় তাঁকে শনাক্ত করতে ও কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করতে অসুবিধা হচ্ছিল। এ কারণে তিনি নিজের অস্বস্তির কথা জানিয়েছিলেন।

তাসনীম সিরাজ মাহবুব আরও বলেন, সেদিন ক্লাসে আরও দুজন ছাত্রীর সঙ্গে একজন শিক্ষার্থী বসেছিলেন, যাঁর চোখসহ পুরো মুখমণ্ডল ঢাকা ছিল। তাঁকে শনাক্ত করতে এবং চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করতে অসুবিধা হচ্ছিল। এতে পাঠদানের সময় তিনি স্বস্তি অনুভব করছিলেন না। একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে পাঠদান গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিষয়টি নিয়ে ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

তিনি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করেন উল্লেখ করে ইংরেজি বিভাগের এই শিক্ষক ভিডিওতে বলেন, প্রায় ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আচরণ সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা জানেন। কোনো শিক্ষার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস বা পোশাককে অবমাননা করার প্রশ্নই আসে না।

তাসনীম সিরাজের ভাষ্য, ওই শিক্ষার্থীকে পোশাক পরিবর্তন করতে বলার কথা আলোচনা হয়নি। চোখ দেখতে না পাওয়ায় অস্বস্তি হচ্ছে—এটা বলেছিলেন। এরপর ওই শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে চলে যান। তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি। তবে ওই শিক্ষার্থীর পক্ষে কথা বলা আরেকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে পোশাকের স্বাধীনতা, পরিচয় শনাক্ত করা এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতবিনিময় হয়।

তাসনীম সিরাজ মাহবুব জানান, মতবিনিময়ের সময় পবিত্র কোরআন শরিফের সুরা আন-নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে শালীনতা ও সৌন্দর্য প্রদর্শন সীমিত রাখার নির্দেশের কথা উল্লেখ করেন তিনি। ক্লাসে বোরকা পরা অন্য দুই শিক্ষার্থীর উদাহরণ দিয়ে নিজের বোঝাপড়া অনুযায়ী মুখমণ্ডল দৃশ্যমান রেখেও শালীন পোশাকে পর্দা করা যায়, এটাও বলেছিলেন। নিজের পবিত্র হজ পালনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে ইহরাম অবস্থায় নারীদের নিকাব না পরার বিষয়ে হাদিসের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম আরও বলেন, সেদিন ক্লাসে অন্য অনেক শিক্ষার্থী হিজাব ও বোরকা পরে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মুখমণ্ডল ঢাকা থাকলেও চোখ দৃশ্যমান ছিল। ফলে তাঁদের চিনতে অসুবিধা হয়নি। তাঁদের কাউকে পোশাক নিয়ে কিছু বলা হয়নি। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য করা, নিকাব খুলতে বলা, ক্লাস ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া কিংবা ধর্মীয় পোশাকের কারণে শাস্তি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেনি। ভবিষ্যতে তাঁর ক্লাসে আসতেও নিষেধ করেননি তিনি।

ঘটনার পর বেনামি ফোন, ই–মেইল, আপত্তিকর বার্তা ও হুমকি পাওয়ার কথা জানান তাসনীম সিরাজ মাহবুব। এ জন্য নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

ঢাবিতে নিকাব পরা নিয়ে কথা বলার প্রতিবাদ, শিক্ষককে ক্লাস থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত

দুঃখ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন তাসনীম

ভিডিও বার্তায় তাসনীম সিরাজ মাহবুব বলেন, ওই শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে চলে যাওয়ার পর অন্যদের কাছে জানতে পারেন, শিক্ষার্থীটি কষ্ট পেয়ে চলে গেছেন। কাউকে কষ্ট দেওয়া উদ্দেশ্য নয় জানিয়ে ওই শিক্ষার্থীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে চান বলে অন্যদের জানান।

এই শিক্ষকের দাবি, সহপাঠীদের মাধ্যমে ওই শিক্ষার্থীকে খোঁজ করেন। তিনবার খবর পাঠান এবং করিডরে প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষা করেন। তবে ওই শিক্ষার্থী বেরিয়ে না আসায় সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করতে পারেননি।

পরিবারের একজন গুরুতর অসুস্থ সদস্যের অস্ত্রোপচারের কারণে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হয়েছিল উল্লেখ করে ভিডিওতে তাসনীম মাহবুব বলেন, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর বক্তব্য না শুনেই বিভাগ তাঁর সব কোর্স অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ঘটনাটি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ভাষ্য

ঘটনার পরই ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্স ফাইনাল সেমিস্টারের শিক্ষার্থী সুমি আক্তার তার ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছিলেন। সেই পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ক্লাসের শুরুতে তাসনিম সিরাজ মাহবুব শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা ও পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেন। এরপর নিকাব পরা এক শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ করে বলেন, এভাবে পর্দা করার প্রয়োজন নেই, মুখ খোলা রাখা যায় এবং হাত-পা ঢাকারও প্রয়োজন নেই। ওই শিক্ষার্থীর নিকাবের কারণে তিনি “আনকম্ফোর্টেবল”, “আনসেইফ” ও “ডিস্ট্র্যাক্টেড” বোধ করছেন উল্লেখ করে তাঁকে পেছনে গিয়ে বসতে বলেন।’

সুমি আক্তার লেখেন, এ ঘটনার পর তিনি প্রতিবাদ করেন। এটি ওই শিক্ষার্থীর মাজহাব ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় এবং সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলে এভাবে পর্দা করতে পারে বলে উল্লেখ করেন। এতে ওই অধ্যাপক তর্কে জড়ান। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীটি শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে যান। তাঁর সঙ্গে আরও দুজন ছাত্রীও ক্লাস ছাড়েন।

পরে ওই ঘটনার প্রতিবাদে ৮ অক্টোবর দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন নারী শিক্ষার্থীরা। ডাকসুর কমনরুম, রিডিং রুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে ছালমার নেতৃত্বে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একদল নারী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীর কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। সেখানে তারা পাঁচ দফা দাবি জানান। এর আগে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আরেক দল শিক্ষার্থী একই দাবি তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন।

ওই দিন বেলা দেড়টায় সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা-কর্মীরা।

শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ এবং লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ৮ অক্টোবরই তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে ক্লাস থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় ইংরেজি বিভাগ।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক যা বলছে।

আজ শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় নেটওয়ার্ক বিষয়টি নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, তাসনীম সিরাজ মাহবুব রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, অপতথ্য ও বিদ্যায়তনিক পরাধীনতার শিকার হয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, ঘটনাটিকে শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে নানা রং মিশিয়ে জনপরিসরে ব্যবহার করা হয়েছে। শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবি তোলা হয়েছে। ঘটনা পরম্পরায় পরিষ্কার যে এটি একটি স্বার্থান্বেষী মহলের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নীলনকশা।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ক্লাসের কথোপকথন একটি নৈমিত্তিক শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে যেভাবে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে ফেলেছে, তা বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার প্রশ্নকে আবারও সামনে এনেছে। যেকোনো পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যই শ্রেণিকক্ষের আলোচনা একটি সীমিত পরিসরের প্রতিনিধিত্ব করে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বহু একাডেমিক বিষয়েই আলোচনা, বাদানুবাদ বা তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। শিক্ষক বা শিক্ষার্থী যে কারও বক্তব্যে ভুল–বোঝাবুঝিরও সৃষ্টি হতে পারে এবং সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের গণ্ডির মধ্যেই সমাধান করার প্রচলিত রীতি আছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এ ক্ষেত্রে সেই প্রচলিত রীতি, পদ্ধতি এবং বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, তাসনীম সিরাজ মাহবুবকে ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদেশ অনুযায়ী বেআইনি। অনুমতি ছাড়া শিক্ষকের বক্তব্য ধারণ করা ও অনলাইনে খণ্ডিতভাবে ছড়িয়ে দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপতথ্যমূলক ক্যাম্পেইন করা সাইবার অপরাধ। যারা এই কাজ করেছে, তাদের যথোপযুক্ত আইনের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে তারা।

Read full story at source