কোথাও খাবারে তেলাপোকা, কোথাও খাবার তৈরির স্থানে শুয়েছিল বিড়াল

· Prothom Alo

দুই দিন ধরে ডায়রিয়ায় ভুগছিলেন চট্টগ্রাম নগরের খাজা রোড এলাকার বাসিন্দা নুরুল আবছার। ডাবের পানি ও খাবার স্যালাইন খেয়েও সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে যান এলাকার গাউসুল আজম আরবান ডিসপেনসারিতে।

Visit turconews.click for more information.

গত মঙ্গলবার সকালে ওই ডিসপেনসারির সামনে কথা হয় নুরুল আবছারের সঙ্গে। পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী রেহানা বেগম। তিনি জানান, অফিসের কাজে বাইরে থাকায় তাঁর স্বামীকে প্রায় প্রতিদিনই হোটেল-রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেতে হয়। দুই দিন আগে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়।

নুরুল আবছারের অসুস্থতার কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে তাঁর মতো চট্টগ্রাম নগরের অনেক মানুষই প্রতিদিনের খাবারের জন্য হোটেল-রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভর করেন। কর্মজীবী মানুষের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও নানা কাজে নগরে আসা লোকজনও এসব প্রতিষ্ঠানে খাবার খান।

সম্প্রতি নগরের বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় সরকারি সংস্থার অভিযানে খাবার তৈরি ও সংরক্ষণে নানা অনিয়ম ধরা পড়েছে। কোথাও খাবারের উপকরণে পাওয়া গেছে জীবিত ও মৃত তেলাপোকা, কোথাও রান্নাঘরে পোকামাকড়ের বিচরণ। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে খোলা ডাস্টবিনের পাশে রান্না, কাঁচা ও রান্না করা মাংস একসঙ্গে সংরক্ষণ এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরির চিত্রও দেখা গেছে। পোড়া তেল ও মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। আবার একটি হোটেলে দেখা গেছে খাবার তৈরির স্থানে শুয়ে আছে বিড়াল।

চিকিৎসকেরা বলছেন, দূষিত খাবার খেলে ডায়রিয়া, বমি ও পেটব্যথাসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যজনিত অসুস্থতা হতে পারে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি এবং রান্নার পর সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে জীবাণুর সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানটিনে রুটির খামিরে তেলাপোকাস্যাঁতস্যাঁতে মেঝে, নোংরা ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পোকাযুক্ত বাদাম ব্যবহার করে উৎপাদন হচ্ছিল খাবার। সম্প্রতি ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারির কারখানায়

খাবারে তেলাপোকা, রান্নাঘরে অনিয়ম

গত সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে খাবারের উপকরণে জীবিত ও মৃত তেলাপোকা এবং ছারপোকার উপস্থিতি পায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। ডালডা, কিশমিশ, দুধ, মোরব্বা, তেল, মসলা ও রুটি তৈরির খামিতে এসব পোকামাকড় পাওয়া যায়। রান্নাঘর ও খাবার সংরক্ষণের স্থানও ছিল অপরিচ্ছন্ন।

অভিযানে রান্নাঘরে খোলা ডাস্টবিন রাখা এবং কাঁচা ও রান্না করা মাংস একসঙ্গে সংরক্ষণের মতো অনিয়মও ধরা পড়ে। এ ছাড়া আগস্ট মাসে নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা নগরের ব্যস্ততম জিইসি মোড়ে আল-হেলাল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে রান্নাঘরে খাবার তৈরির স্থানে বিড়াল শুয়ে থাকতে দেখেন।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর অন্তত ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে দেড় কোটি টাকার বেশি জরিমানা করা হয়েছে। খাবারে ভেজাল, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং খাদ্য তৈরিতে অননুমোদিত উপকরণ ব্যবহারের মতো অভিযোগে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জরিমানার তালিকায় সাদিয়াস কিচেন, বারকোড, হোম রেসিপি ফুডস, কাচ্চি ডাইন ও কেএফসির বিক্রয়কেন্দ্রের নামও রয়েছে।

চট্টগ্রামের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা (নগর) মোহাম্মদ ফারহান ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, খাবার তৈরির স্থান, খাদ্য উপকরণ সংরক্ষণ, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা এবং খাদ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে খাবার তৈরির স্থানে পোকামাকড়ের উপস্থিতি থাকলে খাবার দূষিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

রেস্তোরাঁর রান্না করা খাবারের ওপর তেলাপোকার বিচরণক্ষতিকর রং মিশিয়ে মিশিয়ে তৈরি হচ্ছিল খাবার। সম্প্রতি নগরের দেওয়ানহাট এলাকায় গ্রান্ড তাজমহল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে

হাসপাতালের পাশেও অনিরাপদ খাবার

১ অক্টোবর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে সিএমসি ক্যাফে ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ক্যানটিনে নানা অনিয়ম ধরা পড়ে। সিএমসি ক্যাফের ফ্রিজে কাঁচা মাছ-মাংসের সঙ্গে রান্না করা খাবার সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। কর্মচারীদের ক্যানটিনে রুটি তৈরির খামিরে পাওয়া যায় তেলাপোকা।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, হাসপাতালের মতো জায়গায় খাবার তৈরি ও সংরক্ষণে অনিয়ম রোগী ও তাঁদের স্বজনদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কাঁচা মাছ-মাংসের সঙ্গে রান্না করা খাবার রাখলে এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি করলে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবদুর রব প্রথম আলোকে বলেন, দূষিত খাবার খেলে ও দূষিত পানি পান করলে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিভিন্ন ধরনের খাবার খাওয়ার পাশাপাশি সেগুলো কোথায় ও কী পরিবেশে তৈরি হচ্ছে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। খাবার তৈরির স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। তাই শুরু থেকেই পর্যাপ্ত খাবার স্যালাইন ও নিরাপদ পানি পান করা জরুরি। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

চট্টগ্রামে কাচ্চি ডাইনের রান্নাঘরে ইঁদুর-তেলাপোকা, ৩ লাখ টাকা জরিমানা

Read full story at source