ভালো থেকো, লিও

· Prothom Alo

বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন লিওনেল মেসি। তাঁকে নিয়ে এক ভক্তের লেখা।

Visit casino-promo.biz for more information.

কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের কখনো দেখা হয় না। তাঁরা জানেনও না, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কেউ তাঁদের আনন্দে খুশি হয়, তাঁদের মন খারাপ হলে নিজেও বিষন্ন হয়ে পড়ে। অথচ সেই মানুষগুলোই কখনো কখনো আমাদের জীবনের গল্পের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে যায়। আমার জীবনে সেই মানুষটির নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

ভাবছি, লেখাটা কীভাবে শুরু করলে পরিপূর্ণ শোনাবে। কিন্তু ভাবনাগুলো দলা পাকাচ্ছে। মন খারাপ হচ্ছে। জীবনের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া একটা বিশেষ অধ্যায়ের শেষ হলো আজ। আকাশি-সাদা জার্সিতে মেসির শেষ খেলা। যতটা সহজে কথাটা লিখছি, বাস্তবটা ততটাই কঠিন হয়ে ধরা দিচ্ছে। মেসিকে আর খেলতে দেখবো না? ভাবলেই কেমন একটা শূন্যতা ভর করছে। এতোটা আবেগ কীভাবে আসে একজন ভিনদেশি মানুষের জন্য? কী হয় মেসি আমার?

উত্তরটা খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০০৬ সালে। ফুটবলের সঙ্গে তখন আমার দূরদূরান্তেরও কোনো সম্পর্ক ছিল না। পারিবারিক সূত্রে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের একটা দল বেছে নেওয়ার গল্পও আমার ছিল না। বরং কাকতালীয়ভাবেই মেসির সঙ্গে আমার পরিচয়। ছোটবেলায় বোর্ডিং স্কুলে পড়ার সুবাদে বেশ কড়া নিরাপত্তার মধ্যে থাকতাম। মোবাইল ফোন বা কোনো ডিভাইস, গল্পের বই, ম্যাগাজিন কিংবা টেলিভিশন—কিছুই দেখার সুযোগ ছিল না। সেই বছর ছুটিতে বাড়ি গিয়ে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে এলাম হোস্টেলে লুকিয়ে। ভেতরে কী আছে, তাও জানতাম না। তারপর একদিন সেই ম্যাগাজিন খুলে প্রথম পাতায় আবিষ্কার করলাম বাদামি চুলের ১৮ বছরের এক আর্জেন্টাইন তরুণকে। ১৩ বছরের কিশোরী আমার এটাই জীবনের প্রথম 'ক্রাশ'। মজার ব্যাপার হলো, মেসিকে নিয়ে আমার প্রথম অনুভূতিটা ফুটবল থেকে আসেনি, এসেছিল ম্যাগাজিনের ছবিটা থেকে। সে বয়সে বান্ধবীরা হিন্দি সিনেমার হিরোর ভিউকার্ড জমাতো আর আমি এক আর্জেন্টাইন ছেলের । তখন থেকেই মেসিকে অনুসরণ করা শুরু আমার । মেসির খেলা দেখবো বলে হোস্টেল সুপারকে মিথ্যা কথা বলে বাড়ি চলে যাওয়া, লুকিয়ে বাগানে বসে খেলা দেখে ডেঙ্গু বাধানো, প্রথম আলোর খেলার পাতা থেকে মেসির সব ছবি কেটে ফেলা—সবই ছিল পাগলামির চূড়ান্ত।

যে ছবি দেখে মেসিকে চিনেছিলাম

সেই বয়সে নিজের ভালো লাগার পক্ষে কোনো যুক্তি খুঁজতে হয় না। মেসির জন্মস্থান রোজারিও। আর আমার পদবিও রোজারিও। মেসি খেলে ইন্টার মায়ামিতে, যে ক্লাব ফ্লোরিডা শহরে, আর আমার নাম? ওটাই! কী কাকতাল! ভাবলে হাসি পায়, আনন্দও হয়। ফুটবলের প্রতি আমার ভালোবাসাটা মেসির জন্যই—এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই। আজ এত বছর পর বুঝি, কৈশোরের সেই ভালো লাগার সঙ্গে সঙ্গে আমার নিজের একটা জগতও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সত্যি বলতে, আমি মেসিকে দেখতে দেখতে বড় হয়েছি, অভ্যস্ত হয়েছি । এই বিশ বছরের অভ্যস্ততার ঘোর কাটানো কঠিন।

এই দীর্ঘ জার্নিতে মেসিকে নিয়ে নানা গল্প জমে গেছে, সব কী আর লিখে বুঝানো যায় ! তবু কিছু পাগলামির গল্পও ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় রাত। মেসির হাতে বিশ্বকাপ ওঠার মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, স্কুলজীবন থেকে যে ছেলেটাকে দেখে এত পাগলামি শুরু হয়েছিল, তার জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটার সাক্ষী হতে পারলাম আমি। মনে হয়েছিল, এবার বুঝি গল্পটা পূর্ণ হলো। তবে আর্জেন্টিনার অনেক মানুষের মতো আমিও ‘কাবালা’ (কুসংস্কার) বিশ্বাস করি। ২০২২ বিশ্বকাপে তাই কিছু নিয়ম মেনে চলতাম। যেমন, একা খেলা দেখব, ঘরে কেউ থাকবে না—এ রকম আরও কত কী!

আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স ফাইনালের শেষ ৩০ মিনিট আমি খেলা দেখিনি। ল্যাপটপ বন্ধ করে বাইবেল নিয়ে বসেছিলাম প্রার্থনায়। প্রার্থনাটা ছিল অদ্ভুত। ‘আমার জীবন থেকে এক বছর নিয়ে নাও, এর বিনিময়ে মেসিকে জিতিয়ে দাও। ও এটা ডিজার্ভ করে। প্লিজ, ২০১৪ সালের মতো কিছু যেন না হয়।’

লিওনেল মেসি

বিষয়টা আমার কাছে এতটাই সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিল যে, মনে মনে সত্যিই নিজের জীবন থেকে এক বছর দিয়ে দিয়েছিলাম। শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু আমি সত্যিই ভয়ে ফাইনালটা দেখিনি। তারপর মেসি জিতে গেলো। মনে হলো, আমিও জিতে গেলাম। সারারাত ঢাকা শহর ঘুরেছি। রাস্তায় তখন বিজয় মিছিলের আনন্দ। মেসি যেন সবার হয়ে গেছে। পরে অবশ্য সেই ফাইনাল খেলা আমি অসংখ্যবার দেখেছি।

আর এবারের ফাইনাল? সেটা শুরু হওয়ার ১৫ মিনিট পর থেকে আর দেখিনি। পরেও দেখিনি। সাহস হয়নি, কেন জানি না। শুধু কি ফাইনাল? আর্জেন্টিনা-মিশরের ম্যাচে বাইরে সবাই চিৎকার করছে গোল! গোল! আর্জেন্টিনার না, মিশরের। আমি তখন টিভি রেখে অন্য রুমে গিয়ে ভয়ে বাইবেল জড়িয়ে জপছি, আর্জেন্টিনাকে তুমি জিতিয়ে দাও! আর্জেন্টিনাকে তুমি জিতিয়ে দাও।

তাতেও ক্ষান্ত হইনি। ডায়রি বের করে পাতার পর পাতা লিখে গেছি, আর্জেন্টিনা জিতে গেছে। আর্জেন্টিনা জিতে গেছে! তারপর আর্জেন্টিনা জিতে গেলো। সে কী আনন্দ!

আমি জানতাম, মেসিকে একদিন থামতে হবে। ঠিক যেমনটা ভেবেছিলাম, স্পেনের সঙ্গে ফাইনালে সেটাই ছিল মেসির শেষ ম্যাচ। কিন্তু শেষ হয়েও কি শেষ হয়? এ তো মেসি। কী অদ্ভুত এক যাদুর বলয়ে আটকে রেখেছে সব প্রজন্মকে। কিন্তু এবার সত্যিই শেষ হচ্ছে সব। আজ সেই দিন, আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবার মাঠে নামলেন মেসি। মেসি আর আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলবে না—এই সত্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার, আমাদের হয়তো অনেকটা সময় লাগবে।

মাঝেমধ্যে সত্যিই মনে হয়, উচ্চতার শিখরে পৌঁছানোর জন্য যা কিছু করা সম্ভব, মেসি তার সবই অর্জন করেছে। তবু সবার থেকে সে আলাদা অন্য একটা কারণে—মানুষ হিসেবে তাঁর বিনয়, তাঁর সংবেদনশীলতা আর শিশুসুলভ আবেগ। তা না হলে কেউ এভাবে ডায়েরির তিনটি পাতায় নিজের অবসরের ঘোষণা দিতে পারে ? অবশ্য মেসি সবই পারে। তাই এই জীবন্ত কিংবদন্তির বিদায়টাও যেন রাজকীয়।

মেসি হয়তো জানবেন না, আজ পৃথিবীর কত মানুষের মন খারাপ। হয়তো এই খারাপ লাগাটা অনেক দিন থাকবে। হয়তো কারও কারও সঙ্গে সারাজীবন। মেসি হয়তো কোনো দিন জানবেও না, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একজন মানুষ তাঁর এই বিদায়ের সঙ্গে নিজেও যেন অবসর নিয়ে ফেলেছে। ২০০৬–২০২৬। বিশ বছর। একটা মানুষকে দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাওয়ার বিশ বছর। একটা ভালোবাসাকে নিজের জীবনের অংশ করে ফেলার বিশ বছর। ভালো থেকো, লিও। আমার ছোটবেলার প্রেমিক।

Read full story at source