চিকিৎসক থেকে ক্যানসার রোগী, ‘স্তনের যে চাকাটিকে নিরীহ ভেবেছিলাম’

· Prothom Alo

একজন চিকিৎসক যখন নিজেই সেই রোগে আক্রান্ত হন, যে রোগের চিকিৎসা তিনি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন, তখন অভিজ্ঞতাটি আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না। বদলে যায় রোগীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন, এমনকি জীবনকে বোঝার ভাষাও। এটি একজন স্তন ক্যানসারজয়ীর নিজের গল্প।

সেই সময়টা আমার জীবনের খুব ব্যস্ত একটি অধ্যায়। পেশাগত জীবন ভালো চলছিল, একাডেমিক কাজ এগোচ্ছিল। একই সঙ্গে ভাবছিলাম—প্লাস্টিক সার্জারির মধ্যেই আরও সুপার-স্পেশালাইজড হতে চাই; কিন্তু কোন ক্ষেত্রটি হবে আমার নিজের? হ্যান্ড সার্জারি, মাইক্রোসার্জারি, নাকি ব্রেস্ট সার্জারি?

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ব্রেস্ট সার্জারির প্রতি আগ্রহ অবশ্য আগে থেকেই ছিল। আমার প্রাইভেট প্র্যাকটিসের অর্ধেকেরও বেশি রোগী আসতেন স্তন-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে। তারপরও মনে হতো, নারী চিকিৎসক হিসেবে ব্রেস্ট সার্জারিতে অনেকেই এগিয়ে আসবেন; আমি বরং হ্যান্ড সার্জারিকে নিজের বিশেষায়িত ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিই। আমাদের দেশে তখনো এই ক্ষেত্রটি তুলনামূলকভাবে অবহেলিত। তাই আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক অভিজ্ঞতার সুযোগ খুঁজছিলাম।

কিন্তু জীবন তখন আমার জন্য অন্য এক শিক্ষা প্রস্তুত করে রেখেছিল। ব্রেস্ট সার্জারি এবার আমাকে চিকিৎসক হিসেবে নয়—রোগী হিসেবে শিখতে হবে।

স্তনের যে চাকাটিকে নিরীহ ভেবেছিলাম

২০১৯ সাল থেকেই আমার স্তনে একটি ছোট চাকা ছিল। সেটিকে আমি নিরীহ বলেই জানতাম। পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ হিসেবে আলট্রাসাউন্ড গাইডেড এফএনএসি করা হয়েছিল এবং রিপোর্ট এসেছিল ফাইব্রোসিস্টিক ডিজিজ। তাই খুব একটা উদ্বিগ্ন ছিলাম না।

বরং ২০২০ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় একটি হ্যান্ড সার্জারি কনফারেন্সে যাওয়া নিয়েই বেশি উৎসাহিত ছিলাম। তবে মাঝেমধ্যে নিজেই স্তনের গোটাটি পরীক্ষা করতাম। অস্ট্রেলিয়ায় থাকতেই একদিন মনে হলো, এর একটি অংশ যেন আগের চেয়ে একটু শক্ত। দুই স্তনরোগবিশেষজ্ঞ বন্ধুর সঙ্গে কথা বললাম। ঠিক করলাম, দেশে ফিরে এটি অস্ত্রোপচার করব।

তারপর হঠাৎ পৃথিবীটাই বদলে গেল। কোভিড-১৯-এর কারণে কনফারেন্স নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে গেল। দেশে ফিরলাম এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার মধ্যে—চারদিকে অসুস্থতা, মাস্ক ও পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্টের সংকট, ভয় আর ব্যস্ততা। নিজের অপারেশনের পরিকল্পনাও পিছিয়ে গেল।

আজ ফিরে তাকিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করি—রোগীটি যদি আমি না হয়ে আমার কোনো রোগী হতেন, আমি কি শুধু এফএনএসির ওপর নির্ভর করতাম? সম্ভবত না। আমি কোর বায়োপসি করতে বলতাম।

কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে অপেক্ষা করেছি। সেখান থেকেই একটি কঠিন শিক্ষা—চিকিৎসক হওয়া মানেই নিজের অসুস্থতার ক্ষেত্রে সব সময় বেশি নিরপেক্ষ হওয়া নয়। কখনো কখনো রোগীর জন্য যে সতর্কতা আমরা দেখাই, নিজের বেলাতেই সেটি হারিয়ে ফেলি।

একটি রিপোর্ট বদলে দিল সবকিছু

কোভিড-১৯-এর কঠিন সময়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনজন অ্যাডভান্সড ব্রেস্ট ক্যানসার রোগীকে দেখে মনে হলো—নিজের স্তনের গোটাটি আর ফেলে রাখা ঠিক হবে না। এবার কোর বায়োপসি করালাম।

তিন দিন পর প্যাথলজিস্ট বন্ধু জানালেন, বেশির ভাগ কোর-এ ফাইব্রোসিস্টিক চেঞ্জ থাকলেও একটি অংশে অস্বাভাবিক পরিবর্তন রয়েছে। একজন সিনিয়র প্যাথলজিস্টের রিভিউতে ব্রেস্ট ক্যানসারের সম্ভাবনা উঠে এল।

তবু মনে বিশ্বাস ছিল—শেষ পর্যন্ত হয়তো এটি ফাইব্রোসিস্টিক ডিজিজ-ই প্রমাণিত হবে। কিন্তু পরদিন আলট্রাসাউন্ড, ম্যামোগ্রাম এবং পরে ব্রেস্ট এমআরআই—একটির পর একটি পরীক্ষায় সন্দেহ আরও জোরালো হতে থাকল।

তারপর নিজের নামের পাশে লেখা দেখলাম—“স্তন ক্যানসার”।

মন খারাপের চেয়েও যেন একধরনের শূন্যতা।

যে রোগ হাজারবার বই, পত্রিকা ও সাময়িকীতে পড়েছি, যে রোগের শত শত রোগীর অপারেশন করেছি—আজ সেই রোগ আমার নিজের রিপোর্টে।

তবু মনের এক কোণে বলছিলাম—না, আমার ক্ষেত্রে হয়তো তা নয়। এখন বুঝি, সেটাই হয়তো বাস্তবতাকে মেনে নিতে না চাওয়া।

তবে আমার ভেতরে আশাও ছিল। ১০ বছর আগে বাবার স্টেজ-৩ ক্যানসার চিকিৎসার সংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছি; আলহামদুলিল্লাহ, তিনি ভালো আছেন। মনে হয়েছিল—সত্যিই যদি আমার ক্যানসার হয়, ইনশা আল্লাহ আমিও ভালো থাকব।

চিকিৎসক থেকে রোগী

আমার স্বামী এবং কাছের দুই সহকর্মী ও বন্ধু ব্রেস্ট সার্জনকে নিয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন সিনিয়র সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট স্যারের কাছে গেলাম। রিপোর্ট ও সম্ভাব্য অপারেশন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো। সিদ্ধান্ত হলো, পরদিন ফ্রোজেন সেকশনের সুবিধাসহ সার্জারি হবে।

অপারেশনের পর পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ধীরে ধীরে যখন চেতনা ফিরছিল, দিন না রাত বুঝতে পারছিলাম না। নার্সকে ডাকতে চেষ্টা করছি, কিন্তু কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। কয়েকবারের চেষ্টায় তাঁরা শুনলেন। স্বামীকে ডেকে দিতে বললাম। গভীর রাত হওয়ায় তাঁরা রাজি হলেন না।

সার্জন হিসেবে তখন বিরক্ত লাগছিল—আমি বলছি, অথচ আমার কথাটা কেন গুরুত্ব পাচ্ছে না?

কিন্তু রোগী হিসেবে সেই কয়েকটি মুহূর্ত আমাকে এমন কিছু শিখিয়েছিল, যা কোনো পাঠ্যপুস্তক শেখাতে পারেনি। একজন রোগীর অসহায়ত্ব কেমন, কথা বলতে চেয়েও নিজের কথা পৌঁছাতে না পারা কতটা কষ্টের, আর সেই সময় পাশে কেউ মন দিয়ে শুনছে—এটুকু কত গুরুত্বপূর্ণ, সেদিন নিজে অনুভব করেছিলাম।

শেষ পর্যন্ত রিপোর্টে ব্রেস্ট ক্যানসারই ধরা পড়ল। স্বস্তির বিষয় ছিল, টিউমার বায়োলজি তুলনামূলকভাবে ভালো। এরপর কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি নিতে হলো। প্রায় সাত মাসের চিকিৎসাযাত্রা শেষে আমি ক্যানসারমুক্ত হলাম।

এই সাত মাস আমাকে শুধু ক্যানসারের চিকিৎসা শেখায়নি; রোগীর চোখ দিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থাকে দেখতে শিখিয়েছে।

বদলে গেল আমার চিকিৎসা-দর্শন

নিজের ক্যানসার-যাত্রা স্তন ক্যানসার সম্পর্কে আমার ধারণাকে চারদিক থেকে সমৃদ্ধ করেছে। আগে রোগটিকে দেখতাম মূলত চিকিৎসকের চোখে; এখন রোগীর দিক থেকেও দেখতে শিখেছি। আর তার সঙ্গে বদলেছে আমার ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস।

এখন কোনো স্তনে গোটা সন্দেহজনক মনে হলে প্রয়োজন অনুযায়ী আলট্রাসাউন্ড, ম্যামোগ্রাম এমনকি এমআরআই করাতেও দ্বিধা করি না। কোনো দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক গোটাকে শুধু “ফাইব্রোসিস্টিক” ভেবে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করি না। কোর বায়োপসি ছাড়া ব্রেস্ট ক্যানসার সার্জারির সিদ্ধান্তেও যাই না।

আমার নিজের টিউমার বায়োলজি ছিল ইআর/পিআর পজিটিভ এবং এইচইআর২ নেগেটিভ। নিজের অভিজ্ঞতা আমাকে আরও গভীরভাবে বুঝিয়েছে—চিকিৎসার আগে ক্যানসারের বায়োলজি জানা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি বিষয় এখন আমার কাছে অপরিহার্য—মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ড। ক্যানসারের চিকিৎসা একজন চিকিৎসকের একক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। অথচ নিজের ক্ষেত্রে শুরুতে অনেক সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।

এখন চিকিৎসা শুরু করার আগেই রোগী ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সম্ভাব্য পুরো চিকিৎসার যাত্রা নিয়ে কথা বলি—কেন কোন চিকিৎসা লাগতে পারে, সামনে কী হতে পারে, জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ, রোগীর এগুলো জানা দরকার এবং জানার অধিকারও তাঁর আছে।

বগলের সার্জারি হলে হাতের দীর্ঘমেয়াদি যত্ন সম্পর্কে রোগীকে শেখাই। কম বয়সী রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরুর আগেই প্রজনন অর্থাৎ—ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের সক্ষমতা—নিয়ে আলোচনা করাকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

রোগীর প্রয়োজন করুণা নয়, সহমর্মিতা

ক্যানসার জয়ের জন্য একজন রোগীর প্রয়োজন সঠিক তথ্য, সম্মান, সাহস, একটি দক্ষ চিকিৎসক দল এবং একজন নির্ভরযোগ্য পরিচর্যাকারী। সেই তিনি হতে পারেন মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী কিংবা কাছের কোনো বন্ধু—যিনি পুরো যাত্রায় পাশে থাকবেন।

আর কোনো রোগীই এখন আমার কাছে শুধু একটি ক্যানসার শনাক্তকরণের বিষয় নয়। তাঁর পরিবার আছে, সম্পর্ক আছে, স্বপ্ন আছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর নিজের পরিকল্পনা আছে। তাই চিকিৎসা পরিকল্পনায় শুধু ক্যানসারটিকে দেখলে হবে না; মানুষটির জীবন ও ভবিষ্যৎকেও দেখতে হবে।

ক্যানসারজয়ীরা শোনালেন সুস্থ হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা

নিজের জন্য সাতটি শিক্ষা

এই যাত্রা আমাকে নিজের জীবনকেও নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে—নিজের প্রয়োজনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে না দেওয়া, প্রতিটি দিনের মূল্য বোঝা, কাজ পরিকল্পনা করে করা, অপ্রয়োজনীয় চাপ কমানো, নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকা, প্রয়োজনে সাহসের সঙ্গে ‘না’ বলা এবং দরকার হলে অন্যের সাহায্য নিতে শেখা।

এগুলো এখন আর আমার কাছে কিছু ভালো উপদেশ নয়; নিজের জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা।

ক্যানসারের চিকিৎসা যত মসৃণভাবেই হোক, চিকিৎসা শেষে জীবন ঠিক আগের অবস্থায় হুবহু ফিরে যায় না। কিন্তু জীবন বদলে যাওয়া মানেই জীবন কম সুন্দর হয়ে যাওয়া নয়। সেই পরিবর্তনকে গ্রহণ করেই জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে নিতে হয়।

আমরা প্রায়ই ভাবি—ডিগ্রিটা শেষ হোক, প্রমোশনটা হোক, সন্তান একটু বড় হোক, আর্থিক নিরাপত্তা আসুক; তারপর ভালোভাবে বাঁচব।

আমিও হয়তো একসময় এভাবেই ভাবতাম।

ক্যানসার আমাকে শিখিয়েছে—জীবন কোনো ভবিষ্যৎ গন্তব্যে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে নেই। সেই গন্তব্যের দিকে প্রতিদিন যে পথটুকু আমরা হেঁটে চলেছি, সেই যাত্রাটিই আসলে জীবন।

আজ আমি একজন স্তন ক্যানসারজয়ী। একই সঙ্গে একজন চিকিৎসক ও সার্জন। এই অভিজ্ঞতা আমাকে আমার রোগীদের আরও কাছে নিয়ে এসেছে। আগে তাঁদের ক্যানসারকে চিকিৎসকের চোখ দিয়ে দেখতাম; এখন তাঁদের নীরব ভয়, অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা, আশা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকেও অনেকটা রোগীর চোখ দিয়ে অনুভব করতে পারি।

হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটিই—ক্যানসার আমার জীবনের একটি অধ্যায়—পুরো জীবন নয়।

জীবনকে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখা যায় না। জীবন বাঁচতে হয় আজ—প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত, এই চলমান যাত্রার মধ্যেই।

আমার অঙ্গীকার

স্তন ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা একজন মানুষ ও চিকিৎসক হিসেবে আমি বুঝেছি—ক্যানসারের চিকিৎসায় শুধু সঠিক চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত সেবা, সহমর্মিতা এবং চিকিৎসার পুরো সময়জুড়ে রোগীর পাশে থাকা।

এই বিশ্বাস থেকেই চট্টগ্রামে একটি অলাভজনক, মানবিক ও বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্নের উদ্যোগ ‘চট্টগ্রাম কল’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। নিজের অভিজ্ঞতা ও চিকিৎসক হিসেবে অর্জিত শিক্ষা দিয়ে এই উদ্যোগের পাশে থাকতে চাই।

চট্টগ্রাম কল—আমাদের ক্যানসার সেন্টার, আমাদের সম্মিলিত স্বপ্ন।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, প্লাস্টিক সার্জারি, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), ঢাকা

Read full story at source