জাতীয় সংস্কৃতির কল্পনা

· Prothom Alo

আবুল মনসুর আহমদকে নতুন করে পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে রোচনা মজুমদারের বই আবুল মনসুর আহমদের পূর্ব বাংলা । ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও আত্মপরিচয় নিয়ে তাঁর ভাবনাকে শুধু পূর্ব বাংলার ইতিহাসের ভেতর নয়, বৃহত্তর বৈশ্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছে বইটি। বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে মৌখিক বক্তৃতা করেন তৈমুর রেজা। এখানে তাঁর বক্তব্য প্রকাশিত হলো।

Visit newsbetting.cv for more information.

রোচনা মজুমদারের আবুল মনসুর আহমদের পূর্ব বাংলা বইটি দুটো দৃষ্টিকোণ থেকে খুব তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, এখানে আবুল মনসুর আহমদের চিন্তায় পূর্ব বাংলার ভাষিক ও সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য একটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁকে নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আবুল মনসুর আহমদের চিন্তার বিচারের ক্ষেত্রে এটিই সম্ভবত প্রথম গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। তাঁকে বোঝার জন্য এই বিচার জরুরি। কারণ, তিনি বিশ্বের সমসাময়িক চিন্তাভাবনার সঙ্গে খুবই পরিচিত ছিলেন এবং সেসব চিন্তাধারাকে নিজের চিন্তা তৈরি করার কাজে ব্যবহার করতেন। রোচনা মজুমদার আবুল মনসুরের চিন্তার এই উপেক্ষিত দিকটা তুলে ধরেছেন।

বইটার দ্বিতীয় গুরুত্ব এখানে যে আবুল মনসুর আহমদের চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ থিসিস এখানে বিশদ করা হয়েছে। থিসিসটি হলো: রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা বাঙালি মুসলমান জাতিসত্তার পূর্ণতার জন্য যথেষ্ট নয়। যে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশ যেটি পেয়েছে ১৯৭১ সালে, তার আগে পাকিস্তান পেয়েছিল ১৯৪৭ সালে, সেই রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের পাশাপাশি বাঙালি মুসলমানকে কৃষ্টিক স্বকীয়তাও অর্জন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং কৃষ্টিক স্বকীয়তা—এই দুইয়ের যোগসূত্রেই কেবল সত্যিকারের স্বাধীনতা আসতে পারে।

বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের সম্পর্ক কী? এই প্রশ্নের যে উত্তর আবুল মনসুর আহমদ দিয়েছেন, তার একটা চেনা রূপ হচ্ছে ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে বিতর্কে দেওয়া তাঁর মতামত। তিনি এ বিষয়ে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, তার পেছনে আমেরিকান জাতীয়তাবাদী লড়াই থেকে তিনি যা শিখেছিলেন, সেটির একটা ভূমিকা আছে। আঠারো শতক থেকে শুরু করে বিশ শতক অবধি কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকান বুদ্ধিজীবী, ভাবুক, সাহিত্যিক—যেমন নোয়া ওয়েবস্টার, জন টুক, রালফ এমারসন—আমেরিকার ‘কালচারাল সভরেনটি’ কীভাবে অর্জন করা যাবে, তা নিয়ে ভেবেছিলেন।

সেই আলাপে ঢোকার আগে বলে রাখা দরকার যে বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির সম্পর্কের প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠার পেছনে আছে বাঙালি মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনধারার কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, যা অনেক দিন ধরেই বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন হয়ে ছিল। উদাহরণ হিসেবে ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত মৌলবি নইমুদ্দীনের জোব্দা তোল্ মাছায়েল্ বইটি দেখা যাক। শরিয়াহর হুকুম-আহকাম বিষয়ে আধুনিক গদ্যে লেখা এটা প্রথম বহুল পঠিত বই। তিনি লিখেছেন, ‘সরার [শরিয়তের] নিয়মগুলা…আরবি ভাষাতে বিস্তার রূপে’ লেখা; তবে অধুনা ‘গবর্দ্ধন বঙ্গভাষাতেও’ কিছু কিছু অনুবাদ হচ্ছে। তবে এসব অনুবাদ তার ‘অসুশ্রাব্য দোষে’ স্বদেশী গুণীগণ পড়তে চান না। আটীয়ার তৎকালীন জমিদার মাহমুদালী খাঁর আদেশে নইমুদ্দীন অতি সরল বাংলায় একটি শরিয়ার বই লিখতে বসলেন। তিনি লিখছেন, ‘আরবি-ভাষায় যে সকল শব্দগুলা বঙ্গভাষায় ভাষান্তর করা অসাধ্য বুঝিলাম এবং করিলেও অসুশ্রাব্য হয় তাহা পূর্ব্বমত রাখা গেল। যেমন ইমান, কলেমা, নামাজ, রোজা…।’

রোচনা মজুমদারের বই ‘আবুল মনসুর আহমদের পূর্ব বাংলা’র প্রচ্ছদ
রোচনা মজুমদারের বইটি থেকে দুটো উদাহরণ নিচ্ছি। ওয়েবস্টার ডিকশনারির রচয়িতা নোয়া ওয়েবস্টারের প্রস্তাব ছিল, ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি আমেরিকানদের যে অগাধ ভক্তি–শ্রদ্ধা রয়েছে, তা থেকে মুক্ত হতে হবে। ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি ভক্তি থাকলে আর আমেরিকান হওয়া যাবে না। আর জন টুক বলেছিলেন, আমরা একটি নতুন আমেরিকান ইংরেজি তৈরি করব, যার বনিয়াদ হবে অ্যাংলো-স্যাক্সন সংস্কৃতি।

পুরোনো অনুবাদগুলো অকেজো, কারণ সেগুলো প্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দের জবরদস্তি বাংলা তরজমা চালুর চেষ্টা করেছে, ফলে ভাষা সুশ্রাব্য হয়নি। নইমুদ্দীন তাই শব্দগুলো মূল আরবি-ফারসিতেই রাখছেন। কারণ, তেমন করা গেলেই বরং বাঙালি মুসলমান পাঠক সহজে সেগুলো বুঝতে পারবেন। অর্থাৎ বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতির মধ্যেই এমন কিছু অনুষঙ্গ আছে, যা প্রকাশ করতে গেলে বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দের প্রচলন রাখতে হবে। জোরাজুরি করে বাংলা করতে গেলেই বরং সেটা শ্রুতিমধুর হবে না, আর ভাষাটা লোকের কাছে লাগবে অচেনা। কিন্তু ফোর্ট উইলিয়ামের পণ্ডিতেরা যে সংস্কৃত-বহুল বাংলার ছাঁচ তৈরি করছিলেন, সেখানে আরবি-ফারসির প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ।

বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্কের এই এক আদি প্যারাডক্স। মীর মশাররফ হোসেন বিষাদ-সিন্ধু লেখেন সংস্কৃত-বহুল বাংলায়, মূল আরবি-ফারসি শব্দ ফুটনোটে নামিয়ে রেখে। সে রকম করেছিলেন বলেই তাঁর বইটি সাহিত্য-মহলে সমাদর পেয়েছিল। ভালো বাংলা লেখার সুনাম পেতে হলে এমন একটি বাংলা লিখতে হবে, যেটা হবে মুসলিম পাঠকদের কাছে অচেনা; আর মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলা লিখতে হলে সেটা হবে অশুদ্ধ বাংলা। ঠিক এই সমস্যাটা নিয়েই সচেতন ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। এই ‘মুসলমানি’ বাংলা লিখতে গিয়ে নিজের ভোগান্তির কথাও তিনি লিখেছেন আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর বইয়ে। তাঁর চেষ্টা ছিল এমন বাংলা ভাষার কল্পনা, যা হবে যুগপৎ উৎকৃষ্ট বাংলা, যা আবার মুসলমানের অভিজ্ঞতাও ধরতে পারবে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে পূর্ব পাকিস্তানের ‘কৃষ্টীয় স্বকীয়তা’ অর্জনের জন্য আবুল মনসুর আহমদ মুসলমানের ভাষার এই স্বাতন্ত্র্যকে একটি বনিয়াদ হিসেবে দাঁড় করান। এই কাজে তাঁর সহায় ছিল আমেরিকার অভিজ্ঞতা। আমেরিকান জাতীয়তাবাদীদের সামনে মূল প্রশ্ন ছিল: আমেরিকা ও তার মাতৃরাষ্ট্র ব্রিটেন। এই দুই দেশের ভাষাই ইংরেজি। আঠারো-উনিশ শতকে ব্রিটেন প্রায় সর্বাথে আমেরিকার তুলনায় শ্রেষ্ঠ ছিল। ফলে আমেরিকানদের একটা উদ্বেগ ছিল: ব্রিটেন এবং আমাদের ভাষা যদি অভিন্ন হয়, তাহলে আমেরিকার ‘কালচালার সভরেনটি’ কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে? কীভাবে ইংরেজি বলেও আমরা ‘অ-ইংরেজ’ বা ‘আমেরিকান’ হতে পারি?

রোচনা মজুমদারের বইটি থেকে দুটো উদাহরণ নিচ্ছি। ওয়েবস্টার ডিকশনারির রচয়িতা নোয়া ওয়েবস্টারের প্রস্তাব ছিল, ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি আমেরিকানদের যে অগাধ ভক্তি–শ্রদ্ধা রয়েছে, তা থেকে মুক্ত হতে হবে। ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি ভক্তি থাকলে আর আমেরিকান হওয়া যাবে না। আর জন টুক বলেছিলেন, আমরা একটি নতুন আমেরিকান ইংরেজি তৈরি করব, যার বনিয়াদ হবে অ্যাংলো-স্যাক্সন সংস্কৃতি। অর্থাৎ অভিজাত ব্রিটিশদের ইংরেজির বিপরীতে একটি নতুন আমেরিকান ইংরেজি, যেটা উঠে আসবে অ্যাংলো-স্যাক্সন আমজনতার অভিজ্ঞতার জগৎ থেকে। এই নতুন ভাষা হবে অভিজাত সংস্কৃতি থেকে দূরের, গণমানুষের কাছের। এই পথেই আমেরিকা তার কৃষ্টিক স্বকীয়তা কায়েম করবে।

আবুল মনসুর আহমদ ভাবতেন, বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতির একটা সুরক্ষিত ঘর আছে, যার নাম পশ্চিমবঙ্গ। বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতির জন্য একটি নতুন ঘর হয়েছে, যেটা পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গ। অথচ আজকের দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে আমরা লক্ষ করব, ইত্যবসরে এখানে বিরাট এক পালাবদল ঘটে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এখন কোণঠাসা। বিপরীতে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা।

ব্রিটেন-আমেরিকার এই দ্বৈরথের মধ্যে আবুল মনসুর আহমদ পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের ভিন্নতার একটা ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। এখানেও দেশ দুটো, কিন্তু ভাষা অভিন্ন। তাঁর মতে প্রচলিত বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য আসলে বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতি। তাঁর প্রস্তাব হলো, বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি হবে এর থেকে আলাদা। ব্রিটিশ-অ্যাংলো–স্যাক্সন সংস্কৃতির দ্বন্দ্বের মতোই তিনি দেখেছিলেন ‘মিনার’ আর ‘খামার’ বাংলা; মিনার–বাংলা অভিজাত, খামার–বাংলা সাধারণ মানুষের মুখের লব্জের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

এই বিতর্ক পুনর্গঠনের মাধ্যমে রোচনা মজুমদার একটি তাৎপর্যপূর্ণ কাজ করেছেন। বাংলা সাংস্কৃতিক জাতীয়তার যে গোড়ার কথা—দেশভাগ হয়ে গেলেও একটি অভিন্ন বাঙালি সংস্কৃতি আছে—আবুল মনসুর আহমদের এই যুক্তি সেটাকে খারিজ করে দিচ্ছে।

আবুল মনসুর আহমদের এই যুক্তি আমরা আজকের দিনে কীভাবে পড়ব? তাঁর চিন্তায় একটা মূল প্রশ্ন ছিল, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচলিত রূপে মুসলমানের মুখের লব্জ ও অভিজ্ঞতা বাদ পড়া। প্রচলিত বাংলা যেহেতু হিন্দু বাংলা, ফলে মুসলমানের জন্য চাই আলাদা বাংলা; যে বাংলার ওপরে নির্মিত হবে কৃষ্টিক স্বকীয়তার সৌধ। ১৯৬৭ সালে যখন রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথের কিছু গান নিষিদ্ধ করার সূত্রে প্রবল বিতর্কের ঝড় উঠল, সে রকম একটি প্রেক্ষাপট থেকে আবুল মনসুর আহমদ লিখেছিলেন, পাকিস্তানের বঙ্গভাষীদের যে সাংস্কৃতিক পরিচয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। কিন্তু আজকের দিনে যখন বাঙালি মুসলমানের স্বকীয়তার প্রশ্ন আবার নতুন করে বাংলাদেশে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন এই আলাপটাকে আমরা কীভাবে বুঝব? প্রশ্নটা যতই অস্বস্তিকর লাগুক, একে পাশ কাটিয়ে সামনে যাওয়ার রাস্তা নেই। ফলে আবুল মনসুর আহমদের প্রশ্নটাই আবার উঠছে: বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের যোগসূত্র কেমন হবে?

এ বিষয়ে দুটো প্রস্তাব দেওয়া যায়। প্রথমত, মনে রাখা দরকার, আবুল মনসুর আহমদ রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে সন্দিগ্ধ ছিলেন, কারণ তিনি মনে করতেন, রবীন্দ্রনাথের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রবেশ ঘটবে; রবীন্দ্রনাথের গান থেকে ভারতীয় আধিপত্যবাদকে আলাদা করা যাবে না। আবুল মনসুর আহমদ ভাবতেন, বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতির একটা সুরক্ষিত ঘর আছে, যার নাম পশ্চিমবঙ্গ। বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতির জন্য একটি নতুন ঘর হয়েছে, যেটা পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গ।

অথচ আজকের দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে আমরা লক্ষ করব, ইত্যবসরে এখানে বিরাট এক পালাবদল ঘটে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এখন কোণঠাসা। বিপরীতে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা।

আজ তিনি যদি আমাদের মধ্যে থাকতেন, আমার বিশ্বাস, তিনি এই পালাবদলটি খেয়াল করতেন যে পুরোনো আধিপত্যের চাপ এখন বিলীনপ্রায়। বাঙালি মুসলমানের স্বকীয়তা হারানোর ভয় আর নেই। বাংলাদেশ এখন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির নতুন কেন্দ্র। আজকের দিনে রবীন্দ্রনাথসহ বাঙালির সমগ্র ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অধিকার দাবি করে নতুন একটি জাতীয় কল্পনা সৃষ্টির কাজে হয়তো নেতৃত্ব দিতেন আবুল মনসুর আহমদ।

পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির এই পিছু হটার কারণে দুই বাংলার মধ্যকার আধিপত্যের সম্পর্ক প্রায় উবে গেছে। দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্র-প্রকল্পের যোগসূত্র—যে কারণে আবুল মনসুর আহমদ ভাবতেন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের কদর করা মানে ভারতীয় আধিপত্যবাদকে দাওয়াত করে আনা, তা–ও এখন আর সত্য নেই। রবীন্দ্রনাথ যে ভারতবর্ষের কল্পনা করেছিলেন, সেখান থেকে ভারত অনেক দূর সরে গেছে। ভারত রাষ্ট্রকে ঘিরে যে বয়ান ভারতে এখন প্রধান হয়ে উঠেছে, রবীন্দ্রনাথ সেখানে খুবই উপেক্ষিত ও গৌণ একটি চরিত্র।

এই দুই আধিপত্যের পতনের ফলে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সম্পর্ক আজ নতুনভাবে কল্পনা করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে এখন তাই ভিন্ন রকম সম্পর্ক কল্পনা করার সময় এসেছে। এই ক্ষেত্রে দুটি প্রস্তাব আমাদের সামনে ইতিমধ্যে হাজির হয়েছে। ফরহাদ মজহার রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ বইয়ে বাঙালি মুসলমানের তরফে রবীন্দ্রনাথকে আত্তীকৃৎ করার একটি তরিকার আভাস দিয়েছেন। সাজ্জাদ শরিফ তাঁর নানা আলাপে এই আত্তীকরণকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মূলত ১৯৫০–৬০ দশক থেকে পূর্ব বাংলার জনগণের স্বাধিকার ও স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস থেকে। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ও পূর্ববঙ্গের সম্পর্ক নিয়েও কিছু মূল্যবান গবেষণা হয়েছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সামনে প্রশ্ন: আমাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার জন্য কি রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিতে হবে? নাকি আজ আমাদের এ কথা উপলব্ধি করতে হবে যে বাংলাদেশই এখন হয়ে উঠেছে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সুরক্ষিত ঘর? সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার একটি ভিন্ন রাস্তা কি এখানে খুলছে, যেখানে বাংলা সংস্কৃতির প্রধান বাহক এখন বাংলাদেশ; যেখানে রবীন্দ্রনাথ ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের অনেক সন্নিকটে?

আবুল মনসুর আহমদ আজ আমাদের মধ্যে থাকলে কী বলতেন? এক অর্থে তাঁর চিন্তা-পদ্ধতিতে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের উপাদান ছিল। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর–এ প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে আবুল মনসুর আহমদ তাঁর একটি আলাপের স্মৃতিচারণা করেছেন। তিনি বলছেন, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের একটি উক্তি মনে পড়লে এখনো তিনি শিহরণ অনুভব করেন। প্রফুল্লচন্দ্র বলেছিলেন, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক খাঁটি বাঙালির ঐক্যের একটি প্রতীক, হিন্দু আর মুসলিম দুই পক্ষই যার শরিক।

এটি সেই সময়ের কথা, যখন আবুল হাশিমদের সঙ্গে মিলে আবুল মনসুর আহমদ যৌথ বাংলার স্বপ্ন দেখছিলেন, যেখানে গড়ে উঠবে বাঙালির একটি সত্যিকারের মিলিত সংস্কৃতি। অথচ দেশভাগের পর এমন কথা তিনি আর বলছেন না। একজন প্রকৃত ঐতিহাসিক বস্তুবাদীর মতো তিনি জানতেন যে চিন্তাকে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে এবং বর্তমানের সাপেক্ষে গ্রহণ করতে হয়। আজ তিনি যদি আমাদের মধ্যে থাকতেন, আমার বিশ্বাস, তিনি এই পালাবদলটি খেয়াল করতেন যে পুরোনো আধিপত্যের চাপ এখন বিলীনপ্রায়। বাঙালি মুসলমানের স্বকীয়তা হারানোর ভয় আর নেই। বাংলাদেশ এখন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির নতুন কেন্দ্র। আজকের দিনে রবীন্দ্রনাথসহ বাঙালির সমগ্র ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অধিকার দাবি করে নতুন একটি জাতীয় কল্পনা সৃষ্টির কাজে হয়তো নেতৃত্ব দিতেন আবুল মনসুর আহমদ।

  • তৈমুর রেজা: সহকারী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

  • আবুল মনসুর আহমদের পূর্ব বাংলা
    রোচনা মজুমদার

    প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
    প্রকাশ: জুন ২০২৬
    প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল
    পৃষ্ঠা: ৭২; মূল্য: ২০০ টাকা

Read full story at source