অ্যাকশনে ভরপুর এই ১০ থাই সিনেমা দেখেছেন কি
· Prothom Alo

দেশি দর্শকের কাছে কোরীয়, চীনা, মালয়েশিয়ান বা ইন্দোনেশিয়ান সিনেমা কয়েক বছর ধরেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ওটিটির প্রসারের কারণে যুক্ত হয়েছে থাই সিনেমাও। টনি জা, পানা রিত্তিকরাই, জিজা ইয়ানিন—তাঁদের হাত ধরেই বিশ্বজুড়ে নতুন পরিচয় পেয়েছিল থাইল্যান্ডের অ্যাকশন সিনেমা। নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর থেকেই আলোচনায় থাই অ্যাকশন ছবি ‘দ্য ডেবট কালেক্টর’। দুর্দান্ত মারপিট, দ্রুতগতির অ্যাকশন, বাস্তবধর্মী স্টান্ট আর মুয়াই থাইয়ের নির্মম লড়াইয়ের দৃশ্য ছবিটিকে অল্প সময়েই দর্শকদের নজরে নিয়ে এসেছে। নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকও এই ছবির মাধ্যমে আবার আবিষ্কার করছেন থাইল্যান্ডের অ্যাকশন সিনেমার আলাদা এক জগৎ। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ডেবট কালেক্টর’ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির গ্লোবাল টপ চার্টেও জায়গা করে নিয়েছিল সিনেমাটি। দেশি দর্শকের কাছে টিভির সুবাদের আগে থাই সিনেমার মধ্যে আগে কেবল ‘ওং ব্যাক’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সিনেমাগুলোই বেশি পরিচিত ছিল। সেখানে এখন যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন নাম। সেরা ১০ থাই মার্শাল আর্ট অ্যাকশন সিনেমা কোনগুলো? কোন সিনেমা দেখতে বসলে ‘পয়সা উশুল’ হবে? চলুন জেনে নেওয়া যাক—
‘ব্যাংকক অ্যাড্রেনালিন’
‘ব্যাংকক অ্যাড্রেনালিন’ সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবিগল্পের শুরুটা খুবই সাধারণ। কয়েকজন পশ্চিমা তরুণ ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে ঘুরতে আসে ব্যাংককে। কিন্তু ভুল মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তেই তাদের জীবন বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত বাঁচতে হলে একের পর এক লড়াই করে বেরিয়ে আসতে হয় বিপদ থেকে।
Visit umafrika.club for more information.
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন ব্রিটিশ উশু শিল্পী ড্যানি ও’নিল। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন পেশাদার রেসলার কোনান স্টিভেন্স, টিম ম্যান ও কাজু প্যাট্রিক ট্যাং। ছবির সবচেয়ে মজার দিক হলো, থাইল্যান্ডের অ্যাকশন সিনেমায় যেন সব সময়ই বিশাল পরিত্যক্ত গুদামঘরের অভাব হয় না। সেই গুদামই মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় মুয়াই থাই যোদ্ধাদের যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখানে উড়ে আসে লাথি, কনুই, অ্যাক্রোবেটিকস—সব মিলিয়ে অ্যাকশনপ্রেমীদের জন্য জমজমাট এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে ছবিটি।
গল্পে নতুনত্ব কম থাকলেও দ্রুতগতির অ্যাকশন আর চমৎকার ফাইট কোরিওগ্রাফির কারণে আজও ছবিটি থাই অ্যাকশন সিনেমার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
‘রেজিং ফিনিক্স’
‘রেজিং ফিনিক্স’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবিবাস্তবের মার্শাল আর্টের সঙ্গে কল্পনার মিশেল ঘটিয়ে একেবারে নতুন যুদ্ধকৌশল তৈরি করার সাহস খুব কম নির্মাতাই দেখান। সেই কাজই করেছে ‘রেজিং ফিনিক্স’। ছবিতে দেখানো হয়েছে, থাইল্যান্ডের ইতিহাসের কোনো এক সময়ে মুয়াই থাই, ড্রাঙ্কেন ফিস্ট এবং ক্যাপোইরা মিলিয়ে জন্ম নিয়েছিল এক কাল্পনিক যুদ্ধশৈলী—‘মেইরাইইউথ’।
বাস্তবে এমন কোনো মার্শাল আর্টের অস্তিত্ব নেই। কিন্তু পর্দায় জিজা ইয়ানিন ও কাজু প্যাট্রিক ট্যাং যেভাবে এই যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করেছেন, তা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য যে দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগে—ইতিহাসের বই বিশ্বাস করবেন, নাকি নিজের চোখ? নৃত্যের ছন্দ, মাতাল মানুষের ভারসাম্যহীন চলাফেরা আর মুয়াই থাইয়ের বিস্ফোরক আঘাত—সব মিলিয়ে ছবির অ্যাকশন একেবারেই আলাদা স্বাদ এনে দেয়। জিজা ইয়ানিনের গতি, নমনীয়তা এবং নিখুঁত কোরিওগ্রাফি ছবিটিকে থাই অ্যাকশন সিনেমার অন্যতম ব্যতিক্রমী উদাহরণে পরিণত করেছে।
‘ভেঞ্জেন্স অব অ্যান অ্যাসাসিন’
‘ভেঞ্জেন্স অব অ্যান অ্যাসাসিন’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবিতালিকার অষ্টম ছবিটি কিংবদন্তি থাই অ্যাকশন নির্মাতা পানা রিত্তিকরাইর। তাঁর মৃত্যুর আগে নির্মিত শেষ চলচ্চিত্র ‘ভেঞ্জেন্স অব অ্যান অ্যাসাসিন’ অনেকের কাছেই তাঁর জন্য উপযুক্ত বিদায়। পানা রিত্তিকরাই সব সময়ই নতুন কিছু করার চেষ্টা করতেন। এই ছবির শুরুতেই দর্শক এমন এক নির্মম অ্যাকশন দৃশ্য দেখেন, যা অনেকের কাছে ‘শাওলিন সকার’-এর অনেক বেশি সহিংস সংস্করণ বলেই মনে হতে পারে।
এরপর প্রায় দেড় ঘণ্টাজুড়ে ছবির চরিত্রদের শারীরিক সহ্যের সীমা কোথায়, সেটিই যেন পরীক্ষা করতে থাকেন পরিচালক। কোথাও কোথাও বাস্তবতার সীমা কিছুটা অতিক্রম করেছে ছবিটি। যেমন—বুক ভেদ করে ধারালো অস্ত্র ঢুকে যাওয়ার পরও বেঁচে থাকার দৃশ্য অনেকের কাছেই অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে।
তবে এসবের মধ্যেও ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি ড্যান চুপং। তাঁর দুর্দান্ত মার্শাল আর্টদক্ষতা, শক্তিশালী উপস্থিতি আর বিস্ফোরক ফাইট দৃশ্য ছবিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শুধু মুয়াই থাই নয়, ছবিতে রয়েছে একটি দীর্ঘ ওয়ান-শট বন্দুকযুদ্ধের দৃশ্য, যা দেখে কিংবদন্তি অ্যাকশন পরিচালক জন উও মুগ্ধ হতেন বলে মনে করেন অনেক সমালোচক।
‘বর্ন টু ফাইট’
‘বর্ন টু ফাইট’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবিহলিউডে ‘ডাই হার্ড’ ধাঁচের অ্যাকশন ছবির একটি আলাদা পরিচিতি রয়েছে। সাধারণত কোনো ভবন বা স্থাপনা সন্ত্রাসীদের দখলে চলে যায়, তারপর একজন নায়ক অসম্ভবকে সম্ভব করে সবাইকে উদ্ধার করেন। পানা রিত্তিকরাই সেই পরিচিত গল্পকেই নিয়ে গেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গায়। তাঁর ‘বর্ন টু ফাইট’ যেন ‘ডাই হার্ড ইন আ ভিলেজ’।
এখানেও প্রধান চরিত্রে আছেন ড্যান চুপং, তবে তিনি একা নন। ছবির শেষ এক-তৃতীয়াংশজুড়ে একটি পুরো গ্রাম নিজেদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ শুরু করে।
গ্রামের প্রত্যেক মানুষ নিজের দক্ষতাকেই অস্ত্র বানিয়ে ফেলে। কেউ ফুটবল খেলোয়াড়—সে ফুটবল দিয়েই শত্রুর মোকাবিলা করে। কেউ আবার পা হারিয়েও ক্রাচের সাহায্যে যুদ্ধে অংশ নেয়। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-তরুণ—সবাই একসঙ্গে লড়াইয়ে নেমে পড়ে। এই কারণেই ছবির শেষ অংশটি বিশাল আকারের এক নিরবচ্ছিন্ন অ্যাকশন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিস্ফোরণ, মারামারি, কসরত আর দলগত প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে এটি থাই অ্যাকশন সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় ক্লাইম্যাক্স।
‘অং ব্যাক ২: দ্য বিগিনিং’
‘অং ব্যাক ২: দ্য বিগিনিং’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবিথাই মার্শাল আর্ট সিনেমার কথা উঠলে যে নামটি সবচেয়ে আগে আসে, সেটি টনি জা। তবে তালিকার এই পর্যায়ে এসে তাঁর উপস্থিতি শুধু প্রত্যাশিতই নয়, বরং অবধারিত।
প্রথম ‘অং বাক’-এ মুয়াই থাইয়ের অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়ে টনি জা বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন। কিন্তু ‘অং বাক ২: দ্য বিগিনিং’-এ তিনি প্রমাণ করেন, তাঁর সামর্থ্য শুধু একটি যুদ্ধশৈলীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই ছবিতে মুয়াই থাইয়ের সঙ্গে তিনি মিশিয়েছেন আরও অন্তত অর্ধডজন যুদ্ধকৌশল। তলোয়ার, বর্শা, লাঠি, হাতাহাতি লড়াই—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর দক্ষতা দর্শকদের বিস্মিত করে।
মধ্যযুগীয় থাইল্যান্ডকে পটভূমি করে নির্মিত হওয়ায় ছবিটি আগের চেয়ে অনেক বেশি রুক্ষ, অন্ধকার এবং সহিংস। বিশাল সেট, ঐতিহাসিক আবহ এবং নির্মম যুদ্ধের দৃশ্য ছবিটিকে মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছে।
মূল পরিকল্পনা ছিল একটি বিশাল গল্প এক ছবিতেই শেষ করা। কিন্তু নির্মাণের পরিসর এতটাই বড় হয়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত ছবিটি দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। ফলে প্রথম পর্ব শেষ হয় এক রুদ্ধশ্বাস ক্লিফহ্যাঙ্গারে, যা দর্শকদের পরবর্তী কিস্তির জন্য অধীর অপেক্ষায় রাখে।
‘অং ব্যাক ৩’
‘অং ব্যাক ৩’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবিঅনেক সমালোচকের মতে, টনি জার সবচেয়ে অবমূল্যায়িত কাজ ‘অং বাক ৩’। অ্যাকশনের দিক থেকে এটি আগের ছবির সমান, কেউ কেউ আবার আরও এগিয়ে রাখেন। তবে ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর গল্প এবং প্রধান চরিত্রের মানসিক পরিবর্তন।
‘অং বাক ২’-এ টনি জার চরিত্রটি ছিল এক উন্মত্ত যোদ্ধা। যুদ্ধ শুরু হলেই যেন তিনি বন্য প্রাণীতে পরিণত হতেন। কিন্তু ‘অং বাক ৩’-এ সেই মানুষকেই দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে—এক শান্ত, ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসী হিসেবে।
এই দুই বিপরীত মানসিক অবস্থার প্রতিফলন দেখা যায় অ্যাকশন দৃশ্যেও। আগের ছবির ক্রোধ আর প্রতিশোধের জায়গায় এখানে এসেছে আত্মসংযম, আধ্যাত্মিকতা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব।
দুটি ছবি পাশাপাশি দেখলে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শেষ অংশে টনি জার অভিনয় এবং লড়াইয়ের ধরন দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
যাঁরা শুধু অ্যাকশন নয়, চরিত্রের বিকাশও দেখতে চান, তাঁদের জন্য ‘অং বাক ৩’ অবশ্যই দেখার মতো একটি ছবি।
‘চকলেট’
‘চকলেট’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবিমার্শাল আর্ট শেখার শুরুতে প্রিয় সিনেমার লড়াই অনুকরণ করেননি—এমন মানুষ খুব কমই আছেন। তবে শুধু সিনেমা দেখে একজন যোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প খুব একটা দেখা যায় না। এই ব্যতিক্রমী ধারণার ওপরই নির্মিত হয়েছে ‘চকলেট’।
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র জেন, একজন অটিজমে আক্রান্ত তরুণী। চারপাশের পৃথিবীকে সে বোঝে ভিন্নভাবে। তার সবচেয়ে বড় শিক্ষক হয়ে ওঠে টনি জার সিনেমাগুলো। সেগুলো দেখেই সে একের পর এক যুদ্ধকৌশল রপ্ত করে।
এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন জিজা ইয়ানিন। ছবিটি মুক্তির পর তাঁকে অনেকেই থাইল্যান্ডের মিশেল ইয়ো বলে আখ্যা দেন। শুধু মার্শাল আর্ট নয়, অভিনয়দক্ষতাও তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। গল্পে জেনের পরিবারকে ইয়াকুজা অপরাধীরা হুমকি দেয়। পরিবারের সুরক্ষায় একাই তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় সে। এরপর শুরু হয় দুর্দান্ত সব লড়াই।
ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ জিজা ইয়ানিনের গতি, নিখুঁত টাইমিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট। নারীপ্রধান মার্শাল আর্ট সিনেমা হিসেবেও ‘চকলেট’ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
‘বর্ন টু ফাইট’
‘বর্ন টু ফাইট’ সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবিহ্যাঁ, নাম দেখে ভুল হওয়ার সুযোগ আছে। তালিকায় এটি দ্বিতীয় ‘বর্ন টু ফাইট’। প্রথমে যে ছবির কথা বলা হয়েছে, সেটি ছিল ২০০৪ সালের রিমেক। এবার আসল ছবির পালা। দুটি ছবির মিল বলতে মূলত নামটুকুই। গল্প, উপস্থাপনা ও নির্মাণ—সবই ভিন্ন। ১৯৮৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির ডিভিডির প্রচ্ছদেই একটি মন্তব্য ছাপা হয়েছিল টনি জার। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘এই ছবিই আমাকে মার্শাল আর্ট সিনেমায় কাজ করার স্বপ্ন দেখিয়েছিল।’
এমন প্রশংসাই বলে দেয়, ছবিটির গুরুত্ব কতটা। পরবর্তী সময়ে পানা রিত্তিকরাই মূলত পরিচালক ও অ্যাকশন কোরিওগ্রাফার হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। কিন্তু এই ছবিতে ক্যামেরার সামনেও তিনি নিজের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
তাঁর লড়াই, শারীরিক কসরত এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট এতটাই নিখুঁত যে অনেকেই তাঁর সঙ্গে জ্যাকি চ্যানের তুলনা করেন। বিশেষ করে আগুনের মধ্য দিয়ে স্টান্ট করার সাহস এবং নিজের শরীরকে বাজি রেখে দৃশ্য ধারণ করার মানসিকতা তাঁকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। থাইল্যান্ডের প্রচণ্ড গরমও যেন তাঁর কাছে কোনো বাধা ছিল না। আগুনের মধ্যেও সমান স্বাচ্ছন্দ্যে স্টান্ট করেছেন তিনি।
আজকের আধুনিক থাই অ্যাকশন সিনেমার ভিত্তি যে নির্মাতাদের হাতে তৈরি হয়েছিল, পানা রিত্তিকরাই তাঁদের অন্যতম। আর সেই যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক এই ‘বর্ন টু ফাইট’।
‘টম ইয়ুম গুং’
‘টম ইয়ুম গুং’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবিআন্তর্জাতিক বাজারে ছবিটি ‘দ্য প্রোটেক্টর’ নামেও পরিচিত। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে টনি জা। চুরি হয়ে যাওয়া পরিবারের দুই প্রিয় হাতিকে উদ্ধার করতে তিনি পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। কিন্তু সেখানে অপেক্ষা করে আরও ভয়ংকর এক বাস্তবতা। হাতি পাচার ও বন্য প্রাণী ধ্বংসে জড়িত একটি শক্তিশালী অপরাধ চক্র তাঁর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর শুরু হয় একের পর এক রুদ্ধশ্বাস লড়াই। ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু টনি জা নন, তাঁর প্রতিপক্ষেরাও। পানা রিত্তিকরাই ও টনি জা এমন একটি দল গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে ছিলেন জনি এনগুয়েন, জন ফু এবং লাতিফ ক্রাউডার। পরবর্তী সময়ে এই তিনজনই আন্তর্জাতিক মার্শাল আর্ট সিনেমার পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
এ ছাড়া ছবিতে টনি জার মুখোমুখি হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ডব্লিউডব্লিউই তারকা ও ‘ওয়ার্ল্ডস স্ট্রংগেস্ট ম্যান’ প্রতিযোগিতার অংশগ্রহণকারী নাথান জোনস। বিশাল দেহের এই অভিনেতা ছবির অন্যতম ভয়ংকর প্রতিপক্ষ হিসেবে দর্শকের মনে দাগ কেটেছেন।
তবে ‘টম ইয়াম গুং’-কে কিংবদন্তির মর্যাদা দিয়েছে এর অভিনব যুদ্ধশৈলী। ছবিতে দেখানো হয় ‘মুয়াই কোডচাসান’ বা ‘এলিফ্যান্ট বক্সিং’—মুয়াই থাইয়ের এমন একটি কল্পিত রূপ, যার কৌশল অনুপ্রাণিত হাতির চলন, শক্তি ও প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থেকে।
এই কৌশল ব্যবহার করে টনি জা ছবির সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্যগুলোর একটিতে প্রায় পঞ্চাশজন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একাই লড়াই করেন। সেই প্রতিপক্ষদের মধ্যে ছিলেন অভিজ্ঞ অ্যাকশন অভিনেতা রন স্মুরেনবার্গও।
হাড় ভাঙার অসংখ্য অভিনব কৌশল, নিরবচ্ছিন্ন অ্যাকশন এবং টনি জার অবিশ্বাস্য শারীরিক সক্ষমতা এই ছবিকে আজও মার্শাল আর্টপ্রেমীদের অন্যতম প্রিয় তালিকায় রেখেছে। পরবর্তী সময়ে নির্মিত ‘টম ইয়াম গুং ২’-এও টনি জাকে দেখা যায় নতুন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে। বিশেষ করে আরজেডএ এবং ম্যারিস ক্রাম্পের সঙ্গে তাঁর লড়াইয়ের কোরিওগ্রাফি প্রশংসিত হয়।
হলিউড নয়, চীনা সিনেমা! দেখুন আয়ে শীর্ষে থাকা ১০ ছবি‘অং ব্যাক: দ্য মুয়ে থাই ওরিয়র’
‘অং ব্যাক: দ্য মুয়ে থাই ওরিয়র’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবিথাই মার্শাল আর্ট সিনেমার ইতিহাসে যদি একটি ছবির নাম লিখতে হয়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ‘অং বাক: দ্য মুয়াই থাই ওয়ারিয়র’। ছবিটির প্রচারণার সময় তিনটি বাক্যই ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ—‘কোনো স্টান্ট ডাবল নয়। কোনো তারের কারসাজি নয়। কোনো কম্পিউটার গ্রাফিকস নয়।’ এই তিন দাবিই দর্শকদের কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছিল। আর সিনেমা হলে গিয়ে তাঁরা দেখেছিলেন, দাবিগুলো শুধু প্রচারণা নয়, বাস্তব।
ছবির প্রতিটি অ্যাকশন দৃশ্য যেন নতুন এক বিস্ময়। ফাইট ক্লাবের নির্মম লড়াই, জনাকীর্ণ বাজারে শ্বাসরুদ্ধকর ধাওয়া, কাঁটাতারের বৃত্তের ভেতর দিয়ে টনি জার অবিশ্বাস্য লাফ, শত্রুদের কাঁধের ওপর দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া—প্রতিটি দৃশ্যই দর্শকদের হতবাক করে দেয়।
এরপরও বিস্ময় শেষ হয়নি। জ্বলন্ত আগুনে পা নিয়েও শত্রুদের সঙ্গে লড়াই কিংবা মোটরসাইকেলে থাকা প্রতিপক্ষকে উড়ে গিয়ে হাঁটুর আঘাতে পরাস্ত করার মতো দৃশ্য তখনকার অ্যাকশন সিনেমায় প্রায় অকল্পনীয় ছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ছবির মাধ্যমে বিশ্বের অধিকাংশ দর্শক প্রথমবারের মতো বড় পর্দায় মুয়াই থাইকে এত শক্তিশালী ও বাস্তব রূপে দেখেছিলেন। শুধু লড়াই নয়, ছবির প্রতিটি স্টান্ট ছিল মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো। কম্পিউটারনির্ভর কৌশলের বদলে শিল্পীদের বাস্তব দক্ষতার ওপর নির্ভর করেই তৈরি হয়েছিল পুরো সিনেমা।
পরে যেমন ‘ইপ ম্যান’ কিংবা ‘দ্য রেইড’ মুক্তির পর দর্শকেরা বাস্তবধর্মী অ্যাকশনের নতুন স্বাদ পেয়েছিলেন, ‘অং বাক’-এর সময়ও বিশ্বজুড়ে একই প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। বহু বছর ধরে মার্শাল আর্ট সিনেমার মানদণ্ড হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে ‘অং বাক’। নতুন কোনো অ্যাকশন ছবি মুক্তি পেলেই তার সঙ্গে তুলনা করা হতো এই সিনেমার।
এর চেয়ে বড় অর্জন ছিল অন্য জায়গায়। ‘অং বাক’ শুধু টনি জা ও পানা রিত্তিকরাইকে আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করেনি, থাইল্যান্ডকেও বিশ্বের হার্ডকোর মার্শাল আর্ট সিনেমাপ্রেমীদের স্থায়ী গন্তব্যে পরিণত করেছে।
কুংফুকিংডমডটকম ও আইএমডিবি অবলম্বনে