নকল ও নিম্নমানের জন্মনিরোধক সামগ্রী ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
· Prothom Alo

সাম্প্রতিক তথ্য–উপাত্ত ও পরিসংখ্যান বলছে, দেশের জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি কিছুটা গতি হারিয়েছে। টিএফআর বাড়তির দিকে, সিপিআর কমতির দিকে। এই পরিস্থিতিতে আজ বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর পরিস্থিতিসহ নানা বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দিন খান। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল
Visit newsbetting.cv for more information.
বাংলাদেশে গর্ভনিরোধের দরকার হলো কেন?
তছলিম উদ্দিন খান: আপনি ভাবুন, আমাদের দেশটি ভৌগোলিকভাবে কতটুকু? আর এই ছোট দেশে মানুষ কত? নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুর ছাড়া এত জনঘনত্বের দেশ বিশ্বে আর একটিও নেই।
ঠিক স্বাধীনতার পরপরই বোঝা গেল, দেশে মানুষ অনেক বেশি। প্রজননক্ষম নারীরা জীবদ্দশায় গড়ে ছয়টির বেশি সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। নীতিনির্ধারকেরা জনসংখ্যাকে দেশের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে দেখলেন। বিবেচনা করলেন যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি থামাতে হবে। ৫০ বছরের বেশি সময় আগে রাষ্ট্রপরিচালকেরা গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখেছিলেন।
আপনি কি বলতে পারবেন, শুরুর দিকের সরকারগুলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কী কী করেছিল?
তছলিম উদ্দিন খান: সরকার চেয়েছিল, মানুষের দোরগোড়ায় পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দিতে। সক্ষম দম্পতিরা চাইলেই যেন গর্ভনিরোধসামগ্রী বা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি পান, সরকার সেই ব্যবস্থা করেছিল। মন্ত্রণালয়ে পৃথক বিভাগ করা হয়েছিল, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বিপুলসংখ্যক মাঠকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সরবরাহ বৃদ্ধি করা এবং সরবরাহ অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কোন সময় এই বিপুল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এসএমসি যুক্ত হয়?
তছলিম উদ্দিন খান: ১৯৭৫ সালে এসএমসি সরকারে কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। শুরুতে এটি ছিল একটি প্রকল্প। তখন এর নাম ছিল ফ্যামিলি প্ল্যানিং সোশ্যাল মার্কেটিং প্রজেক্ট। প্রকল্পের মাধ্যমে রাজা কনডম ও মায়া বড়ি দম্পতিদের দেওয়া শুরু হয়। ১৯৯০ সালে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসএমসি গঠিত হয়। দেশটি ছিল নতুন। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর পরিচালনা, মাঠপর্যায়ের বিপুলসংখ্যক কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া—এসব কাজে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার কমতি ছিল। সরকারের এই উদ্যোগের সঙ্গে একাধিক দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছিল আর যুক্ত হয়েছিল অনেক দেশি এনজিও।
বাংলাদেশ জনবহুল দেশ। বিপুল জনসংখ্যা ছোট এই দেশের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে এবং ক্রমে সেই চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাধীনতা–উত্তর সরকারগুলো জনসংখ্যাকে সমস্যা হিসেবে দেখেছিল এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বা জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিল। এতে দেশের দম্পতিদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি বা সামগ্রী ব্যবহারের হার (সিপিআর) বাড়ে এবং মোট প্রজননের হার (টিএফআর) কমে। বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী প্রশংসা পায়। এই দীর্ঘ পথচলায় সরকারের, তথা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পাশে ছিল সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি (এসএমসি)।
পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি একসময় জমজমাট ছিল। দেখা যেত, শোনা যেত, বোঝা যেত। আপনার কী মনে হয়?
তছলিম উদ্দিন খান: আপনি ঠিকই বলেছেন। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে নানা প্রোগ্রাম হতো। সারা দেশের মানুষ তা শুনতেন ও দেখতেন। আর কোনো রেডিও বা টেলিভিশন ছিল না। রাজা কনডম ও মায়া বড়ির কথা শোনেননি, এমন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দেশে বিরল ছিল। এ ছাড়া হাটে–বাজারে, বড় বড় বাসস্ট্যান্ডে, লঞ্চঘাটে, রেলস্টেশনে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির—রাজা কনডম, মায়া বড়ি—বড় বড় সাইনবোর্ড চোখে পড়ত।
সারা দেশেই পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠকর্মী ও এনজিও মাঠকর্মীদের উপস্থিতি চোখে পড়ত। তাঁরা নিয়মিতভাবে বাড়ি বাড়ি যেতেন, দম্পতিদের পরামর্শ দিতেন, দম্পতিরা যেন পরিকল্পিত পরিবার গড়ে তোলেন, এ বিষয়ে পরামর্শ দিতেন, গর্ভনিরোধের কথা বলতেন, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী বিতরণ করতেন। সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মসূচিটি ‘মোমেনটাম’ পেয়েছিল।
বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সফল কর্মসূচি হিসেবে বর্ণনা করা হতো, ঠিক কি না?
তছলিম উদ্দিন খান: স্বাধীনতার সময় টিএফআর ছিল ৬ দশমিক ৫ বা ৬ দশমিক ৪; অর্থাৎ মায়েরা গড়ে ছয়টির বেশি সন্তান জন্ম দিতেন। বেশি সন্তান জন্ম দেওয়ার সঙ্গে বেশি মাতৃমৃত্যুর সম্পর্ক আছে। ওই সময় মাতৃমৃত্যুর হার অনেক বেশি ছিল। শিশুমৃত্যুর হারও বেশি ছিল। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি দেশব্যাপী জোরদারভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার কারণে টিএফআর ক্রমে কমতে থাকে। টিএফআর কমে ১৯৯৩–৯৪ সালে ৩ দশমিক ৪–এ দাঁড়ায়। এই সময় দম্পতিদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের (সিপিআর) হারও বাড়তে থাকে। ২০০৪ সালে তা হয় ৩, ২০২২ সালে টিএফআর আরও কমে হয় ২ দশমিক ৩; অর্থাৎ মায়েরা কম সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। একদিকে সিপিআর বাড়তে থাকে, ফলে টিএফআর কমতে থাকে। বিষয়টি সরল সমীকরণের মতো ঘটেছে।
বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য আছে? আপনার কী মনে হয়।
তছলিম উদ্দিন খান: জন্মনিয়ন্ত্রণের অনেক ধরনের পদ্ধতি আছে। বাংলাদেশ যেকোনো একটি পদ্ধতি বেছে নেয়নি বা একটি পদ্ধতির ওপর জোর দেয়নি। খাওয়ার বড়ি, ইনজেকটেবল, কনডম, দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি এবং স্থায়ী পদ্ধতি—এসবের মিশ্রণে কর্মসূচিটি চলছে। আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, গ্রামাঞ্চলে এই সেবা মানুষের বাড়ি বাড়ি দেওয়া হয়।
বর্তমানে এসএমসির অংশীদারত্ব কেমন? এসএমসির জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী কত মানুষ ব্যবহার করেন?
তছলিম উদ্দিন খান: বর্তমানে দেশে যত খাওয়ার বড়ি ব্যবহৃত হয়, তার ৫৫ শতাংশ এসএমসির। যত কনডম ব্যবহৃত হয়, তার ৭২ শতাংশ এসএমসির। যত ইনজেকটেবল ব্যবহৃত হয়, তার ৫০ শতাংশ এসএমসির। এ ছাড়া এসএমসির আইইউডি ও ইমপ্ল্যান্টের প্রচুর ব্যবহার আছে। এই পরিসংখ্যান থেকে এটা স্পষ্ট যে জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবায় এসএমসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এটা স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া এসএমসির এই সাফল্য সম্ভব হতো না।
কিন্তু এ কথা তো সত্যি যে এসএমসির পণ্য মানুষকে কিনতে হয়। সরকার বিনা মূল্যে দেয়।
তছলিম উদ্দিন খান: এ কথা মনে রাখা দরকার যে এসএমসির অর্জিত অর্থ কোনো ব্যক্তি নিতে পারেন না বা ভোগ করতে পারেন না। এসএমসি মুনাফার জন্য পণ্য উৎপাদন, বাজারজাত ও বিপণন করে না। বাজার বিশ্লেষণ করার পর এসএমসির পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এসএমসি নিয়মিতভাবে বাজার বিশ্লেষণ করে। সব স্তরের মানুষ যেন এসএমসির পণ্য কিনতে পারেন, এ ব্যাপারে এসএমসি বিশেষ মনোযোগী।
একই পণ্যের হয়তো পাঁচটি ব্র্যান্ড আছে। কোনো ব্র্যান্ডের দাম কম, কোনোটির বেশি। এখানে লাভ যা হয়, তাকে আমরা বলি ‘ফাংশনাল বেনিফিট’। এই লাভ অন্য সামাজিক কাজে ব্যবহার করা হয় বা ‘প্রফিট শেয়ার’ করা হয়।
কিছুদিন আগে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর অপূর্ণ চাহিদা ছিল ১০ শতাংশ। এখন তা আরও বেড়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এসএমসি কী করতে পারে?
তছলিম উদ্দিন খান: দেখুন, দেশে প্রায় দেড় লাখ ফার্মেসি আছে। সব ফার্মেসিতে আপনি এসএমসির জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী পাবেন। আমি বোঝাতে চাইছি
যে সাপ্লাই বা সরবরাহে কোনো সমস্যা বা ঘাটতি নেই। কাজ করতে হবে চাহিদা সৃষ্টিতে। এই কাজ করতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে। ব্যাপক প্রচার–প্রচারণার কাজ করতে হবে। নতুন নতুন প্রমোশনাল কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাজ কমেছে বলে ধারণা করি।
অন্য একটি বিষয় নিয়ে বলি। বাজারে নিম্নমানের কনডম, নকল কনডম জায়গা করে নিচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। আপনারা কি এ ব্যাপারে অবগত?
তছলিম উদ্দিন খান: আমরাও শুনছি। আমরা আমাদের দায়বদ্ধতা থেকে এ ব্যাপারে কথা বলছি। আমরা জানতে পেরেছি যে নামী ব্র্যান্ডের কনডমের প্যাকেট বানিয়ে তাতে নিম্নমানের কনডম ঢুকিয়ে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। আমরা জেনেছি, কিছু কনডমে ‘মাইক্রো লিকেজ’ বা অতিসূক্ষ্ম ছিদ্র পাওয়া যাচ্ছে। ছিদ্রযুক্ত কনডম ব্যবহার বিপজ্জনক। কনডম দুটি কাজ করে। গর্ভনিরোধ ও রোগপ্রতিরোধ। বাজারে এ ধরনের কনডম থাকার কারণে দুই ধরনের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রথমত, জন্মনিয়ন্ত্রণের মূল কাজটি হবে না। দ্বিতীয়ত, যৌনরোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। আমরা ধারণা করি, অসাধু কিছু মানুষ এই নিম্নমানের কনডম আমদানি করছেন অথবা চোরাই পথে আনছেন। এ ব্যাপারে প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
অন্য একটি সমস্যা হচ্ছে বাল্যবিবাহ। এটি তো শুধু সামাজিক সমস্যা নয়।
তছলিম উদ্দিন খান: দেশের ৫০ শতাংশ বিয়ে বাল্যবিবাহ। আইন আছে, তা অমান্য করেই এসব বিয়ে হচ্ছে। থামছে না, তারপরও এর বিরুদ্ধে আরও প্রচার চালাতে হবে। আর যেসব কিশোরীর বিয়ে হয়েই গেছে, চেষ্টা চালাতে হবে তারা যেন কিশোরী মা না হয়। বয়স ২০ বছর না হলে মা হওয়া ঠিক হবে না। মা কিশোরী হলে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। সুতরাং বিবাহিত কিশোরীর গর্ভনিরোধ নিশ্চিত করতে হবে। তাকে সঠিক বার্তা দিতে হবে, তার জন্মনিয়ন্ত্রণ চাহিদা পূরণ করতে হবে।
কী কথা বলা উচিত, কেমন বার্তা দেওয়া উচিত?
তছলিম উদ্দিন খান: একটি সহজ–সরল কথা আমরা ব্যবহার করতে বলি: ১৮–২০–৩৫। ১৮ বছরের আগে বিয়ে নয়, ২০ বছরের আগে মা হওয়া নয়, বয়স ৩৫ ছাড়ালে মা হওয়া নয়। দুটি সন্তান জন্মের সময়ের ব্যবধান তিন বছর হওয়া দরকার। তিন বছরের কম হলে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে। আবার এটাও জানানো যে ৩৫ বছরের পর গর্ভধারণ ঝুঁকিপূর্ণ।
জনসংখ্যা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, টিএফআর ২ দশমিক ৪। এটি কতটা উদ্বেগের?
তছলিম উদ্দিন খান: এটি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। বাংলাদেশ ক্রমে টিএফআর কমাতে পেরেছে, যদিও একটি লম্বা সময় ধরে টিএফআর ২ দশমিক ৩–এ স্থির ছিল। টিএফআর ২ দশমিক ৪ হওয়ার অর্থ, কিছু কাজ হয়তো ঠিকঠাকমতো হচ্ছে না। ৫০ বছর ধরে এসএমসি সরকারের সহযোগী হিসেবে মানুষের পাশে ছিল। এখনো আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে।
সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
তছলিম উদ্দিন খান: প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ।