ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে কি চীনই জিতল

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—দুই পরাশক্তি। গত মে মাসে দুই দেশের প্রেসিডেন্টরা বৈঠকে বসেছিলেন। তখন চীন সফরে গিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। দুই নেতার ওই শীর্ষ বৈঠককে যদি ‘অচলাবস্থায় পর্যবসিত বৈঠক’ বলা হয়; তাহলে এ সপ্তাহে ওয়াশিংটনে তাঁদের শীর্ষ বৈঠকে বড় কোনো অগ্রগতির আশা যেন পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

Visit h-doctor.club for more information.

সি চিন পিং এবার সস্ত্রীক ওয়াশিংটন সফর করেছেন। হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেছেন ট্রাম্পের সঙ্গে। দুই প্রেসিডেন্টের এ বৈঠককে কূটনীতির চেয়ে বরং ‘ডিপ্লোটেইনমেন্ট’ বলছেন অনেকেই। অর্থাৎ, কূটনীতি ও বিনোদন উদ্‌যাপনের মিশেল ছিল বৈঠকটি। এখানে বিরোধ দূর করা ও অগ্রগতির অর্জনের চেয়ে জাঁকজমক ও লোকদেখানো বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

ট্রাম্প-সি বৈঠকে অর্জন কম, তাতেও কেন খুশি চীন
বাণিজ্য সমঝোতা নিয়ে সামান্য অগ্রগতি ছাড়া দুই প্রেসিডেন্টের বৈঠকে আর কোনো বড় অগ্রগতি দেখা যায়নি। তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি—চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে কোনো বিষয়েই উল্লেখযোগ্য অর্জন কার্যত নেই।

ট্রাম্প-সির এবারের বৈঠকে মোটাদাগে ফলাফল হলো—শিগগিরই চীন থেকে দুটি জায়ান্ট পান্ডা আটলান্টার চিড়িয়াখানায় পাঠানো হবে।

চীনের প্রেসিডেন্ট গত বুধবার ওয়াশিংটনে পৌঁছান। দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে সি’কে বরণ করে নিতে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ উড়োজাহাজের দোরগোড়ায় হাজির হন ট্রাম্প ও মেলানিয়া। দেওয়া হয় লালগালিচা সংবর্ধনা। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ট্রাম্পের নতুন হেলিপ্যাড ও মেরিন ওয়ান হেলিকপ্টার ঘুরে দেখেন সি। এরপর তাঁরা ৯০ মিনিট বৈঠক করেন।

ট্রাম্প বলেছেন, সির সঙ্গে তাঁর ‘দারুণ বৈঠক’ হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাইওয়ানের স্বাধীনতা ও ইরান যুদ্ধ নিয়েও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন দুই নেতা। ট্রাম্প বলেন, সি ‘গ্রানাইটের প্রতি বেশ আগ্রহী’, এটা তিনি বৈঠকে জানতে পেরেছেন।

দুই বিশ্বনেতার এ বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সি চিন পিংয়ের প্রতি অতিমাত্রায় সম্মান দেখাচ্ছেন ট্রাম্প—মন্তব্য করেন জুলিয়ান গেউয়ার্টজ। তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনে চীন-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন।

ইরানকে চীনের সহায়তা গ্রহণযোগ্য নয়, সিকে বললেন ট্রাম্প: মার্কিন রাষ্ট্রদূত

কিন্তু বৈঠক থেকে বাস্তবিক কোনো অগ্রগতি কি হয়েছে? যদিও আগে থেকেই এ বৈঠক নিয়ে প্রত্যাশা বেশ কম ছিল। তবে প্রত্যাশার পারদ সেই পর্যায়েও উঠতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অন্যতম বড় একটি বিষয়—বাণিজ্য। গত বছর ট্রাম্প চীনা পণ্যে একের পর এক শুল্ক আরোপ করেন। তখন হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে চীনের বিরুদ্ধে অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার অভিযোগ তোলা হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ৩৭ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতি।

চীন থেকে পণ্য আমদানি কমানো এবং চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই ছিল ট্রাম্পের শুল্কারোপের উদ্দেশ্য। কিছু ক্ষেত্রে সেটা কাজেও দিয়েছে। ২০২৪ সালে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ডলারের। পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে তা ২০ হাজার কোটি (২০০ বিলিয়ন) ডলারে নেমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ বাণিজ্য ঘাটতির কিছু অংশ পূরণ হচ্ছে তৃতীয় দেশ হয়ে চীনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর মাধ্যমে। চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত গত বছর রেকর্ড ১ লাখ কোটি (১ ট্রিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪৩ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র আর চীন থেকে। কাজেই দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক। গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে দেশ দুটি যখন বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে সরে আসার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়, তখন শুধু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারা স্বস্তি পাননি, বিশ্ব অর্থনীতিতেও স্বস্তি এসেছিল।

সির সঙ্গে ‘দারুণ বৈঠক’ হয়েছে, জানালেন ট্রাম্প

আসছে নভেম্বরে এ সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। চীনা অর্থনীতি মূলত রপ্তানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই বেইজিং সমঝোতার মেয়াদ ট্রাম্পের শাসনামল শেষ হওয়া পর্যন্ত বাড়ানোর চেষ্টা করছিল বলে খবর পাওয়া যায়। ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ করবেন।

উইলিয়াম ইয়াং, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক।এটা একেবারে স্পষ্ট, বৈঠকে মূল বিষয়বস্তুর চেয়ে প্রতীকী বিষয় ও আনুষ্ঠানিকতা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার জানা গেছে, চীনের প্রেসিডেন্টের তুমুল আলোচিত ওয়াশিংটন সফর থেকে উভয় দেশের বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে সরে আসার সমঝোতার মেয়াদ মাত্র দুই মাস বেড়েছে। এ বিষয়ে চিন্তক প্রতিষ্ঠান এশিয়া সোসাইটির জ্যেষ্ঠ ফেলো নিল টমাস বলেন, ‘বৈঠকটি জাঁকজমক ও আনুষ্ঠানিকতায় পূর্ণ ছিল। তবে এর বাইরে এটা বৈঠকের প্রস্তুতির ঘাটতির বিষয়টিই তুলে ধরে।’

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, এটা একেবারে স্পষ্ট, বৈঠকে মূল বিষয়বস্তুর চেয়ে প্রতীকী বিষয় ও আনুষ্ঠানিকতা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। দুই মাসের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি এটাই প্রমাণ করে, বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো মৌলিক মতপার্থক্য রয়েছে।

ট্রাম্প যখন চীনা পণ্যের ওপর শুল্কারোপ করেছিলেন, তখন বেইজিংও কড়া পদক্ষেপ নিয়েছিল। ওই সময় বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয় চীন। যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প উৎপাদন ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য এসব খনিজ খুবই দরকারি। কাজেই বেইজিংয়ের রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত চীনের ওপর ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতাকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছিল।

জুলিয়ান গেউয়ার্টজ বলেন, বেইজিংয়ের পাল্টা পদক্ষেপ... ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। চীনের বিষয়ে ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ কমিয়েছে।

বাণিজ্য সমঝোতা নিয়ে সামান্য অগ্রগতি ছাড়া দুই প্রেসিডেন্টের বৈঠকে আর কোনো বড় অগ্রগতি দেখা যায়নি। তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি—চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে কোনো বিষয়েই উল্লেখযোগ্য অর্জন কার্যত নেই।

(বাঁ থেকে) চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লিউয়ান, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার, ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে তাইওয়ান ইস্যুকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখে চীন। তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে বেইজিং। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে সরাসরি সহায়তা দেয়। এ সহায়তা কমিয়ে আনতে ট্রাম্পের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছেন সি।

বৈঠকের পর চীনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবরণে বলা হয়েছে, সি ট্রাম্পকে বলেছেন, তিনি আশা করছেন, ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সঠিক অবস্থান বজায় রাখবে’।

এখন ট্রাম্প যদি বলেন, ‘আমরা তাইওয়ানে স্বাধীনতা সমর্থন করছি না’, বেইজিং অবশ্যই স্বাগত জানাবে। কিন্তু সেটা হবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বহু পুরোনো অবস্থান থেকে স্পষ্টত সরে আসা। সি’র এমন চাওয়ায় ট্রাম্প রাজি হয়েছেন কিনা, সেটা অবশ্য তিনি বলেননি।

প্রেসিডেন্ট সিকে প্রথা ভেঙে স্বাগত জানালেন ট্রাম্প, সম্পর্কের বরফ কি গলবে

তবে মনে হচ্ছে, তাইওয়ানের কাছে ১ হাজার ৪০০ কোটি (১৪ বিলিয়ন) ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজ অনুমোদনের বিষয়টি ট্রাম্প এখনো এগিয়ে নেননি। চীন চায়, এ প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাক।

বৈঠক থেকে বড় কোনো অর্জনের খবর না আসাটা বরং চীনের জন্য একটি সাফল্য, বলেন নিল টমাস। তিনি আরও বলেন, চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বৈঠকটি দারুণ হয়েছে।

নিল টমাস বলেন, সি চিন পিং রাষ্ট্রীয় সফরে ওয়াশিংটনে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে বিপুল সম্মান পেয়েছেন। চীনের মানুষের কাছেও দারুণ কিছু ছবি পৌঁছেছে। এসব ছবিতে ট্রাম্প ও সিকে বিশ্বমঞ্চে সমমর্যাদার নেতা হিসেবে দেখা গেছে। অথচ এ জন্য চীনকে কোনো ছাড় দিতে কিংবা সমঝোতা করতে হয়নি।

অ্যামি হকিন্স: দ্য গার্ডিয়ানের চীন-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ সংবাদদাতা

সিকে কী খাওয়ালেন ট্রাম্প, নৈশভোজে কারা ছিলেন

Read full story at source