মানুষ কি স্বভাবত ভালো না মন্দ: ইসলাম কী বলে

· Prothom Alo

ইসলাম মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা দিয়েছে। মানুষকে জন্মগত পাপী বলা হয়নি। আবার তাকে এমন নিষ্পাপ সত্তাও বলা হয়নি, যার মধ্যে মন্দের কোনো আকর্ষণ নেই।

মানুষের ভেতরে আল্লাহ এমন এক স্বভাব সৃষ্টি করেছেন, যা সত্য ও কল্যাণকে গ্রহণ করতে সক্ষম। পাশাপাশি তার মধ্যে প্রবৃত্তি, কামনা ও দুর্বলতাও রাখা হয়েছে। তার জীবন তাই নিজের ভেতরের ভালোকে জাগিয়ে তোলা এবং মন্দ প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করার এক অবিরাম সাধনা।

Visit playerbros.org for more information.

কোরআন-হাদিসের আলোকে মানুষের স্বভাবের কয়েকটি দিক লক্ষ করা যায়।

১. মানুষ ‘ফিতরাত’র ওপর জন্ম নেয়

আল্লাহ বলেন, ‘তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখো। এটাই আল্লাহর ফিতরাত, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৩০)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে।’ এরপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক বানায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৮৫)

অর্থাৎ মানুষের প্রথম স্বভাব সত্যবিমুখ নয়। তার ভেতরে সত্যকে গ্রহণ করার একটি স্বাভাবিক প্রস্তুতি থাকে। শিশুর হৃদয় তাই নানা কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত থাকে। পরে পরিবার, পরিবেশ ও সমাজ তার চিন্তা ও চরিত্রকে নানা দিকে নিয়ে যায়।

২. মানুষের মধ্যে ভালো–মন্দ দুই প্রবণতাই রয়েছে

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘অতঃপর তিনি তাকে তার পাপপ্রবণতা ও তাকওয়ার জ্ঞান দিয়েছেন।’ (সুরা শামস, আয়াত: ৮)

মানুষের ভেতরে তাই ভালো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা যেমন আছে, তেমনি মন্দের দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সে সত্য বলতে পারে, আবার মিথ্যাও বলতে পারে। ক্ষমা করতে পারে, আবার প্রতিশোধও নিতে পারে। দান করতে পারে, আবার সম্পদের মোহেও ডুবে যেতে পারে।

ইসলামের নৈতিক শিক্ষা মানুষের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই গড়ে উঠেছে। মানুষের ভেতর থেকে কোনো একটি প্রবণতাকে অস্বীকার করা নয়; তার ভালো দিকটিকে শক্তিশালী করাই ইসলামের লক্ষ্য।

সবচেয়ে সুখী মানুষ হওয়ার শিক্ষা নবীদের জীবন থেকে

৩. নফস মানুষকে মন্দের দিকে টানে

আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নফস মন্দের প্রতি প্রবলভাবে নির্দেশ দেয়।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩)

মানুষের ভেতরে এমন কিছু আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, যা তাকে নিজের সীমা অতিক্রম করতে প্ররোচিত করে; রাগের সময় প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছে করে, সম্পদ পেলে আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে, ক্ষমতা এলে কর্তৃত্বের নেশা তৈরি হয়, প্রশংসা পেলে অহংকার জন্ম নিতে পারে।

এ কারণেই আত্মশুদ্ধি ইসলামি জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সেই ব্যক্তি নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; শক্তিশালী সেই ব্যক্তি, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)

৪. পরিবেশ মানুষের চরিত্রকে প্রভাবিত করে

শিশু কীভাবে কথা বলবে, কীভাবে আচরণ করবে, কোন বস্তুকে ভালো মনে করবে এসবের ওপর তার পরিবার ও পরিবেশের গভীর প্রভাব থাকে। নবীজি (সা.) বাবা-মায়ের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তনের বিষয়টি বুঝিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৮৫)

মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১৮০০১পুণ্য হলো যা তোমার অন্তরকে প্রশান্ত করে; আর পাপ হলো যা তোমার অন্তরে সংশয় সৃষ্টি করে, যদিও মানুষ তোমাকে তার বৈধতার ফতোয়া দেয়।

এ কারণেই ইসলাম পরিবারকে মানুষের চরিত্র নির্মাণের প্রথম শিক্ষালয় হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে। ভালো সঙ্গ মানুষকে ভালো পথে টেনে নেয়। মন্দ সঙ্গ ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক লজ্জাবোধ ও নৈতিক সংবেদনশীলতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

কোরআন সতর্ক করে বলেছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ১১৯)

৫. মানুষ ভুল করে, কিন্তু ফিরে আসার ক্ষমতাও রাখে

মানুষকে ফেরেশতার মতো ভুলহীন করে সৃষ্টি করা হয়নি। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আদম সন্তান সবাই ভুলকারী; আর উত্তম ভুলকারীরা হলো যারা তওবা করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৯)

এখানে মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি শিক্ষা রয়েছে। মানুষের ভালো হওয়া মানে এই নয় যে সে কখনো ভুল করবে না। ভুলের পর সে কোন দিকে ফিরে যায়, সেটিও তার চরিত্রের অংশ।

আদম (আ.)-এর ঘটনাতেও আমরা দেখি, ভুলের পর তিনি আল্লাহর দিকে ফিরে গেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আদম তাঁর প্রতিপালকের কাছ থেকে কিছু বাণী লাভ করলেন। ফলে আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করলেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৭)

মুমিন চরিত্রের জন্য ক্ষতিকর ৭ স্বভাব

৬. মানুষের বিবেক সত্য–মিথ্যার পার্থক্য বোঝে

আল্লাহ বলেন, ‘আমি কি তাকে দুটি পথ দেখাইনি?’ (সুরা বালাদ, আয়াত: ১০)

মানুষের সামনে ভালো ও মন্দের পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তার ভেতরে একটি নৈতিক অনুভূতিও রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পুণ্য হলো যা তোমার অন্তরকে প্রশান্ত করে; আর পাপ হলো যা তোমার অন্তরে সংশয় সৃষ্টি করে, যদিও মানুষ তোমাকে তার বৈধতার ফতোয়া দেয়।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১৮০০১)

তাই বিবেককে জীবিত রাখা জরুরি। বারবার পাপ করতে করতে মানুষের অন্তর একসময় অসাড় হয়ে যেতে পারে। আবার ইমান, তওবা ও নেক আমলের মাধ্যমে সেই অন্তর জেগেও উঠতে পারে।

৭. মানুষকে পরিবর্তন করা সম্ভব

মানুষ যদি জন্মগতভাবেই অপরিবর্তনীয় মন্দ সত্তা হতো, তাহলে নবী-রাসুলদের দাওয়াত, শিক্ষা, তাযকিয়া ও নসিহতের কোনো অর্থ থাকত না। অথচ ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, একটা মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও জীবন সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।

যে মানুষ আজ ভুল পথে আছে, সে আগামীকাল সত্যের পথে ফিরতে পারে। যে হৃদয় আজ কঠিন, সেটিও তওবা ও আল্লাহর স্মরণে কোমল হতে পারে।

কোরআন বলে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ১১)

পরিবর্তনের এই সম্ভাবনাই মানুষকে আশাবাদী করে। যে মানুষ আজ ভুল পথে আছে, সে আগামীকাল সত্যের পথে ফিরতে পারে। যে হৃদয় আজ কঠিন, সেটিও তওবা ও আল্লাহর স্মরণে কোমল হতে পারে।

৮. মানুষের প্রকৃত সাফল্য আত্মশুদ্ধিতে

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যে তাকে পরিশুদ্ধ করেছে, সে সফল হয়েছে। আর যে তাকে কলুষিত করেছে, সে ব্যর্থ হয়েছে।’ (সুরা শামস, আয়াত: ৯–১০)

মানুষের সবচেয়ে বড় কাজ তাই নিজের ভেতরের জগৎকে পরিচ্ছন্ন করা। বাহ্যিক সৌন্দর্য মানুষকে আকর্ষণ করতে পারে, সম্পদ তাকে সম্মানিত করতে পারে, জ্ঞান তাকে মর্যাদা দিতে পারে; কিন্তু অন্তর কলুষিত হলে এসবের কোনোটিই তাকে প্রকৃত অর্থে সফল করতে পারে না।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘শরীরে একটি গোশতের টুকরা আছে; তা ঠিক হলে পুরো শরীর ঠিক হয়, আর তা নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়। জেনে রেখো, সেটি হলো হৃদয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২)

যে ৭ কারণে মানুষ হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হয়

Read full story at source