দেহটা আসলে কার
· Prothom Alo

কোনো শিল্পীর কাজকে শিল্প-ইতিহাসের মধ্যে স্থাপন করা মানে কেবল পূর্ববর্তী বা সমকালীন শিল্পীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাদৃশ্য খুঁজে বের করা নয়। দেখতে হয়, শিল্পী কোন পরিচিত বাস্তবতাকে গ্রহণ করছেন, কোথায় সেটি ভেঙে দিচ্ছেন এবং কীভাবে পুনর্গঠন করে পরিচিতির বাইরে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছেন। তৌফিকুর রহমানের ‘রেখা–গড়ন–স্থিতি’ প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য ও অঙ্কন পাশাপাশি দেখলে প্রথমেই যা চোখে পড়ে, তা হলো—এখানে দেহ কোনো স্থির, সম্পূর্ণ ও পূর্বনির্ধারিত অবয়ব নয়। দেহ নির্মীয়মাণ; কখনো সংযোজিত, কখনো খণ্ডিত, কখনো রূপান্তরিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাকে মানুষ, প্রাণী কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করাও কঠিন। প্রদর্শনীর কেন্দ্রে তাই দেহের দৃশ্যমানতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পরিচয়ের প্রশ্ন—একটি দেহকে আমরা কীভাবে চিনে নিই এবং কোন পর্যায়ে সেই চেনার প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়।
Visit esporist.com for more information.
শিল্পীর বক্তব্যে অঙ্কন ও ভাস্কর্যের উৎস একই অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত—পরিচিত রূপের ভেতর থেকে অজানাকে আবিষ্কার করা। কিন্তু এই দুই মাধ্যমকে কেবল একই ভাবনার দুই প্রকাশ হিসেবে দেখলে তাদের পার্থক্যটি আড়ালে থেকে যায়। অঙ্কন কি ভাস্কর্যের প্রাথমিক নকশা? নাকি ভাস্কর্য তৈরি হওয়ার পর অঙ্কন তার আরেকটি স্বাধীন রূপ লাভ করে? তৌফিকুরের প্রদর্শনী এই প্রশ্নের সরল উত্তর দেয় না।
অঙ্কনে রেখা একটি সমতলের ওপর অবয়ব তৈরি করে। ভাস্কর্যে সেই রেখা যেন সমতল ছেড়ে স্থান দখল করে—ইস্পাতের দণ্ড, পাত, বাঁক ও ফাঁকের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ভাস্কর্যে রেখা আর কাগজের রেখা থাকে না; তা হয়ে ওঠে ওজন, প্রতিরোধ, ভারসাম্য ও বস্তুগত চাপের অংশ। কাগজে যে রেখা অনায়াসে একটি শরীরের সীমানা নির্ধারণ করতে পারে, ইস্পাতে সেই রেখাকে বহন করতে হয় নিজের ওজন। ফলে অঙ্কনের রেখা ও ভাস্কর্যের রেখা একই ভাষার অংশ হলেও একই অভিজ্ঞতা নয়।
এই জায়গায় ‘রেখা–গড়ন–স্থিতি’ নামটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নামটি রেখা থেকে গড়ন, গড়ন থেকে স্থিতির একটি সরল যাত্রার কথা বলে; কিন্তু প্রদর্শনীর কাজগুলো সেই সরলতা মানে না। রেখা গড়ন তৈরি করে, আবার গড়নকে ভাঙেও। গড়ন স্থিতি আনে, আবার তার ভেতরেই থাকে ফাঁক, বিচ্ছেদ ও অসম্পূর্ণতা। স্থিতি এখানে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নয়; একটি সাময়িক ভারসাম্য মাত্র। শিল্পীর কথায় ভাস্কর্য থেকে ‘অস্তিত্বের আরেক সম্ভাবনা’র দিকে যাওয়ার যে ইঙ্গিত আছে, কাজগুলো বোঝার জন্য সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন তখন আর শুধু ‘এটি কী?’ নয়—‘এটি কী হয়ে উঠছে?’
ভাস্কর্যের নির্মাণপ্রক্রিয়া তাই নিছক কারিগরি বিষয় নয়। কাটা ইস্পাতের খণ্ড, বাঁকানো দণ্ড, ঝালাই-জোড়ার চিহ্ন, ধাতব পাতের মধ্যকার ফাঁক—সবকিছু মিলেই অবয়বের অর্থ তৈরি করে। ঝালাইয়ের দাগকে সরাসরি ক্ষত হিসেবে পড়ার প্রয়োজন নেই; বরং তা মনে করিয়ে দেয়, এই দেহ প্রকৃতির দেওয়া সম্পূর্ণ শরীর নয়, মানুষের নির্মাণে তৈরি একটি শরীর। তার শরীরের ইতিহাস তার গড়নের মধ্যেই দৃশ্যমান।
‘আনটাইটেলড’, তৌফিকুর রহমান‘এটার্নাল পোয়েট’, ২০১৭–২০২৬-এ দেহ ব্যক্তিগত পরিচয়ের বাইরে সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়। অবয়বটি রবীন্দ্রনাথের কথা মনে করায়, কিন্তু প্রচলিত প্রতিকৃতি হিসেবে কাজ করে না। রামকিঙ্কর বেইজের রবীন্দ্রনাথ-প্রতিকৃতির কথাও তুলনামূলকভাবে মনে পড়তে পারে, তবে এখানে প্রত্যক্ষ প্রভাবের প্রশ্ন নয়। একজন সাংস্কৃতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিকে যখন প্রচলিত প্রতিকৃতি থেকে সরিয়ে নতুন বস্তুগত দেহে পুনর্গঠন করা হয়, তখন পরিচয় কতটা অবয়ব, কতটা স্মৃতি আর কতটা দর্শকের পূর্বজ্ঞান—কাজটি সেই প্রশ্নই সামনে আনে।
‘মার্জড’, ২০২৬-এ শূন্যস্থান এই নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইস্পাতের উপস্থিতির মতোই তাদের মধ্যকার ফাঁক দেহকে দৃশ্যমান করে তোলে। শূন্যতা এখানে অনুপস্থিতি নয়; দেহের সম্ভাব্য বিস্তার। কাজটি সম্পূর্ণ মানবদেহ নয়, আবার নিছক বিমূর্ত গড়নও নয়—এই মধ্যবর্তী অবস্থানই তাকে শক্তি দেয়। দর্শক একটি পরিচিত অবয়বের ইঙ্গিত পান, কিন্তু তাকে সম্পূর্ণভাবে কোনো একটি নামে আটকে রাখতে পারেন না।
‘ডুয়েল বিইং’, ২০২২-এ মানুষ ও প্রাণীর সীমারেখা আরও সরাসরি সামনে আসে। মানবিক ও প্রাণিসুলভ বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি অবস্থান একধরনের দ্বৈততার অনুভূতি তৈরি করে। তবে কাজটির তাৎপর্য দুটি পরিচিত সত্তাকে জোড়া দেওয়ায় নয়; বরং দুটি পরিচয় একত্র হওয়ার পর যে সত্তা তৈরি হয়, তাকে আবার আগের কোনো একটি পরিচয়ে ফিরিয়ে নেওয়া যায় কি না—সেই সংশয়েই। সংকরতা এখানে কোনো চূড়ান্ত শ্রেণি নয়; পরিচয় তৈরির একটি চলমান প্রক্রিয়া।
‘কম্পোজিট ম্যান’, ২০১৮ এবং ‘কম্পোজিট ওম্যান’, ২০২৬—শিরোনাম দুটি দর্শককে নির্দিষ্ট লিঙ্গপরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু অবয়ব দুটি প্রচলিত পুরুষ বা নারীর শরীরের পূর্ণ প্রতিরূপ নয়। নাম–পরিচয় নির্ধারণ করতে চায়, শরীর সেই নির্ধারণকে অস্থির করে। শিরোনাম ও অবয়বের মধ্যে তৈরি হওয়া এই টানই কাজ দুটির গুরুত্বপূর্ণ দিক। শিল্পী কোনো একটি চূড়ান্ত অর্থ দর্শকের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে তাকে পরিচিতি ও অবয়বের মাঝখানে দাঁড় করান।
‘বার্ড বিইং’, ২০২৫-এ ‘পাখি’র চেয়ে ‘সত্তা’ শব্দটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণী এখানে কেবল একটি প্রজাতির পরিচয় নয়; একটি অস্তিত্বের সম্ভাবনা। মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্ককে শ্রেণিবিন্যাসের বদলে পারস্পরিক অস্তিত্বের দিকে সরিয়ে নেওয়ার এই প্রবণতা তৌফিকুরের দেহ-ভাবনার সঙ্গেই যুক্ত।
‘মাদারহুড’, ২০১৮-এ দেহের প্রশ্নটি আরও জটিল জৈবিক অঞ্চলে প্রবেশ করে। বৃহৎ স্তনগ্রন্থি বা ওলান-সদৃশ গড়ন মাতৃত্বকে কোমলতা ও মমতার প্রচলিত প্রতীকে আটকে রাখে না। যৌন পরিপক্বতা, প্রজনন ও সন্তানপালনের জৈবিক বাস্তবতা একই সঙ্গে সামনে আসে। যৌনতা কোথায় শেষ হয়, মাতৃত্ব কোথা থেকে শুরু হয়—কাজটি সেই সীমারেখা স্পষ্ট করে না। দক্ষিণ এশীয় দেহ-ঐতিহ্যের সঙ্গে একধরনের দূরবর্তী অনুরণন অনুভব করা যায়, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহ্যের প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার হিসেবে কাজটিকে দেখার ভিত্তি নেই।
‘এটার্নাল পোয়েট’, ২০১৭–২০২৬-এ দেহ ব্যক্তিগত পরিচয়ের বাইরে সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়। অবয়বটি রবীন্দ্রনাথের কথা মনে করায়, কিন্তু প্রচলিত প্রতিকৃতি হিসেবে কাজ করে না। রামকিঙ্কর বেইজের রবীন্দ্রনাথ-প্রতিকৃতির কথাও তুলনামূলকভাবে মনে পড়তে পারে, তবে এখানে প্রত্যক্ষ প্রভাবের প্রশ্ন নয়। একজন সাংস্কৃতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিকে যখন প্রচলিত প্রতিকৃতি থেকে সরিয়ে নতুন বস্তুগত দেহে পুনর্গঠন করা হয়, তখন পরিচয় কতটা অবয়ব, কতটা স্মৃতি আর কতটা দর্শকের পূর্বজ্ঞান—কাজটি সেই প্রশ্নই সামনে আনে।
তৌফিকুর রহমানের একটি চিত্রকর্মকালো ঘনত্ব কাগজে এমন এক বস্তুগত চাপ তৈরি করে, যা ভাস্কর্যের ভরের কথা মনে করায়; অথচ তা স্পর্শ করা যায় না, তার চারপাশ দিয়ে ঘোরাও যায় না। বিপরীতে ভাস্কর্যের ফাঁক কাগজের সাদা অংশের মতো দৃষ্টির অবকাশ তৈরি করলেও তা বাস্তব স্থান দখল করে। দুই মাধ্যম পরস্পরের দিকে এগোয়, কিন্তু একে অন্যে সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয় না। তাদের সম্পর্ক মিলনের নয়; অসম্পূর্ণ অনুবাদের।
‘গোট’, ১৯৯৮, বর্তমান প্রদর্শনীতে থাকা একটি পুরোনো কাজ। ঢালাই লোহার এই ছোট কাজটি প্রাণী-দেহ নিয়ে শিল্পীর দীর্ঘ আগ্রহের একটি সূত্র দেয়। কিন্তু একে কয়েক দশকের শৈলীগত বিবর্তনের সরল প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না; বরং পুরোনো কাজটির উপস্থিতি বর্তমান কাজগুলোর সঙ্গে একটি সময়গত সম্পর্ক তৈরি করে। প্রাণী ও মানবদেহের পরিচিত অবয়ব দীর্ঘদিন ধরে শিল্পীর অনুসন্ধানের অংশ হয়ে আছে—‘গোট’ সেই ধারার একটি প্রাথমিক দৃশ্যমান চিহ্ন।
তৌফিকুরের কাজকে পিকাসো, হেনরি মুর, জিয়াকোমেত্তি কিংবা অ্যান্টনি গর্মলির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, তবে প্রত্যক্ষ প্রভাবের সূত্র হিসেবে নয়। আধুনিক ও সমকালীন ভাস্কর্যে দেহের খণ্ডন, শূন্যস্থান, ভঙ্গুরতা ও অস্তিত্ব নিয়ে যে দীর্ঘ আলোচনা চলে আসছে, তৌফিকুরের কাজ তার সঙ্গেই সংলাপ তৈরি করে। হেনরি মুরের ক্ষেত্রে দেহের ভেতরের ফাঁক যেমন অবয়বের সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠে, তৌফিকুরের ‘মার্জড’-এও ফাঁক কেবল অনুপস্থিতি নয়। জিয়াকোমেত্তির দীর্ঘায়িত দেহ যেখানে অস্তিত্বের ভঙ্গুরতার দিকে নিয়ে যায়, তৌফিকুরের দেহ সেখানে নির্মাণের মধ্য দিয়ে নতুন অবয়ব লাভ করতে থাকে। অ্যান্টনি গর্মলির ক্ষেত্রে দেহ ও অস্তিত্বের সম্পর্ক যে প্রশ্ন তৈরি করে, তৌফিকুরের কাজ সেই প্রশ্নকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে—কারণ তাঁর দেহ অনেক সময় সম্পূর্ণ মানবদেহই থাকে না।
অঙ্কনে এই অনিশ্চয়তা আরও গতিশীল। ‘হাইব্রিড রিয়েলিটি’, ২০২৪-এ চোখ, মুখ, হাত, পা ও প্রাণীর বিভিন্ন অংশ পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করে। দর্শক অংশগুলো চিনতে পারেন, কিন্তু সেই অংশের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ অবয়ব নির্মাণ করতে পারেন না। অঙ্কনগুলো তাই কেবল সংকর শরীরের ছবি নয়; এগুলো দেখায়, আমরা কীভাবে শরীরকে চিনে নিই। চোখকে চোখ, হাতকে হাত হিসেবে শনাক্ত করার পর যখন তারা অপ্রত্যাশিতভাবে অন্য অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন চেনার প্রক্রিয়াটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এই অঙ্কনগুলোর রেখাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রেখা শুধু সীমা নির্ধারণ করে না; অবয়ব খুঁজতে খুঁজতে এগোয়। কখনো একটি অংশকে স্পষ্ট করে, কখনো অন্য অংশের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়, কখনো একটি সম্ভাব্য শরীর তৈরি করে আবার সেটিকে অসম্পূর্ণ রেখে দেয়। অঙ্কন তখন আর কোনো প্রস্তুত নকশা থাকে না; নিজেই হয়ে ওঠে অনুসন্ধানের ক্ষেত্র।
‘আনস্পোকেন ডার্কনেস’, ২০২৬-এ এই অনুসন্ধান আরও ঘন। কালো রং এখানে কেবল রেখার বিকল্প নয়, একধরনের ভর ও ঘনত্ব। বিপরীতে সাদা কাগজ হয়ে ওঠে ফাঁক, অনুপস্থিতি কিংবা এখনো প্রকাশিত হয়নি এমন সম্ভাবনার ক্ষেত্র। প্রশ্নটি ‘কোন দেহ?’ থেকে সরে গিয়ে দাঁড়ায়—একটি দেহ দৃশ্যমান হওয়ার জন্য তাকে কতটা প্রকাশিত হতে হয়?
এখানেই অঙ্কন ও ভাস্কর্যের দূরত্বটি গুরুত্বপূর্ণ। কালো ঘনত্ব কাগজে এমন এক বস্তুগত চাপ তৈরি করে, যা ভাস্কর্যের ভরের কথা মনে করায়; অথচ তা স্পর্শ করা যায় না, তার চারপাশ দিয়ে ঘোরাও যায় না। বিপরীতে ভাস্কর্যের ফাঁক কাগজের সাদা অংশের মতো দৃষ্টির অবকাশ তৈরি করলেও তা বাস্তব স্থান দখল করে। দুই মাধ্যম পরস্পরের দিকে এগোয়, কিন্তু একে অন্যে সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয় না। তাদের সম্পর্ক মিলনের নয়; অসম্পূর্ণ অনুবাদের।
তৌফিকুর রহমানের একটি চিত্রকর্মদেহের বিভিন্ন অংশের সংযোজন, ইস্পাতের পাত ও দণ্ড, ঝালাইয়ের চিহ্ন, কৌণিক পৃষ্ঠ এবং মানুষ-প্রাণীর মিশ্র অবয়ব বারবার ফিরে আসায় কোনো কোনো কাজে ভাষাটি সূত্রনির্ভর হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রতিটি নতুন সংযোজনই যে নতুন অর্থ তৈরি করবে, তা নয়। কোথাও কোথাও শরীরের আরও একটি অংশ যুক্ত হওয়ার ফলে জটিলতা না বেড়ে শুধু দৃশ্যগত সঞ্চয় ঘটে।
অঙ্কনগুলোকে ভাস্কর্যের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে পড়লে তাদের স্বাতন্ত্র্য কমে যায়। ‘হাইব্রিড রিয়েলিটি’ কোনো সম্ভাব্য ভাস্কর্যের নকশা নয়; কাগজের সমতলেই একটি অস্থির শরীর নির্মাণ করে। রেখা সেখানে আয়তনকে নির্দেশ করে, কিন্তু আয়তনে পরিণত হয় না। দর্শক একটি ত্রিমাত্রিক দেহের সম্ভাবনা অনুভব করেন, অথচ সেই দেহ কাগজের বাইরে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে না। অন্যদিকে ভাস্কর্যকে অঙ্কনের ত্রিমাত্রিক সম্প্রসারণ ভাবলেও একই সমস্যা থেকে যায়। ইস্পাতের পাত বা দণ্ড কেবল রেখাকে স্থানে প্রসারিত করে না; তারা স্থানকে কেটে, আটকে ও পুনর্গঠন করে। ‘মার্জড’-এর ফাঁক কাগজের সাদা অংশের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু সেই ফাঁক বাস্তব স্থান—তার ভেতর দিয়ে আলো যায়, দর্শকের দৃষ্টি সরে যায়, শরীরের চারপাশে চলাচলের ক্ষেত্র তৈরি হয়।
এই পার্থক্যই তৌফিকুরের দুই মাধ্যমকে পাশাপাশি রাখার প্রয়োজন তৈরি করে। অঙ্কনের রেখা যে স্বাধীনতা পায়, ভাস্কর্যের ইস্পাত তা পায় না; ইস্পাতকে ওজন, মাধ্যাকর্ষণ ও জোড়ের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়। আবার ভাস্কর্যের ফাঁক, ছায়া ও বস্তুগত উপস্থিতি অঙ্কনের সমতলে পুরোপুরি ফিরে আসতে পারে না। অঙ্কন তাই ভাস্কর্যের খসড়া নয়, ভাস্কর্যও অঙ্কনের সমাপ্ত রূপ নয়; বরং দুটি মাধ্যম একই প্রশ্নকে ভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরীক্ষা করে।
তবে এই ভাষার একটি সীমাবদ্ধতাও আছে। দেহের বিভিন্ন অংশের সংযোজন, ইস্পাতের পাত ও দণ্ড, ঝালাইয়ের চিহ্ন, কৌণিক পৃষ্ঠ এবং মানুষ-প্রাণীর মিশ্র অবয়ব বারবার ফিরে আসায় কোনো কোনো কাজে ভাষাটি সূত্রনির্ভর হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রতিটি নতুন সংযোজনই যে নতুন অর্থ তৈরি করবে, তা নয়। কোথাও কোথাও শরীরের আরও একটি অংশ যুক্ত হওয়ার ফলে জটিলতা না বেড়ে শুধু দৃশ্যগত সঞ্চয় ঘটে। ভবিষ্যৎ কাজের জন্য তাই বিয়োজনের সম্ভাবনাটি গুরুত্বপূর্ণ। আরও কিছু বাদ দেওয়া, কোনো রেখাকে অসমাপ্ত রাখা, একটি ফাঁককে বড় করা কিংবা পরিচিত অবয়বকে সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই থামিয়ে দেওয়া—এসবই নির্মিত ভাষাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলতে পারে।
‘ডুয়েল বিইং’, তৌফিকুর রহমানশেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দেহের নয়, আমাদের দেখার পদ্ধতির। একটি দেহকে আমরা কতটা দেখে চিনতে পারি, আর কতটা পরিচয় নিজেরাই তার ওপর বসিয়ে দিই? তৌফিকুরের কাজ সেই নিশ্চিত জায়গাটিকে সরিয়ে দেয়। সেখানে দেহ কোনো উত্তর নয়—একটি চলমান প্রশ্ন। দেহটা আসলে কার?
‘রেখা–গড়ন–স্থিতি’কে শুধু একটি প্রদর্শনীর নাম হিসেবে পড়লে তার গভীরতর দিকটি ধরা পড়ে না। রেখা এখানে শুধু গড়নের জন্ম দেয় না; পরিচয়ের সীমাও পরীক্ষা করে। গড়ন শুধু শরীর তৈরি করে না; শরীরের পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আর স্থিতি কোনো চূড়ান্ত ভারসাম্য নয়—একটি অনিশ্চিত অবস্থাকে সাময়িকভাবে ধরে রাখার ব্যবস্থা মাত্র।
তৌফিকুর রহমানের এই প্রদর্শনীর গুরুত্বপূর্ণ অর্জন কোনো নির্দিষ্ট নতুন অবয়ব আবিষ্কার করা নয়। বরং পরিচিত দেহকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে দর্শক তাকে চিনতে পারেন, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে নাম দিতে পারেন না। মানুষ সেখানে প্রাণীর দিকে সরে যায়, প্রাণী মানুষের দিকে; পুরুষ ও নারী—নামের ভেতর প্রবেশ করেও সেই নামকে অতিক্রম করে; কবির স্মৃতি প্রতিকৃতি হয়ে ওঠে না, নতুন দেহে পুনর্গঠিত হয়; মাতৃত্ব জৈবিকতা ও যৌনতার সীমা মুছে দেয়; পাখি প্রজাতি থেকে সত্তায় পরিণত হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দেহের নয়, আমাদের দেখার পদ্ধতির। একটি দেহকে আমরা কতটা দেখে চিনতে পারি, আর কতটা পরিচয় নিজেরাই তার ওপর বসিয়ে দিই? তৌফিকুরের কাজ সেই নিশ্চিত জায়গাটিকে সরিয়ে দেয়। সেখানে দেহ কোনো উত্তর নয়—একটি চলমান প্রশ্ন। দেহটা আসলে কার?
‘রেখা–গড়ন–স্থিতি’ তৌফিকুর রহমানের ভাস্কর্য ও অঙ্কন নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনী। কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমান। রাজধানীর লালমাটিয়ায় কালাকেন্দ্রে ১১ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীর শেষ দিন ২৭ সেপ্টেম্বর। খোলা থাকবে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।