ইশারা ভাষার মানুষকে নীরব করে রাখবেন না
· Prothom Alo

বীণা (ছদ্মনাম) হাত দিয়ে কথা বলে। তার ভাষা কণ্ঠস্বরনির্ভর নয়, তার ভাষা ইশারা। কিন্তু তাই বলে তার বলার মতো কথা কম নয়।
Visit turconews.click for more information.
তারও আছে অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, অভিযোগ, প্রত্যাশা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। সমস্যা হলো, আমরা কি তার ভাষা বুঝতে প্রস্তুত?
এ প্রশ্নই সামনে নিয়ে আসে ‘দ্য সাইলেন্স’ নামের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য অডিও-ভিজ্যুয়াল ফিকশনের গল্প।
সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে বীণা নামের একজন ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী তরুণীর ন্যায়বিচার পাওয়ার সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।
চলচ্চিত্রটির মূল বক্তব্য খুব সরল—ভাষার কারণে যেন কোনো মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার বাধাগ্রস্ত না হয়।
৩০ লাখ বাক্প্রতিবন্ধীর মুক্তির হাতিয়ার ইশারা ভাষা নিয়ে অবহেলা কেনইশারা ভাষা প্রাণের ভাষাআন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস উপলক্ষে সংকেত ও ইউএনডিপির উদ্যোগে ফিকশনটি নির্মিত হয়েছে।
তবে এটি শুধু একটি চলচ্চিত্রের গল্প নয়; বরং আমাদের চারপাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে তাকানোর সুযোগ।
একটি গুরুতর ঘটনার পর বীণার মা–বাবা তাকে নিয়ে থানায় যান। তাঁরা চান, ঘটনার বিচার হোক। পুলিশ কর্মকর্তা বীণার কাছে জানতে চান, কী ঘটেছে।
বীণা ইশারায় উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে কেউ তার ভাষা বোঝে না। তার বাবা জানান, বীণা জন্ম থেকেই শুনতে ও কথা বলতে পারে না।
এরপর আসে সেই কঠিন বাস্তবতা—বীণার বক্তব্য কীভাবে গ্রহণ করা হবে? তার নিজের ভাষায় বলা কথাকে কীভাবে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ করা হবে?
চিত্রনাট্যের এ দৃশ্য খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, এখানে আসলে একজন মানুষের ন্যায়বিচারের পথ কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, সেটিই দেখানো হয়েছে।
ইশারা ভাষাকে যেভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে বিটিভিবাংলা ইশারা ভাষা প্রমিতকরণ কেন জরুরিআমরা যদি এমন একটি সমাজের কথা বলি, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক আইনের সমান আশ্রয় পাবেন, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—একজন মানুষ যে ভাষায় সবচেয়ে ভালোভাবে নিজের কথা বলতে পারে, সেই ভাষায় তাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে না কেন?
ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী মানুষকে আমরা অনেক সময় ‘বোবা’ বা ‘নির্বাক’ হিসেবে দেখি। এই দৃষ্টিভঙ্গিই সমস্যার শুরু।
বীণা কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে কথা বলতে পারে না—এটি তার একটি যোগাযোগগত বাস্তবতা। কিন্তু সে যে কথা বলতে পারে না, তা নয়। সে কথা বলে—তার নিজের ভাষায়।
বীণার হাতের নড়াচড়া, মুখের অভিব্যক্তি, চোখের দৃষ্টি—সব মিলিয়ে সে তার বক্তব্য প্রকাশ করে।
আমরা যদি তার ভাষা না বুঝি, তাহলে সেটি তার নীরবতা নয়; সেটি আমাদের বোঝার সীমাবদ্ধতা।
এ পার্থক্য আমাদের বুঝতে হবে। কারণ, একজন মানুষকে ‘নীরব’ বলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা অনেক সময় তার বক্তব্যকেও অদৃশ্য করে ফেলি।
স্বল্পদৈর্ঘ্য অডিও-ভিজ্যুয়াল ফিকশন ‘দ্য সাইলেন্স’–এর একটি দৃশ্য।বীণার গল্পে পরিবর্তন আসে যখন একজন ইশারা ভাষার দোভাষীর সন্ধান পাওয়া যায়। পুলিশ কর্মকর্তা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে একজন দোভাষীর সন্ধান পান।
এরপর দোভাষী আহসান বীণার সঙ্গে ইশারা ভাষায় যোগাযোগ করেন। হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বদলে যায়। যে মেয়েটির কথা এতক্ষণ কেউ বুঝতে পারছিল না, সে নিজের ভাষায় কথা বলার সুযোগ পায়।
আদালতেও বীণার বক্তব্য দোভাষীর মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। বীণা ইশারা ভাষায় ঘটনার বিবরণ দেয়, আর দোভাষী তা আদালতের সামনে অনুবাদ করেন। এ জায়গাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়।
একজন দোভাষী শুধু দুটি ভাষার মধ্যে অনুবাদ করেন না। অনেক ক্ষেত্রে তিনি একজন মানুষের বক্তব্যকে এমন একটি জায়গায় পৌঁছে দেন, যেখানে সেই বক্তব্যের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থাৎ দোভাষীর উপস্থিতি শুধু যোগাযোগ সহজ করে না; এটি একজন মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগকেও সহজ করতে পারে।
চলচ্চিত্রের আদালতের দৃশ্যে দোভাষীর অনুবাদের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে বিচারকের নির্দেশে বীণাকে ইশারা ভাষায় প্রশ্ন করা হয়। সে ইশারায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করে।
শরীরের কথা নাকি ব্যক্তিগত গল্প : নীরবতা, ক্ষত, রক্ত ও প্রেমের ভাষাছোট ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ভাষা মডেলএ দৃশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—বিচারপ্রক্রিয়ায় একজন মানুষের বক্তব্য গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষাগত ব্যবস্থা কি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখি?
ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী কেউ যখন থানায় যান, তখন তার জন্য যোগাযোগের ব্যবস্থা দরকার। হাসপাতালে গেলে দরকার। সরকারি অফিসে গেলেও দরকার।
আদালতে গেলে তো আরও বেশি দরকার। কারণ, সেখানে একটি ভুল–বোঝাবুঝির পরিণতি অনেক বড় হতে পারে।
তাই ইশারা ভাষার দোভাষীকে কেবল ‘সহায়ক ব্যক্তি’ হিসেবে না দেখে প্রয়োজনীয় যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
বীণার গল্পের শেষ দিকে একটি বাক্য উচ্চারিত হয়—‘ভাষা শুধু কণ্ঠস্বর দিয়েই হয় না।’ বাক্যটি আসলে আমাদের প্রচলিত ভাষার ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
আমরা ভাষাকে প্রায়ই কণ্ঠস্বরের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু পৃথিবীতে মানুষের যোগাযোগের ধরন অনেক বৈচিত্র্যময়। ইশারা ভাষা সেই বৈচিত্র্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই ইশারা ভাষা শেখা মানে শুধু কয়েকটি ইশারা শেখা নয়। এর অর্থ হলো এমন একজন মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা, যার সঙ্গে হয়তো এত দিন আমরা যোগাযোগের সুযোগই তৈরি করিনি।
ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী মানুষের অন্তর্ভুক্তি শুধু প্রতিবন্ধিতা-বিষয়ক কোনো আলাদা কর্মসূচির বিষয় নয়। এটি মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের বিষয়। পুলিশ, আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি সেবাকেন্দ্র—সব জায়গায় যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
সবাইকে পেশাদার ইশারা ভাষার দোভাষী হতে হবে—এমন দাবি কেউ করছে না। কিন্তু আমাদের সমাজে অন্তত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা দরকার, যেখানে ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী মানুষকে দেখে আমরা অসহায়ভাবে তাকিয়ে না থাকি।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা যদি কিছু মৌলিক ইশারা জানেন, একজন চিকিৎসক যদি রোগীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রাথমিক পদ্ধতি জানেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা বোঝেন, তাহলে অনেক পরিস্থিতিই সহজ হতে পারে।
আর যেখানে বিস্তারিত বা আইনি যোগাযোগের প্রয়োজন, সেখানে অবশ্যই দক্ষ ও উপযুক্ত দোভাষীর সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কারণ, ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন মানুষের ভাষাকে বাধা হতে দেওয়া যায় না।
ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী মানুষের অন্তর্ভুক্তি শুধু প্রতিবন্ধিতা-বিষয়ক কোনো আলাদা কর্মসূচির বিষয় নয়। এটি মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের বিষয়।
পুলিশ, আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি সেবাকেন্দ্র—সব জায়গায় যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইশারা ভাষা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।
আমরা আমাদের সন্তানদের অনেক ভাষা শেখাই। ভবিষ্যতে তারা যদি ইশারা ভাষার কিছু মৌলিক বিষয়ও শেখে, তাহলে সেটি শুধু তাদের ব্যক্তিগত দক্ষতা বাড়াবে না; বরং সমাজের একজন মানুষকে অন্য একজন মানুষের কাছে আরও সহজে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করবে।
‘দ্য সাইলেন্স’-এর শেষ দৃশ্যে বীণা তার মা–বাবার হাত ধরে আদালত থেকে বেরিয়ে যায়। তার জীবনের কষ্ট মুছে যায়নি।
বিচারপ্রক্রিয়াও হয়তো সেখানেই শেষ নয়। কিন্তু অন্তত একটি বড় বাধা অতিক্রম করা গেছে—তার কথা তার নিজের ভাষায় শোনা হয়েছে।
এ জায়গাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা। ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায় নয়। ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ হলো—একজন মানুষের কথা শোনা। আর কাউকে শুনতে হলে তার ভাষা বুঝতে হবে।
তাই আসুন, ইশারা ভাষাকে শুধু ইশারা হিসেবে না দেখি। এটিকে ভাষা হিসেবে দেখি, মানুষের অধিকার প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখি।
আহসান হাবিব, ইশারা ভাষার সংবাদ উপস্থাপক, বাংলাদেশ টেলিভিশন।