তিমির ভাষার খোঁজে: সাগরের তলদেশে বুদ্ধিমত্তার সন্ধান

· Prothom Alo

মানবজাতি পৃথিবীর বুকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর কোটি বছর আগে থেকেই মহাসমুদ্রের অন্ধকার তলদেশে এক গভীর ও সুসংগঠিত বাক্যালাপ চলে আসছে। সাগরের গভীর স্তব্ধতা ভেদ করে গড়ে উঠেছে সুর, ধ্বনি আর সংকেতের এক বিস্ময়কর গাণিতিক ও ব্যাকরণগত জগৎ। কিন্তু মানুষ দীর্ঘকাল ধরে তিমির এই ধ্বনিপ্রবাহকে কেবল পশুর সাধারণ গর্জন, অন্ধ আবেগ কিংবা অর্থহীন যান্ত্রিক শব্দ ভেবে ভুল করে এসেছে।

সবচেয়ে করুণ ও ভীতিপ্রদ সত্য হলো, শত শত বছর ধরে মানুষ যখন কাঠের ও লোহার জাহাজ ভাসিয়ে অন্ধের মতো হাজার হাজার তিমি নিধন করছিল, তখনও তিমিসমাজ সাগরের গহ্বরে একে অপরকে ভালোবেসে, নিজেদের দুঃখ প্রকাশ করে অস্তিত্বের বার্তাই পাঠিয়ে যাচ্ছিল। মানুষ যখন বিশালাকার তিমিকে কেবল বাতি জ্বালানোর তেল আর চর্বির উৎস হিসেবে দেখত, তখনও এরা একই গভীর ভাষায় নিজেদের ভালোবাসত এবং অস্তিত্বের জানান দিত। মানুষের চোখ এড়িয়ে সাগরের গভীরে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছিল তাদের সেই বার্তা—‘আমি এখানে আছি, আমি জীবিত আছি।’

Visit syntagm.co.za for more information.

তিমির সংকেতে মানুষের ভাষার মতোই লুকিয়ে আছে ব্যাকরণগত জটিলতা, স্বরবর্ণের উপস্থিতি এবং সামাজিক যোগাযোগের নিখুঁত নিয়মাবলি

মানুষের পুষে রাখা দীর্ঘকালের এই ভুল ধারণা অবশেষে ভেঙে পড়ে ২০২৩ সালে। আলাস্কা উপকূল এবং পরবর্তীকালে ক্যারিবীয় দ্বীপ ডমিনিকায় পরিচালিত আধুনিক গবেষণা প্রমাণ করে, তিমির এই ধ্বনি কোনো অর্থহীন পশুর গর্জন নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক অ্যাকুস্টিক বা শব্দগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, তিমির সংকেতে মানুষের ভাষার মতোই লুকিয়ে আছে ব্যাকরণগত জটিলতা, স্বরবর্ণের উপস্থিতি এবং সামাজিক যোগাযোগের নিখুঁত নিয়মাবলি। যা একসময় মানুষের কাছে কেবল নীরব আওয়াজ ছিল, তা মূলত কোটি বছর ধরে চলে আসা এক পূর্ণাঙ্গ ও সমৃদ্ধ ভাষারীতি।

স্বরবর্ণ ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে পারে তিমি
মানুষ যখন বিশালাকার তিমিকে কেবল বাতি জ্বালানোর তেল আর চর্বির উৎস হিসেবে দেখত, তখনও এরা একই গভীর ভাষায় নিজেদের ভালোবাসত এবং অস্তিত্বের জানান দিত।

তিমিদের এই অদ্ভুত ও শিষ্টাচারপূর্ণ যোগাযোগের এক বাস্তব দৃশ্য দেখা যায় ২০২৩ সালে, আলাস্কার খোলা সাগরে। ইউসি ডেভিসের জীববিজ্ঞানী ব্রেন্ডা ম্যাকাওয়ান ও তাঁর দল একটি অভাবনীয় পরীক্ষা চালান। তাঁরা সমুদ্রে একটি উচ্চমানের স্পিকার নামিয়ে আগের দিন রেকর্ড করা টুয়েন নামে ৩৮ বছর বয়সী এক স্ত্রী হাম্পব্যাক তিমির কন্টাক্ট কল বাজিয়ে শোনান।

শব্দটি শোনামাত্রই টুয়েন নৌকার কাছে ভেসে ওঠে এবং টানা ২০ মিনিট ধরে মানুষের বাজানো সংকেতের উত্তর দিতে থাকে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল, টুয়েন মানুষের মতোই বাক্যালাপের নিয়ম মেনে কথা বলছিল। প্রতিটি সংকেত শোনার পর সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে অপেক্ষা করত এবং ঠিক নিজের পালা এলে তবেই স্বর উচ্চারণ করত। এটি ছিল মানুষের সঙ্গে অন্য কোনো প্রজাতির দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের প্রথম ঐতিহাসিক প্রমাণ।

নীল তিমি সম্পর্কে ১০ মজার তথ্য
ইউসি ডেভিসের জীববিজ্ঞানী ব্রেন্ডা ম্যাকাওয়ান ও তাঁর দল সমুদ্রে উচ্চমানের স্পিকার নামিয়ে আগের দিন রেকর্ড করা টুয়েন নামে ৩৮ বছর বয়সী এক স্ত্রী হাম্পব্যাক তিমির কন্টাক্ট কল বাজিয়ে শোনান।

তিমির ভাষা বোঝার এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পেছনে লুকিয়ে ছিল আরেক চমৎকার গল্প। সমুদ্রবিজ্ঞানী ডেভিড গ্রুবার যখন স্পার্ম তিমির যান্ত্রিক ‘ক্লিক’ শব্দ শুনছিলেন, তখন এমআইটির বিখ্যাত ক্রিপ্টোগ্রাফার শাফি গোল্ডওয়াসার তা শুনে থমকে দাঁড়ান। তিনি মন্তব্য করেন—এই শব্দগুলো কোনো পশুর এলোমেলো আওয়াজ নয়, বরং এগুলো সামরিক গোপন কোড বা মোর্স কোডের মতোই গাণিতিকভাবে সাজানো।

এই ঐতিহাসিক ভাবনা থেকেই ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে প্রজেক্ট সিইটিআই। এমআইটি, হার্ভার্ড, ইউসি বার্কলে ও ইউসি ডেভিসের মতো বিশ্বের শীর্ষ ১৫টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা একসঙ্গে কাজ শুরু করেন। তাঁরা ক্যারিবীয় দ্বীপ ডমিনিকা উপকূলে স্পার্ম তিমির প্রায় ৯ হাজার পৃথক অডিও রেকর্ডিং ও সেন্সরের ডেটা সংগ্রহ করেন। এরপর সেগুলো চ্যাটজিপিটির মতো আধুনিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলে (LLM) বিশ্লেষণ করতে থাকেন, যাতে কোটি কোটি বছর ধরে সাগরের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই অচেনা ভাষার রহস্য উন্মোচন করা যায়।

নীল তিমির চেয়েও লম্বা জেলিফিশ
সমুদ্রবিজ্ঞানী ডেভিড গ্রুবার যখন স্পার্ম তিমির যান্ত্রিক ক্লিক শব্দ শুনছিলেন, তখন এমআইটির বিখ্যাত ক্রিপ্টোগ্রাফার শাফি গোল্ডওয়াসার তা শুনে থমকে দাঁড়ান।

তিমিসমাজের ব্যাকরণ ও সুসংগঠিত ভাষারীতি

প্রজেক্ট সিইটিআইয়ের এই বিস্ময়কর গবেষণায় তিমিদের ভাষার নিখুঁত ব্যাকরণ ও যোগাযোগের জটিল কাঠামোর এক অনন্য রূপ সামনে আসে। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস ছিল, স্পার্ম তিমিরা অত্যন্ত সীমিত পরিসরে, মাত্র ২১টি নির্দিষ্ট সংকেত বা ‘কোডা’ ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে। তবে আধুনিক এআই প্রযুক্তি হাজার হাজার অডিও ফাইল বিশ্লেষণ করে চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করে। জানা যায়, এরা আসলে মাত্র ২১টি নয়, বরং অন্তত ১৫৬টি স্বতন্ত্র কোডা ব্যবহার করে অত্যন্ত জটিল ভাব আদান-প্রদান করে।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের ভাষার মতোই তিমির ধ্বনিতে চারটি স্বাধীন অভ্যন্তরীণ উপাদান রয়েছে। এগুলো সূক্ষ্মভাবে পরিবর্তন করে তারা একটি বাক্যের পুরো অর্থই বদলে দিতে পারে। প্রথমে স্বাধীন উপাদানগুলো দেখা যাক।

মানুষের ভাষার মতোই তিমির ধ্বনিতে চারটি স্বাধীন অভ্যন্তরীণ উপাদান রয়েছে

১. টেম্পো: ক্লিকের গতি বা দ্রুততা। শব্দ কত দ্রুত বা ধীরে উচ্চারিত হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে তারা পরিস্থিতির জরুরি অবস্থা বা গভীর আবেগ প্রকাশ করে।

২. ছন্দ: পরপর কয়েকটি সংকেত বা ক্লিকের মধ্যবর্তী নিখুঁত বিরতি ও গাণিতিক অনুপাত।

৩. অলংকরণ: মূল সংকেতের মাঝখানে অতিরিক্ত ছোট ছোট শব্দ যুক্ত করা, যা বাক্যের অর্থকে অন্যদিকে মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

৪. রুবাতো: উচ্চারণের সময়ে সূক্ষ্ম কালের তারতম্য ঘটিয়ে ভয়, আশঙ্কা বা প্রশান্তির মতো অনুভূতির গভীরতা ফুটিয়ে তোলা।

হাঙ্গরের আক্রমণ থেকে বিজ্ঞানীকে বাঁচাল যে তিমি
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের ভাষার মতোই তিমির ধ্বনিতে চারটি স্বাধীন অভ্যন্তরীণ উপাদান রয়েছে। এগুলো সূক্ষ্মভাবে পরিবর্তন করে তারা একটি বাক্যের পুরো অর্থই বদলে দিতে পারে।

ভাষাবিজ্ঞানের নিয়মে অল্প কিছু মৌলিক ধ্বনি-উপাদানকে যুক্ত করে অসীম অর্থযুক্ত বাক্য গঠন করার এই অনন্য ক্ষমতাকে বলা হয় ডুয়ালিটি অব প্যাটার্নিং। এত দিন প্রথাগত বিজ্ঞান বিশ্বাস করত, এই ক্ষমতা কেবল মানবজাতিরই একচ্ছত্র অধিকার। এমনকি ইউসি বার্কলের ভাষাবিদ গ্যাসপার বাকুস প্রমাণ করেছেন, তিমির ধ্বনিতে মানুষের উচ্চারিত স্বরবর্ণের মতোই স্পষ্ট অ্যাকুস্টিক গঠন রয়েছে। যেমন—‘Father’ শব্দের 'আ' ধ্বনির মতো ‘এ-কোডা’ (A-coda) এবং 'See' শব্দের 'ঈ' ধ্বনির মতো ‘আই-কোডা’ (I-coda)। মানুষ ও তিমির শারীরিক গঠন সম্পূর্ণ পৃথক হওয়া সত্ত্বেও ভাষার এমন অভিন্ন জটিলতায় পৌঁছানোকে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় কনভারজেন্ট ইভল্যুশন।

পাশাপাশি তিমিরা কার সঙ্গে কথা বলছে, তার ওপর ভিত্তি করে সংকেতের রূপ বদলে ফেলে। একে ভাষাবিজ্ঞানে বলা হয় অডিয়েন্স ডিজাইন। অর্থাৎ, একজন মানুষ যেমন বিচারক, বন্ধু কিংবা শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় স্বর ও ভঙ্গি বদলে নেয়, তিমিরাও তা-ই করে।

তিমিরা কার সঙ্গে কথা বলছে, তার ওপর ভিত্তি করে সংকেতের রূপ বদলে ফেলে। একে ভাষাবিজ্ঞানে বলা হয় অডিয়েন্স ডিজাইন

এর থেকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয় যে অন্য তিমিরও একটি নিজস্ব মন, আবেগ ও মনস্তাত্ত্বিক অস্তিত্ব রয়েছে। তা অনুধাবন করার বিরল সামাজিক প্রজ্ঞাও এদের মস্তিষ্কে বিদ্যমান।

এমনকি সদ্যোজাত স্পার্ম তিমিরা মানুষের শিশুদের মতোই জীবনের শুরুতে অস্পষ্ট ধ্বনি বা ব্যাবলিং করার মাধ্যমে ভাষা শেখা শুরু করে। এরপর তারা মায়ের কাছে অনুশীলন করতে করতে নিজেদের পরিবার বা গোত্র চিহ্নিতকারী প্রথম পরিপূর্ণ সংকেত আইডেন্টিটি কোডা শেখে। এটি কেবল কোনো জন্মগত প্রবৃত্তি নয়, বরং মানুষের সংস্কৃতির মতোই বংশপরম্পরায় পরিবাহিত হওয়া এক অর্জিত সামাজিক ঐতিহ্য।

প্রাণীরা যোগাযোগ করে কীভাবে
মানুষ ও তিমির শারীরিক গঠন সম্পূর্ণ পৃথক হওয়া সত্ত্বেও ভাষার এমন অভিন্ন জটিলতায় পৌঁছানোকে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় কনভারজেন্ট ইভল্যুশন।

শতাব্দীব্যাপী ট্র্যাজেডি, প্রতিরোধ ও সুরক্ষার সংগ্রাম

তিমিদের এই বুদ্ধিমত্তা ও সুসংগঠিত যোগাযোগের প্রমাণ কেবল বিজ্ঞানাগারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ইতিহাসও তার বড় সাক্ষী। উনবিংশ শতাব্দীর মার্কিন তিমিশিকারি জাহাজগুলোর পুরোনো দিনলিপি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শিকারিরা যখন কোনো নতুন সাগরে পৌঁছাত, তখন প্রথম দিকে প্রচুর তিমি শিকার করতে পারত। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে, মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে সফলভাবে তিমি শিকারের হার এক ধাক্কায় ৫৮ শতাংশ কমে যেত! তিমিরা কেবল যে ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালাত তা নয়; বরং যেসব তিমি প্রাথমিক আক্রমণ থেকে বেঁচে ফিরত, তারা তাদের জটিল শব্দ সংকেতের (কোডা) মাধ্যমে হাজার হাজার মাইল দূরের অন্য তিমি পরিবারগুলোকে বিপদের বার্তা পাঠিয়ে সতর্ক করে দিত। ফলে কোনো দিন মানুষের হারপুন না দেখা তিমিগুলোও দূর থেকেই জাহাজ এড়িয়ে চলার কৌশল শিখে ফেলত।

হারম্যান মেলভিলের লেখা বিখ্যাত উপন্যাস মবিডিক বইয়ের প্রচ্ছদ

এমনই এক ভাষার ভুল-বোঝাবুঝি থেকে ঘটেছিল সামুদ্রিক ইতিহাসের অন্যতম লোমহর্ষক ঘটনা—১৮২০ সালের বিখ্যাত এসেক্স জাহাজের ট্র্যাজেডি। সেখানে একটি বিশাল স্পার্ম তিমি সজোরে জোড়া ধাক্কা দিয়ে ৮০০ টনের পুরো জাহাজটিকে সমুদ্রের বুকে ডুবিয়ে দেয়। এখান থেকেই হারম্যান মেলভিল তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস মবিডিক লেখেন। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, এটি কোনো অন্ধ আক্রোশ ছিল না। আক্রমণের ঠিক আগে জাহাজের ক্ষতিগ্রস্ত কাঠের গায়ে নাবিকেরা হাতুড়ি দিয়ে দ্রুত আঘাত করছিলেন। পানির নিচে সেই হাতুড়ির শব্দের ছন্দকে তিমিটি তাদের নিজস্ব ভাষার কোনো নির্দিষ্ট ‘ক্লিক সংকেত’ ভেবে ভুল করেছিল। তিমিটি বিশ্বাস করেছিল, জাহাজটি থেকে তাদের ভাষায় কোনো বার্তা দেওয়া হচ্ছে; আর সেই বার্তার জবাব দিতে গিয়েই ঘটে যায় সেই ঐতিহাসিক সংঘর্ষ।

আমরা কেন ডলফিনের মাংস খাই না
উনবিংশ শতাব্দীর মার্কিন তিমিশিকারি জাহাজগুলোর পুরোনো দিনলিপি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শিকারিরা যখন কোনো নতুন সাগরে পৌঁছাত, তখন প্রথম দিকে প্রচুর তিমি শিকার করতে পারত।

দুর্ভাগ্যবশত, একুশ শতকে এসে মানুষ ও তিমির এই অমীমাংসিত সম্পর্ক আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশাল বাণিজ্যিক জাহাজ, সামরিক শক্তির উচ্চশব্দের সোনার এবং সাগরের তলদেশে তেলের সন্ধানে চালিত বিস্ফোরণের বিকট আওয়াজ সমুদ্রের স্বাভাবিক স্তব্ধতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তিমির চোখ বলতে শব্দ; তাই এই বিকট যান্ত্রিক আওয়াজ তাদের কান নষ্ট করে দেয়, পরিবার থেকে আলাদা করে ফেলে এবং দিগভ্রান্ত বানায়। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, ‘বধির তিমি মানেই মৃত তিমি’।

তবে এই নীরব গণহত্যা ও পরিবেশগত ট্র্যাজেডি থামানোর এক নতুন আশার আলো দেখা গেছে সম্প্রতি। ২০২৪ সালে নিউজিল্যান্ড এবং কুক আইল্যান্ডের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নেতারা একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। শতাব্দী ধরে চলে আসা ত্যাগের অবসান ঘটিয়ে তাঁরা তিমিদের মানুষের মতোই ‘আইনি ব্যক্তি’ হিসেবে মৌলিক মানবাধিকার ও আইনি সুরক্ষা প্রদান করেছেন; যা মহাসমুদ্রের এই প্রাজ্ঞ অধিবাসীদের রক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

মানুষের জন্যই কি তিমির যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে
তিমির চোখ বলতে শব্দ; তাই এই বিকট যান্ত্রিক আওয়াজ তাদের কান নষ্ট করে দেয়, পরিবার থেকে আলাদা করে ফেলে এবং দিগভ্রান্ত বানায়। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, ‘বধির তিমি মানেই মৃত তিমি’।

প্রথম বার্তা

তিমিদের এই বিশাল ও জটিল ভাষাভাবভান্ডারের রহস্য ভেদ করতে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্প্রতি এক রূপকথার মতো আবিষ্কারের দ্বার উন্মোচন করেছে। গবেষকেরা তাদের ১৫৬টি কোডার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত ও বহুল ব্যবহৃত সংকেতটি অনুবাদ করতে সক্ষম হয়েছেন। সেটি হলো ১ + ১ + ৩ নামের একটি সংকেত।

প্রথমে দুটি একক, বিচ্ছিন্ন ‘ক্লিক’ শব্দ—এক, আর এক। তারপর এক পলকের গভীর নীরবতা। শেষে দ্রুতগতির তিনটি ধারাবাহিক তরঙ্গের দোলা—এক, দুই, তিন। গভীর জলে ডুব দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, বিশাল শূন্যতা ভেদ করে সমুদ্রের বুকে ভেসে ওঠার সময়ে, পুরো গোত্রের হাত ধরাধরি করে একত্রিত হওয়ার লগ্নে কিংবা নতুন কোনো প্রাণের আগমনী ক্ষণে, অথবা অন্য কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনাকে জানাতে—জীবন ছুঁয়ে যাওয়া প্রতিটি মুহূর্তেই বেজে ওঠে এই সুর।

‘আই এম হিয়ার’ বা ‘আমি এখানে আছি’। এটি কোনো জটিল কৌশলগত তথ্য কিংবা বিপদের সতর্কবার্তা নয়; এটি কেবলই বিশালাকার তিমিদের নিজের অস্তিত্বের এক সরল ঘোষণা। পরম মমতায় এক সচেতন জীব কর্তৃক অন্য সচেতন জীবকে জানিয়ে দেওয়া যে ‘অন্ধকার ও অসীম এই সাগরের মাঝে আমি একা নই, আমি জীবিত এবং তোমার সঙ্গেই আছি।’

সামুদ্রিক প্রাণীরা কীভাবে ঘুমায়
গবেষকেরা তিমিদের ১৫৬টি কোডার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত ও বহুল ব্যবহৃত সংকেতটি অনুবাদ করতে সক্ষম হয়েছেন। সেটি হলো ১ + ১ + ৩ নামের একটি সংকেত।

মানবজাতি সোজা হয়ে দাঁড়ানোর কোটি বছর আগে থেকেই—গত তিন কোটি বছর ধরে—সমুদ্রের অন্ধকারে প্রতিধ্বনিত হতে থাকা এই সাধারণ কিন্তু গভীর বাক্যটি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়; চেতনা, ভাষা ও অনুভূতির একচ্ছত্র অধিকারী কেবল মানুষ নয়।

মহাকাশের অসীম শূন্যতায় কান পেতে দূর ভিনগ্রহের কোনো বুদ্ধিমান প্রজাতি কিংবা সংকেত সন্ধান করার আগে, আমাদের নিজেদের গ্রহের সাগরের অতলে বাস করা এই প্রাচীন প্রাজ্ঞদের (তিমি) ভাষা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। তাদের ভাষাকে সম্মান জানানো, তাদের বিপন্ন অস্তিত্বকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা এবং এই পৃথিবীকে বাঁচানোই এখন মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক: বিজ্ঞানবক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্তযেসব প্রাণী সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচে

Read full story at source