জুয়া খেলার ভয়াবহ ৭ ক্ষতি
· Prothom Alo

ইসলামে জুয়াকে ‘মাইসির’ ও ‘কিমার’ বলা হয়। কোনো শ্রম, ব্যবসায়িক বিনিময় বা বৈধ চুক্তি ছাড়া স্রেফ ভাগ্য কিংবা ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে অন্যের সম্পদ হস্তগত করার যেকোনো প্রক্রিয়াকে ইসলাম কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করেছে।
প্রচলিত ক্যাসিনো, তাসের বাজি কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির স্পোর্টস বেটিং ও অনলাইন জুয়ার বিভিন্ন অ্যাপস—বাহ্যিক রূপ যা-ই হোক না কেন, সবই ইসলামের দৃষ্টিতে জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।
Visit fish-roadgame.com for more information.
জুয়াকে মানুষের আত্মিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ এবং শয়তানের নোংরা হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি এবং ভাগ্যনির্ধারক তিরসমূহ—এসবই শয়তানের অপবিত্র ও ঘৃণ্য কাজ। অতএব, তোমরা এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা চূড়ান্ত সফলতা লাভ করতে পারো।’ (সুরা মায়িদাহ, আয়াত: ৯০)
জুয়ার ভয়াবহ প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পুরো পরিবার ও সমাজব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়। জুয়া খেলার সাতটি মারাত্মক ক্ষতি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. পারস্পরিক শত্রুতা তৈরি
জুয়া মানুষের ভেতর এক অসুস্থ লোভ ও আক্রোশের জন্ম দেয়। পরাজিত ব্যক্তির মনে বিজয়ীর প্রতি তীব্র হিংসা, ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হয়; যার ফলে স্বাভাবিক ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হয়ে চরম সামাজিক শত্রুতার সৃষ্টি হয়। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হলো, জুয়া মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে পুরোপুরি গাফেল করে দেয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা এই মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় তুলে ধরে বলেন,
‘শয়তান তো শুধু এটাই চায় যে মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিক এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখুক। অতএব, তোমরা কি এখনো নিবৃত্ত হবে না?’ (সুরা মায়িদাহ, আয়াত: ৯১)
২. অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাৎ
জুয়ার মূল চালিকা শক্তি হলো—অন্যকে নিঃস্ব করে নিজের পকেট ভারী করা। অর্থনৈতিক লেনদেনে কোনো বৈধ বিনিময়মূল্য, উৎপাদনশীল শ্রম বা পারস্পরিক সম্মতিপূর্ণ বৈধ ব্যবসা ছাড়া এভাবে সম্পদ কুক্ষিগত করা স্পষ্ট জুলুম।
আল্লাহ–তাআলা সতর্ক করে বলেন: ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের ধনসম্পদ গ্রাস কোরো না; তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কোনো ব্যবসা করা বৈধ...’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)
জুয়াড়ির উপার্জিত প্রতিটি পয়সা বাতিল ও অন্যায় আয়ের অন্তর্ভুক্ত।
জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ শতভাগ হারাম। আর শরীর যদি হারাম অর্থে গঠিত রক্ত-মাংসে পরিচালিত হয়, তবে তার কোনো আমল বা আহাজারি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না।মুসলিম সমাজে আসক্তি: প্রতিকারের উপায় কী
৩. দোয়া কবুল না হওয়া
জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ শতভাগ হারাম। আর শরীর যদি হারাম অর্থে গঠিত রক্ত-মাংসে পরিচালিত হয়, তবে তার কোনো আমল বা আহাজারি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না।
রাসুল (সা.) এমন এক ব্যক্তির দৃষ্টান্ত টেনেছেন, যে দূর-দূরান্তে দীর্ঘ সফর করে পরিশ্রমে ধূলিমলিন ও রুক্ষ বেশে আকাশের দিকে হাত তুলে কাতর কণ্ঠে ডাকতে থাকে, ‘হে আমার প্রতিপালক, হে আমার পালনকর্তা’ অথচ তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং সে লালিত-পালিত হয়েছে সম্পূর্ণ হারাম উপার্জনে।
এরপর নবীজি (সা.) প্রশ্ন রাখেন, ‘তাহলে এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
৪. অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব
জুয়ার লোভ মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। সাময়িক কিছু জয়ের ফাঁদে পড়ে মানুষ আরও বড় বাজি ধরে এবং একপর্যায়ে নিজের জমানো মূলধন, স্থাবর সম্পত্তি এমনকি ভিটেমাটি পর্যন্ত হারিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা জুয়ার এই বাস্তব ক্ষতি সম্পর্কে বলেন, ‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন—এ দুটোর ভেতর রয়েছে মহাপাপ; যদিও মানুষের জন্য তাতে কিছু (সাময়িক) উপকারিতা রয়েছে, কিন্তু এগুলোর পাপ ও ক্ষতির দিক উপকারিতার চেয়ে বহুগুণ বড়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৯)
৫. মানসিক ভারসাম্যহীনতা
জুয়া হলো এক মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক আসক্তি। ক্রমাগত অর্থ হারানো এবং ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে জুয়াড়ি তীব্র বিষাদ, মানসিক অস্থিরতা ও হতাশায় ভোগে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে তার পরিবারে।
জুয়ার টাকার জন্য পরিবারে নিত্যদিন অশান্তি, মারধর ও দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকে; যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদ, পরিবারের অকালপতন এবং জুয়াড়ির আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
জুয়ার ঋণ শোধ করতে কিংবা পুনরায় বাজি ধরার অর্থের জোগান দিতে গিয়ে ব্যক্তি ধীরে ধীরে ভয়ংকর অপরাধের পথে পা বাড়ায়।অর্থনৈতিক বৈষম্য রোধে ইসলামের ৫ পদক্ষেপ
৬. অপরাধের বিস্তার
জুয়ার ঋণ শোধ করতে কিংবা পুনরায় বাজি ধরার অর্থের জোগান দিতে গিয়ে ব্যক্তি ধীরে ধীরে ভয়ংকর অপরাধের পথে পা বাড়ায়। ব্যক্তিপর্যায়ের মিথ্যাচার থেকে শুরু করে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির মতো জঘন্য অপরাধের পেছনে অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে এই জুয়ার নেশা। ফলে সমাজে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে এবং নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
৭. বেহেশত থেকে বঞ্চিত হওয়া
জুয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো পরকালের চিরন্তন ক্ষতি। একজন জুয়াড়ি যদি তওবা ছাড়া এই পাপে অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে আল্লাহর রহমত ও জান্নাতের প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
রাসুল (সা.) কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, ‘চার শ্রেণির মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না—পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, জুয়াড়ি (কিমারবাজ), দান করে খোঁটা দানকারী এবং সর্বদা মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৫৬৭২)
জুয়ার আহ্বানেও কাফফারা
ইসলাম জুয়াকে কতটা সমূলে উৎপাটন করতে চেয়েছে, তা বোঝা যায় নবীজির একটি হাদিস থেকে। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে নিছক কথার ছলেও বলে, “এসো, আমরা জুয়া খেলি”, সে যেন এর কাফফারা হিসেবে দান-সদকা করে!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৬০)
শুধু খেলার প্রস্তাব দেওয়ার কারণেই যদি পাপ মাফের জন্য সদকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে যে ব্যক্তি সরাসরি জুয়া খেলায় মত্ত থাকে, তার অপরাধের গভীরতা কত ভয়াবহ তা সহজেই অনুমেয়। এমনকি নিছক বাজির উদ্দেশ্যে ঘুঁটি বা পাশা দিয়ে খেলার ব্যাপারে রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পাশা খেলে, সে যেন তার হাতকে শূকরের গোশত ও রক্তে রঞ্জিত করল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৬০)
পরিশেষে, জুয়া কোনো আধুনিক বিনোদন বা অর্থ উপার্জনের স্মার্ট পথ নয়; বরং এটি ইহকাল ও পরকালকে ধ্বংস করে দেওয়ার এক নরকীয় ফাঁদ। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে সব ধরনের প্রকাশ্য ও ডিজিটাল জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং হালাল উপার্জনের পবিত্র পথে ফিরে আসাই প্রতিটি বিশ্বাসী মানুষের আবশ্যিক কর্তব্য।
সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: শিক্ষার্থী, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, ঢাকা