বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ
· Prothom Alo
সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী
মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীপ্রধান বন সংরক্ষক, বন অধিদপ্তর
সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের মাধ্যমে বাড়তি মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। ম্যানগ্রোভ মৎস্য চাষে সহায়তা করে ও উৎপাদন বাড়ায়—এটি নতুন নয়। তবে কোথায় এ ধরনের চাষ করা যাবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কোনোভাবেই প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে মৎস্য চাষ করা যাবে না। চকরিয়া সুন্দরবন এর বড় উদাহরণ।
২০১২ সাল থেকে আমরা উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের পাইলটিং করছি। কালীগঞ্জ ও শ্যামনগরে ১০০ হেক্টর এলাকায় ৩০০টি ঘেরে কেওড়া, বাইন, গোলপাতাসহ উপযোগী প্রজাতি লাগানো হয়েছে। সব এলাকায় ম্যানগ্রোভ না হওয়ায় কোথাও মূল ভূখণ্ডের প্রজাতিও পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো হয়েছে।
বড় পরিসরে যেতে সম্ভাবনাময় ১ লাখ ৯৫ হাজার হেক্টর এলাকার সঠিক ম্যাপিং করতে হবে। কোথায় ম্যানগ্রোভ উপযোগী এবং কারা নিজস্ব বা ইজারা নেওয়া জমিতে চাষ করছেন, তা চিহ্নিত করে প্রথম পর্যায়ে নিজস্ব জমির চাষিদের যুক্ত করা যেতে পারে।
চিংড়িঘের যেখানে আছে, সেখানে কী পরিমাণ মাটির বাঁধ আছে, আগে সেটার একটা প্রকৃত চিত্র (ম্যাপিং) করতে হবে। এ চিত্র পাওয়ার পর কী পরিমাণ ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ করা যাবে, সেটা ঠিক করতে হবে।
চিংড়িঘেরে এ ধরনের ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ একদিকে মাছকে ছায়া দেবে, গাছের পাতা পানিতে পড়ে প্লাঙ্কটনের জোগান বাড়াবে। সব মিলিয়ে চিংড়ির জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে। যেহেতু এখানে কীটনাশক, ফিড ও সারের ব্যবহার কম হবে, ফলে এখানে অর্গানিক চিংড়ির উৎপাদন বাড়বে। তাতে হাই ভ্যালু প্রোডাক্ট (উচ্চ মূল্যের) হিসেবে চিংড়ির রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ আছে। প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভকে রক্ষা করেই এটা করতে হবে।
ড. মো. লতিফুল ইসলাম
ড. মো. লতিফুল ইসলামমহাপরিচালক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)
কার্বন বাফারিংয়ের জন্য একটি দেশের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন। সে তুলনায় আমাদের বনাঞ্চল খুবই কম এবং এর বড় অংশ সুন্দরবন, শালবন ও মধুপুরে সীমিত। তাই উপকূলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মাছের প্রজনন, খাদ্য ও বিচরণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। চিংড়ি চাষ নিয়ে পরিবেশদূষণের অভিযোগের পর গবেষণায় আমরা দেখেছি, জোয়ারের পানি ঘেরে ওঠানামার ফলে পলি জমে এবং পানি পরিশোধিত হয়ে বের হয়। ম্যানগ্রোভের লিটারে থাকা নাইট্রোজেন ও ফসফরাস মৎস্যসম্পদের পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করে।
‘আমাদের উপকূলে যেখানে চিংড়ির চাষ হয়, সেখানে সব জমি ম্যানগ্রোভ চাষের উপযোগী কি না, সেটা আগে দেখতে হবে। এর পাশাপাশি আমাদের চিংড়ির জোনিং (চিংড়ির জন্য নির্ধারিত অঞ্চল) করতে হবে।’ জোনিংয়ের পাশাপাশি জোনের ভেতরেও ঠিক করতে হবে কোথায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক, সেমি–ইনটেনসিভ ও এক্সটেনসিভ চাষ হবে। প্রয়োজনে সেমি–ইনটেনসিভ এলাকার পাশে ১০ শতাংশ ম্যানগ্রোভ বাফার জোন রাখা যেতে পারে।
চিংড়ি একসময় রপ্তানি পণ্যের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। বর্তমানে রপ্তানিতে চিংড়ি এখন চতুর্থ বা পঞ্চম অবস্থানে। চিংড়িকে রপ্তানির তালিকায় ১ নম্বরে নিয়ে উৎপাদন বাড়াতে আমাদের আধুনিক ও উচ্চ প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। এ বিষয়ে মৎস্য, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
মো. সাজদার রহমান
মো. সাজদার রহমানপরিচালক, ব্লু ইকোনমি, মৎস্য অধিদপ্তর
সুন্দরবনকে আমরা মৎস্যসম্পদের আঁতুড়ঘর হিসেবে দেখি। ম্যানগ্রোভের পাতা ও ছোট ডাল পানিতে পচে পুষ্টি তৈরি করে, যা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, জুপ্ল্যাঙ্কটনসহ চিংড়ির খাদ্য তৈরিতে সহায়তা করে। গবেষণায় আমরা দেখেছি, সুন্দরবনের লিফ লিটার ব্যবহার করলে চিংড়ির পোনার টিকে থাকার হার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। ম্যানগ্রোভের শিকড় চিংড়ির খোলস বদলের সময় আশ্রয়ও দেয়।
প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ করে কোথায় সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষ করা যাবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতাকে আরও বড় পরিসরে প্রদর্শনী হিসেবে মাঠে প্রয়োগ করা দরকার। কারণ, লাভজনক মডেল দেখলে চাষিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আগ্রহী হবেন।
বড় পরিসরে যেতে হলে চাষিদের মালিকানা ও জমির ধরনও বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় এলাকার সঠিক ম্যাপিং জরুরি। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি জাতীয় কাঠামো বা কারিগরি নির্দেশিকা তৈরি করা প্রয়োজন। এতে স্থান নির্বাচন, ম্যানগ্রোভ প্রজাতি, পোনা, মজুত ঘনত্ব, জীবনিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, রোগ নজরদারি ও পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়গুলো থাকতে হবে।
মৎস্য ও বন বিভাগের যৌথ ব্যবস্থাপনায় কাজটি আরও কার্যকর হতে পারে। তবে সাতক্ষীরা, খুলনা বা কক্সবাজার—সব এলাকার পরিবেশ এক নয়। তাই একসঙ্গে বড় পরিসরে না গিয়ে আগে এলাকার উপযোগিতা যাচাই করে যেখানে সুফল বেশি, সেখানে ধাপে ধাপে এ মডেল সম্প্রসারণ করা উচিত।
নাজমুল আহসান
নাজমুল আহসানঅধ্যাপক, ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
মাঠপর্যায় ও পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় আমরা দেখেছি, ম্যানগ্রোভ চিংড়ির টিকে থাকা ও উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করে। অগভীর পানিতে গাছের ছায়া চিংড়িকে আশ্রয় দেয় এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তবে উপকূলে শুধু ঘেরে গাছ লাগালেই হবে না; পুরো উপকূলীয় এলাকার পানি ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
আমরা প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের কথা বলছি। কিন্তু চারদিকে বাঁধ, গেট ও বিভিন্ন অবকাঠামো দিয়ে পানি আটকে রেখে শুধু ভেতরে গাছ লাগালে প্রকৃতিনির্ভর সমাধান হবে না। প্রকৃতিকে তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তাই ম্যানগ্রোভ লাগানোর পাশাপাশি পুরো উপকূলীয় বেল্টকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
আমাদের দেশে পরিকল্পনার ঘাটতি নেই; ঘাটতি মূলত কার্যকর বাস্তবায়ন ও পর্যায়ভিত্তিক উদ্যোগে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সুন্দরবনভিত্তিক সমন্বিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাকে পুরো উপকূলীয় বেল্টে সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, দাতা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাজের ম্যাপিং করে কোথায় কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা জরুরি।
গবেষণায় দেখেছি, ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষ কৃষকের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং এর পরিবেশগত কিছু বাড়তি সুফলও রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের সহায়তা ছাড়া কৃষকেরা সহজে এ ধরনের চাষে যাবেন না। তাই এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে নীতি সহায়তা, কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
সৈয়দা আফজালুন নেসা
সৈয়দা আফজালুন নেসাহেড অব সাসটেইনেবিলিটি, এইচএসবিসি বাংলাদেশ
আজকের মূল প্রবন্ধে যেমনটি উঠে এসেছে, ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষে চাষিদের জন্য দৃশ্যমান আর্থিক লাভ নিশ্চিত করা গেলে এই পদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে পারে। তাই উপকূলীয় মানুষের জীবিকা, পরিবেশগত অবদান এবং দুর্যোগঝুঁকি—তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষকে একটি লাভজনক ও টেকসই অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করা গেলে এই মডেল দেশের পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
এইচএসবিসি বাংলাদেশ ২০২১ সাল থেকে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা নিশ্চিতে কাজ করছে। দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা মিরসরাইয়ের জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনায়নের উদ্যোগ নিই। ব্র্যাকের সঙ্গে অংশীদারত্বে বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় দুই লাখের বেশি ম্যানগ্রোভ চারা বেড়ে উঠছে, যা উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখছে।
২০২৪ সালে আমরা সাতক্ষীরায় সলিডারিডাডের সঙ্গে ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষের একটি সমন্বিত উদ্যোগ শুরু করি। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব কমাতে সহায়তা করে এবং অন্যান্য অনেক গাছের তুলনায় বেশি কার্বন শোষণ ও সংরক্ষণ করতে পারে।
আমাদের লক্ষ্য শুধু ম্যানগ্রোভ রোপণ নয়, এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক সুযোগকেও যুক্ত করা। ম্যানগ্রোভ চিংড়ির জন্য প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস তৈরি করে এবং চিংড়ি চাষে রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। তাঁরা ভাসমান ম্যানগ্রোভ নার্সারি পরিচালনা ও চারা উৎপাদনের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরি করছেন।
এভাবে প্রকৃতি সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা, টেকসই জীবিকা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে একই উদ্যোগের আওতায় এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।
সেলিম রেজা হাসান
সেলিম রেজা হাসানবাংলাদেশ কান্ট্রি ম্যানেজার, সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ। জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার কারণে অনেক কৃষক মৎস্য চাষ, বিশেষ করে চিংড়ি চাষে যুক্ত হয়েছেন। এ বাস্তবতায়, কীভাবে চিংড়ি চাষকে আরও পরিবেশবান্ধব করা যায় , যাতে প্রকৃতির ক্ষতি না করে কৃষকের জীবিকা নিশ্চিত করা যায়; এই লক্ষ্যেই আমরা দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ ও লবণাক্ত এলাকায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক জলবায়ু-অভিযোজন ও প্রশমন মডেল তৈরির চেষ্টা করেছি। এইচএসবিসির সহায়তায় ১০০ হেক্টর জমিতে ম্যানগ্রোভ রোপণের মাধ্যমে একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। প্রায় ৩০ শতাংশ ম্যানগ্রোভ রাখলে বাস্তুতন্ত্রে কী পরিবর্তন আসে, কৃষক কী সুবিধা পান এবং দীর্ঘ মেয়াদে কীভাবে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যায়, আমরা তা দেখার চেষ্টা করেছি।
অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি উপকূলের জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে ও প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে জোর দেওয়া জরুরি। ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ গ্রহণে কৃষকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এর সুবিধা পেতে দীর্ঘমেয়াদি সময় লাগে। আবার উপকূলের অনেক কৃষক ভাগচাষি; তাঁদের নিজেদের জমি নেই। নিজের জমি না থাকায় তাঁরা দীর্ঘমেয়াদি এই পদ্ধতি গ্রহণ করবেন কেন, সেটিও বড় প্রশ্ন।
উজানের পানির প্রবাহ কমে উপকূলে লবণাক্ততা ও পলি বাড়ছে। এতে চিংড়ির উৎপাদন কমে মৃত্যুহার বাড়ছে। তাই ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের পাশাপাশি কৃষকের চাষপদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
আমাদের লক্ষ্য উপকূলীয় মানুষের সহনশীল জীবিকা নিশ্চিত করা। ১০০ হেক্টরের পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ৫ হাজার বা ১০ হাজার হেক্টরে মডেলটি সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ ও গবেষণা দরকার। পাশাপাশি নারীদের জন্য ম্যানগ্রোভের চারা উৎপাদনে ভাসমান নার্সারির মতো বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অত্যন্ত কার্যকরী একটি প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান, যা কেবল খাদ্য ও জীবিকা নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে না, বরং পুরো উপকূলীয় ইকোসিস্টেমকে পুনরুজ্জীবিত করে টেকসই অভিযোজনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
মোহাম্মদ নুরুল আযম
মোহাম্মদ নুরুল আযমপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এক্সেমপ্লেরি কনসালটিং
উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবিকা কৃষি ও মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীল। চিংড়ি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য হলেও চিংড়ি চাষ করতে গিয়ে অনেক ম্যানগ্রোভ বন উজাড় হয়েছে। তাই আমাদের প্রশ্ন হলো, কৃষকের জীবিকা রক্ষা করে কীভাবে মাছ চাষ করা যায় এবং একই সঙ্গে প্রকৃতিকে রক্ষা করা যায়।
আমরা তিনটি মডেল তুলনা করেছি—একক চিংড়ি চাষ, চিংড়ির সঙ্গে অন্যান্য মাছের সমন্বিত চাষ এবং সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষ। শেষের মডেলে পুকুরের প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গায় ম্যানগ্রোভ রাখা হয় এবং চিংড়ি, মাছ, কাঁকড়ার পাশাপাশি মধু, গোলপাতা ও অন্যান্য ম্যানগ্রোভজাত পণ্য থেকে আয় করার সুযোগ থাকে। শুরুতে কিছু বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে এ মডেলে কৃষকের আয় বেশি। পাশাপাশি ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষা, পানির মান উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও কার্বন সংরক্ষণের মতো বাড়তি সুবিধাও পাওয়া যায়।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষে দীর্ঘ মেয়াদে কৃষক ও সমাজ—দুই পক্ষই বেশি উপকৃত হয়। তবে ম্যানগ্রোভ পরিপক্ব হতে পাঁচ থেকে আট বছর সময় লাগে। তাই কৃষকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, নিরাপদ জমির অধিকার এবং কার্বন ও প্রতিবেশব্যবস্থার সেবার মূল্যায়ন জরুরি।
বর্তমানে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনায় চিংড়ি চাষের বড় এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায় মডেলটি সম্প্রসারণের সুযোগ আছে। ১০০ হেক্টরের পাইলট প্রকল্প থেকে আমাদের আরও বড় পরিসরে যেতে হবে। এ জন্য সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ, গবেষণা, সহজ অর্থায়ন ও বেসরকারি অংশীদারত্ব প্রয়োজন। আমরা যদি এই মডেলকে বৃহৎ পরিসরে নিতে পারি, তাহলে কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি উপকূলীয় প্রকৃতি ও সুন্দরবনের ওপর চাপও কমানো সম্ভব।
এ কে ওসমান হারুনী
এ কে ওসমান হারুনীসিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার-অ্যাগ্রিকালচার; ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাস
ম্যানগ্রোভ শুধু গাছ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেশব্যবস্থা। তাই ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষে জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশব্যবস্থা পুনরুদ্ধারকেও গুরুত্ব দিতে হবে। চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণে চকরিয়া সুন্দরবনসহ অনেক প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করেছি। এর পরিণতি এখন উপকূলের নানা দুর্যোগে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি চাষ একসময় খুব লাভজনক ছিল। কিন্তু উৎপাদনশীলতা কমছে। শুধু চাষের এলাকা বাড়িয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না; আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা ও ভালো মানের পোনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষের মডেলকে আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে। কোথায় কতটুকু ম্যানগ্রোভ থাকবে, কীভাবে অন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে এবং কোন এলাকায় কোন প্রজাতি উপযোগী—এসব বিষয়ও দেখতে হবে।
যেসব এলাকায় প্রাকৃতিক বন ইতিমধ্যে নষ্ট হয়েছে, সেখানে শুধু গাছ লাগানো নয়, পুরো প্রতিবেশব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের দিকে যেতে হবে। তবে সব জায়গায় চিংড়ি চাষ উপযোগী হবে না। তাই বিদ্যমান চিংড়ি চাষের এলাকায় ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং উপযুক্ত জায়গায় সমন্বিত মডেল চালুর সুযোগ দেখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে কৃষকের লাভের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জমি কম, তাই আরও উৎপাদনশীল ও বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যেতে হবে। বেসরকারি খাতকেও যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি পোনা, হ্যাচারি, বিতরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। ম্যানগ্রোভের চারা উৎপাদনে ভাসমান নার্সারির উদ্যোগটি আমার কাছে আশাব্যঞ্জক মনে হয়েছে। সফলভাবে এটি করা গেলে স্থানীয় মানুষ ও কৃষকের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
মইন উদ্দিন আহমেদ
মইন উদ্দিন আহমেদঅ্যাকুয়াকালচার বিশেষজ্ঞ
ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত চিংড়ি চাষের সমস্যা, বিশেষ করে পলি জমে পানির গভীরতা কমে যাওয়া এবং পরিবেশগত চাপ কমানো। আমরা দেখেছি, ম্যানগ্রোভ থাকলে রোগের ঝুঁকি কমে, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং কৃষক ম্যানগ্রোভজাত পণ্য থেকে বাড়তি আয় করতে পারেন।
তবে এ পদ্ধতি নিয়ে আরও গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে যাচাই প্রয়োজন। কৃষকেরা নিজেরা কতটা এই প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন এবং কী কী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন, তা জানা জরুরি। কারণ কৃষক ও পরিবেশ—দুই পক্ষই উপকৃত হলে সরকারও এ খাতে আরও কার্যকরভাবে বিনিয়োগ করতে পারবে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এ মডেলের বড় সুযোগ রয়েছে। নতুন জেগে ওঠা দ্বীপ বা উপযুক্ত এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ম্যানগ্রোভ ও চিংড়ি চাষ সমন্বয় করা যেতে পারে। যেমন, ৬০ শতাংশ এলাকায় ম্যানগ্রোভ ও ৪০ শতাংশ এলাকায় চিংড়ি চাষের মতো মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে যেখানে লবণাক্ততা বা পলি জমার কারণে চিংড়ি চাষের উৎপাদনশীলতা কমে গেছে, সেসব এলাকার বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
আমাদের চিংড়ি খাতকে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। এলডিসি উত্তরণের পর বাড়তে পারে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয়—সেই চ্যালেঞ্জও এখন থেকেই বিবেচনায় নিতে হবে। ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়িকে পরিবেশবান্ধব ও মূল্য সংযোজিত পণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং ব্যয় কমানো সম্ভব। আমার ২৪ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আরও গবেষণার মাধ্যমে এ খাতকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কানিজ ফাতেমা–তুজ–জহুরা
কানিজ ফাতেমা–তুজ–জহুরাবিশেষজ্ঞ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মৎস্য চাষ খাত, ব্র্যাক
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা অনেক বড় এবং সব জায়গায় লবণাক্ততার মাত্রাও এক নয়। তাই সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ কোথায় কীভাবে করা হবে, তা নির্ধারণে লবণাক্ততার মানচিত্র তৈরি করা জরুরি। লবণাক্ততার মাত্রা অনুযায়ী কোন এলাকায় কোন ম্যানগ্রোভ প্রজাতি উপযোগী এবং কৃষক কীভাবে তা গ্রহণ করবেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এই মডেলকে বড় পরিসরে নিতে হলে তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে। প্রথমত, কৃষকের লাভ কতটা হচ্ছে এবং তিনি পদ্ধতিটি কতটা গ্রহণ করছেন। আমরা দেখেছি, একক চাষের তুলনায় বহুমুখী চাষে লাভ বেশি। তবে কৃষক বাস্তবে কতটা এটি গ্রহণ করছেন, সেটি আরও যাচাই করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু সহনশীলতা তৈরিতে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের ভূমিকা কতটা। তৃতীয়ত, প্রতিবেশব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এর সুবিধা কতটা।
কৃষকের পর্যায়ে এ পদ্ধতি গ্রহণে আচরণগত পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। চিংড়ি চাষে ক্ষতি বা উৎপাদন কমে গেলে কীভাবে আরও ভালো ও টেকসই পদ্ধতিতে যাওয়া যায়, সে বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করতে হবে।
চকরিয়া সুন্দরবনের মতো এলাকায় চিংড়ি চাষের কারণে ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে আছে। তাই লবণাক্ততার মানচিত্র তৈরি করে বেশি লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ চালু করা গেলে এটি বড় পরিসরে নেওয়া সম্ভব। কৃষকের লাভ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং প্রতিবেশব্যবস্থার সুবিধা—এই তিনটি দিক সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে পারলেই বাংলাদেশের উপকূলের জন্য একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা সম্ভব।
কাজী ইমদাদুল হক
কাজী ইমদাদুল হকসিনিয়র ডিরেক্টর ও হেড অব ক্লাইমেট অ্যাকশন, ফ্রেন্ডশিপ
আমরা প্রায় ১২ বছর ধরে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ নিয়ে কাজ করছি এবং প্রায় ১০ লাখ গাছ লাগিয়েছি। এত দিন ম্যানগ্রোভ ও চিংড়িকে দুটি বিপরীত বিষয় হিসেবে দেখেছি। কিন্তু চিংড়িকেও বাদ দেওয়া যায় না, ম্যানগ্রোভকেও নয়। তাই কয়েক বছর ধরে দুটিকে কীভাবে সমন্বিত করা যায়, তা নিয়ে ভাবছি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই মডেল কার জন্য—বড় ঘেরের মালিক, নাকি এক বিঘা বা জমিহীন কৃষকের জন্যও? ম্যানগ্রোভের সুবিধা শুধু উৎপাদন বা কার্বন নয়, উপকূলের মানুষের সুরক্ষা, জীবিকা ও প্রতিবেশব্যবস্থার সুবিধাও এর সঙ্গে যুক্ত। ম্যানগ্রোভ লাগানোর পর স্থানীয় মানুষ মাছ ধরে আয় করছেন, নারীরাও সুফল পাচ্ছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিতে হবে।
ম্যানগ্রোভের তাৎক্ষণিক খরচ হিসাব করলেও এটি না থাকলে পরিবেশগত ক্ষতির মূল্যায়ন করি না। ঘেরের চারপাশে ৩০ শতাংশ ম্যানগ্রোভ রাখার মডেলটি জলবায়ু সহনশীলতার জন্য কতটা কার্যকর, তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা দরকার। টেকসই জীবিকা ও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের মধ্যে সমন্বয় করেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
সারোয়ার আলম
সারোয়ার আলমপ্রোগ্রাম ম্যানেজার, আইইউসিএন বাংলাদেশ
ম্যানগ্রোভের সঙ্গে মৎস্য উৎপাদন ও জীবিকার সমন্বয় একটি ভালো প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের উদাহরণ হতে পারে। তবে শুধু গাছ লাগানো, বনভূমি বাড়ানো, পানির মান উন্নত করা বা মানুষের জীবিকা উন্নত হলেই সেটিকে নেচার-বেজড সলিউশন বলা যাবে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ২৮টি সূচক ও ৮টি মানদণ্ডের সঙ্গে এই উদ্যোগকে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
উপকূলীয় এলাকায় সব জায়গায় ম্যানগ্রোভ লাগানো সম্ভব নয়। তাই বন, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য চাষ, মানুষের জীবিকা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার মানে শুধু গাছ লাগানো নয়, এর সঙ্গে জীবিকা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নও যুক্ত করতে হবে।
এ জন্য একটি জাতীয় মানদণ্ডভিত্তিক নির্দেশিকা দরকার। সব অংশীজনকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বর্তমান নীতি ও আইনগুলোতে নেচার-বেজড সলিউশনের বিষয়টি যুক্ত করে এগোতে পারলে ১০০ হেক্টর থেকে ১ হাজার, ২ হাজার বা ৫ হাজার হেক্টরে এ মডেল সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
লতিকা বালা বৈদ্য
লতিকা বালা বৈদ্যউদ্যোক্তা, ভাসমান ম্যানগ্রোভ নার্সারি
আমি খুলনার পাইকগাছা থানার কেওড়াতলা গ্রামের এক নারী উদ্যোক্তা। ২০২৪ সালে আমাদের গ্রামে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সভায় অংশ নিয়ে জানতে পারি, ম্যানগ্রোভ চিংড়ি চাষের জন্য কতটা উপকারী, বিশেষ করে তাপমাত্রার প্রভাব থেকে চিংড়িকে রক্ষা করতে। তবে ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষে বড় সমস্যা হলো চারার সংকট। প্রকল্পের মাধ্যমে নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগে আমি যুক্ত হই।
আমার সমতল জায়গা ছিল না, তাই বাড়ির পাশের পাঁচ শতকের ছোট পুকুরেই নার্সারি করি। প্রশিক্ষণে বীজ সংগ্রহ, রোপণ ও পরিচর্যার পদ্ধতি শিখি। সাড়ে আট কেজি বীজ থেকে প্রায় ৮ হাজার ২০০টি চারা তৈরি করে প্রকল্পের সহায়তায় বিক্রি করি। এতে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা আয় হয়। একই পুকুরে দুই হাজার বাগদা চিংড়ির পোনা ছেড়ে ১৫ কেজি বাগদা ও ২০ কেজি তেলাপিয়া বিক্রি করেছি। ফলে একই জায়গা আমার আয়ের দুটি উৎস হয়ে উঠেছে। এই প্রকল্প না এলে এত বড় স্বপ্ন দেখাও সম্ভব হতো না।
তুষার কান্তি মন্ডল
তুষার কান্তি মন্ডলচিংড়িচাষি, আইএমবিএ কৃষক
আমি প্রায় ১৪ বছর ধরে চিংড়ি চাষ করছি। বর্তমানে আমার প্রায় ২৫ বিঘা ঘের আছে। তবে গত সাত থেকে আট বছর মাছের উৎপাদন অনেক কমে গিয়েছিল। ২০২৪ সালে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জানতে পারি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খাদ্যের অভাবও মাছ মারা যাওয়ার কারণ।
সলিডারিডাড কর্তৃক আয়োজিত প্রশিক্ষণ ও সভায় অংশ নিয়ে ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষের উপকারিতা জেনে ও প্রকল্পের সহায়তায় তিনটি ঘেরে প্রায় ১৪ বিঘা জমিতে ২৫০টি ম্যানগ্রোভের চারা রোপণ করি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক গাছ মারা গেলেও এখন প্রায় ১৩০টি টিকে আছে। রৌদ্রের সময় চিংড়ি গাছের ছায়া ও শিকড়ের আশপাশে আশ্রয় নেয়। পানিও সবুজ হয়েছে, প্ল্যাঙ্কটন তৈরি হওয়ায় মাছের খাবারের চাহিদা মিটছে। ফলে সার ও খাবারের ব্যবহার ও উৎপাদন খরচ কমছে। ভবিষ্যতে ম্যানগ্রোভ থেকে বাড়তি আয়ও হবে। এই সমন্বিত চাষ চিংড়ি চাষের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে।
সুপারিশ
প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ রক্ষা করে উপযুক্ত এলাকায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ।
উপকূলীয় এলাকার ম্যাপিং ও লবণাক্ততার মানচিত্র তৈরি করে চাষের এলাকা নির্ধারণ।
মৎস্য, বন ও পরিবেশ বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন।
চাষিদের জন্য সহজ অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা।
স্থানীয়ভাবে ম্যানগ্রোভের চারা উৎপাদন ও ভাসমান নার্সারি সম্প্রসারণ।
ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য, জীবিকা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করা।
অংশগ্রহণকারী
মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী, প্রধান বন সংরক্ষক, বন অধিদপ্তর।
মো. লতিফুল ইসলাম, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)।
মো. সাজদার রহমান, পরিচালক, ব্লু ইকোনমি, মৎস্য অধিদপ্তর।
ড. নাজমুল আহসান, অধ্যাপক, ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
সৈয়দা আফজালুন নেসা, হেড অব সাসটেইনেবিলিটি, এইচএসবিসি বাংলাদেশ।
সেলিম রেজা হাসান, বাংলাদেশ কান্ট্রি ম্যানেজার, সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া।
মোহাম্মদ নুরুল আযম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এক্সেমপ্লেরি কনসালটিং।
এ কে ওসমান হারুনী, সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার-অ্যাগ্রিকালচার, ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাস।
মইন উদ্দিন আহমেদ, অ্যাকুয়াকালচার বিশেষজ্ঞ।
কানিজ ফাতেমা–তুজ–জহুরা, বিশেষজ্ঞ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মৎস্য চাষ খাত, ব্র্যাক।
কাজী ইমদাদুল হক, সিনিয়র ডিরেক্টর ও হেড অব ক্লাইমেট অ্যাকশন, ফ্রেন্ডশিপ।
সারোয়ার আলম, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, আইইউসিএন।
লতিকা বালা বৈদ্য, উদ্যোক্তা, ভাসমান ম্যানগ্রোভ নার্সারি। তুষার কান্তি মণ্ডল, চিংড়িচাষি, আইএমবিএ কৃষক।
সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।