রাঢ়ীখালের হোসেন স্যার

· Prothom Alo

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]

Visit zeppelin.cool for more information.

পুরো নাম মো. নূর-উল-হোসেন। সবার কাছে পরিচিত হোসেন স্যার নামে।

আমাদের স্কুলের নাম ভাগ্যকুল হরেন্দ্রলাল উচ্চবিদ্যালয়। আমি ছিলাম স্যারের জীবনের শেষ দিকের ছাত্র। স্যার শুরুতে রাঢ়ীখালের স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশনে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর ছাত্র ছিলেন ড. হুমায়ুন আজাদ।

স্যার সাধারণত ওপরের শ্রেণিতে পড়াতেন। একবার ক্লাস সেভেনে একজন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে স্যার ক্লাস নিতে এলেন। সেই প্রথম শিক্ষক হিসেবে তাঁকে পেলাম। ক্লাসে এসেই স্যার নাম ডাকতে শুরু করলেন। আমরাও যথারীতি ‘জি স্যার’ বলে উপস্থিতি জানান দেওয়া শুরু করলাম। তিনি মৃদু ভৎ৴সনা করলেন। বললেন, বাংলা ও ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলা দূষণীয়। ইংরেজিতে এমনভাবে ‘৭’ লিখতে শেখালেন, যাতে পেট কাটা না লাগে।

হোসেন স্যার রাঢ়ীখালের মানুষ। মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার দক্ষিণ রাঢ়ীখাল তাঁর গ্রাম। হুমায়ুন আজাদের বাড়ির ঠিক পূর্ব দিকের পুকুরটির অপর প্রান্তেই স্যারের পৈতৃক বাড়ি। স্যার পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতন থেকে লেখাপড়া করে আসা মানুষ। সে আমলে স্যারের মতো উচ্চশিক্ষিত মানুষ আমাদের অঞ্চলে খুব বেশি ছিলেন না।

হোসেন স্যার অষ্টম শ্রেণি থেকে আমাদের নিয়মিত পড়ানো শুরু করেন। ক্লাসেই চেষ্টা করতেন ভালোভাবে পড়াতে। মানবিক বিভাগের বিষয়গুলো, বিশেষ করে ভূগোল, পৌরনীতি ও ইতিহাস পড়াতেন। স্যার প্রাইভেট পড়াতেন না। একবার অবশ্য আমাকে মাত্র দুই মাস প্রাইভেট পড়িয়েছিলেন।

তখন আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। ক্লাসের বাইরে অন্যান্য বই পড়ার অভ্যাস ছিল। এটা জানতে পেরে স্যার আমাকে রাহুল সাংকৃত্যায়নের ভোল্‌গা থেকে গঙ্গা বইটি পড়তে দিলেন। পড়ার পর স্যারের সঙ্গে আলোচনা করলাম। স্যার খুশি হলেন।

প্রতি শুক্রবার সকালে স্যার রাঢ়ীখাল থেকে আমাদের ভাগ্যকুল বাজারে আসতেন কেনাকাটা করতে। আমাদের বাড়ির সামনে এসে আমার জন্য এটা-ওটা পাঠাতেন। আমিও স্যারের সঙ্গে প্রায় দুই মাইল হেঁটে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত যেতাম। এ সময় নানা বিষয়ে কথা হতো। স্যারের চিন্তাভাবনা জানতে পারতাম।

স্যার একটা কথা প্রায়ই বলতেন, ‘পদ্মাপারের মানুষেরাই একদিন রাজধানী ঢাকা দখল করবে!’ স্যারের এ কথার অর্থ তখন বুঝতাম না।

ক্লাসে স্যার নানা বিষয়ে লেখালেখির ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। না বুঝেই বলতাম, ‘স্যার, লেখেন না কেন?’ তিনি বলতেন, ‘কাগজ-কালি কিনতে খরচ তো কম নয়। কে দেবে?’

২.

হোসেন স্যার একদিন অবসরে গেলেন। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিদায় সংবর্ধনা দিল না। আমাদের খারাপ লাগল। শেষে আমরা কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্রই তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার উদ্যোগ নিলাম। স্যারের কাছেই জানতে চাইলাম, কাকে প্রধান অতিথি করব। তিনি তাঁরই ছাত্র হুমায়ুন আজাদের নাম বললেন।

এরপর আমি বন্ধু সাইফুল টিপুকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে হুমায়ুন আজাদ স্যারের বাসভবনে গেলাম। এ ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে আলাপ করলাম। স্যার বললেন, ‘আমি ১৫ বছর গ্রামে যাই না। তবু হোসেন স্যারের বিদায় সংবর্ধনায় যাব।’

১৯৯৩ সালের এক শুক্রবার ভাগ্যকুলে হোসেন স্যারকে সংবর্ধনা দেওয়া হলো। হুমায়ুন আজাদ অনুষ্ঠানে এক দীর্ঘ ও অসামান্য বক্তব্য দিলেন। দুই কৃতী মানুষ একে অপরের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হলেন। এই হোসেন স্যারের কারণেই হুমায়ুন আজাদ তাঁর হাইস্কুলটিকে বলতেন, ‘তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়’! সেদিনও তিনি সে কথা বললেন।

ওই অনুষ্ঠানের পর হুমায়ুন আজাদ নিয়মিতই গ্রামে আসতে লাগলেন। তাঁর উপন্যাস ও কবিতায় গ্রামের নানা ছবি উঠে এল।

নূর-উল-হোসেন স্যারও লেখালেখিতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। হোসেন স্যারের অন্তত ২০টি বইয়ের কথা জানি। অধিকাংশ বই–ই এক বা দুই ফর্মার। কয়েকটি চার থেকে ছয় ফর্মার। বইগুলো তিনি নিজের অর্থেই প্রকাশ করতেন। তাঁর ছাত্রছাত্রী, বিভিন্ন স্কুল ও প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সেগুলো বিক্রি করতেন। অনেকেই তাঁকে সম্মান দিতেন, আবার অনেকে যথাযথ সম্মান দিতেন না। স্যারকে অবশ্য কখনো দমে যেতে দেখিনি।

বইগুলোর কোনোটির মূল্যই ১০০ টাকার বেশি ছিল না। তিনি উপন্যাস, কবিতা, ইতিহাস ও প্রবন্ধের বই লিখেছেন। তাঁর উপন্যাসে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক, প্রেম, বিজ্ঞানমনস্কতা, প্রগতি ও সমাজ বিনির্মাণের কথাই বলেছেন।

হোসেন স্যার গত হয়েছেন অন্তত ২০ বছর আগে। হুমায়ুন আজাদ স্যারও নেই। আমি প্রতিদিন ভাগ্যকুলের বাড়ি থেকে পুরান ঢাকায় ব্যাংকে চাকরি করতে আসি। আসা-যাওয়ার পথে আজও হোসেন স্যারের কথা মনে পড়ে।

মুজিব রহমান, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, অগ্রণী ব্যাংক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, ঢাকা

Read full story at source