কানাডার পাশে কেন ইউরোপকে দাঁড়াতেই হবে

· Prothom Alo

চলতি বছরের শুরুতে দাভোসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির দেওয়া ভাষণ এখনো বিশ্বের কূটনীতিকদের আলোচনায়। তিনি বলেছিলেন, মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তা না হলে তারা শক্তিশালী দেশের আগ্রাসী আচরণের শিকার হতে পারে।

Visit tr-sport.bond for more information.

কার্নি শুধু কথা বলেননি, কাজেও তা দেখিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেন, তখন কানাডা তার ইউরোপীয় মিত্রদের পাশে দাঁড়ায়।

কার্নির সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। কানাডা ন্যাটোর সদস্য। ইউরোপকে রুশ আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা এই জোটের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এর পাশাপাশি কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ ‘সেইফ’-এও যোগ দিয়েছে।

কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র কানাডার বিরুদ্ধে দ্রুত বড় আকারের নতুন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছে। অথচ ইউরোপের নেতারা আশ্চর্যজনকভাবে নীরব। কানাডা ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার। ইউরোপের এই নীরবতা বড় ভুল। সংহতি একতরফা হতে পারে না।

ট্রাম্প শুধু ইউরোপের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করেননি। তিনি বারবার বলেছেন, কানাডার যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়া উচিত। সরাসরি কানাডাকে যুক্ত করার বদলে তিনি দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নিতে চাপ দিতে চান। এ কারণেই কানাডা থেকে গাড়ি, ট্রাক ও গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন, যা ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার কথা। পাশাপাশি কানাডার ২০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত শাস্তিমূলক শুল্কও আরোপ করেছেন।

ট্রাম্প আরও চান, কানাডা যেন অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। দেশটি যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অন্য অংশীদারের সঙ্গে বিকল্প বাণিজ্যচুক্তি করতে না পারে, সে জন্যও চাপ দিচ্ছেন। লক্ষ্য পূরণে তিনি আরও বেশি শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।

এ লড়াইয়ে কানাডা হেরে গেলে তার ক্ষতি তারা সামাল দিতে পারবে না। ইউরোপ যেমন ট্রাম্পের সামরিক চাপের ঝুঁকিতে রয়েছে, কানাডাও তাঁর অর্থনৈতিক চাপের কাছে অত্যন্ত দুর্বল। দেশটির রপ্তানি করা পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত কানাডাকে আরও গভীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের প্রস্তাব দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র যে পথ বেছে নিয়েছে, তার একটি আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে ইউরোপকে নিজেদের তুলে ধরতে হবে।

ইউরোপ কানাডাকে আরও বিস্তৃত শুল্কমুক্ত বাণিজ্যচুক্তির প্রস্তাব দিতে পারে। এতে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তাও যাবে। আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়েও দুই পক্ষ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে। ভবিষ্যতে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং চীনের বিরল মৃত্তিকা উপাদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প সরবরাহকারী হতে পারে। এসব পণ্য বহু শিল্পের জন্য অপরিহার্য।

ইউরোপের সাহসী পদক্ষেপের পথে প্রথম বাধা হলো ভীরুতা। ট্রাম্প তোষামোদকারীদের সম্মান করেন না—এর যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ইউরোপীয় নেতারা তাঁর বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে ভয় পান। অথচ কোনো দেশ তাঁর চাপের সামনে মাথা না নোয়ালে ট্রাম্প প্রায়ই পিছিয়ে গেছেন। মাঝারি শক্তির দেশগুলো একসঙ্গে দাঁড়ালে তাদের বিকল্প বাড়বে এবং শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়বে।

মার্ক কার্নি যথার্থই বলেছিলেন, বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিশ্বে মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা দেশগুলোর সামনে দুটি পথ। তারা একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বড় শক্তির অনুগ্রহ চাইতে পারে। অথবা একত্র হয়ে নিজেদের জন্য তৃতীয় একটি শক্তিশালী পথ তৈরি করতে পারে। কানাডা তার পথ বেছে নিয়েছে। এখন ইউরোপের উচিত সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ানো।

অন্তত কানাডাকে একটি উদার প্রস্তাব দিলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দেশটির অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। কারণ, ইউরোপও যেকোনো সময় ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে। তাঁর মনোযোগ আবার গ্রিনল্যান্ড, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য, ইরানের যুদ্ধ কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে যেতে পারে। ইউরোপ কি তখনো একাই তাঁর চাপ মোকাবিলা করতে চায়?

দ্বিতীয় বাধা হলো ইউরোপের অহংকার। ট্রাম্প-পূর্ব সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মোটামুটি কার্যকর ছিল। তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন অন্তত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেকে পরাশক্তি মনে করত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমান অংশীদার হিসেবে বাণিজ্যচুক্তি করত এবং প্রয়োজনমতো মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করত।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। শক্তিই যেখানে প্রধান বিষয়, সেখানে ইউরোপকে স্বীকার করতে হবে যে আপাতত যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো রাজনৈতিক ঐক্য, সামরিক শক্তি, ভূরাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তার নেই। বরং ইউরোপ অনেকটা কানাডার মতোই একটি মাঝারি শক্তি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন মাঝারি শক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো এটি বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর শক্তি নয়। তাই শক্তিশালী রাষ্ট্রের চাপে পড়ার ঝুঁকি তারও রয়েছে। এই বাস্তবতা মেনে নিলে একই ধরনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার প্রয়োজন ইউরোপ আরও ভালোভাবে বুঝবে।

তৃতীয় বাধা হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কঠোরতা। সবচেয়ে বড় মাঝারি শক্তি হিসেবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ালে ইউরোপের লাভ সবচেয়ে বেশি। এমনকি বিভিন্ন ইচ্ছুক দেশের জোট গঠনে ইউরোপ নেতৃত্ব দিতে পারে। কিন্তু এ জন্য তাকে অতিরিক্ত কঠোর ও বাণিজ্যকেন্দ্রিক সহযোগিতার মডেল থেকে বের হতে হবে। বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক একীভবনের সুযোগ মূলত সেই দেশগুলোর জন্য, যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হতে চায় বা এর সব নিয়ম মেনে নিতে রাজি।

এর বদলে ইউরোপকে আরও নমনীয় ও বিস্তৃত সহযোগিতার পথ নিতে হবে। কোথাও গভীর অর্থনৈতিক একীভবন, কোথাও রাজনৈতিক সহযোগিতা, কোথাও কৌশলগত জোট—প্রয়োজন অনুযায়ী এসবের সমন্বয় করা যেতে পারে। ইউক্রেন ও কয়েকটি বলকান দেশের জন্য গভীর সহযোগিতা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পথে একটি ধাপ হতে পারে। কানাডা এবং আপাতত যুক্তরাজ্যের মতো দেশের সঙ্গে সদস্য হওয়ার লক্ষ্য ছাড়াই আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা করা সম্ভব।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ‘সিপিটিপিপি’র ঘনিষ্ঠ সংযোগের কথাও বলেছেন। এটি কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ ১২ দেশের বাণিজ্য জোট। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও এই জোট একসঙ্গে বিশ্বের অর্থনীতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে, যা যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের অংশের চেয়েও বেশি। ইতিমধ্যে ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো একে অপরের ওপর সুরক্ষামূলক শুল্ক না বসানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। তবে অগ্রগতি এখনো ধীর।

মার্ক কার্নি যথার্থই বলেছিলেন, বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিশ্বে মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা দেশগুলোর সামনে দুটি পথ। তারা একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বড় শক্তির অনুগ্রহ চাইতে পারে। অথবা একত্র হয়ে নিজেদের জন্য তৃতীয় একটি শক্তিশালী পথ তৈরি করতে পারে। কানাডা তার পথ বেছে নিয়েছে। এখন ইউরোপের উচিত সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ানো।

ফিলিপ লেগ্রেইন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

Read full story at source