নতুন সিইওর দায়িত্ব গ্রহণ, অ্যাপলের সামনে নতুন ভারসাম্যের পরীক্ষা

· Prothom Alo

অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে মঙ্গলবার দায়িত্ব নিয়েছেন জন টার্নাস। গত ১৫ বছর কোম্পানিটির নেতৃত্ব দেওয়া টিম কুকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তিনি। তবে টিম কুক অ্যাপলের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সময় টার্নাসের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিল অ্যাপল। বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরেই এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের কথা আলোচিত হচ্ছিল। টিম কুকের ভাষায়, দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হবে একেবারেই ‘নির্বিঘ্ন’। তবে নেতৃত্ব বদলের এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

Visit rhodia.club for more information.

টার্নাসকে একসঙ্গে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে। নেতৃত্ব পর্যায়ে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে অ্যাপলে। এর মধ্য দিয়ে অ্যাপলকে এগিয়ে নিতে হবে তাঁকে। একই সঙ্গে ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে প্রতিভাবান কর্মীদের চলে যাওয়া ঠেকাতে হবে। তাঁর সঙ্গে নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে কুক অ্যাপলে থেকে যাচ্ছেন। ফলে কুকের উপস্থিতিতে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে হবে টার্নাসকে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, টার্নাসকে ভারসাম্য বজায় রাখার কঠিন কাজ করতে হবে। কুকের সময়ে অ্যাপলের যে আর্থিক ও কঠোর ব্যবস্থাপনা শৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে নতুন এমন পণ্য উদ্ভাবন করতে হবে, যেসব পণ্য ভোক্তাদের আকৃষ্ট করতে পারবে।

আইফোন

প্রযুক্তি খাতে এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন চলছে এখন। এর মধ্যেই টার্নাসকে দায়িত্ব সামলাতে হবে। চলতি মাসের বার্ষিক হার্ডওয়্যার ইভেন্টে অ্যাপল ভাঁজযোগ্য (ফোল্ডেবল) আইফোন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ১৯ বছরে এটাই হতে পারে আইফোনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। একই সঙ্গে নিজেদের পণ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আরও গভীরভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে কোম্পানি।

২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত অ্যাপলের পণ্য বিপণনে কাজ করা ভোক্তা প্রযুক্তি বিশ্লেষক মাইকেল গার্টেনবার্গ বলেন, অ্যাপলকে এখন ‘এরপর কী?’—এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। তাঁর মতে, টার্নাসের কাজ হবে ‘অ্যাপলকে আবার আকর্ষণীয় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, যদিও এটি এখন কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি। দেখাতে হবে, তারা এখনো উদ্ভাবন করতে পারে।’

এআই গ্রহণের ক্ষেত্রে অ্যাপল কতটা আগ্রাসী হবে, তা নিয়ে কোম্পানিটি এত দিন দ্বিধায় ছিল। এখন নতুন ব্যবস্থাপনা দলের হাত ধরে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে। গত চার মাসে ৫১ বছর বয়সী টার্নাস নিজস্ব নির্বাহী দল গড়ে তুলছেন। এতে অ্যাপলের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নতুন মুখও যুক্ত হচ্ছে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির হাস স্কুল অব বিজনেসের ডিন ও সেন্টার ফর ওয়ার্কপ্লেস কালচার অ্যান্ড ইনোভেশনের পরিচালক জেনিফার চ্যাটম্যান। তিনি বলেন, অ্যাপল দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের চিন্তাধারার ওপর নির্ভর করে অভ্যস্ত। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন ধারণা আসার জন্য যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না।’

এ বিষয়ে অ্যাপল কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

চলতি গ্রীষ্মে আমেরিকান এয়ারলাইনস থেকে নেট গ্যাটেনকে নিয়োগ দিয়েছে অ্যাপল। তিনি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন। এর আগে এ দায়িত্বে ছিলেন কেট অ্যাডামস। তিনি এ বছর অবসরে যাবেন।

অ্যাপলের হার্ডওয়্যার প্রকৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও টার্নাসের ডেপুটি হিসেবে কাজ করা লরা লেগ্রোস ২০২২ সালে অ্যাপল ছেড়েছিলেন। তাঁকে আবার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তি জানিয়েছেন। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, টার্নাসের কাছে সরাসরি রিপোর্ট করবেন লেগ্রোস। কোম্পানির বিভিন্ন অংশের সঙ্গে টার্নাসের যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি পরামর্শক ও দূত হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন।

গ্যাটেন ও লেগ্রোসের সঙ্গে শিগগিরই নেতৃত্ব পর্যায়ে আরও নতুন মুখ যোগ দিতে পারে। টার্নাসের নির্বাহী দলের প্রায় অর্ধেক সদস্য অবসরের বয়সের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। যদিও তাঁদের কেউই প্রকাশ্যে অবসরের পরিকল্পনার কথা জানাননি।

অ্যাডামসের পাশাপাশি অ্যাপল থেকে আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিদায় নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে অ্যাপল পের প্রধান জেনিফার বেইলিও আছেন। তিনি এ বছর অবসরে যাবেন। ২০০৩ সালে অ্যাপলে যোগ দিয়েছিলেন বেইলি।

অ্যাপলের হার্ডওয়্যার বিভাগের গুরুত্ব অনেক। এই হার্ডওয়্যার বিভাগ কেন্দ্র করে ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এ বিভাগটি এপ্রিলে পুনর্গঠন করা হয়। টার্নাসকে পরবর্তী সিইও হিসেবে ঘোষণা করার সময়ই চিপ বিভাগের প্রধান জনি সরুজিকে প্রধান হার্ডওয়্যার কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

আইফোন

টার্নাসের নেতৃত্বাধীন হার্ডওয়্যার প্রকৌশল দল আইফোনসহ বিভিন্ন ডিভাইস নিয়ে কাজ করত। পরে দলটিকে সরুজির নেতৃত্বাধীন হার্ডওয়্যার টেকনোলজি বিভাগের সঙ্গে একীভূত করা হয়।

সরুজির পদোন্নতির সময় হার্ডওয়্যার বিভাগ থেকে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা চলে যান। অ্যাপলের স্মার্ট হোম পণ্যের হার্ডওয়্যার বিভাগের প্রধান ব্রায়ান লিঞ্চ মার্চে স্মার্ট রিং প্রস্তুতকারী ওউরায় যোগ দেন। অ্যাপলের অগমেন্টেড ও ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি পণ্যের হার্ডওয়্যার বিভাগের প্রধান পল মিড জুলাইয়ে ওপেনএআইয়ে যোগ দেন।

অ্যাপলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিভিন্ন দিক নিয়ে এর আগে ব্লুমবার্গও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

চাকরি ছাড়ার প্রবণতা

শুধু শীর্ষ পর্যায়েই নয়, অ্যাপলের সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও চাকরি ছাড়ার প্রবণতা বেড়েছে। জুলাইয়ে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে করা মেধাস্বত্ব মামলায় অ্যাপল জানিয়েছিল, তাদের সাবেক ৪০০–এর বেশি কর্মী বর্তমানে ওপেনএআইয়ে কাজ করছেন।

ওপেনএআই অ্যাপলের সাবেক ডিজাইনপ্রধান জনি আইভের সহপ্রতিষ্ঠিত ডিজাইন স্টুডিও আইও অধিগ্রহণ করে। এরপরের কয়েক মাসে অ্যাপলের অনেক কর্মী ওপেনএআইয়ে যোগ দেন। মামলায় অ্যাপল অভিযোগ করেছে, আইওর আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক অ্যাপল নির্বাহীর নেতৃত্বাধীন ওপেনএআইয়ের হার্ডওয়্যার বিভাগ অ্যাপল থেকে বহু প্রকৌশলী নিয়োগ করেছে। আগস্টে মামলাটি খারিজের আবেদন করেছে ওপেনএআই।

এদিকে নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে টিম কুক অ্যাপলে থেকে গেলেও টার্নাসকে নিজের নেতৃত্বের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে হবে। অ্যাপল জানিয়েছে, ৬৫ বছর বয়সী কুক কোম্পানির কিছু বিষয়ে সহায়তা করবেন। যেমন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা।

সিলিকন ভ্যালির কোম্পানিগুলোয় সিইও পদ ছাড়ার পর বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে থেকে যাওয়ার নজির দীর্ঘদিনের। তবে এর ফল সব সময় ইতিবাচক হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ডেভিড ইয়ফি। অ্যাপল নিয়ে তিনি একাধিক কেস স্টাডি লিখেছেন।

ইয়ফির মতে, অ্যাপলের কৌশল বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে টার্নাস ও কুকের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলে প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে। যেমন টার্নাস হয়তো এআইয়ে আরও বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ২০২৪ সালে কুক যে অ্যাপল কার প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছিলেন, সেটি আবার চালু করতে পারেন। কিংবা ২০২৪ সালে বাজারে আসা হেডসেট ভিশন প্রোর হালনাগাদ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

ইয়ফি বলেন, প্রশ্ন হলো, টিম কি এসব পরিবর্তন মেনে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। আবার জন টার্নাস কি এসব সিদ্ধান্ত নিতে অস্বস্তি বোধ করবেন। কেননা, টিম তো দলে থাকবেনই।

এখন পর্যন্ত অবশ্য কুক ও টার্নাসের মধ্যে মতভেদ দেখা যাচ্ছে না। জুলাইয়ে তাঁরা আইডাহোর সান ভ্যালি সম্মেলনে অংশ নেন। অর্থনীতি, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে প্রতিবছর এই সম্মেলন হয়।

অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিম কুক বলেন, ‘নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সর্বকালের সেরা হোক, আমরা সেটাই চেয়েছি। আমরা চাই, বিষয়টি আদর্শ উদাহরণ হয়ে থাকুক। এখন পর্যন্ত সবকিছু সেভাবেই এগোচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।’

Read full story at source