গ্রেপ্তার দুই আসামি ও উদ্ধার মোটরসাইকেলের রং নিয়ে প্রশ্ন
· Prothom Alo

জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দেওয়ায় অটোরিকশা থেকে পড়ে প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিনের (৫৬) নিহতের ঘটনায় মূল সন্দেহভাজনসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে র্যাব। একই সঙ্গে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করার কথাও জানিয়েছে তারা।
Visit sport-tr.bet for more information.
গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তি হলেন মোশাররফ হোসেন পনি ওরফে পনি গাজী ও তাঁর সহযোগী সেড্রিক। তাঁদের কাছ থেকে ‘ইয়ামাহা আর-১৫’ মডেলের একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানিয়েছে র্যাব। র্যাব বলছে, বাইকটি ছিনতাইয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল।
আজ রোববার বিকেল চারটায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলায় র্যাব-২ ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানানো হয়। র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) নয়মুল হাসান এ ব্রিফিং করেন।
ব্রিফিং শেষে গ্রেপ্তার মূল সন্দেহভাজনসহ দুই ব্যক্তিকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। তখন মূল সন্দেহভাজন মোশাররফ হোসেন চিৎকার করে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করেন। এমনকি ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের সঙ্গে তাঁর মোটরসাইকেলের কোনো মিল নেই বলেও দাবি করেন তিনি। গতকাল শনিবার ছিনতাইয়ের ঘটনায় যে দুটি সিসি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরার ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে, সেখানেও ছিনতাইয়ে নীল রঙের একটি মোটরসাইকেল দেখতে পাওয়া যায়। ফলে গ্রেপ্তার আসামি ও উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের রং নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
গ্রেপ্তারের বিষয়ে ব্রিফিংয়ে র্যাব কর্মকর্তা নয়মুল হাসান বলেন, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় রনজিলা পারভিন হত্যা মামলার মূল সন্দেহভাজন ছিনতাইকারী মোশাররফ হোসেন ও তাঁর সহযোগী সেড্রিককে রাজধানীর পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত ইয়ামাহা আর-১৫ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরা।
নয়মুল হাসান বলেন, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিব। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছেন তাঁরা। তবে ঘটনার দিন মোটরসাইকেলটি পনি গাজীর কাছে ছিল। এ ছাড়া রনজিলা পারভিনের স্বামী আবদুল মতিন ঘটনাস্থলে এই বাইক ব্যবহৃত হয়েছে বলে তাঁদের নিশ্চিত করেছে বলে দাবি করেছে র্যাব।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, তাঁরা প্রাথমিক তথ্য অনুসন্ধানে জানতে পেরেছেন, হত্যার মূল সন্দেহভাজন পনি গাজী একজন পেশাদার ছিনতাইকারী। একাধিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক, ভয়ভীতি প্রদর্শন করাসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড করে আসছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন থানায় মোট ১৩টি মামলা রয়েছে।
মামলার বিবরণ উল্লেখ করে নয়মুল হাসান বলেন, ডিএমপির হাতিরঝিল, আদাবর ও কাফরুল থানায় পনির গাজীর বিরুদ্ধে মাদকের তিনটি; ভাটারা, মোহাম্মদপুর, কাফরুল, বাড্ডা, শাহজাহানপুর থানায় চুরি, ভয়ভীতি প্রদর্শনের ছয়টি; আদাবর, খিলগাঁও, কামরাঙ্গীরচর থানায় চুরি ও সিঁধেল চুরির তিনটি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া চাঁদপুর মডেল থানায় ডাকাতির প্রস্তুতির একটি মামলা রয়েছে।
নয়মুল হাসান বলেন, পনি গাজী এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। জামিনে বের হয়েছেন। তবে কবে বের হয়েছেন, সেটি এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তাঁরা। পুলিশ বিষয়টি যাচাই করছে। আর সেড্রিকের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য তাঁদের কাছে নেই। তবে মোটরসাইকেলের মালিক নিশ্চিত করেছে যে পনিরের পেছনের সিটে সেড্রিকই ছিলেন।
র্যাবের তিনটি যুক্তি
এক প্রশ্নের জবাবে দুজন আসামিকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ব্রিফিংয়ে তিনটি যুক্তি তুলে ধরেন র্যাব-২-এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান। তিনি বলেন, প্রথমত, মোটরসাইকেলের মালিক রাকিব তাঁর আত্মসমর্থন বক্তব্যে জানিয়েছেন, বাইকটি পনি গাজী জোর করে বিভিন্ন সময় নিয়ে যেতেন। ২৬ আগস্ট থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত মোটরসাইকেলটি পনি গাজীর কাছেই ছিল। বাইকটি নিয়ে পনি গাজী কী করেন, সে বিষয়ে তিনি জানেন না। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, সিসি ক্যামেরায় দেখতে পাওয়া মোটরসাইকেলচালকের সঙ্গে পনিরের দৈহিক গঠন মিলে যায়। স্থানীয় ১৫ জন সোর্সকেও ভিডিও দেখিয়ে পনিরের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন তাঁরা। উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি নিহত শিক্ষিকার স্বামীকেও দেখিয়েছেন। তিনিও হুবহু এ রকম মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন। তৃতীয়ত, রাত আড়াইটা থেকে চারটা পর্যন্ত আসামিদের মুঠোফোন নম্বরগুলো ওই এলাকা দিয়ে ঘোরাফেরা করেছে। এর বাইরে এই মুহূর্তে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
মালিক রাকিবের সঙ্গে পনির গাজীর সম্পর্ক প্রসঙ্গে নয়মুল হাসান বলেন, আসামি পনির মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিবের এলাকার বড় ভাই। আর রাকিব একটি ওয়ার্কশপে কাজ করেন। তাঁকে বাইক না দিলে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেওয়া হতো। এ কারণে তিনি তাঁকে বাইক দিতে বাধ্য হন। রাকিবকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তিনি কতটুকু সম্পৃক্ত, সেটি তদন্ত করে দেখে তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত হয়নি।
উদ্ধার হওয়া বাইকের রং নিয়ে প্রশ্ন
ব্রিফিং শেষে গ্রেপ্তার দুই আসামিকে র্যাব-২ ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর প্রাঙ্গণে ক্যামেরার সামনে হাজির করা হয়। র্যাবের চার সদস্য তাঁদের ধরে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করেন। এ সময় পনির গাজী সাংবাদিকদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলে ওঠেন, তিনি এ ঘটনায় জড়িত নন। তাঁকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে। তাঁর বাইকের রং সাদাকালো, কিন্তু ছিনতাইয়ে দেখতে পাওয়া গাড়ির রং ছিল নীল। বিষয়টি তিনি সাংবাদিকদের তদন্ত করে দেখার অনুরোধ করেন। এ কথা বলার পর র্যাব তাঁকে দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নেয়।
এ ছাড়া গতকাল শনিবার ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফুটেজে দেখা গেছে, একটি নীল রঙের মোটরসাইকেল নিয়ে দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে ঘোরাফেরা করছেন। তবে উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল দাবি করে র্যাব যে ছবি গণমাধ্যমে সরবরাহ করেছে, সেটির রং সাদাকালো দেখা গেছে। ফলে গ্রেপ্তার আসামি ও উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি আসলেই ছিনতাইয়ে ব্যবহার হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে নয়মুল হাসান বলেন, ‘আমরা বারবার বলছি, সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারণ, মামলায় আসামি অজ্ঞাত। সন্দেহভাজন থেকেই তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন থেকেই ধীরে ধীরে জিনিসটা ডেভেলপ করবে। আরও স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব। একটু ওয়েট করব। দুজনকে আমরা কিছুক্ষণ পরে থানায় হস্তান্তর করব। তারপর আদালতের অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’