পুরোনো সমাজের ভেতর নতুন মানুষের উত্থান
· Prothom Alo

ভাষানির্ভর সাংস্কৃতিক উৎপাদন হিসেবে উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা উপন্যাসের যে বিকাশ ঘটেছিল, নানা কারণে সেই ধারার মধ্যে পূর্ব বাংলার মুসলমান সমাজ-সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত ছিল। বঙ্গ–অঞ্চলের মুসলমান জনগোষ্ঠীর ভেতর থেকে শক্তিশালী সাহিত্য-প্রতিভার অভাবে এমনটা ঘটেছে, এই যুক্তি হয়তো দেওয়া যায়; কিন্তু ইতিহাসের সত্য-তথ্য তা বলে না। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত তৎকালীন বর্ণহিন্দু লেখকদের মধ্যে অনেকের বাড়ি পূর্ববঙ্গে ছিল এবং মুসলমান প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের গভীর বন্ধুত্বের পরিচয়, নিবিড় পারিবারিক সম্পর্কের কথা স্মৃতিমূলক রচনায় পাওয়া যায় অথচ তাদের লেখা উপন্যাসে মুসলমাম সমাজ নেই। অন্যদিকে বিশ শতকের প্রথমার্ধে মুসলমান সব লেখকের উপন্যাসে হিন্দু প্রতিবেশীদের জীবনাচার অনিন্দ্য সত্যে উদ্ভাসিত। প্রমাণ কী? কাজী ইমদাদুল হকের (১৮৮২-১৯২৬) আবদুল্লাহ (১৯৩৩) উপন্যাসে এর উদাহরণ আছে। মাদারগঞ্জ ও রসুলপুরের তালুক ভোলনাথের কাছে বন্ধক ছিল। আবদুল কাদের বেঁচে থাকতে কিছু টাকা পরিশোধ করেছে, বাকি টাকার দায়ে নিলামে উঠেছে। ভোলানাথের অবস্থা এখন বেশ ভালো—ছোট ছেলে সদরের ডাক্তার, বড় ছেলে হরনাথ বরিহাটী কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট। খোদা নাওয়াজ ছুটে যায় আবদুল্লাহর কাছে, বৃত্তান্ত শুনে সে শ্বশুর সৈয়দ সাহেবের নির্মম আচরণ সত্ত্বেও নিলামের টাকা নিয়ে বরিহাটী কোর্টে গিয়ে হরনাথ বাবুর সঙ্গে দেখা করে এই সম্ভ্রান্ত পরিবারের নিঃস্ব অবস্থার কথা তুলে ধরে।
‘আমার শ্বশুর আমার সঙ্গে কিছু দুর্ব্যবহার করেছিলেন সত্য কিন্তু ইদানিং যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে...হরনাথ বাবু সমস্তই শুনিলেন। এই মহৎ যুবকের প্রতি তাঁহার মন আপনা হইতে নত হইয়া পড়িল। শ্রদ্ধায়, প্রীতিতে তাহার সমগ্র অন্তর্দেশ ভরিয়া উঠিল। তিনি আবদুল্লাহকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন, “ভাই তোমার মহত্বের কাছে আজ আমি নতশিরে পরাজয় স্বীকার করছি।...এ-ঋণ তোমার পরিশোধ করতে হবে না।” এই বলিয়া হরনাথ বাবু সম্মুখস্থ দেরাজ টানিয়া ডিক্রীখানি বাহির করিয়া তাহাদের সম্মুখেই টুকরা টুকরা করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিলেন।’ (কাজী, ২০১৯: ১৯২)
Visit mchezo.life for more information.
দেখা যায়, আবদুল্লাহর চারিত্র্যিক মাধুর্যের কাছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ম্যাজিস্ট্রেট হরনাথ বাবু মুগ্ধ। তালুক বন্ধক রাখার সুদ-আসলের পাওনা টাকা মাফ করে দিয়েছেন এবং ডিক্রির কাগজটি পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন। মুসলমান প্রতিবেশীদের সঙ্গে এমন উদারতার ঘটনা ঔপন্যাসিক আন্তরিক দরদের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। যদিও আবদুল্লাহ উপন্যাসের মূল বিষয় তৎকালীন মুসলমান সমাজের অন্তর্নিহিত সমস্যাকে চিহ্নিতকরণ। কাহিনি বিন্যাস, চরিত্র সৃজনে দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও লেখকের অন্তর্দৃষ্টি, জীবনবোধ ও প্রগতিচিন্তা প্রসংশনীয়। ক. পীরবাদ-মুরিদি ব্যবসার অন্তঃসারশূন্যতা। খ. আশরাফ-আতরাফ সমস্যা, পর্দাপ্রথা কড়াকড়ি, সুদ-মহাজনি ব্যবসা স্বরূপ উদ্ঘাটন। গ. মুলমানদের ইংরেজি শিক্ষার বাধা অতিক্রমের সাহসী চরিত্র সৃষ্টি ও মুসলমান মধ্যবিত্তশ্রেণির উত্থান। ঘ. মুসলিম পরিবারের অন্তঃপুরে নারীর নমিত অবস্থান। প্রথাবদ্ধ সামাজিক রীতিনীতিতে অবরুদ্ধ, তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুসলমান ছিল আত্মবন্দী। পীরগঞ্জের পীর বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আবদুল্লাহর পিতা ওলিউল্লাহ। অঞ্চলজুড়ে থাকা ভক্ত-মুরিদানের বার্ষিক সেলামি-দানে পূর্বপুরুষের জীবন নবাবি হাওলাতে কেটেছে। মুরিদানের সংখ্যা ক্রমে কমে আসায় ওলিউল্লাহ কষ্টেসৃষ্টে সংসার যাপন করতেন। সামান্য পৈতৃক সম্পত্তি এবং মুরিদানদের খোদাওয়াস্তে দানের ওপর নির্ভর করে পুত্র আবদুল্লাহকে কলকাতায় পড়ালেখার খরচ পাঠাতেন। সেই যুগের শরিফ ঘরের রীতি অনুযায়ী আবদুল্লাহ প্রথমে মাদ্রাসায় দ্বীনি শিক্ষা লাভ করেন, পরে নিজ ইচ্ছায় ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হয়। বিএ পরীক্ষার কয়েক মাস আগে আকস্মিকভাবে পিতার মৃত্যু হলে আবদুল্লাহর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থায় কলকাতায় গিয়ে কোনো চাকরির চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেয় আবদুল্লাহ। তার মা বলেছিল পৈতৃক খন্দকারি পেশা গ্রহণ করতে; কিন্তু আবদুল্লাহর খন্দকারি পেশা পছন্দ না।
‘না আম্মা সে আমাকে দিয়ে হবে না।..আব্বাও ও-কাজটা বড় পছন্দ করতেন না, তবে আর উপায় ছিল না বলেই তিনি নিতান্ত অনিচ্ছায় মুরিদানে যেতেন।...
তাদের হেদায়েত করার মত সওয়াবের কাজ কি আছে বাবা!
হ্যাঁ, হেদায়েত করা সওয়াবের কাজ বটে কিন্তু তাতে পয়সা নেওয়াটা কোন মতেই সওয়াব হতে পারে না। বরং উল্টো।...এই পীর-মুরিদী ব্যবসাটা হিন্দুদের পুরুহিতগিরির দেখাদেখিই শেখা, নইলে হযরত ত নিজেই মানা করে গেছেন, কেউ যেন ধর্ম সম্বন্ধে হেদায়েত করে পয়সা না নেয়।’
আবদুল্লাহর মা অসহিষ্ণু হইয়া কহিলেন—‘ওই ত ইংরেজি পড়ার দোষ, কেবল বাজে তর্ক শেখে, শরীয়ত মানতে চায় না। তুই যে পীরগোষ্ঠির নাম-কাম বজায় রাখতে পারবি নে, তা আমি সেই কালেই বুঝেছিলাম।’ (কাজী, ২০১৯: ৯-১০)
তৎকালীন মুসলিম সমাজে পীরে ভক্তি, পীরের মাধ্যমে মুরিদানের আখিরাতে মুক্তিতে বিশ্বাস, বংশপরম্পরায় পীরের ছেলে পীরগিরি-প্রথা চেপে বসেছিল। পরিবারের প্রবীণ এবং উত্তর প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা বনাম ইংরেজি শিক্ষা নিয়ে যে মানস-দ্বন্দ্ব, বংশানুক্রমিক পীরালি-পেশা গ্রহণ করা নিয়ে চেতনাগত সংঘাতময় পরিস্থিতি আবদুল্লাহর মায়ের সংলাপ—‘ওই ত ইংরেজি পড়ার দোষ, কেবল বাজে তর্ক করতে শেখে, শরীয়ত মানে না’-এর মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে। এন্ট্রান্স ও এফএ পাস করে যখন আবদুল্লাহ বিএ ভর্তি হয়েছিল তখন পিতা ওলিউল্লাহর মনে আর্থিক সচ্ছলতার স্বপ্ন জেগেছিল। বিএ পাস করতে পারলে ডেপুটি, সাবরেজিস্ট্রার প্রভৃতি হওয়া সম্ভব। অনেক ভাবনাচিন্তা করার পর মায়ের পরামর্শে পড়ার খরচের জন্য বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে আবদুল্লাহ একবালপুরে তার শ্বশুর সৈয়দ আবদুল কুদ্দুসের বাড়িতে যায়।
‘বাবা, তোর শ্বশুরের কাছে গিয়ে কথাটা একবার পেড়ে দেখ,
আম্মা, তিনি যে সাহায্য করবেন, এমন ত আমার মনে হয় না।’ (কাজী, ২০১৯: ১১)
‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসের প্রচ্ছদ‘সৈয়দ সাহেব ক্রোধে উন্মত্তের ন্যায় চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “এত বড় আস্পর্ধা ওর! ব্যাটা জোলা, পাগড়ী বেঁধে এমামতি কত্তে এসেছে?” আকবর আলী দৃঢ়স্বরে কহিলেন, “কেন, তাতে কি দোষ হ’য়েছে? উনি ত দস্তর মত পাশ-করা মৌলবী, ওঁর মত আলেম এদেশে কয়টা আছে, সৈয়দ সাহেব?” “এঃ! আলেম হয়েছে! ব্যাটা জোলার বেটা জোলা, আজ আলেম হ’য়েছে, ওর চৌদ্দ পুরুষ আমাদের জুতা ব’য়ে এসেছে, আর আজ কিনা ও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে এমামতি ক’রবে, আর আমরা ওই ব্যাটার পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ব?”
সৈয়দ আবদুল কুদ্দুস তাঁদের পুরোনো আত্মীয়। সম্পর্কে পিতা ওলিউল্লাহর খালাতো ভাই এবং মায়ের ফুফাতো ভাই, অন্যদিকে তাঁর কন্যা সালেহাকে বিয়ে করার সূত্রে শ্বশুর। সৈয়দ সাহেব একবালপুরের ‘আশরাফ’ (অভিজাত) শ্রেণির প্রতিপত্তিশালী লোক, হজ্ব করে আসার পর একটা পাকা মসজিদ নির্মাণে ব্যস্ত। পিতা ওলিউল্লাহর মৃত্যুর খবর জানিয়ে চিঠি লিখলেও সৈয়দ সাহেব রসুলপুরে যাননি এবং আবদুল্লাহর স্ত্রী সালেহাকেও পাঠাননি। এসব দুঃখ-অভিমান সত্ত্বেও আবদুল্লাহর আশা ছিল পিতার অবর্তমানে শ্বশুর তাকে পড়ালেখার খরচ সাহায্য করবেন। কিন্তু সৈয়দ সাহেব মসজিদ নির্মাণের বিশাল খরচ, মাদারগঞ্জ ও রসুলপুরের দুটো তালুক বন্ধক দিয়ে ঋণে জর্জরিত এসব অজুহাত তুলে আবদুল্লাহকে সাহায্য করতে রাজি হলেন না। তা ছাড়া তিনি ইংরেজি শিক্ষার ঘোর বিরোধী। সৈয়দ সাহেবের মেজ ছেলে আবদুল কাদের ও আবদুল্লাহ সহপাঠী। আবদুল কাদের মাদ্রাসা পড়া ছেড়ে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হয়েছে জেনে তার পড়ালেখার খরচ বন্ধ করে দেন। সৈয়দ সাহেবের রক্ষণশীল মানসিকতার সঙ্গে আবদুল্লাহর প্রগতিমুখী মানস-দ্বন্দ্ব আবদুল্লাহ উপন্যাসের প্রধান ডিসকোর্স। ‘আবদুল কাদের আর আমি যখন মাদ্রাসা ছেড়ে স্কুলে ভর্তি হই, তখন আব্বাকে আমি জানিয়েছিলাম, কিন্তু সে তার বাপের কাছে গোপন রেখেছিল। সে খুবই জানত যে, তার বাবা একবার জানতে পারলে আর কিছুতেই পড়ার খরচ দেবে না, কেননা তিনি ইংরেজি শেখার উপর ভারী নারাজ।’ (কাজী, ২০১৯: ১১) এই নিয়ে পিতা-পুত্রের মন–কষাকষিতে আবদুল কাদের বাড়ি ছেড়ে বরিহাটী গিয়ে সহপাঠী ওয়াহেদ আলীর বাড়িতে আশ্রয় নেয়। ওয়াহেদ আলীর পিতা আকবর আলী বরিহাটী কমিশনার অফিসের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেট করবেট সাহেবের সঙ্গে বেশ জানাশোনা আছে। খবর নিয়ে জানতে পেরেছেন সাবরেজিস্ট্রারের একটা পদ শূন্য হয়েছে। আকবর আলী করবেট সাহেবকে বললেন—
‘ইনি আপিসে কোন চাকরী চান না সার, সবরেজিস্ট্রারীর জন্য এপ্রেন্টিসী প্রার্থনা করেন।... খুব সম্ভ্রান্ত বংশের লোক।’ সাহেব বললেন, ‘ও, আপনি একবালপুরের সৈয়দ বংশের লোক বটে! বড় ঘরের ছেলে চাকরীর দরকার কি?’ আবদুল কাদের বলল—‘আমাদের ঘরের আবস্থা ভালো নেই। আপনি দয়া কল্লে আমার কষ্ট দূর হয়।’...আচ্ছা একটা দরখাস্ত পাঠিয়ে দেবেন।’ (কাজী, ২০১৯: ৮১-৮২)
এভাবে আকবর আলীর সুপারিশে আবদুল কাদেরের সাবরেজিস্ট্রার পদে চাকরি হয়। আবদুল্লাহর স্কুলে চাকরি হয়। সৈয়দ সাহেবের শরাফতি জাত্যভিমান, অতিধার্মিকতার বিপরীতে পরবর্তী প্রজন্মের কাদের, আবদুল্লাহ উদ্ভিন্নমান মুসলিম মধ্যবিত্তের পথিকৃৎ হয়ে ওঠে।
কাজী ইমদাদুল হক আবদুল্লাহ উপন্যাসে দেখিয়েছেন, সেই সময় মুসলমান সমাজ ‘আশরাফ’ (উচ্চ বংশ, অভিজাত, সম্পদশালী মর্যাদাবান) এবং ‘আতরাফ’ (নিম্ন বংশ, গরিব, অশিক্ষিত) দুই শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। ‘আশরাফ’-‘আতরাফের’ ব্যবধান কেমন ছিল, তা সৈয়দ সাহেবের মসজিদ নির্মাণ শেষ হবার পর উদ্বোধন উপলক্ষে লক্ষ্ণৌ থেকে মাওলানা এনে মৌলুদ শরিফ (হজরত মুহাম্মদ (সা.) শানে কেয়ামসহকারে সালাম-দরুদ পড়া) পড়ানো এবং গ্রামবাসী-আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত করে বিশাল খানার আয়োজন করার মধ্যে স্পষ্ট হয় উপন্যাসের নিম্নোক্ত বর্ণনায়—
‘বিবিগণের মধ্যে যাঁহারা উহাদিগকে চিনিতেন না তাঁহারা উহাদের আভিজাত্য সম্বন্ধে সন্দিহান হইয়া এক দস্তরখানে বসিতে ইতঃস্তত করিতেছিলেন। এমন সময় মজলিশপুরের এক বিবি কয়েকজনকে একটু আড়ালে লইয়া গিয়া রাবিয়াদের পরিচয় দিয়া কহিলেন, রাবিয়ার পিতামহ দ্বিতীয় যে বিবাহ করিয়াছিলেন, সে বিবি একটু নীচু ঘরের মেয়ে—রাবিয়ার পিতা তাঁহারই গর্ভে জন্মিয়াছিলেন। এই কথা শুনিয়া শরীফাবাদের এক বিবি কহিলেন, “হুঁ, সে আমি চা’লচলন দেখে আগেই ঠাউরেছিলাম।” এবং সৈয়দ সাহেবের বড়বিবিকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“বেয়ান সাহেব, রাবিয়ারা কি আমাদের সঙ্গে এক দস্তরখানে ব’সবে?” বড়বিবি কহিলেন—“না, না, ওরা কেন বসবে? ওরা খাদেমী ক’রবে ‘খন।” শরীফবাদের বিবি কহিলেন—“না, না, সেটা ভাল দেখাবে না। ওদের আলাদা ঘরে বসালেই হবে।...” হালিমা এ কথা শুনিয়া মর্মাহত হইল। সে তাহার শাশুড়িকে গিয়া কহিল—“তবে আমিও ব’সব না আম্মা, ভাবী সাহেবদের সঙ্গে খাব ‘খন।...” সকলে বসিয়া গিয়াছেন, বাঁদিরা সিলপ্সি (হাত ধোয়ার পাত্র) লইয়া একে একে হাত ধোয়াইতেছে, এমন সময় সালেহা আসিয়া মাতাকে কহিল—“তাঁরা নেই! বেলার কাছে শুনলাম, এক্ষণি তারা পাছ-দুয়ারে পাল্কী ডাকিয়া চ’লে গিয়েছেন।” হালিমা কাছেই ছিল, শুনিয়া মনটা খারাপ হইয়া গেল। বড় বিবি মৃদুস্বরে কহিলেন—“ওঃ, গোসা ক’রে বিবিরা চ’লে গিয়েছেন।”’ (কাজী ২০১৯: ১১৬-১৭)
‘আশরাফ’ বংশের লোকেরা ‘আতরাফ’ বংশের সঙ্গে একই দস্তরখানায় বসে খানা খেতেন না। একসারিতে বসে খানা খেলে শরিফদের মর্যাদাহানি হবে—এই যে মানুষে মানুষে ব্যবধান, এটা ইসলাম ধর্মে নেই। অথচ তৎকলীন মুসলমান সমাজে এই কুসংস্কার বিরাজমান ছিল। উপন্যাসের বর্ণিত ঘটনার মধ্যে মজলিশপুরের রাবিয়া ও অন্যান্য নারীদের একই দস্তরখানায় বসে খেতে না দেওয়ায় অপমানবোধ থেকেই ‘গোস্সা’ করে পালকিতে ছড়ে চলে গিয়েছেন। অথচ মজলিশপুরের রাবিয়া কিন্তু সৈয়দ সাহেবের ছোট ছেলে আবদুল খালেকের বিয়ে করা স্ত্রী। ‘আশরাফ’ বংশের অহংবোধের মূর্তি কেমন ছিল, তা বরিহাটীতে জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে সৈয়দ সাহেবের অভিব্যক্তির মধ্যেও ফুটে উঠেছে—
‘সৈয়দ সাহেব ক্রোধে উন্মত্তের ন্যায় চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “এত বড় আস্পর্ধা ওর! ব্যাটা জোলা, পাগড়ী বেঁধে এমামতি কত্তে এসেছে?” আকবর আলী দৃঢ়স্বরে কহিলেন, “কেন, তাতে কি দোষ হ’য়েছে? উনি ত দস্তর মত পাশ-করা মৌলবী, ওঁর মত আলেম এদেশে কয়টা আছে, সৈয়দ সাহেব?”
“এঃ! আলেম হয়েছে! ব্যাটা জোলার বেটা জোলা, আজ আলেম হ’য়েছে, ওর চৌদ্দ পুরুষ আমাদের জুতা ব’য়ে এসেছে, আর আজ কিনা ও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে এমামতি ক’রবে, আর আমরা ওই ব্যাটার পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ব?”
একজন কহিল, “ওনারেই দেও বার ক’রে—ওসব স’য়েদ ফ’য়েদের ধার আমরা ধারি না।” আকবর আলী কহিলেন, “সৈয়দ সাহেব, এটা আপনার অন্যায়। কেতাব মত ধত্তে গেলে মুসলমানের সমাজে উঁচু-নিচু বিচার নেই, তাতে আবার এটা খোদার ঘর।” সৈয়দ সাহেব বাধা দিয়ে কহিলেন, “তাই বলে জোলা তাঁতি নিকারী যে-সে জাতের পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ প’ড়তে হবে?”’ (কাজী, ২০১৯: ১৩৬)
কাজী ইমদাদুল হকআবদুল্লাহ প্রচলিত পর্দাপ্রথার অবরুদ্ধতাকে মোকাবিলা করেছে দৃঢ়তার সঙ্গে। প্রথা ভেঙে চিকিৎসার জন্য হালিমাকে সৈয়দ বাড়ি থেকে প্রথমে সদরে, পরে বরিহাটীতে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। আবদুল্লাহর এই নায়কোচিত কাণ্ড দেখে আবদুল কাদের বলেছে, ‘আবদুল্লাহ কেমন করিয়া এমন অসাধ্য সাধন করিল তাহা ভাবিয়া আশ্চর্য হই।’ সমালোচক তাই মন্তব্য করেছেন, ‘আধুনিক জীবনের সমস্যা তাঁকে নতুন পথসন্ধানে প্রবৃত্ত করেছে। পর্দা-প্রথার শ্বাসরুদ্ধকর কড়াকড়ির বিরুদ্ধে আবদুল্লাহ বিদ্রোহ করেছেন।’ (আনিস, ২০২০: ৩২৩)
সৈয়দ সাহেব সেখানে নামাজ না পড়ে বেরিয়ে যান। তাঁর পেছনে পেছনে সুফি সাহেব (সৈয়দ সাহেবের মুরিদ সফিউল্লাহ) বেরিয়ে এসে ‘ওয়াক থু’ করলেন। এই যে জাত্যভিমান, বংশ-অহং, এটার সঙ্গে ইসলাম ধর্মে কোনো সম্পর্ক নেই। বৈদিক হিন্দু ধর্মে চতুর্বর্ণ—(ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য, শূদ্র) প্রথার অনুসরণে মুসলমানদের মধ্যেও সেই সময় বিভাজন তৈরি হয় এবং প্রকট আকার ধারণ করেছিল। জাত্যভিমানের কারণে শরিফজাদিদের উপযুক্ত পাত্রের অভাবে বিয়ে বিলম্বিত হতো। সমাজে বিয়ে-থা নির্দিষ্ট ঘরের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। শরিফ বংশের বাহিরে ‘কথা উঠলেই মুরুব্বীরা আপত্তি করে বলতেন, ওদের সঙ্গে কোনো পুরুষের “হসব-নসব” (বৈবাহিক সম্পর্ক) নেই।’ (পৃ. ১৬৬)
মুসলমান জমিদারের শরাফতি মর্যাদার গর্ববোধ থেকেই তারা লেখাপড়া শেখা, ব্যবসা করা, চাকরি করাকে ছোটলোকের কাজ মনে করত। মুসলমান শরিফ সমাজ (দুরবস্থায় পড়েও গুমর ছাড়তে চাইত না।) তাই যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থ–বিত্ত ও শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে। ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট করবেট সাহেব আবদুল কাদেরের উদ্দেশে বলে, উপন্যাসের ভাষায়:
‘দেখো, হিন্দুরা লেখাপড়া শিখে কেমন উন্নতি করে ফেলেছে-অপিসে আদালতে কি ব্যবসায়-বাণিজ্যে, যেখানে দেশীয় লোক দেখতে পাই, কেবলই হিন্দু—ক্বচিৎ কালে-ভদ্রে একজন মুসলমান নজরে পড়ে। ক্রমে এরাই দেশের সর্বেসর্বা হ’য়ে উঠবে, দেখতে পাবেন, আপনারা কেবল কাঠ কাটবার জন্যে প’ড়ে থাকবেন।’ (কাজী, ২০১৯: ৮১)
মুসলমান সমাজের এই অন্তর্নিহিত সত্য, মানসিক গোঁড়ামির বাস্তবতাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ঔপন্যাসিক তুলে ধরেছেন। মুসলমান সমাজের শ্বাসরুদ্ধকর পর্দাপ্রথা এবং অনুদার দৃষ্টিভঙ্গির স্বরূপ উঠে এসেছে আবদুল্লাহ উপন্যাসের সৈয়দ সাহেবের চরিত্রে। মসজিদের আকামতের কয়েক দিন পর সৈয়দ সাহেবের মেজ ছেলে সাবরেজিস্ট্রার আবদুল কাদেরের স্ত্রী হালিমা খুব অসুস্থ হলে প্রথমে গ্রামের কবিরাজি চিকিৎসা চলে। রোগিণী মশারির ভেতর, পাশে পর্দার ভেতর শাশুড়ি ও চাকরানিকে কবিরাজ নানা প্রশ্ন করে রোগীর অবস্থা জেনে ওষুধ দেয়। স্টেথস্কোপ দিয়ে পর্দার ওপাশ থেকে ডাক্তার বুকের কফ ও শ্বাস পরীক্ষা করতে চেয়েছে; কিন্তু তারা কেউ ঠিকমতো স্টেথস্কোপ ধরতে না পারায় তা সম্ভব হয়নি। হালিমার অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। সৈয়দ সাহেব দোয়া, তাবিজ, পানিপড়া, মক্কা শরিফ থেকে আনা উটের শুকনা গোশত ঘষে খাওয়ানো হলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। আবদুল কাদেরের ছুটি শেষ, এদিকে স্ত্রী হালিমা মুমূর্ষু। আবদুল্লাহ বলল, এই রোগ সারানো কবিরাজের কর্ম নয়। হালিমাকে সদরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। আবদুল কাদের বলল, ‘আব্বা কী রাজি হবেন? তিনি ডাক্তারি ওষুধের নামই শুনতে পারেন না।’ হালিমার অবস্থা আরও কঠিনতর হলে আবদুল কাদের সৈয়দ সাহেবকে ডাক্তারের কথা বলতেই সে চটে গেল:
‘হ্যাঁ, এই রমজান শরিফে শরাব-টরাব খাইয়ে এখন বউটার আখেরাতের সর্বনাশ কর আর কি! কেন কবিরাজ মশায় ত দাওয়াই দিচ্ছেন।...আমি তদ্বির কচ্ছি, এতে দেখো আল্লাহ রহম দেবে নিশ্চয়।...তোমরা খোদার উপর ভরসা করতে শেখনি, ওটা ইংরেজি পড়ার দোষ।’ (কাজী, ২০১৯: ১২০)
হালিমার অবস্থা আরও সঙিন হলে আবদুল্লাহ তাকে নৌকাযোগে সদরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। হালিমাকে সদরে নেওয়ার কথা শুনে সৈয়দ সাহেব যেন আকাশ থেকে পড়ল। চোখ কপালে তুলে বলল, ‘সে কি! মান-সম্ভ্রম তো আর কিছু রাখলে না দেখছি।’ আবদুল্লাহ প্রতিবাদের সুরে বলে, ‘মান-সম্ভ্রমের কথা পরে, জান বাঁচান আগে। ডাক্তার বলেছেন, রোগ কঠিন, এখানে রেখে চিকিৎসা হবে না।’ আবদুল্লাহ নাছোড়বান্দা, সৈয়দ সাহেবের প্রবল বাধা ও গুরুতর আপত্তি সত্ত্বেও পরদিন নৌকা করে বরিহটী নদীর তীরে ডাক্তার দেবনাথ সরকারের বাড়িতে গিয়ে ওঠে। রোগীর সেবার জন্য সঙ্গে গেল আবদুল্লাহর মা এবং আবদুল্লাহর স্ত্রী সালেহা। দেবনাথ সরকার একবালপুরের ভোলানাথ সরকারের ছেলে। সে এখন বরিহাটী হাসপাতালের সহকারী সার্জন। সে নিজেই বাড়িটা ছেড়ে দিয়ে হালিমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করল। হালিমাকে বরিহাটী আনা হয়েছে খবর শুনে আবদুল কাদের এসে যোগ দিল। খাটের ওপর মশারি টানিয়ে একটা মোটা চাদরে হালিমার গা ঢাকিয়ে পর্দা করে দিল। ‘ডাক্তার বললেন, এর ভেতরে ত স্টেথস্কোপ ইউস করা যাবে না।’ আবদুল কাদের চিন্তিত হয়ে বলল, তা হালে উপায়? ডাক্তার বললেন, ও–সব মশারিটশারি তুলে ফেলুন, রোগীকে ভাল ক’রে দেখতে দিন। না দেখে কি আন্দাজে চিকিৎসা চলে? আপনারা এডুকেটেড হ’য়েও যে এসব ওল্ড ফগিইজম ছাড়তে পারেন না, এ বড় আশ্চর্য।’ (কাজী, ২০১৯: ১২৭) আবদুল কাদের আমতা আমতা করে বলল, ‘আব্বা ভয়ানক চটে যাবেন।’ আবদুল্লাহর মা মৃদু আপত্তি করল। আবদুল্লাহ এসব ওজর-আপত্তিতে কান দিল না। দৃঢ়তার সঙ্গে ডাক্তারকে কাজ করতে বলল। স্টেথস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করে ডাক্তার বলল, ‘নিমোনিয়া। ইনজেকশন ট্রিটমেন্ট কত্তে পাল্লে ভাল হয়।’ আবদুল্লাহ নিজেই ইনজেকশন আনতে ট্রেনে কলকাতায় যায়। ফার্মেসি থেকে ইনজেকশন কিনতে গিয়ে মজিলপুরের খালাতো ভাই ফজলুর সঙ্গে দেখা হয়। ফজলু ডেপুটিশিপের ক্যান্ডিডেট, ম্যাজিস্ট্রেট অনুমোদন করেছে, কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে সে কলকাতা এসেছে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর হালিমার শরীর ক্রমেই সুস্থতার দিকে। এমন সময় সৈয়দ সাহেব বরিহাটীতে হালিমাকে দেখতে এসে জানতে পারলেন রোগীকে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। তার প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ:
‘তোমরা বাকী কিছু রাখলে না, দেখছি! আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, কেন আব্বা?..কোনো শরীফ ঘরের বউ-ঝিকে এমন ক’রে ডাক্তারকে দিয়ে পরীক্ষে করাতে দেখেছ?..আবার গা ফুঁড়ে দাওয়াই দেওয়া...হ্যাঁ, তা চাদর মুড়ি দিয়ে ত ছিল।...তা হলে বে-আবরু হ’ল না?...-ও সব ডাক্তারি-ফাক্তারির কাজ নেই, বাড়ী নিয়ে চল, আমি হাকিম আনাচ্ছি, খোদা চাহে ত তাতেই আরাম হ’য়ে যাবে।’ (কাজী, ২০১৯: ১৩৩)
চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার আগে ডাক্তার রোগীকে বাড়ি নেওয়ার অনুমতি দিল না। সৈয়দ সাহেব রাগ করে নিজের মেয়ে সালেহাকে নিয়ে চলে গেল। সালেহা আবদুল্লাহর স্ত্রী, স্বামীকে ছেড়ে যেতে মন চাইছে না; কিন্তু সে কথা সৈয়দ সাহেবের সামনে বলার সাহস নেই। উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায়, পর্দাপ্রথার এমন কড়াকড়ি ছিল যে গুরুতর রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজনে স্টেথস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করা, ইনজেকশন দেওয়াকে গুনাহের কাজ বলে গণ্য করা হতো। অথচ ইসলামের প্রকৃত ধর্মমতে, ‘জীবন বাঁচানো ফরজ’। চিকিৎসার প্রয়োজনে মানুষের যেকোনো অঙ্গ প্রদর্শন, যান্ত্রিক পরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত করা শাস্ত্রসম্মত। আবদুল্লাহ প্রচলিত পর্দাপ্রথার অবরুদ্ধতাকে মোকাবিলা করেছে দৃঢ়তার সঙ্গে। প্রথা ভেঙে চিকিৎসার জন্য হালিমাকে সৈয়দ বাড়ি থেকে প্রথমে সদরে, পরে বরিহাটীতে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। আবদুল্লাহর এই নায়কোচিত কাণ্ড দেখে আবদুল কাদের বলেছে, ‘আবদুল্লাহ কেমন করিয়া এমন অসাধ্য সাধন করিল তাহা ভাবিয়া আশ্চর্য হই।’ সমালোচক তাই মন্তব্য করেছেন, ‘আধুনিক জীবনের সমস্যা তাঁকে নতুন পথসন্ধানে প্রবৃত্ত করেছে। পর্দা-প্রথার শ্বাসরুদ্ধকর কড়াকড়ির বিরুদ্ধে আবদুল্লাহ বিদ্রোহ করেছেন।’ (আনিস, ২০২০: ৩২৩)
হান্টারের এই রিপোর্টের ফলে ভারতীয় মুসলমানদের সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারের ভুল ভাঙে এবং নীতি পরিবর্তন করে মুসলমানদের শিক্ষায় নমনীয় ও উদারনীতি গ্রহণ করে। সাবরেজিস্ট্রি আবদুল কাদের, আইনজীবী আলতাফ, ফজলু মিঞা, পুলিশ ওয়াহেদ আলী—এরা নিম্ন শ্রেণির মুসলমান কৃষক, জোলা, নিকারি, সমাজ থেকে উঠে আসা সেই যুগের নয়া মানুষ। এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র আবদুল্লাহর দ্রোহ-সংঘাতের মধ্য দিয়ে মুসলমান সমাজ যে রূপান্তরিত হচ্ছে, আধুনিকতাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে এগিয়ে যাচ্ছে, গড়ে ওঠছে মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি—এই দৃষ্টিভঙ্গিই আবদুল্লাহ উপন্যাসকে সেকালে অধিক পাঠকপ্রিয় করে তুলেছে।
আবদুল্লাহ উপন্যাসে বর্ণিত পলাশডাঙ্গা, রসুলপুর গ্রামে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সুদ-মহাজনি ব্যবসার প্রচলন দেখা যায়। পলাশডাঙ্গা গ্রামের মদন গাজী সম্পন্ন গৃহস্থ। গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, উঠানভরা হাঁস-মুরগি নিয়ে বেশ সুখে-স্বচ্ছন্দে চলছে। তার খামার জমিগুলো বেশ উর্বরতা শক্তি, বাপ ও জোয়ান বেটা সাদেক গাজী পরিশ্রমে ধান-পাট বিক্রি করে হাতে দুটো কাঁচাপয়সাও আসে। গ্রামের লোকজন বলতে শুরু করল, ‘জ্যেষ্ঠ ছেলে সাদেকের বিয়েতে চার গ্রামের লোক খাওয়াতে হবে, নইলে শেখদের মান থাকে কী করে!’ ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান করতে গিয়ে মদন গাজী খামার জমিগুলো দিগম্বর ঘোষের কাছে ‘রেহেন’ রেখে সুদেই টাকা ধার নেয়। দুই বছর খরা-অজন্মার কারণে মদন গাজী সুদের কিস্তি বাকি পড়ে তা চক্রবৃদ্ধিতে তামাদি হয়ে যায়। মদনের খামার জমিগুলো নিলাম হয়ে গেলে ঘোষ মহাশয় সেগুলো খরিদ করে নেয়। আদালতে নালিশে ডিক্রি নিয়ে দিগম্বর ঘোষ মদনের বউ-ঝিসহ সবাইকে বাড়ি থেকে বের করে দখল নিতে এলে নিঃস্ব মদন গাজী ঘোষ মহাশয়ের পায়ে পড়ে কিছুদিনের সময় চায়; কিন্তু দিগম্বর ঘোষ একমুহূর্ত সময় দিতে রাজি নয়। ঘোর বিপদে দিশাহারা হয়ে ছেলে সাদেক গাজী নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে। এটা শুনে মদন গাজী বেহুঁশ হয়ে পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়। সাদেক গাজী নদী সাঁতরিয়ে রসুলপুরে আবদুল্লাহর ফুফা মীর মোহসেন আলীর বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়ে বৃত্তান্ত জানায়। মীর সাহেব তৎক্ষণাৎ মদন গাজীর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে দিগম্বর ঘোষের ৩২২ টাকা শোধ করে গাজী পরিবারের মান-ইজ্জত রক্ষা করে। সুদের ফাঁদে পড়ে সেই সময় সচ্ছল গৃহস্থ পরিবার কীভাবে নিঃস্ব, দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে, বর্ণিত ঘটনা তার বাস্তব প্রমাণ। সুদ-ব্যবসা সম্পর্কে তৎকালীন সমাজে হিন্দু-মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গির একটা পার্থক্য ফুটে উঠেছে:
‘মুসলমান হইয়া যে ব্যক্তি সুদ খায়, সে জাহান্নামী এবং সে জাহান্নামীর সঙ্গে মুসলমান হইয়া যে কারবার করে সেও জাহান্নামে যায়। এই জন্যই সুদখোরের বাড়ীতে খাওয়া অথবা তাহাকে বাড়ীতে “দাওয়াৎ” করিয়া খাওয়ান মস্ত গোনার কাজ। কিন্তু হিন্দুদের যখন ধর্মে বাধে না, তখন সুদ খাইলে তাহাদের কোন দোষ হইতে পারে না।’ (কাজী, ২০১৯: ৪১)
রসুলপুরের মীর মোহসেন আলী সম্পর্কে আবদুল্লাহর ফুফা। সম্পন্ন গৃহস্থ, আছে পাটের কারবার ও অন্যান্য ব্যবসা। গ্রামের গরিব মুসলমানেরা বিপদে পড়ে তার কাছে সাহায্যের জন্য এলে সে স্বল্প সুদে তাদের টাকা ধার দেয়। হিন্দু মহাজনেরা যেখানে চড়াসুদে কারবার করে, সেখানে মীর সাহেব নামমাত্র সুদে মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে। পীর বংশে বিয়ে করলেও হঠাৎ অসুখে তার স্ত্রী মারা যায়। নিঃসন্তান, তবু আর বিয়ে করেনি। সে সুদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে আবদুল্লাহর বাবা ওলিউল্লাহ বেঁচে থাকতে মীর সাহেবের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ রাখত না। বাবার মৃত্যুর পর শ্বশুর সৈয়দ আবদুল কুদ্দুস, আবদুল্লাহর পড়ার খরচ দিতে রাজি হল না, তখন ফুফা মীর সাহেবই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া গ্রামের টাকার অভাবে পড়ালেখা করতে পারছে না, বাদশা মিঞার ছেলে আলতাফ, আহমদ আলী, আবদুল বারী প্রমুখ ছেলেদের মীর সাহেব মাসিক হারে টাকা দিয়ে সাহায্য করে। কিন্তু মীর সাহেবের বদনাম রটে যায় সুদখোর হিসেবে। আবদুল্লাহ সৌভাগ্যক্রমে বরিহাটী গভর্নমেন্ট স্কুলের মাস্টারির চাকরি পায়। মীরের সাহায্যে আলতাফ বি.এ’ল পাস করে বরিহাটীতে ওকালতি করছে। ‘নব্য শিক্ষিতরা বুঝেছিলেন, শিক্ষাই সামাজিক মর্যাদা, বিত্ত ও ক্ষমতা এনে দেবে এবং জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ মহিলাদেরও আর একেবারে অন্ধকারে রাখা ঠিক হবে না।’ (মুনতাসীর, ১৯৮৬: ২৮২) মীরের পালিত মেয়ে মালেকার স্বামীর হঠাৎ মৃত্যুতে সে বিধবা হয়। মালেকার প্রতি আলতাফে আকর্ষণ আছে; কিন্তু তার বাবা বাদশা মিঞা রাজি না। এদিকে আবদুল্লাহর স্ত্রী, সৈয়দ সাহেবের মেয়ে সালেহার সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যু হয়। অল্প কিছুদিন পরেই সৈয়দ সাহেব, আবদুল্লাহর কাছে মেয়ের দেনমোহর বাবদ পঁচিশ হাজার টাকা দাবি করে এবং দ্রুত পরিশোধ না করলে সে আইনের আশ্রয় নেবে বলে চিঠি লেখে। আবদুল্লাহ নিরুপায়, চাকরি থেকে জমানো এক হাজার, জমি রেহেন দিয়ে আট হাজার টাকা জোগাড় করলেও সৈয়দ সাহেব টাকাটা একসঙ্গে চায়। ফুফা মীর সাহেব এবারও আবদুল্লাহকে বাকি টাকা দিয়ে সাহায্য করে। রাবেয়ার প্রস্তাবে বিধবা মালেকাকে আবদুল্লাহ দ্বিতীয়বার বিয়ে করে। ইতিমধ্যে সৈয়দ সাহেবের সাবরেজিস্ট্রার ছেলে আবদুল কাদের দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। হালিমা দুই সন্তান নিয়ে বিধবা হয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন সময় সৈয়দ সাহেব আবদুল কাদেরের ইনস্যুরেন্সের পাঁচ হাজার টাকার শরিয়ত মতো হিস্যা চেয়ে আবদুল্লাহকে চিঠি লেখে। আবদুল্লাহ সেই টাকাও ছয় ভাগের দুই ভাগ বারো শ টাকা পাঠিয়ে দেয়। একসময় সৈয়দ সাহেবের বয়সজনিত অসুস্থতায় মৃত্যু হয়। বড় ছেলে আবদুল মালেক স্ত্রী নিয়ে শ্বশুরালয়ে চলে যায়। ছোট ছেলে আবদুল খালেক তালুক-সম্পত্তি সম্পর্কে উদাসীন। চাকর–পুত্র খোদা নাওয়াজ তালুক দেখাশোনা করলেও নিরক্ষর হওয়ায় গোমস্তা ফাঁকিতে পরিবার দুরবস্থায় পড়ে যায়। পর্দাপ্রথা ভেঙে হালিমাকে বরিহাটীতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার করানো, ইংরেজি পড়ার জন্য পদে পদে তিরস্কার শুনতে হয়েছে সৈয়দ সাহেবের কাছ থেকে। শ্বশুরের এমন অমানবিক, বিবেচনাহীন, নির্মমতার শিকার হলেও আবদুল্লাহর মনে কোনো রাগ, অভিমান, ঘৃণার উদ্রেক হতে দেখা যায় না। উপন্যাসের শুরু থেকেই শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহ চরিত্রে সৎ, মহৎ, ভালো মানুষ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। এত নিখুঁত, ত্রুটিহীন, যে তার মানবীয় দুর্বলতাও থাকতে নেই? এমন কি তিরস্কার, বঞ্চনার জন্যও তার ভেতরে কোনো ক্ষোভ বা প্রতিক্রিয়া হবে না? স্ত্রীর মৃত্যুর পর মোহরানার টাকা একটু বিলম্ব করতে রাজি হন না, সেই সাবেক শ্বশুরের সম্পত্তি রক্ষার জন্য আবদুল্লাহকেই ছুটে আসতে হয়, এটা আরোপিত আদর্শ, বাস্তবতাবিবর্জিত। উদ্ভিন্নমান মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ঠুনকো শরাফতি আভিজাত্যের গৌরবে ক্ষয়িষ্ণু মুসলমান সমাজের রীতিনীতি সম্পর্কে কাজী ইমদাদুল হক মৌলিক পর্যবেক্ষণ শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। আবদুল্লাহ উপন্যাসের কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি সমকালীন সমাজকে নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখেছেন, স্বসমাজের ত্রুটি ও দুর্বলতাকে দ্বিধাহীন চিত্তে তুলে ধরেছেন। প্রসঙ্গক্রমে, উইলিয়াম হান্টার দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমানস (১৮৭১) বইয়ে সুপারিশ করেন: ‘আমাদের উচিত, এভাবে মুসলমানদের মধ্যে একটি নয়া সম্প্রদায় গড়ে তোলা, যারা নিজেদের সংকীর্ণ শিক্ষার গণ্ডির মধ্যেই আর শিক্ষিত হবে না; বরং তারা পাশ্চাত্য সংযত ও স্বাস্থ্যকর জ্ঞানের দ্বারা অনুরঞ্জিত হবে। আবার সেই সঙ্গে ধর্মীয় আইনেও আকর্ষণ করবে, অথচ ইংরেজিতে দখল থাকার দরুন তারা জীবনে অর্থকরী পেশায়ও ঢুকতে পারবে।’ (হান্টার, ২০১৯: ১৩৯)
হান্টারের এই রিপোর্টের ফলে ভারতীয় মুসলমানদের সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারের ভুল ভাঙে এবং নীতি পরিবর্তন করে মুসলমানদের শিক্ষায় নমনীয় ও উদারনীতি গ্রহণ করে। সাবরেজিস্ট্রি আবদুল কাদের, আইনজীবী আলতাফ, ফজলু মিঞা, পুলিশ ওয়াহেদ আলী—এরা নিম্ন শ্রেণির মুসলমান কৃষক, জোলা, নিকারি, সমাজ থেকে উঠে আসা সেই যুগের নয়া মানুষ। এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র আবদুল্লাহর দ্রোহ-সংঘাতের মধ্য দিয়ে মুসলমান সমাজ যে রূপান্তরিত হচ্ছে, আধুনিকতাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে এগিয়ে যাচ্ছে, গড়ে ওঠছে মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি—এই দৃষ্টিভঙ্গিই আবদুল্লাহ উপন্যাসকে সেকালে অধিক পাঠকপ্রিয় করে তুলেছে।
সহায়ক গ্রন্থ
আনিসুজ্জামান (২০২০) মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য, চারুলিপি, ঢাকা।
উইলিয়াম হান্টার (২০১৯) দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমানস, অনুবাদ: আবদুল মওদুদ, আহমদ পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা।
কাজী ইমদাদুল হক (২০১৯) আবদুল্লাহ, ঐতিহ্য, ঢাকা।
মুনতাসীর মামুন (১৯৮৬) উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গের সমাজ, সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।