বিশ্ব মানবতা দিবস: মানবিক সংকটে সমাজ

· Prothom Alo

আজ (১৯ আগস্ট) ১৮তম বিশ্ব মানবতা দিবস। যাঁরা আত্মত্যাগ করে মানবসেবায় ব্রতী হয়েছেন, যাঁরা মানবকল্যাণে ও মানব উন্নতি সাধনে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশে দিবসটি পালন করা হয়। দিবসটির ইতিহাস খুব প্রাচীন নয়। জানা যায়, জাতিসংঘের মানবিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্রাজিলের কূটনীতিক সার্জিও ভিয়েরা দি মেলো ২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট ২১ সহকর্মীকে নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকের বাগদাদে যান। সেখানে বোমা হামলায় তাঁরা নিহত হন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৮ সালের ১৯ আগস্টকে বিশ্ব মানবতা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। পরের বছর ২০০৯ সালে দিবসটি পালন শুরু হয়। জাতিসংঘের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থাকে দিবসটি পালনের আমন্ত্রণ জানানো হয়। দিবসটি পালনের মাধ্যমে সারা বিশ্বের নাগরিকদের মানবিক কাজের প্রতি সমর্থন জোরদার করা হয়।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

বিশ্ব মানবতা দিবস মানবিক সহায়তার অপরিহার্যতাকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং মানুষের মধ্যে মানবতাবোধকে জাগ্রত করে। বিশ্বের নানা প্রান্তের যুদ্ধ, সংঘাত, দুর্যোগ ও সংকটময় পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। এক কথায় মানবিকতার প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। সমতা, ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলা, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও এর প্রসারের ব্যাপারেও আমাদের উৎসাহিত করে। ২০২৬ সালে এসে দিবসটি পালনের ১৮তম বছরে বিশ্ববাসী এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যুদ্ধ–সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু সংকট ও আর্থিক অনুদানের ঘাটতি মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ বছর বিশ্ব মানবতা দিবসের প্রতিপাদ্য হলো, ‘বৈশ্বিক সংহতি এবং মানবতার রক্ষকদের সুরক্ষা।’

Visit mchezo.life for more information.

আন্তর্জাতিক মানবতা আইন অনুযায়ী, যুদ্ধ–সংঘাত বা দুর্যোগকবলিত এলাকায় মানবিক কাজে নিয়োজিত কর্মীদের সুরক্ষা পাওয়া মৌলিক অধিকার। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইরান, গাজা, ফিলিস্তিন, সুদান, ইউক্রেনসহ বিশ্বজুড়ে মানবিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা হামলা, অপহরণ ও প্রাণহানির শিকার হচ্ছেন। যে আশঙ্কা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪–২৫ সালে বৈশ্বিকভাবে ৩৮০ জনের বেশি মানবিক কাজে নিয়োজিত কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বর্তমান বিশ্বে ৩০ কোটির বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সাহায্য প্রয়োজন। যুদ্ধ–সংগ্রাম, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিশ্বজুড়ে জোর করে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১২ কোটিতে পৌঁছেছে। ফলে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। অথচ বিশ্বব্যাপী মানবিক তহবিলের চাহিদার বিপরীতে অনুদান মিলছে অর্ধেকের কম; যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয় কর্মসূচিতে। তাই ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘ দৃঢ়ভাবে দাবি তুলছে মানবতার পক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার।

মূলত মানবিকতা কেবল একটি অনুভূতি নয়; বরং এটি একটি দায়িত্ব। কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না, এ জন্য প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। যুদ্ধ, দুর্যোগ ও সংকটের মুখে যাঁরা নিজের জীবন বাজি রেখে অন্যের জীবন বাঁচান, তাঁদের সুরক্ষা দেওয়া নৈতিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। মানুষকে সহানুভূতিশীল, সহনশীল ও মানবিক হতে উৎসাহিত করাই এই দিবসের মূল বার্তা। বিশ্ব মানবতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানবিক সহায়তার কথা, জাগ্রত করে মানবতাবোধ, যা হয়ে ওঠে অসুন্দরের বিপরীতে সুন্দরের দৃষ্টান্ত।

মানবিকতা একটি জাতির সভ্যতার মাপকাঠি। শুধু প্রযুক্তি, অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই একটি দেশকে উন্নত করে না; বরং মানুষের মধ্যে যদি পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহানুভূতি না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন অনেকাংশেই অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে আগে মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা শিখতে হবে। একটি দেশ বা জাতির উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তার মধ্যে মানবিকতা থাকে। সুতরাং মানবিক সমাজ গঠন আজ সময়ের দাবি।

মানবিকতা শুধু দয়া–সহানুভূতি নয়; এটি মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহনশীলতা ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের যোগফল। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে সবাইকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করাই মানবিকতার মূল কথা। একটি দেশের উন্নয়নে মানবিক দিকটি উপেক্ষিত হচ্ছে কি না, সে বিষয়টির প্রতি রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া দরকার। রাষ্ট্রের সুষম উন্নয়নে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হয় এবং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। যেমন সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বাংলাদেশ সমাজে বর্তমানে যে নারী ও শিশু নির্যাতন ব্যাপক রূপ নিয়েছে, তার অন্যতম কারণ সামাজিক অবক্ষয়। ভাবতে অবাক লাগে এ দেশে তিন বছরের শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়। অনেকের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দায়ী। আর এই মাদকের পেছনে আছে অর্থ। কারণ, মাদকের পেছনে যে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা, সেটি বন্ধ না করে শুধু এর বাহককে ধরলে সমাজ থেকে অপরাধ কমবে না। আরেকটি হলো, দেশে সেই অপরাধের বিচারকাজে দলীয় সমর্থনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে নিরপেক্ষ বিচার করলে এ ধরনের অপরাধ থেকে সমাজ কিছুটা রেহাই পেতে পারে। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগের কারণে প্রতিদিন নানাভাবে মানবতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। যেমন রাস্তাঘাটে কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষ সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে অনেকেই কনটেন্ট তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ডিজিটাল দুনিয়ায় অনবরত সংবেদনশীল ও সহিংস কনটেন্ট দেখতে দেখতে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে। অথচ ইসলামে মানবিকতা হলো ইমান ও আমলের অন্যতম মূল ভিত্তি। ইসলাম ধর্ম কেবল কিছু নির্দিষ্ট ইবাদতের সমষ্টি নয়; বরং সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ও মানুষের সেবা করাকে ইবাদতের সমতুল্য গণ্য করা হয়েছে।

সমাজের সর্বত্র দুর্নীতি, ক্ষমতা, অর্থ ও অস্ত্রের যে দানবীয় রূপ দেখা যাচ্ছে, তাতে মানবিকতা আশা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আমাদের দরকার একটি মানবিক বাংলাদেশ। এ দেশ এমন দেশ হবে, যেখানে প্রত্যেক মানুষ অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে; গরিব–ধনী, নারী–পুরুষ, শিশু–বৃদ্ধ সবাই সমান সম্মান পাবে; শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য নিশ্চিত হবে; পথশিশু, অসহায় ও প্রতিবন্ধীরা স্বাভাবিক জীবনের সুযোগ পাবে; প্রত্যেক নাগরিকের মধ্যে সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ থাকবে; ধর্ম–বর্ণ–গোত্র–নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে বসবাস করবে। তবেই এ দেশ একটি মানবিক দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পাবে।

  • লেখক: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান ও অতিরিক্ত পরিচালক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খুলনা

Read full story at source