ট্রেন্ডিং মাচা নয়, চেনা গ্রিন টি-ও হতে পারে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের সঙ্গী
· Prothom Alo

মাচার ট্রেন্ড যতই বাড়ুক, পরিচিত গ্রিন টির জনপ্রিয়তা কমেনি। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ এই পানীয় শুধু সতেজতাই দেয় না, পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবেও রাখতে পারেন প্রতিদিনের অভ্যাসে।
স্বাস্থ্যসচেতনতার দুনিয়ায় মাচা এখন বেশ ট্রেন্ডিং। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ক্যাফে, সবখানেই সবুজ এই পানীয়ের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তবে মাচার জনপ্রিয়তার ভিড়ে বহুদিনের পরিচিত গ্রিন টি-কে ভুলে যাওয়ার কারণ নেই। বরং সাধারণ চা পাতায় তৈরি এক কাপ গ্রিন টিও হতে পারে প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের অংশ।
Visit freshyourfeel.org for more information.
মাচার ঝলকানির বাইরে গ্রিন টির গল্প
মাচা আর গ্রিন টি, দুটিই একই চা-গাছ থেকে তৈরি হলেও দুটির প্রস্তুতপ্রণালি এক নয়। মাচায় প্রক্রিয়াজাত চা পাতা সূক্ষ্ম গুঁড়ায় পরিণত করা হয় এবং সেই পুরো গুঁড়োটাই পান করা হয়। আর গ্রিন টির ক্ষেত্রে চা পাতা গরম পানিতে ভিজিয়ে তার নির্যাস পান করা হয়।
তাই মাচা কিছুটা আধুনিক ও ট্রেন্ডি হলেও গ্রিন টির গল্প অনেক বেশি চেনা। গরম পানিতে কয়েক মিনিট চা পাতা ভিজিয়ে তৈরি এক কাপ পানীয় সহজ, ঝামেলাহীন এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
চা-বাগান থেকে কাপ পর্যন্ত
এক কাপ গ্রিন টির পেছনে কিন্তু মোটেই সহজ কোনো গল্প নেই। এর শুরু হয় চা-বাগানে। ভালো মানের গ্রিন টির জন্য সাধারণত কুঁড়ির সঙ্গে একটি কচি পাতা সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই সতেজ পাতা পৌঁছে যায় কারখানায়।
প্রথমে পাতার ওজন ও মান যাচাই করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পাতাগুলো ছড়িয়ে রাখা হয়, যাতে কিছুটা আর্দ্রতা কমে আসে।
এরপর আসে ফিক্সেশন বা তাপ প্রয়োগের ধাপ। উচ্চ তাপমাত্রায় পাতাকে দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে এনজাইমের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর ফলে পাতার অক্সিডেশন সীমিত থাকে এবং গ্রিন টির স্বাভাবিক সবুজ রং ও বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে।
তাপ প্রয়োগের পর পাতাগুলোতে আবার নিয়ন্ত্রিতভাবে আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর রোলিং মেশিনে নির্দিষ্ট চাপ ও গতিতে পাতাগুলোকে ঘুরিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এই ধাপ পাতার কোষীয় গঠনে পরিবর্তন আনে এবং স্বাদ ও ঘ্রাণ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সবশেষে একাধিক ধাপে শুকিয়ে পাতার আর্দ্রতা নামিয়ে আনা হয়। ঠান্ডা করা, বাছাই এবং প্যাকেটজাত করার পরই সেই চা পৌঁছে যায় আমাদের রান্নাঘর কিংবা চায়ের কাপে।
অর্থাৎ, প্রতিদিন কয়েক মিনিটে তৈরি হয়ে যাওয়া এক কাপ গ্রিন টির পেছনে রয়েছে কৃষি, প্রযুক্তি এবং নিখুঁত প্রক্রিয়াজাতকরণের দীর্ঘ গল্প।
গ্রিন টি এত জনপ্রিয় কেন?
গ্রিন টির জনপ্রিয়তার বড় কারণ এর পলিফেনল ও ক্যাটেচিন। এর মধ্যে ইজিসিজি বা ‘এপিগ্যালোক্যাটেচিন গ্যালেট’ নিয়ে বিশেষভাবে গবেষণা হয়েছে। এসব উদ্ভিজ্জ যৌগ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত এবং শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।
এ কারণেই স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের দৈনন্দিন পানীয়ের তালিকায় গ্রিন টি জায়গা করে নিয়েছে।
তবে এখানেই একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, গ্রিন টি কোনো ম্যাজিক ড্রিংক নয়। এক কাপ চা খেলেই ওজন কমে যাবে, শরীরের সব ‘টক্সিন’ বেরিয়ে যাবে কিংবা রোগ প্রতিরোধ নিশ্চিত হবে। এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।
বরং চিনি ছাড়া, পরিমিত পরিমাণে গ্রিন টি একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
মাচা কি তাহলে বেশি স্বাস্থ্যকর?
এই তুলনাটিও একটু ভিন্নভাবে দেখা দরকার। মাচায় পুরো চা পাতাই গুঁড়া করে পান করা হয়। ফলে পাতার বিভিন্ন উপাদান সরাসরি গ্রহণ করা হয়। অন্যদিকে গ্রিন টি পান করার সময় পাতার নির্যাসই মূলত পান করা হয়।
তাই দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু শুধু এই কারণেই একটিকে ‘সেরা’ আর অন্যটিকে ‘খারাপ’ বলা ঠিক নয়। কোনটি আপনার জন্য উপযোগী, তা নির্ভর করতে পারে আপনার পছন্দ, খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের ওপর।
ট্রেন্ড বদলালেও চায়ের গল্প বদলায় না
আজ মাচা ট্রেন্ডিং। কাল হয়তো অন্য কোনো পানীয় স্বাস্থ্যসচেতনতার নতুন প্রতীক হয়ে উঠবে। কিন্তু সাধারণ গ্রিন টি তার জায়গা ধরে রেখেছে বহুদিন ধরেই।
কারণ এর জন্য বিশেষ কোনো আয়োজন লাগে না। গরম পানি, কয়েকটি চা পাতা আর কয়েক মিনিট সময়। এইটুকুতেই তৈরি হয়ে যায় এক কাপ গ্রিন টি।
আর সেই এক কাপের ভেতরে থাকে শুধু অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের গল্প নয়; থাকে চা-বাগানের কচি পাতা, শ্রমিকের পরিশ্রম, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাতকরণের ছাপ।
তাই মাচার সবুজ আভা যতই নজর কাড়ুক, পরিচিত গ্রিন টি-কে একেবারে সেকেলে ভাবার কারণ নেই। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের আসল চাবিকাঠি কোনো একটি ট্রেন্ডি পানীয় নয়; বরং নিয়মিত ভালো অভ্যাস, পরিমিত খাবার এবং সামগ্রিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন।
এক কাপ চা সেই গল্পের ছোট্ট, কিন্তু সুন্দর একটি অংশ হতে পারে।
ছবি: পেকজেলসডটকম