বিসিএসের ভাইভা বদলাচ্ছে: প্রার্থীকে এবার বলতে হবে নিজের জীবনের গল্প

· Prothom Alo

বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা মানেই এত দিন ছিল নানা ‘প্রথাগত’ প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া। নিজের পরিচয় দেওয়া, পঠিত বিষয় নিয়ে তথ্য জানানো, ক্যাডারে বিস্তারিত তথ্য, ক্যাডার পছন্দের কারণ ব্যাখ্যাসহ দেশ-বিদেশের নানা ঘটনার ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ ও মতামত তুলে ধরা—এসবেই সীমাবদ্ধ ছিল ভাইভা বোর্ডের মনোযোগ।

তবে বিসিএসের সেই চেনা ছবিতে এবার বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম জানিয়েছেন, পিএসসি এখন সনাতন মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘কম্পিটেন্সি-বেজড ইন্টারভিউ’ বা যোগ্যতাভিত্তিক সাক্ষাৎকার পদ্ধতি অনুসরণ করা শুরু করেছে। সরকারি ক্যাডার সার্ভিসে একজন প্রার্থী কতটা দক্ষ ও উপযুক্ত, তা নিরূপণে বিশ্বজুড়ে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রমাণিত মাধ্যম। পিএসসির প্রশাসনিক ও পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কারের অংশ হিসেবেই এই রূপান্তর আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কমিশনের সদস্যরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন।

Visit tr-sport.click for more information.

ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকে এমটিও পদে চাকরি, শুরুতেই বেতন ৭০ হাজার

কম্পিটেন্সি-বেজড ইন্টারভিউ আসলে কী

যেহেতু পিএসসি কম্পিটেন্সি-বেজড ইন্টারভিউয়ের পথে যাচ্ছে—স্বভাবতই প্রশ্ন এটা কী? ‘কম্পিটেন্সি’ শব্দটির সহজ অর্থ দক্ষতা, সক্ষমতা ও বাস্তব প্রয়োগ ক্ষমতা। একজন সরকারি কর্মকর্তার শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান থাকলেই চলে না। তাঁকে মাঠে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়, সংকটে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে হয়, দলকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হয় এবং সীমিত সম্পদে সেরা ফল আনতে হয়। কম্পিটেন্সি-বেজড ভাইভাতে প্রার্থীর ঠিক এসব সক্ষমতাই গভীরভাবে পরখ করা হয়।

বিষয়টি বুঝতে পুরোনো ও নতুন পদ্ধতির প্রশ্নের পার্থক্য দেখা যাক।

পুরোনো প্রশ্ন: ‘আপনি কি মানসিক চাপে কাজ করতে পারেন?’

নতুন প্রশ্ন: ‘এমন একটি ঘটনার কথা বলুন, যখন কম সময়ের মধ্যে খুব জটিল একটি কাজ শেষ করতে হয়েছিল। পরিস্থিতিটি কীভাবে সামলেছিলেন?’

পার্থক্যটি দেখতে ছোট হলেও খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম প্রশ্নে প্রার্থী নিজের একটি গুণ দাবি করছেন। কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নে তাঁকে বাস্তব জীবনের প্রমাণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

‘ভালো নেতা’ বললেই মিলবে না নম্বর

ধরা যাক, বোর্ড প্রার্থীর নেতৃত্বের গুণাবলি বা লিডারশিপ স্কিল যাচাই করতে চায়।

সনাতন পদ্ধতিতে প্রার্থী হয়তো বলতেন, ‘আমি একজন ভালো নেতা। সবাইকে নিয়ে কাজ করতে পারি।’ কিন্তু এতে প্রার্থীর আসল ক্ষমতা প্রকাশের সুযোগ থাকে না।

কম্পিটেন্সি-বেজড প্রশ্নটি হতে পারে এমন—

‘বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো কাজের কথা বলুন, যেখানে দলের সদস্যরা একই মতে ছিলেন না। সেই বহুমত পরিস্থিতি আপনি কীভাবে সামলেছিলেন?’

এবার প্রার্থীকে সত্যি একটি ঘটনা বলতে হবে। বোর্ড এখান থেকে মূলত চারটি বিষয় মেলায়:

পরিস্থিতি: ঠিক কী সমস্যা হয়েছিল?

দায়িত্ব: প্রার্থীর নিজের ভূমিকা কী ছিল?

পদক্ষেপ: তিনি বাস্তবে কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন?

ফলাফল: শেষ পর্যন্ত কাজের পরিণতি কী হয়েছিল?

এই চার জায়গা বিশ্লেষণ করেই কমিশন প্রার্থীর প্রকৃত নেতৃত্বের ধরন বুঝে নেয়।

চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকলেও ভয় নেই

কম্পিটেন্সি-বেজড ইন্টারভিউ শুনে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এই পদ্ধতি মানেই পূর্বে কোনো চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, এমন নয়।

একজন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা তরুণের চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকলেও তাঁর জীবনজুড়ে বৈচিত্র্যময় ক্ষেত্র রয়েছে। তিনি হয়তো ডিবেটিং ক্লাব কিংবা নেচার ক্লাবে কাজ করেছেন, ইভেন্ট পরিচালনা করেছেন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যুক্ত ছিলেন কিংবা বন্ধু ও পরিবারের কোনো সংকট সমাধান করেছেন। এগুলোও কাজের অভিজ্ঞতা।

হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে তিন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পদ ৫৭৫

ধরা যাক প্রশ্ন হলো—

‘দলের কোনো সদস্য যখন দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেননি, তখন আপনি কী করেছিলেন?’

প্রার্থী এখানে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের কোনো অনুষ্ঠানের ঘটনা বলতে পারেন। আবার কেউ বলতে পারেন বন্যা বা দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণের অভিজ্ঞতা। অর্থাৎ বোর্ড জানতে চাইছে না আপনি কোথায় চাকরি করেছেন; তারা জানতে চাইছে বাস্তবে আপনার আচরণের প্রকাশ কেমন ছিল।

কেন এটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ?

সরকারি নিয়োগে কম্পিটেন্সি-বেজড ইন্টারভিউ বৈশ্বিকভাবে অত্যন্ত সমাদৃত। কানাডার পাবলিক সার্ভিস কমিশন তাদের নিয়োগ নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলেছে—পদের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতাগুলো প্রার্থী অতীতে কোন পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে প্রদর্শন করেছেন, তা যাচাই করেই প্রশ্ন তৈরি করতে হয়। একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি নিয়োগ নির্দেশিকাও এই কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত।

এর মূল দর্শন খুব পরিষ্কার: অতীতে কোনো পরিস্থিতিতে একজন মানুষ কীভাবে আচরণ করেছেন এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা বিশ্লেষণ করেই ভবিষ্যতে তাঁর কর্মদক্ষতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।

সরকারি চাকরিতে এটি অত্যন্ত কার্যকর। কারণ, একজন কর্মকর্তাকে শুধু পরীক্ষার খাতায় ভালো উত্তর লিখলে চলে না, তাঁকে বাস্তব জটিলতায় কাজ করতে হয়।

৫১তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি নভেম্বরে, নির্দিষ্ট হয়নি মোট পদ

বিসিএস প্রার্থীরা এখন কী করবেন?

এখন থেকে প্রস্তুতির ধরন বইয়ের পাতার গণ্ডি থেকে বের করে আনতে হবে। নিজের অতীত জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকে নতুন করে মনে করতে হবে এবং খাতায় সাজিয়ে রাখতে হবে:

কোনো দল বা ক্লাব পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা আছে কি?

কোনো কঠিন বা চ্যালেঞ্জিং কাজের দায়িত্ব নিয়েছিলেন?

বিপদে দলগতভাবে কোনো সমস্যার দ্রুত সমাধান করেছেন?

নিজেদের মধ্যকার দ্বিমত মিটিয়ে কাজ করেছেন?

কোনো কাজে মারাত্মক ভুল করার পর তা কীভাবে সংশোধন করেছেন?

এসব বাস্তব ঘটনার তালিকা আজই ডায়েরিতে লিখে রাখুন। কারণ, নতুন এই ইন্টারভিউতে আপনার জীবনই হয়ে উঠবে পরীক্ষার সবচেয়ে বড় উপকরণ।

আগে ভাইভা বোর্ডে প্রশ্ন ছিল, ‘আপনি কী জানেন?’

আর কম্পিটেন্সি-বেজড ইন্টারভিউয়ের দিনে প্রশ্ন হচ্ছে, ‘আপনি বাস্তবে কী করেছেন?’

প্রস্তুতির এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই ভবিষ্যতে বিসিএস পরীক্ষার ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে।

*পরের পর্ব: বিসিএস ভাইভায় কম্পিটেন্সি–বেজড উত্তর দেওয়ার বৈশ্বিক উপায়কে বলে ‘স্টার’ মেথড। আগামী পর্বে পড়ুন এই মেথড ও প্রস্তুতির সহজ গাইডলাইন

ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এসএসসি উত্তীর্ণদের দিচ্ছে ২ বছরের বৃত্তি, মাসে ২৫০০ টাকা

Read full story at source