যমুনার চরে ‘বইয়ের ঘর’

· Prothom Alo

পাঠ্যবইয়ের বাইরে গল্প, কবিতা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বই পড়ার সুযোগ ছিল না চরপেঁচাকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। যমুনার চরের এই বিদ্যালয়ে এবার সেই সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্কুলের এক কোণে কুঁড়েঘরের আদলে তৈরি হয়েছে ছোট্ট একটি পাঠাগার। সেটির তাকগুলো সাজানো হয়েছে নানা ধরনের বইয়ে। বই হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে এখন অন্য রকম আনন্দ।

শুধু চরপেঁচাকোলা নয়, বেড়া উপজেলার আরও দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবার এমন পাঠাগার স্থাপন করেছে শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠন’। ৪ আগস্ট বেড়া বালিকা পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনটি কুঁড়েঘর পাঠাগারের উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা। অন্য দুটি পাঠাগার স্থাপন করা হয়েছে বেড়া পৌর এলাকার বেড়া বিবি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও যমুনার চরাঞ্চলের চরপেঁচাকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

Visit freshyourfeel.org for more information.

বেড়া উপজেলায় কোনো চরাঞ্চলের বিদ্যালয়ে এর আগে পাঠাগার স্থাপনের নজির নেই। ফলে চরপেঁচাকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠাগারটি উপজেলার চরাঞ্চলের প্রথম পাঠাগার হিসেবে নতুন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

চরপেঁচাকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পাঠাগার ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ উৎসাহ। কেউ বই উল্টেপাল্টে দেখছে, কেউ পছন্দের বই হাতে নিয়ে বসেছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও বলছেন, পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বই পড়ার সুযোগ পেলে শিশুদের পড়ার প্রতি আগ্রহ আরও বাড়বে।

মোছা. আয়েশা ও মো. হোসাইন, শিক্ষার্থী, চরপেঁচাকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আগে স্কুলে গল্পের বই পড়ার তেমন সুযোগ ছিল না। এখন অনেক বই আছে। স্কুলে এসে বই পড়তে ভালো লাগছে। বাড়িতেও বই নিয়ে যেতে চাই।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সানজিদা রহমান বলেন, ‘চরের শিশুদের জন্য এটি অনেক বড় পাওয়া। এখানে অনেক পরিবারের পক্ষেই আলাদা করে বই কিনে দেওয়া সম্ভব হয় না। পাঠাগার হওয়ায় শিক্ষার্থীরা এখন স্কুলেই বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে পারবে। ইতিমধ্যে তাদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।’

চরপেঁচাকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছা. আয়েশা ও মো. হোসাইন বলে, ‘আগে স্কুলে গল্পের বই পড়ার তেমন সুযোগ ছিল না। এখন অনেক বই আছে। স্কুলে এসে বই পড়তে ভালো লাগছে। বাড়িতেও বই নিয়ে যেতে চাই।’

বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গেও কথা হয়। তাঁদের মধ্যে ফাতেমা বেগম বলেন, ‘চরে বসবাস করায় সন্তানদের জন্য অতিরিক্ত বই কেনা সব সময় সম্ভব হয় না। স্কুলে পাঠাগার হওয়ায় আমরা খুব খুশি। শিশুরা মোবাইলের দিকে কম ঝুঁকে বই পড়বে, এটাই আমাদের আশা।’

রুনাল্ট চাকমা, ইউএনও, বেড়াশিক্ষার্থীদের নিজেদের উদ্যোগে এমন পাঠাগার গড়ে তোলা সত্যিই প্রশংসনীয়। বই পড়ার সুযোগ যত বাড়বে, শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার পরিধিও তত বাড়বে।

বেড়া পৌর এলাকার বেড়া বিবি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়েও পাঠাগারটি ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রধান শিক্ষক আলী আশরাফ বলেন, ‘পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার অভ্যাস একজন শিক্ষার্থীর চিন্তার জগৎকে বড় করে। কুঁড়েঘর পাঠাগারের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীরা সেই সুযোগ পাচ্ছে। এটি নিয়মিত চালু রাখা গেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে উঠবে।’

ইউএনও রুনাল্ট চাকমা বলেন, শিক্ষার্থীদের নিজেদের উদ্যোগে এমন পাঠাগার গড়ে তোলা সত্যিই প্রশংসনীয়। বই পড়ার সুযোগ যত বাড়বে, শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার পরিধিও তত বাড়বে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোগে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

শিক্ষার্থীদের বইমুখী করা, মোবাইল নির্ভরতা কমানো এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজগঠনের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠন। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মেহেরাব হোসেন বলেন, ‘এবার আমরা তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কুঁড়েঘর পাঠাগার স্থাপন করেছি। এর মধ্যে চরপেঁচাকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাগার স্থাপন আমাদের জন্য বিশেষ আনন্দের। কারণ, চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এখন বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।’

‘কুঁড়েঘর পাঠাগারে’ বই পড়ছে শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি পাবনার বেড়ার চরপেঁচাকোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠন। টিফিনের টাকা সঞ্চয় করে মানবকল্যাণমূলক কাজের মধ্য দিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু। বর্তমানে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার, কুঁড়েঘর পাঠাগার, শিক্ষাসহায়তা, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজ করে আসছে সংগঠনটি।

২০২৫ সালের নভেম্বরে বেড়া পৌর এলাকার হুরাসাগর নদের পাড়ে প্রথম কুঁড়েঘর পাঠাগার স্থাপন করেছিল সংগঠনটি। কুঁড়েঘরের আদলে তৈরি সেই ছোট পাঠাগার দ্রুতই স্থানীয় মানুষের আগ্রহের জায়গা হয়ে ওঠে। এবার সেই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

Read full story at source