শহীদ কাদরীকে চেনার সূত্র কী

· Prothom Alo

আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাস বিবেচনায় নিলে শহীদ কাদরীকে শক্তিমান কবিদের অন্যতম ভাবতে হবে। ত্রিশের আন্দোলনের পরের পর্বে পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে তিনি তাঁর কবিপ্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। ১৯৫৬ সালে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় তাঁর কবিতা ছাপা হওয়ার পর থেকে তিনি নিজেকে কবি হিসেবে ভাবতে শুরু করেন এবং অন্য কবি ও সমালোচকেরা তাঁকে কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তাঁকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। কবিতা নির্মাণের ব্যাপারে সচেতনতা, পঠন-পাঠন, আধুনিকতা, অনুশীলন, ধারাবাহিকতা, তাঁর চারপাশের ও নিজের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার সারাৎসারকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করে তিনি নতুন কবিতা লেখার জন্য গভীর ধৈর্যসহ অপেক্ষা করতেন। নতুন কবিতা অর্থ নতুনভাবে জীবনের সংবেদনশীল অভিজ্ঞতাকে শব্দবলয়ে বেঁধে ফেলা, এ বিশ্বাসে তিনি অনড় ছিলেন। সারা বিশ্বের কবিতাসহ অন্যান্য প্রজাতির (মূলত ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, দর্শন ও মনস্তত্ত্ব) সাহিত্যর নিবিড় পাঠক হিসেবে অর্জিত বুদ্ধিদীপ্ত চেতনা তাঁকে হালকা কবিতার বিষয়বস্তু থেকে দূরে রাখত। কলকাতায় জন্ম নেওয়া কাদরী ঢাকাসহ ইউরোপ ও আমেরিকার বড় শহরে দীর্ঘদিন বসবাসের সুবাদে ঋদ্ধ নাগরিক বৈদগ্ধ্যের সঙ্গে অন্বিত হয়েছিলেন, সে কারণে তাঁকে ‘নাগরিক কবি’ অভিধা দেওয়া হলেও এটি তাঁর ন্যূন পরিচয়মাত্র। তিনি নিজেকে বিশ্ব নাগরিক বা বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম পাঠক মনে করলেও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, জাতীয় আন্দোলন ও তার তাৎপর্যকে ধারণ করেছিলেন গভীর অর্থে। স্বদেশ ছিল তাঁর অস্তিত্বের অপর নাম, বিপন্ন স্বদেশ তাঁর অন্যতম কষ্টদায়ক তীব্র অনুভূতি। দেশ থেকে বহুদূরে দীর্ঘ বছর থাকার পর মাতৃভূমির প্রতি তাঁর তীব্র হাহাকার থাকলেও তাকে কবিতায় যুক্ত করতে শিল্পের নন্দনকে মনে রেখেছেন সব সময়। তিনি সময়, সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও দেশপ্রেমকে উপলব্ধি করেছিলেন নিজের সৃজনশীল সংবেদনশীল আততি থেকে। আপাতভাবে, জনপ্রিয় এই কবিকে বুঝে ওঠা সহজ নয়। তিনিও রোমান্টিক কবিতা লিখেছেন, তবে সেখানে যুক্তি, তর্ক, বিজ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও যাপিত জীবনের নির্যাস ঘনপিনদ্ধ হয়ে উঠেছে। তিনি যেভাবে শব্দকে ব্যবহার করেছেন গদ্যকবিতা নির্মাণ করতে, তা বাংলার কোনো কবির মতো নয়। শব্দশাসন ও এর নান্দনিক সুষমাকে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন নিজস্ব অনুশীলনরীতি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে। অপ্রচলিত আকাড়া ঐতিহ্যবাহী ও আটপৌরে শব্দ ব্যবহার করে শহীদ কাদরী কবিতায় নতুনত্ব এনেছেন, এমনকি ভাষার নতুন ডিকশন তৈরি করার নমুনাও তাঁর কবিতায় দেখা যায়। যাঁরা তাঁর কবিতা পড়ে পুলকিত হন, তাঁরা তাঁর ভেতরের নির্বেদে সহজে পৌঁছাতে পারেন না।

শহীদ কাদরী
কাদরীর চারটি কাব্য পাঠ করলে একজন স্বাধীন আধুনিক শক্তিমান বিজ্ঞানমনস্ক প্রগলভ অথচ পরিমিত বাঙালি কবিকে আমরা খুঁজে পাব। ধারণা করা হয়, অভিমানবশত (কবিতার অপরূপ ও ক্ষমাহীন আক্রমণের হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য আমি দেশ ছেড়েছিলাম) তিনি দেশ থেকে নির্বাসনে গিয়েছিলেন, তবে তাঁর আত্মা জমা রেখে গিয়েছিলেন এই দেশে। এই স্বদেশকে তিনি যেভাবে চিনেছেন, উপলব্ধি করেছেন, হৃদয়ে ধারণ করেছেন, তারই আনুভূতিক বাকপ্রতিমা হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতা।

তাঁর সমসাময়িক কবিরা অনেকেই বিরতিহীন অজস্র কবিতা লিখেছেন। তিনি সাকুল্যে দুই শ কবিতাও লেখেননি। তিনি লিখতে পারতেন, তবে লিখতে চাননি, সচেতনভাবে নিজেকে বিরত রেখেছেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তিনি লিখতেন, খসড়া করতেন, তবে পুরো কবিতা না লিখে রেখে দিতেন, মনের মতো হতো না বলে ছাপতে দিতেন না। ঢাকা বা পৃথিবীর অন্য শহরে বসবাসের সুবাদে তাঁর যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা নিয়ে তিনি আরও কবিতা লিখতে পারতেন, সাহিত্যের অন্য ফর্মেও লিখতে পারতেন, তবে কবিতা ছাড়া তিনি অন্য কিছু লিখতে চাননি। একজন প্রকৃত কবিকে কবিজীবন যাপন করতে হয় যা ছাপোষা বাঙালির পক্ষে সাধারণত সম্ভব হয় না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক প্রবন্ধের শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘বাঙালি কবি নয়’; তার ব্যাখ্যা দিয়ে আরও একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, তার নাম ছিল ‘বাঙালি কেন কবি নয়’। আমাদের ধারণা শহীদ কাদরী এ সত্য জানতেন। তিনি তাঁর সময়ে কবিতার অন্যতম বোদ্ধা ছিলেন। বিশ্ব কবিতা, তার পরিক্রমা, কার্যকারণসূত্র নিয়ে তিনি যে কথাবার্তা বলেছেন, তাতে তাঁর গভীর অভিনিবেশ ও অনুধ্যান ধরা পড়ে। আর ভালো ও মৌলিক কবিতার চরিত্র জানতেন বলেই সহজে সরল অর্থহীন তাৎপর্যহীন কবিতা লিখতে চাননি। তবু তাঁর কবিতায় দুর্বলতা অল্প হলেও খুঁজে পাওয়া যাবে, খুঁজে পাওয়া যাবে পুনরুক্তি। তবে বাংলা কবিতার শক্তি ও সম্ভাবনার সূত্রসমূহ খুঁজতে গেলে আমাদের তাঁর শরণাপন্ন হতে হবে।

Visit syntagm.co.za for more information.

কাদরীর চারটি কাব্য পাঠ করলে একজন স্বাধীন আধুনিক শক্তিমান বিজ্ঞানমনস্ক প্রগলভ অথচ পরিমিত বাঙালি কবিকে আমরা খুঁজে পাব। ধারণা করা হয়, অভিমানবশত (কবিতার অপরূপ ও ক্ষমাহীন আক্রমণের হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য আমি দেশ ছেড়েছিলাম) তিনি দেশ থেকে নির্বাসনে গিয়েছিলেন, তবে তাঁর আত্মা জমা রেখে গিয়েছিলেন এই দেশে। এই স্বদেশকে তিনি যেভাবে চিনেছেন, উপলব্ধি করেছেন, হৃদয়ে ধারণ করেছেন, তারই আনুভূতিক বাকপ্রতিমা হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতা। ‘উত্তরাধিকার’ থেকে ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ কাব্যগুলোয় তাঁর ধারাবাহিক জীবনধারা; জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি সম্পর্কে তার উপলব্ধি, চিন্তাবিভূতি, কাব্যনির্মাণকৌশলের রূপান্তর, শব্দযোজনার ধারা লক্ষ করা যায়। সাধারণত গ্রামীণ প্রকৃতি বা নিসর্গ তাঁর কবিতায় অনুপস্থিত, তবে তিনি নিছক নাগরিক কবিও নন। বরং নাগরিক জীবনের ক্লেদ, নানা রকম অসংগতি, ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব, রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম খেলাধুলা (রাষ্ট্র মানেই লেফট–রাইট–লেফট) এবং অবহেলিত-ব্যবহৃত গরিব নাগরিকের অভিশপ্ত জীবনের খুঁটিনাটিকে তিনি পঙ্‌ক্তি হিসেবে তৈরি করেছেন। সে হিসেবে নগরের সব ধরনের বিষয়কে তিনি অন্বিত করেছেন বাছবিচারহীনভাবে, শ্লীলতা-অশ্লীলতার সীমানা বিবেচনায় না রেখে।

তাঁর কবিতার সবচেয়ে শক্তিমান জায়গা হলো ফিকশনের মতো ডিটেইলিংয়ের ব্যবহার; এই ব্যবহার তিনি সচেতনভাবে করেছেন প্রথমত কবিতার নতুন অবয়ব তৈরির জন্য। দ্বিতীয়ত, তাঁর দেখার আনুবীক্ষণিক গভীরতাকে কাব্যময় করে তোলা, যা তাঁর অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে: ‘ভেসে যায় ঘুঙুরের মতো বেজে সিগারেট-টিন/ ভাঙা কাচ, সন্ধ্যার পত্রিকা আর রঙিন বেলুন/ মসৃণ সিল্কের স্কার্ফ, ছেঁড়া তার, খাম, নীল চিঠি/ লন্ড্রির হলুদ বিল. প্রেসক্রিপশন, শাদা বাক্সে ওষুধের/ শৌখিন শার্টের ছিন্ন বোতাম ইত্যাদি সভ্যতার/ ভবিতব্যহীন নানা স্মৃতি আর রংবেরঙের দিনগুলি।’

শিল্পের জন্য তিনি শিল্প তৈরি করতে চেয়েছেন। বামপন্থার আদর্শ তাঁকে সহায়তা করেছে, তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। বোঝা যায় কত নিখুঁতভাবে, কত অনুপুঙ্খভাবে তিনি এই জীবনের কুহককে উপলব্ধি করেছেন। কবিতার সূক্ষ্মশরীরে এই স্থূল বাস্তবতাকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি বাংলা-ইংরেজিসহ নানা বিদেশি ভাষা বা শব্দ নির্দ্বিধায় ব্যবহার করেছেন। ব্যবহার করেছেন প্রবল গদ্য-আক্রান্ত শব্দ, তবে সেই শব্দের উপযুক্ত স্থান ও সিনট্যাক্স ঠিক করেছেন সচেতনভাবে, গতি-মাত্রা-ছন্দ ঠিক করেছেন কুশলী কবি হিসেবে। যাঁরা শব্দকর কবি, তাঁরা এই সচেতনতা ও শক্তির সাবলীল ব্যবহার দেখে বিস্মিত হবেন; কবিরা শব্দ শাসন করেন, শব্দের ওজন ঠিক করেন, শব্দের নতুন ব্যবহার আবিষ্কার করেন, অপরিচিত, পরিচিত, অব্যবহৃত, অমার্জিত শব্দ ব্যবহার করেন তার অর্থের নতুন মাত্রা দিতে। কবিতার অর্থকে ব্যঞ্জনার আয়নায় উজ্জ্বল করে তোলার কাজ করতে গিয়ে কবিকে নানাবিধ পথে হাঁটতে হয়। সবাই সেই গূঢ় পথের সন্ধান পান না। শহীদ কাদরী সেই পথ নির্মাণ করেছেন তাঁর কবিতায় সাবলীলভাবে। আপাতভাবে, তাঁর কবিতা পড়ে কবির সেই পরিশ্রম বা অনুশীলনের সীমানায় প্রবেশ করা কঠিন। তাঁর রচনাপদ্ধতির নিপুণতা পুনঃপুন পর্যবেক্ষণ করলে আমরা সেই সত্য জানতে পারব। আমরা তাঁর কবিতা থেকে অজস্র উদাহরণ দিতে পারি। তাঁর বিকশিত ঋদ্ধ মনন অনুশীলনের সাহচর্যে কবিতার শরীরে আধুনিকতার পোশাক পরিয়ে দিয়েছে।

কাদরীর কবিতার নানা গলি চোখে পড়ে; বিষয়বস্তু নির্বাচনে তিনি খুব খুঁতখুঁতে ছিলেন বলা যায়। যদিও আড্ডাপ্রিয় রসবোধসম্পন্ন স্নিগ্ধ মননের কবি বন্ধুদের সাহচর্যের বন্ধনকেও কবিতা করে তুলতে সক্ষম ছিলেন। তবে এ পথে বেশি মাড়াননি। তিনি লিখেছেন: ‘ইতিহাসের তমসায় সশঙ্কিত শামসুর রাহমান/ দাঁড়িয়ে আছেন চন্দ্রাহত মুখে/ আর মূহ্যমান আল মাহমুদ চট্টগ্রামে টিলার ওপর/ বুকে পুরে ঝোড়ো হাওয়া।’ তাঁর কবিতার সবচেয়ে শক্তিমান জায়গা হলো ফিকশনের মতো ডিটেইলিংয়ের ব্যবহার; এই ব্যবহার তিনি সচেতনভাবে করেছেন প্রথমত কবিতার নতুন অবয়ব তৈরির জন্য। দ্বিতীয়ত, তাঁর দেখার আনুবীক্ষণিক গভীরতাকে কাব্যময় করে তোলা, যা তাঁর অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে: ‘ভেসে যায় ঘুঙুরের মতো বেজে সিগারেট-টিন/ ভাঙা কাচ, সন্ধ্যার পত্রিকা আর রঙিন বেলুন/ মসৃণ সিল্কের স্কার্ফ, ছেঁড়া তার, খাম, নীল চিঠি/ লন্ড্রির হলুদ বিল. প্রেসক্রিপশন, শাদা বাক্সে ওষুধের/ শৌখিন শার্টের ছিন্ন বোতাম ইত্যাদি সভ্যতার/ ভবিতব্যহীন নানা স্মৃতি আর রংবেরঙের দিনগুলি।’ গদ্যপ্রধান কবিতা প্রচুর লিখেছেন তিনি; সেখানে শব্দকে এমনভাবে পরিশীলিতভাবে, পরিমিতভাবে যুক্ত করেছেন এবং শব্দের ব্যঞ্জনাকে নতুন মাত্রায় ব্যবহার করেছেন।

বুদ্ধি, রসবোধ, শ্লেষ, শিল্পবোধ, ব্যঞ্জনা, অভিজ্ঞতার নির্যাস, সাবমিলিটি, শব্দবোধ, ধ্বনিমাধুর্য ও পরিমিতিবোধ মিলিয়ে এক নিজস্ব কাব্যধারা তিনি তৈরি করতে পেরেছিলেন, যা তাঁকে চিনতে সাহায্য করে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘শামসুর রাহমানের প্রধান অবদান হলো, তিনি আমাদের সাহসের সীমাকে সম্প্রসারণ করেছিলেন।’ আমাদের ধারণা শহীদ কাদরী আমাদের সমৃদ্ধ বাংলা কবিতাকে চেনার চোখ তৈরি করে দিয়েছেন।

সুধীন দত্ত বা বিষ্ণু দের কবিতার সঙ্গে তাঁর কবিতার তুলনা বোধ হয় কেউ কেউ এ কারণে করেছিলেন (তিনি নিজে বলেছিলেন, সুধীন্দ্রনাথ তাঁকে প্রভাবিত করেছিলেন) যদিও আমাদের ধারণা, এ প্রভাব তেমন তাৎপর্যপূর্ণ নয়। তিনি বরং বাংলা শব্দকে কবিতার পোশাকে ব্যবহারের নতুন নিরীক্ষা করেছিলেন, যা একেবারে নতুন। সর্বোপরি, কবিতার লক্ষ্যকে ধারণ করে তাঁর শব্দবলয় এগিয়ে যায়: ‘ধ্বংসস্তূপের পাশে, ভোরের আলোয়/ একটা বিকলাঙ্গ ভায়োলিনের মতো-দেখলাম তে-রাস্তার মোড়ে/ সমস্ত বাংলাদেশ পড়ে আছে আর সেই কিশোর, যে তাকে/ ইচ্ছের ছড় দিয়ে নিজের মতো করে বাজাবে বলে বেড়ে উঠেছিল/ সেও শুয়ে আছে পাশে, রক্তাপ্লুত শার্ট পরে’।

কিছু সহজ অভিব্যক্তিও কাদরীর কবিতায় দেখা যায়। এসব কবিতা আপাতভাবে সরল মনে হবে পাঠকের অন্য কবিতার সঙ্গে তুলনা করতে গেলে। তবে সেখানে তাঁর মৌলিক চেতনাপ্রসূত সংবেদনশীলতার উদাহরণ পাওয়া যায়: ‘সরু চালের সাদা ভাত আর পাবদা মাছের তরকারি/ সাজিয়ে যারা বসে আছেন/ তাদের জানা দরকারি/ ঘর ছেড়ে যে বেরিয়ে গেছে, তার থাকে না ঘরবাড়ি’। হালকা চালে তিনি তাঁর স্বদেশহীনতার যন্ত্রণাকে উপস্থাপিত করেছেন।

শহীদ কাদরী পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে তাঁর সমসাময়িক কবি বন্ধুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। কবিতাই ছিল তাঁর প্রধান আরাধ্য। তবে তিনি স্বভাবে ছিলেন বোহেমিয়ান ও চঞ্চল। বিপন্ন স্বদেশ তাঁকে তাড়িত করেছে, একই সঙ্গে তাকে হারানোর পর (ঢাকায় তাঁর মুখর যাপিত কবিজীবন) নিজের অর্ধেক বা খিন্ন জীবনের নিত্য কষ্ট তাঁকে ব্যথিত করেছে; সে কারণে পরের পর্বের (দীর্ঘ বিরতির পর) কবিতাগুলোয় দেশ ও নিজের বিপন্নতার ছবি প্রস্ফুটিত হয়েছে গভীরভাবে। কবিতাকে উত্তীর্ণ শিল্প হিসেবে তিনি চিনেছিলেন, রপ্ত করেছিলেন কবিতা নির্মাণের উৎকৃষ্ট করণকৌশল। বুদ্ধি, রসবোধ, শ্লেষ, শিল্পবোধ, ব্যঞ্জনা, অভিজ্ঞতার নির্যাস, সাবমিলিটি, শব্দবোধ, ধ্বনিমাধুর্য ও পরিমিতিবোধ মিলিয়ে এক নিজস্ব কাব্যধারা তিনি তৈরি করতে পেরেছিলেন, যা তাঁকে চিনতে সাহায্য করে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘শামসুর রাহমানের প্রধান অবদান হলো, তিনি আমাদের সাহসের সীমাকে সম্প্রসারণ করেছিলেন।’ আমাদের ধারণা শহীদ কাদরী আমাদের সমৃদ্ধ বাংলা কবিতাকে চেনার চোখ তৈরি করে দিয়েছেন।

Read full story at source