মহানবী (সা.) যেভাবে ঘুমাতে বলেছেন
· Prothom Alo

ক্লান্তিময় দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে মানুষের শরীর ও মনের যে সুস্থতার প্রয়োজন হয়, তার জন্য আল্লাহ–তাআলা রাত ও ঘুমকে নির্ধারণ করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনিই নিজ রহমতে তোমাদের জন্য রাত ও দিন বানিয়েছেন, যেন রাতে তোমরা বিশ্রাম নিতে পারো এবং দিনে তাঁর অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে পারো।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৩)
অন্য আয়াতে এসেছে, ‘তিনিই তো তোমাদের জন্য রাতকে করেছেন আবরণ আর ঘুমকে করেছেন ক্লান্তি দূরকারী।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৪৭)
Visit playerbros.org for more information.
আয়াতে আরবি ‘সুবাত’ শব্দ আছে, যার অর্থ হলো বিরামহীন গতি থেকে সাময়িক বিচ্ছিন্নতা ও শারীরিক স্থিরতা। (রাগেব ইসফাহানি, মুফরাদাতু আলফাজিল কুরআন, পৃষ্ঠা: ৩৯৪, দারুল কলাম, দামেস্ক, ২০০৯)
এই স্থিরতা মানুষকে পরবর্তী দিনে নতুন উদ্যমে জীবনসংগ্রামে ফিরে আসার পরম শক্তি জোগায়।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৮০যখন রাতের অন্ধকার নেমে আসে, তখন পাত্রের মুখ ঢেকে রাখো, পানির মশক বেঁধে রাখো, ঘরের দরজাগুলো বন্ধ করো এবং প্রদীপগুলো নিভিয়ে দাও।অসময়ে ঘুম ও অনর্থক রাত জাগা পরিহার
মহানবী (সা.) সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন ছাড়া এশার নামাজের পূর্বে ঘুমানো এবং এশার পর অনর্থক রাত জাগা ও কথাবার্তা বলা অপছন্দ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৮)
আয়েশা (রা.) বলেন, এশার নামাজের পর মহানবী (সা.) অপ্রয়োজনীয় কথা বলতেন না; হয় জিকির ও ইবাদতে নিমগ্ন হয়ে সওয়াব অর্জন করতেন, না হয় ঘুমিয়ে নিজের শরীরকে বিশ্রাম দিতেন। (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৪৭৩২)
অবশ্য ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন, মুসলিম উম্মাহর সেবামূলক কাজ, মেহমানের পরিচর্যা কিংবা বিশেষ পারিবারিক কল্যাণের ক্ষেত্রে এশার পর জাগার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৯)
কিন্তু আধুনিক যুগে অভ্যাসে পরিণত হওয়া অনিয়মিত রাত জাগার প্রবণতা মানুষের ভোরের ইবাদত বিনষ্ট করে এবং শারীরিক ভারসাম্য নষ্ট করে, যা নবীজির শিক্ষার পরিপন্থী।
জান্নাতে কি ঘুম থাকবেনিরাপদ গৃহ ও পরিবেশ সচেতনতা
রাতে ঘুমানোর আগে ঘরবাড়ির নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য মহানবী (সা.) সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘যখন রাতের অন্ধকার নেমে আসে, তখন পাত্রের মুখ ঢেকে রাখো, পানির মশক বেঁধে রাখো, ঘরের দরজাগুলো বন্ধ করো এবং প্রদীপগুলো নিভিয়ে দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৮০) আরও বলেছেন, ‘দরজা বন্ধ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করো, কারণ শয়তান কোনো বন্ধ দরজা খুলতে পারে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০১২)
একইভাবে আগুনে উৎপন্ন বিপদ থেকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘এই আগুন তোমাদের পরম শত্রু; তাই যখন তোমরা ঘুমাতে যাবে, তখন তা নিভিয়ে দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৯৪)
প্রাচীনকালের প্রদীপ বা উন্মুক্ত আগুনের মতো আধুনিক যুগের অরক্ষিত বৈদ্যুতিক সংযোগ, ঘরের হিটার কিংবা গ্যাসে পরিচালিত যন্ত্রপাতি ঘুমানোর আগে পরীক্ষা করে বন্ধ করাও তাঁর নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত, যা ক্ষতিকর বস্তু প্রতিরোধে ‘ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতি সহ্য করা যাবে না’ নীতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪১)
বিছানায় শোয়ার আগে কাপড়ের আঁচল বা তোয়ালে দিয়ে তা ঝেড়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে বিছানায় কোনো অদৃশ্য ক্ষতিকর বস্তু থেকে না যায়।
ঘুমের দৈহিক ও আত্মিক প্রস্তুতি
ঘুমানোর আগে অজু করা এবং শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন তুমি শয্যা গ্রহণ করতে যাবে, তখন নামাজের অজুর মতো ওজু করে নেবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭)
অজু একদিকে যেমন শারীরিক পরিচ্ছন্নতা আনে, অন্যদিকে আত্মাকে এক ঐশ্বরিক শান্তিতে ভরিয়ে তোলে। এ ছাড়া খাবারের চর্বি বা গন্ধযুক্ত হাত পরিষ্কার না করে ঘুমানো সম্পর্কেও তিনি সতর্ক করেছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৬০)
বিছানায় শোয়ার আগে কাপড়ের আঁচল বা তোয়ালে দিয়ে তা ঝেড়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে বিছানায় কোনো অদৃশ্য ক্ষতিকর বস্তু থেকে না যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩২০) এ ছাড়া ডান কাত হয়ে শয়ন করা সুন্নত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭)
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে যে ডান কাতে ঘুমানো হৃৎপিণ্ড ও পাকস্থলীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে দেয় না এবং শরীরের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে।
গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ৪ করণীয়দোয়ার নিরাপত্তা ও জিকিরের সুরক্ষা
ঘুমের আগে কোরআনের বিশেষ কিছু আয়াত ও জিকির তিলাওয়াত করা আত্মিক সুরক্ষার এক দুর্ভেদ্য ঢাল। মহানবী (সা.) ঘুমানোর আগে ‘আয়াতুল কুরসি’ পাঠ করার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, এর ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ফেরেশতা পাহারাদার নিযুক্ত হয় এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান কাছে আসতে পারে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩১১)
প্রতি রাতে তিনি দুই হাতের তালু একত্র করে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করে ফুঁ দিতেন এবং পুরো শরীরে তিনবার মুছে নিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৭) এ ছাড়া সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত তিলাওয়াত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০০৯)
ঘুমানোর সময় রাসুল (সা.) বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন, ‘আল্লাহুম্মা আসলামতু নাফসি ইলাইকা, ওয়া ফাওওয়াদতু আমরি ইলাইকা, ওয়া ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহি ইলাইকা, ওয়া আলজা’তু জাহরি ইলাইকা, রাগবাতাও ওয়া রাহবাতান ইলাইকা, লা মালজাআ ওয়া লা মানজা মিনকা ইল্লা ইলাইকা, আমানতু বিকিতাবিকাল্লাযি আনযালতা, ওয়া বিনাবিয়্যিকাল্লাযি আরসালতা।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি নিজেকে তোমার কাছে সমর্পণ করলাম, আমার সব কাজের ভার তোমার ওপর ন্যস্ত করলাম, আমার মুখমণ্ডল তোমার দিকে ফেরালাম এবং আমার পিঠ তোমার আশ্রয়ে সঁপে দিলাম—তোমার সওয়াবের আশায় এবং তোমার শাস্তির ভয়ে। তুমি ছাড়া কোনো আশ্রয়স্থল নেই এবং তোমার শাস্তি থেকে বাঁচারও কোনো উপায় নেই। তুমি যে কিতাব নাজিল করেছ তার ওপর আমি ইমান আনলাম এবং তুমি যে নবী পাঠিয়েছ তাঁর ওপর ইমান আনলাম।’
তিনি সাহাবি বারাকে এই দোয়া শিখিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘যখন তুমি বিছানায় শয়ন করতে যাবে, তখন নামাজের অজুর মতো অজু করে নেবে। তারপর ডান পাশে কাত হয়ে শুয়ে এই দোয়াটি পড়বে। এরপর যদি তুমি সেই রাতে মারা যাও, তবে দীন-আল-ফিতরাত (ইমানের বিশুদ্ধ অবস্থার) ওপর তোমার মৃত্যু হবে। আর তোমার রাতের শেষ কথা যেন এই দোয়াটিই হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭)
সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৫৪রাতে ঘুম ভেঙে গেলে যে ব্যক্তি আল্লাহর একত্ববাদের জিকির করে এবং ক্ষমা চায় বা দোয়া করে, তার দোয়া সঙ্গে সঙ্গে কবুল করা হয়।রাতে মানসিক ক্লান্তির প্রতিষেধক
ঘুমের মধ্যে দুশ্চিন্তা বা মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে অস্থিরতা তৈরি হলে নবীজি তা দূর করার জন্য চমৎকার জিকির শিখিয়েছেন, ‘আউজু বিকালিমাতিলাহিত তাম্মাতি মিন গাদাবিহি ওয়া ইকাবিহি ওয়া শাররি ইবাদিহি, ওয়া মিন হামাযাতিশ শায়াতিনি ওয়া আন ইয়াহদুরুন।’
অর্থ: ‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কলেমাগুলোর মাধ্যমে তাঁর গজব, তাঁর শাস্তি, তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা ও আমার কাছে তাদের উপস্থিতি থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।’ (সুনানে তিরমিজি: হাদিস: ৩৫২৮)
তিনি বলেছেন, রাতে ঘুম ভেঙে গেলে যে ব্যক্তি আল্লাহর একত্ববাদের জিকির করে এবং ক্ষমা চায় বা দোয়া করে, তার দোয়া সঙ্গে সঙ্গে কবুল করা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৫৪)
শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়া মানুষের জন্য ঘুমানোর আগে তসবি পাঠ করা পরম সঞ্জীবনী শক্তি জোগায়। ফাতেমা (রা.) যখন অতিরিক্ত গৃহস্থালি কাজের চাপে রাসুলের কাছে সেবকের জন্য আরজি জানিয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁকে রাতে শোয়ার সময় ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করার শিক্ষা দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১৮)
এই জিকির শারীরিক ক্লান্তি দূর করে আত্মিক বল বৃদ্ধি করে।
সকালে ঘুম থেকে জেগে নবীজি (সা.)-এর ৭ আমল