হোং ওয়াং কেন চলতি বছর ফিল্ডস মেডেল পেলেন
· Prothom Alo

জীবনে কখনো কি আপনার মনে হয়েছে, ‘নাহ, এই কাজ আমাকে দিয়ে আর হবে না’? যদি এমনটা ভেবে থাকেন, তবে আপনি মোটেও এই দলে একা নন। আধুনিক গণিতের অন্যতম সেরা মস্তিষ্ক, যাঁকে এ বছর গণিতের নোবেলখ্যাত ফিল্ডস মেডেল দেওয়া হয়েছে, সেই হোং ওয়াংও একসময় ঠিক এমনই ভেবেছিলেন!
৪০ বছরের কম বয়সী গণিতবিদদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল। ৬৮ জন বিজয়ীর দীর্ঘ ইতিহাসে হোং ওয়াং মাত্র তৃতীয় নারী, যিনি এই দুর্লভ সম্মাননা অর্জন করেছেন। অথচ এই প্রতিভাবান গণিতবিদ একসময় নিজের মেধা নিয়েই সন্দিহান ছিলেন!
Visit casino-promo.biz for more information.
চীনের গুইলিনে জন্ম নেওয়া হোং ওয়াং ২০১১ সালে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক শেষ করে ফ্রান্সে পাড়ি জমান স্নাতকোত্তর করতে। সেখানেই তাঁর মনে সংশয় জাগে, গণিতে আদৌ তাঁর যথেষ্ট মেধা আছে তো? এই হতাশা থেকে তিনি এক সেমিস্টার গণিত থেকে পুরোপুরি দূরে ছিলেন। এমনকি পেশা বদলে স্থপতি হবেন ভেবে এক মাসের একটি আর্কিটেকচার ইন্টার্নশিপও করে ফেলেন! কিন্তু কিছুদিন পরই তাঁর উপলব্ধি হয়, শূন্য থেকে আর্কিটেকচার শুরু করাটাও তো সহজ নয়।
৬৮ জন বিজয়ীর দীর্ঘ ইতিহাসে হোং ওয়াং মাত্র তৃতীয় নারী, যিনি ফিল্ডস মেডেল সম্মাননা অর্জন করেছেনতাই সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আবারও গণিতেই ফেরেন তিনি। বর্তমানে ৩৫ বছর বয়সী এই তরুণী নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফ্রান্সের একটি বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গণিতের অধ্যাপক। তাঁর এই ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্রটা খুব সহজ—‘অযথা চিন্তা বাদ দিন, নিজেকে প্রশ্ন করা থামান, শুধু নিজের কাজে মন দিন।’
চলুন এবার জেনে নিই, ঠিক কী জাদুকরী কাজের জন্য তাঁর গলায় এই ফিল্ডস মেডেল উঠল।
জ্যাকব জিমারম্যান কেন চলতি বছর ফিল্ডস মেডেল পেলেন৬৮ জন বিজয়ীর দীর্ঘ ইতিহাসে হোং ওয়াং মাত্র তৃতীয় নারী, যিনি এই দুর্লভ সম্মাননা অর্জন করেছেন। অথচ এই প্রতিভাবান গণিতবিদ একসময় নিজের মেধা নিয়েই সন্দিহান ছিলেন!
নি সমাধান করেছেন গণিতের বিখ্যাত কাকায়া কনজেকচার। বিষয়টা বুঝতে একটা সহজ উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনার হাতে একটি সুচ, পেনসিল কিংবা চপস্টিক আছে। আপনি এটাকে টেবিলের ওপর রেখে ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরাতে চান। প্রশ্ন হলো, সুচটি ঘোরানোর জন্য টেবিলের ঠিক কতটুকু জায়গা বা ক্ষেত্রফল দরকার হবে?
সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হবে, সুচটিকে এর মাঝখান বরাবর ধরে ঘোরালেই সবচেয়ে কম জায়গা লাগবে এবং এটি একটি নিখুঁত বৃত্ত তৈরি করবে। ১৯১৭ সালে জাপানি গণিতবিদ সোইচি কাকায়া ঠিক এই প্রশ্নটিই তুলেছিলেন। তবে তিনি দেখলেন, সুচের কেন্দ্রটিকে যদি ঘোরানোর সময় একটু একটু করে বৃত্তাকারে সরানো হয়, তবে এটি আগের চেয়ে অনেক কম জায়গা নেবে। তখন এটি দেখতে তিন কোণা একটি ঢালের মতো হয়, যাকে ডেলটয়েড বলে। এর ক্ষেত্রফল সাধারণ বৃত্তের ঠিক অর্ধেক। কাকায়া ভাবলেন, জায়গাটা কি আরও কমানো সম্ভব?
কয়েক বছর পর রুশ গণিতবিদ আব্রাম বেসিকোভিচ এক চমকপ্রদ উত্তর নিয়ে হাজির হলেন। তিনি দেখালেন, কিছু জটিল নড়াচড়ার মাধ্যমে এই ঘোরানোর জায়গাটাকে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা সম্ভব!
কয়েক দশক পর এই একই সমস্যার একটি নতুন রূপ দেখা দেয় গণিতের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি শাখায়। এই শাখাকে বলে হারমোনিক অ্যানালাইসিস। এখানে তরঙ্গের মতো দোদুল্যমান গতি নিয়ে কাজ করা হয়। হোং ওয়াংয়ের কাজের মূল জায়গাই ছিল এটি।
গণিতের নোবেলখ্যাত ফিল্ডস মেডেল পেলেন ৪ তরুণ গণিতবিদজাপানি গণিতবিদ সোইচি কাকায়া দেখলেন, সুচের কেন্দ্রটিকে যদি ঘোরানোর সময় একটু একটু করে বৃত্তাকারে সরানো হয়, তবে এটি আগের চেয়ে অনেক কম জায়গা নেবে।
আগের কাকায়া সমস্যায় সুচটিকে ভাবা হয়েছিল একেবারে পাতলা, যার কোনো পুরুত্ব নেই। কিন্তু আধুনিক এই সমস্যায় সুচটিকে একটু পুরু হিসেবে ধরা হয় এবং এটি কেবল দ্বিমাত্রিক তলে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যাপারটিকে আরও সহজভাবে কল্পনা করা যাক। একটা সুচ ঘোরানোর বদলে ধরুন, আপনার কাছে অসংখ্য নুডলসের কাঠি আছে। এগুলো শূন্যে ভাসছে এবং সম্ভাব্য সব দিকে মুখ করে আছে। আপনি কাঠিগুলোর দিক বদলাতে পারবেন না, কিন্তু সেগুলোকে স্লাইড করে একটার ভেতর দিয়ে আরেকটা ঢোকাতে পারবেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই অসংখ্য সুচ একে অপরের ওপর কতটা ওভারল্যাপ করতে পারে বা কতটুকু জায়গায় এঁটে যেতে পারে?
গণিতের ভাষায়, এই অসংখ্য সুচের যে আকার তৈরি হয়, সেটি একটি ফ্র্যাক্টাল হতে পারে। ফ্র্যাক্টাল হলো এমন এক জটিল প্যাটার্ন, যা আপনি যত জুম করবেন, ততই এর ভেতরে একই রকম প্যাটার্ন দেখতে পাবেন। এই কারণে এদের মাত্রা বা ডাইমেনশন কোনো পূর্ণ সংখ্যা না হয়ে ভগ্নাংশও হতে পারে।
কিন্তু কাকায়া কনজেকচারের মূল দাবি ছিল, ত্রিমাত্রিক জগতে সম্ভাব্য সব দিকে মুখ করে থাকা এই সুচগুলোর তৈরি ফ্র্যাক্টাল ডাইমেনশন ভগ্নাংশ হবে না, এটি হতে হবে ঠিক ৩।
জ্যামিতির কাজ কীফ্র্যাক্টাল হলো এমন এক জটিল প্যাটার্ন, যা আপনি যত জুম করবেন, ততই এর ভেতরে একই রকম প্যাটার্ন দেখতে পাবেন। এই কারণে এদের ডাইমেনশন কোনো পূর্ণ সংখ্যা না হয়ে ভগ্নাংশও হতে পারে।
এই ‘তিন’ প্রমাণ করাটাই ছিল গণিতবিদদের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা। তিন দশক আগে এক গণিতবিদ দেখিয়েছিলেন, এই মাত্রা অন্তত ২.৫ হতে হবে। এরপর অনেকেই হিসাব কষে এটিকে আরেকটু বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু লক্ষ্য ছিল, এই মাত্রা যে ৩-এর চেয়ে কম হতে পারে না, তা নিখুঁতভাবে প্রমাণ করা।
দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থাই ভেঙে দিয়েছেন হোং ওয়াং। ২০২২ সালে তিনি এবং চীনের নানকাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জশুয়া জাহল মিলে এই সমস্যাটির গভীরে পৌঁছান। অবশেষে গত বছর তাঁরা গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন, ত্রিমাত্রিক জগতে কাকায়া কনজেকচার পুরোপুরি সত্য এবং ওই সুচগুলোর ফ্র্যাক্টাল মাত্রা সত্যিই তিন।
উচ্চতর মাত্রার ক্ষেত্রে এই কনজেকচার এখনো সমাধান করা যায়নি ঠিকই, তবে ত্রিমাত্রিক জগতে হোং ওয়াংয়ের এই যুগান্তকারী সমাধান আধুনিক গণিতকে এক বিশাল মাইলফলক পার করে দিয়েছে। হতাশা কাটিয়ে শূন্য থেকে শুরু করে কীভাবে মহীরুহ হওয়া যায়, তা দেখিয়ে দিয়েছেন হোং ওয়াং। তিনি আজ শুধু গণিতবিদদের জন্যই নয়, বরং সারা বিশ্বের অগণিত তরুণদের জন্যই এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস১১ সংখ্যার ম্যাজিক