তেলাপোকাদের যন্তর মন্তর

· Prothom Alo

‘অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।’ লেখাটা লেখা উচিত হবে কি না? উচিত হলেও কীভাবে শুরু করব ঠিক করে উঠতে পারছিলাম না। তখনই হঠাৎ প্রথম লাইনটা মাথায় এল। আমাদের সময়ের উচ্চমাধ্যমিকের বাংলা পাঠ্যবইয়ের গদ্য অংশের গল্প ‘বিলাসী’–তে শরৎচন্দ্র লিখেছিলেন। যদিও আমি যে বিষয় নিয়ে লিখতে যাচ্ছি, সেই সব তেলাপোকার সঙ্গে শরৎচন্দ্রের তেলাপোকার অর্থ একেবারেই বিপরীত। বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একই বিষয়ের অর্থ বদলে যায়, সময়ই বদলে নেয়।

এবার বর্তমানের তেলাপোকাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক। ভারতের বুকারজয়ী লেখক এবং অধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায় লিখেছেন, ‘গল্পটা আমাদের সবারই জানা, তবু আলাপের খাতিরে আরও একবার বলা যাক। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেশ অহংকার ও অবজ্ঞার সঙ্গে কয়েকজন বেকার ভারতীয় তরুণকে “তেলাপোকা” বলে কটাক্ষ করেছিলেন। এর জবাবে বোস্টনে থাকা অভিজিৎ দিপকে নামের এক শিক্ষার্থী ইনস্টাগ্রামে একটি মন্তব্য পোস্ট করেন: “সব তেলাপোকা যদি এক হয়ে যায়, তবে কী হবে?” কোটি কোটি তরুণ এতে সাড়া দিলেন। আর এভাবেই জন্ম নিল “ককরোচ জনতা পার্টি” (তেলাপোকা জনতা পার্টি)। দিপকে হয়ে উঠলেন এই তেলাপোকাদের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা।’

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

এবার আসুন একটু বাস্তবতার দিকে নজর দেওয়া যাক। কালের হিসাবে আমরা হলাম প্রজন্ম এক্স বা মিলেনিয়ালস। আমরা বেড়ে উঠেছিলাম আমাদের মাতা–পিতা ও শিক্ষক ‘বেবি বুমারস’দের কঠিন তত্ত্বাবধানে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলেই আমাদের কপালে জুটত বেতের বাড়ি। বাড়ি ও স্কুল মিলিয়ে আমি নিজে এক জীবনে যত বেতের বাড়ি খেয়েছি, তার হিসাব করতে গেলে একটা ‘এক্সেল’ ফাইল তৈরি করতে হবে। সেই ফাইলে অনেকগুলো ‘ওয়ার্কশিট’ থাকবে। বাড়িতে বেতের বাড়ি আর স্কুলের আলাদা আলাদা শ্রেণির বেতের বাড়ি। এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য আলাদা আলাদা ‘ভি-লুকআপ’ টুলের দরকার হবে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বেবি বুমারসরা আমাদের পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত জীবনের সব শিক্ষাই দিয়েছিলেন। আমাদের আচার–আচরণ হতে হবে ধর্মগ্রন্থ ও সামাজিকতার আলোকে। আমাদের পোশাক–পরিচ্ছদ হতে হবে মার্জিত। আমাদের কথাবার্তা হতে হবে ভদ্র, সভ্য। আমাদের জন্য কী কী নিষিদ্ধ, সেটা আগেই ঠিক করে দেওয়া হতো। এরপর বলা হতো আমরা কী কী করতে পারব। আমাদের কথাবার্তা থেকে হাসি পর্যন্ত সবকিছুতেই থাকবে পরিমিত বোধের ছোঁয়া। আমরা একেকজন মানুষ না হয়ে হয়ে উঠব ধর্মগ্রন্থের একজন পয়গম্বর বা অবতার। যাতে করে আমাদের আখেরাত বা ইহজীবনের পাশাপাশি পরকাল বা মৃত্যুর পরের জীবনও হবে অবিচ্ছিন্ন সুখের ও শান্তির।

আমরা পাঠ্যবই থেকেই শিখেছিলাম, সময় ও নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে জীবন বদলায়, বদলায় মূল্যবোধ। বদলায় ইতিহাস। বদলায় ভালো–মন্দের সংজ্ঞা। সংস্কৃতি বদলায়। বদলায় সংস্কৃতির মানদণ্ড। আমরা যখনই কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি, তখন থেকেই এগুলো মোটামুটি বুঝতে শিখেছি। আমাদের পূর্বপুরুষেরা কিন্তু সেই আগের জায়গাতেই আটকে আছেন। কতিপয় লেখক, সাহিত্যিক, নির্মাতা ছিলেন ব্যতিক্রম। আমাদের মূল্যবোধ থেকে শুরু করে মুখের ভাষা—সবকিছুর জন্যই ছিল লিখিত কিংবা অলিখিত সিলেবাস। এই সিলেবাসের ঘেরাটোপে থাকতে থাকতে আমরা যেন হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।

আমাদের পূর্বপুরুষ বেবি বুমারসদের অবশ্য তেমন একটা দোষ দেওয়া যায় না। কারণ, তাঁরা তাঁদের পূর্বপুরুষ ‘সাইলেন্ট জেনারেশন’–এর তত্ত্বাবধানে আরও বেশি কঠোর নিয়মকানুন মেনে বেড়ে উঠেছিলেন। এরপর সেগুলোই আমাদের ওপর প্রয়োগ করার যথাযথ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা সফল হয়েছিলেন। কারণ, আমাদের প্রজন্মের বেশির ভাগ মানুষই এখনো সেই পুরোনো মূল্যবোধে আটকে আছেন। এখন মজাটা হচ্ছে আমাদের সঙ্গে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের দূরত্ব। সময়ের হিসাবে জেনারেশন এক্স বা ওয়াইয়ের সঙ্গে জেনেরেশন জেডের তফাত মাত্র বছর ১০ বা ২০ বছরের। এই বছর ১০ বা ২০–এর সময়ে পৃথিবী এগিয়ে গেছে একলাফে এক শ বা দুই শ বছর। তাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম জেন–জিকে বুঝতে হলে আমাদের চিন্তাভাবনাকে ঠিক কতটা প্রসারিত করতে হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

শুক্রবার নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) মুখপাত্র সৌরভ দাস। পাশে বসে আছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। ২৪ জুলাই ২০২৬

মজার ব্যাপার হচ্ছে সাইলেন্ট জেনারেশনের এক কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আজ থেকে এক শ বছর আগে ‘আঠারো বছর বয়সে’ শিরোনামে একটা কবিতা লিখেছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন— ‘আঠরো বছর বয়স ভয়ংকর / তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা, এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর / এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।’ এই কথাগুলো যেন জেন–জিদের জন্য একেবারে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। আমরা এই জেন–জিকে কখনো ভালো চোখে দেখিনি। আমাদের চোখে এরা দেশ–জাতির কোনো খবর রাখে না। এরা সামাজিক নয়। এদের কোনো নিমানুবর্তিতা নেই। এরা অসভ্য। এমন আরও অনেক বিশেষণে আমরা এই প্রজন্মকে আখ্যায়িত করি। আমরা ভুলে যাই আমাদের সময়ের জীবনযাপন থেকে এদের জীবনযাপন এক শ দুই শ বছর এগিয়ে। আমরা তাই যতবারই আমাদের ওপর আরোপিত পূর্বপুরুষদের নিময়কানুন তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছি, ততবারই তারা বিদ্রোহ করেছে। হোক সেটা পরিবারে বা সমাজে বা রাষ্ট্রে।

ভারতে জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে। জেনারেশন এক্স বা মিলেনিয়াল হলে এটাকে হয়তো–বা মেনেই নিত। কিন্তু জেন–জি, যাদের বয়স এখনো আঠারোর কোটায়, তারা সুকান্তের ভাষায় প্রতিরোধ করতে শুরু করল। পুরোনো প্রজন্ম নিজেদের সীমিত কারিগরি জ্ঞানে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে। অন্যদিকে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী জেন–জি প্রজন্ম একেবারেই বিদ্রোহী। হোয়াটসঅ্যাপ–দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার সব কৌশল বিজেপির জানা ছিল। তারা এই প্রজন্মকে নিজেদের ইশারায় চালাতে পারত। কিন্তু ইনস্টাগ্রামের দুনিয়ায় এসে বিজেপি রীতিমতো দিশাহারা। এই তরুণদের দমাতে এখন তাদের হাতে পেশিশক্তি ছাড়া আর কোনো অস্ত্র নেই।

তুমি রবে নীরবে

আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করি, আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রজন্মের দিন শেষ হয়ে এসেছে। এখনকার বিশ্বের তাবৎ দেশের শাসক এই জেন–জিদের সম্পর্কে দাদার বয়সী। এই দাদারা কোনোভাবেই তাঁদের ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ। তাঁরা বেমালুম ভুলেই গেছের যে তাঁদের দিন ফুরিয়ে এসেছে। সুকান্তের ভাষায়—‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান।’ তাঁরা স্থান তো ছাড়ছেনই না; বরং ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাদেরকে দমাতে চাইছেন। জেন–জি, যারা দাদাদের ভাষায় একটা বাজে প্রজন্ম, তারা ভ্রাতৃত্বের অন্যতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রতিরোধ করে যাচ্ছে। পুরোনো বাতিল প্রজন্ম যতই দ্রুত নিজেদেরকে মেয়াদোত্তীর্ণ বলে উপলব্ধি করবে, ততই তাদের জন্য এবং পৃথিবীর জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।

আমাদের বুঝতে হবে, আমাদের আমলের হাতিদের যন্তর মন্তর দিয়ে এখনকার তেলাপোকাদের নিয়ন্ত্রণ করা শুধু কঠিনই নয়, একেবারে অসম্ভব। তাদেরকে বুঝতে হলে আমাদেরকে তাদের সঙ্গে মিশতে হবে, তাদের মতামত শুনতে হবে, অবশেষে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে গেলেই সেখানে তারা নিজেদের প্রতিবাদী চেহারা দেখিয়ে দেবে। আর এটাই তো হওয়ার কথা। কারণ, একটা বয়সের পর মুরগির বাচ্চা পর্যন্ত আর মায়ের পাখনার নিচে আশ্রয় নেয় না। আবারও সুকান্তের কাছে ফিরে যাওয়া যাক—‘আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে করে যাব আশীর্বাদ, তারপর হবো ইতিহাস।’

Read full story at source