কথায় কথায় অন্যের ভুল ধরা কি খারাপ অভ্যাস

· Prothom Alo

আড্ডার মধ্যে তোমার কোনো বন্ধু হয়তো খুব কনফিডেন্সের সঙ্গে বলে বসল, ‘জানিস, আমরা কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবহার করি!’

Visit asg-reflektory.pl for more information.

তুমি যেহেতু বিজ্ঞান নিয়ে একটু–আধটু পড়াশোনা করো, তুমি খুব ভালোভাবেই জানো যে এটা ডাহা মিথ্যা কথা। বিজ্ঞানের দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশিবার ভুল প্রমাণিত হওয়া মিথগুলোর এটি একটি। তোমার হয়তো সঙ্গে সঙ্গেই ইচ্ছা করবে জ্ঞানীর মতো বলে উঠতে, ‘আরে না, তুই তো ভুল বলছিস!’ কিন্তু সবার সামনে তার ভুল ধরিয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে? নাকি সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে চুপ করে থাকাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ?

সব সময় নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে চাওয়ার একটা বড় সামাজিক মূল্য চোকাতে হয়। কেউ কেউ কথায় কথায় অন্যের ভুল ধরতে গিয়ে বন্ধুদের কাছে রীতিমতো বিরক্তিকর চরিত্রে পরিণত হয়। আবার সব ভুল চুপচাপ মেনে নেওয়াটাও ঠিক নয়। তাহলে এই দুইয়ের মধ্যে ব্যালান্স করবে কীভাবে? চলো, এ নিয়ে একটু তলিয়ে ভাবা যাক।

ভুল ধরিয়ে দেওয়া কেন জরুরি

প্রথম কারণটা খুব সোজা, ভুল তথ্য খুব দ্রুত ছড়ায়। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, কোনো মিথ্যা কথা যদি কেউ চ্যালেঞ্জ না করে এবং সেটা বারবার বলা হতে থাকে, তবে একসময় মানুষ সেটাকেই সত্যি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ইল্যুশরি ট্রুথ ইফেক্ট। তাই ভুল কথার প্রতিবাদ না করা মানে তুমিও পরোক্ষভাবে সেই মিথ্যা ছড়াতে সাহায্য করছ।

লজ্জা পেলে গাল লাল হয়ে যায় কেন

অনেক সময় আবার খুব সাধারণ ভুল ভাঙানোটাও জরুরি হয়ে পড়ে, তা না হলে চরম লজ্জায় পড়তে হয়। একটা মজার উদাহরণ দিই। এক লেখকের বাবা ছোটবেলায় তাঁকে মজা করে বলেছিলেন, রাস্তার মাঝখানে যে সাদা লাইনের ওপর ছোট ছোট বাম্পার বা স্পিডব্রেকারের মতো থাকে, সেগুলো নাকি অন্ধ চালকদের জন্য! অনেকটা ব্রেইল পদ্ধতির মতো, যাতে অন্ধরা বুঝতে পারে, তারা ঠিক রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে। ওই লেখক ভাবতেন এটাই সত্যি! ৩০ বছর বয়সে বন্ধুদের আড্ডায় কথাটা বলার পর সবাই যখন হাঁ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল, তখন তিনি বুঝতে পারেন, কত বড় বোকামি করেছেন! তোমার কোনো বন্ধু কি এমন কোনো ভুল ধারণা নিয়ে বড় হোক, সেটা তুমি চাইবে?

তা ছাড়া বিষয়টি যদি হয় স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা নিয়ে কোনো ভুল ধারণা, তবে সেটা শুধরে দেওয়া তোমার নৈতিক দায়িত্ব। কারণ, ভুল তথ্যের কারণে কারও বড় কোনো শারীরিক বা আর্থিক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

জীবনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে কথা বলা যেমন জরুরি, তেমনই পরিস্থিতি বুঝে চুপ থাকাও গুরুত্বপূর্ণ

মাঝেমধ্যে চুপ থাকাও ভালো

এবার আসি উল্টো পিঠে। তুমি হয়তো খুব ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই কারও ভুল ধরিয়ে দিলে, কিন্তু উল্টো সে রেগে গেল। বিশেষ করে যখন কোনো আড্ডায় সবার সামনে কাউকে ভুল প্রমাণ করা হয়, তখন সে চরম অপমানিত বোধ করে। অপমানিত হওয়ার পর কেউ সহজে বলে না, ‘ওহ আচ্ছা, তুই ঠিক বলেছিস!’ বরং সে নিজের ভুলকেই আরও শক্তভাবে ডিফেন্ড করতে শুরু করে।

এখানে ডানিং–ক্রুগার ইফেক্ট নামের একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার কাজ করে। এই ইফেক্ট অনুযায়ী, যে ব্যক্তি কোনো একটি বিষয় নিয়ে সবচেয়ে কম জানেন, তাঁর কনফিডেন্স থাকে আকাশছোঁয়া। অন্যদিকে আসল এক্সপার্টরা সব সময় নিজের জ্ঞান নিয়ে একটু দ্বিধায় থাকেন। ফলে তর্কের সময় দেখা যায়, ইউটিউবে অর্ধেক ভিডিও দেখা কোনো ব্যক্তি শুধু গায়ের জোরে তাঁর ভুল কথাটাই প্রমাণ করে ছাড়ছেন, আর আসল জ্ঞানী ব্যক্তিটি চুপসে যাচ্ছেন।

তা ছাড়া কথায় কথায় ভুল ধরলে বন্ধুরা তোমাকে আঁতেল বা সবজান্তা শমসের ভাবতে শুরু করবে। ফিলিপ ম্যাকগ্রো নামের বিখ্যাত এক মার্কিন চিকিৎসকের একটা দারুণ উক্তি আছে, ‘তুমি কি সঠিক হতে চাও, নাকি সুখী হতে চাও?’ বন্ধুদের আড্ডায় সব সময় সঠিক হওয়ার চেয়ে মাঝেমধ্যে চুপ করে থেকে সুখী হওয়াটা বেশি জরুরি।

বৃষ্টির পানি সরাসরি পান করা কি নিরাপদ

মুখ খোলার আগে নিজেকে যে পাঁচটি প্রশ্ন করবে

কারও ভুল ধরার আগে মাথায় এ পাঁচটি বিষয় একটু হিসাব করে নিলে আর সমস্যা হবে না:

১. সম্পর্কটা কেমন

কাছের কোনো বন্ধুর ভুল ধরলে সে যতটা সহজে নেবে, সদ্য পরিচিত কেউ বা বয়সে বড় কারও ভুল ধরলে পরিস্থিতি তেমন হবে না। সম্পর্ক যত ক্যাজুয়াল, ভুল শুধরে দেওয়া তত সহজ।

২. বিষয়টি কতটা সিরিয়াস

আড্ডার ছলে কেউ যদি বলে বসে, ‘অ্যাভাটার’ মুভিটা তো ২০০৭ সালে রিলিজ হয়েছিল (আসলে ২০০৯ সালে), তবে সেটা নিয়ে তর্ক করার কোনো মানে নেই। কিন্তু কেউ যদি ধর্ম, রাজনীতি বা কারও ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিয়ে ভুল তথ্য দেয়, তবে সেটা শুধরাতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। নিজের এনার্জি সঠিক জায়গায় খরচ করো।

৩. তোমার গলার সুর কেমন

‘তুই একদম ভুল বলছিস’—এভাবে বললে যে কেউই খেপে যাবে। এর চেয়ে যদি বলো, ‘আমি তো একটা বইয়ে অন্য রকম পড়েছিলাম, দাঁড়া তো আরেকবার চেক করে দেখি’—এভাবে বললে আলোচনার একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়।

৪. গুগল করার বিপদ!

পকেটে স্মার্টফোন থাকায় এখন যে কারও কথা মাত্র ১১ সেকেন্ডে গুগল সার্চে ভুল প্রমাণ করে দেওয়া যায়। খুব কাছের বন্ধুদের আড্ডায় এটা মজার হলেও নতুন কারও সঙ্গে আলাপের মাঝখানে কথায় কথায় গুগল বের করে তাকে ভুল প্রমাণ করা সব সময় সঠিক নয়।

৫. তুমি নিজেই যদি ভুল হও

তর্ক করার পর যদি দেখো তুমি নিজেই ভুল ছিলে, তবে গোঁয়ার্তুমি না করে হাসিমুখে সেটা মেনে নাও। ‘আরে তাই তো, আমিই ভুল জানতাম! থ্যাংকস দোস্ত ক্লিয়ার করার জন্য’—এই একটা লাইন তোমাকে সবার কাছে দারুণ জনপ্রিয় করে তুলবে।

স্মার্টলি ভুল ধরিয়ে দেওয়ার উপায়

কাউকে ছোট না করে তার ভুল শুধরে দেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাকে একা পেয়ে বলা। সবার সামনে না বলে আড্ডার ফাঁকে একটু আড়ালে গিয়ে তাকে বলতে পারো, ‘দোস্ত, তুই যে ওই তথ্য দিলি, আমার মনে হয়, ওটা একটু ভুল ছিল।’ এতে তার সম্মান বাঁচবে এবং সে তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।

মানুষের ভুল ধরা মোটেও খারাপ কোনো কাজ নয়। তবে সেটা তুমি কীভাবে করছ, সেটাই আসল। সব সময় তর্কে জেতাটাই মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়; বরং সঠিক তথ্য সবার কাছে পৌঁছানোই আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আর হ্যাঁ, নিজেকে সব সময় নিখুঁত না ভেবে অন্যের কাছ থেকেও নতুন কিছু শেখার মানসিকতা থাকাটাই একজন স্মার্ট মানুষের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্টদৌড়ানোর সময় হাত বাঁকে, হাঁটার সময় তত বাঁকে না কেন

Read full story at source