চিয়া সিড কেন আজটেক ও মায়া সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ছিল, নতুন গবেষণায় আরও প্রমাণ
· Prothom Alo
স্মুদি, পুডিং কিংবা লেবুর শরবত—সবখানেই এখন চিয়া সিডের ছড়াছড়ি। কিন্তু হাজার বছর আগে আজটেক ও মায়া সভ্যতার মানুষও এই ছোট্ট বীজকে দিত বিশেষ গুরুত্ব। কেন এত মূল্যবান ছিল চিয়া? আর আধুনিক বিজ্ঞানই-বা এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে কী বলছে? নতুন একটি বড় গবেষণায় মিলেছে সেই উত্তর।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
আজকাল স্মুদি, পুডিং কিংবা লেবুর শরবতে চিয়া সিডের ব্যবহার জনপ্রিয়আজকাল স্মুদি, পুডিং কিংবা লেবুর শরবতে চিয়া সিডের ব্যবহার জনপ্রিয়। অথচ এই ছোট্ট বীজের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। মধ্য আমেরিকার আজটেক ও মায়া সভ্যতায় চিয়া শুধু খাবারই ছিল না; এটি ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য।
অনেক সময় শাসকদের কর বা খাজনা হিসেবেও চিয়া দেওয়া হতো, আবার বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও এর ব্যবহার ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, সে সময় ভুট্টা, শিম ও স্কোয়াশের পাশাপাশি চিয়াও ছিল মানুষের অন্যতম মূল্যবান খাদ্যসম্পদ।
হাজার বছর আগের সেই বীজই এখন আবার বিশ্বজুড়ে ‘সুপারফুড’ হিসেবে আলোচনায়। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘কোজেন্ট ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি বড় পর্যালোচনাধর্মী গবেষণায় চিয়া সিডের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তানজানিয়ার দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জোয়াকিম মাতোন্দো ও সিরি আবিহুদি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার ফলাফল একত্র করে এই পর্যালোচনা প্রকাশ করেছেন।
ছোট বীজ, বড় পুষ্টিগুণ
মধ্য আমেরিকার এই ক্ষুদ্র বীজে আছে—
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (এএলএ)
উচ্চমানের উদ্ভিজ্জ প্রোটিন
মিউসিলেজ নামের একধরনের দ্রবণীয় আঁশ
বি-জাতীয় ভিটামিনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান
চিয়া সিডের প্রোটিন হজম হওয়ার সময় ছোট ছোট উপাদানে ভেঙে যায়, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও শরীরে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
যেভাবে চিয়া সিড খেলে চুল পড়া কমবেহৃদ্যন্ত্র ও রক্তে শর্করার জন্য উপকারী
চিয়া সিড শরীরের ক্ষুধা-নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনেও প্রভাব ফেলেগবেষণায় সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে হৃদ্রোগ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে চিয়ার ভূমিকার ওপর। চিয়ায় থাকা ওমেগা-৩ চর্বি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীরের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এতে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমতে পারে।
অন্যদিকে চিয়ার আঁশ পানির সঙ্গে মিশে জেল তৈরি করে, যা খাবার হজমের সময় গ্লুকোজ শোষণের গতি কমিয়ে দেয়। ফলে খাওয়ার পর রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যায় না এবং শরীরে ইনসুলিনের কাজও ভালো হয়।
পেট ভরা রাখে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
চিয়া সিড খেলে অনেকক্ষণ পেট ভরা মনে হয়। এর পেছনে দুটি কারণ পাওয়া গেছে গবেষণায়। প্রথমত, চিয়ার আঁশ পানি শুষে ফুলে ওঠে, ফলে পেট ভরার অনুভূতি হয়।
দ্বিতীয়ত, এটি শরীরের ক্ষুধা-নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনেও প্রভাব ফেলে। এই দুই মিলিয়েই চিয়া ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
অন্ত্রের জন্যও ভালো
চিয়ার আঁশ শুধু হজমেই সাহায্য করে না, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখেচিয়ার আঁশ শুধু হজমেই সাহায্য করে না, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে। এটি প্রিবায়োটিকের মতো কাজ করে এবং শরীরের জন্য উপকারী শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি বাড়িয়ে দেয়, যা সার্বিক অন্ত্র-স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রান্নাঘরের বাইরেও কাজে লাগে
চিয়ার এই জেল তৈরির গুণ শুধু স্বাস্থ্যের জন্যই নয়, খাদ্যশিল্পেও কাজে লাগে। গ্লুটেন-মুক্ত বেকারি পণ্যে গঠন ধরে রাখতে, কুকিজ বা মাংসজাত পণ্যে চর্বির বিকল্প হিসেবে, এমনকি ভিগান খাবারে ডিমের বদলেও চিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে।
কিছু সতর্কতাও জরুরি
যদিও বিরল, তবু কারও কারও চিয়ায় অ্যালার্জি হতে পারেগবেষণায় কয়েকটি সতর্কতার কথাও বলা হয়েছে। যদিও বিরল, তবু কারও কারও চিয়ায় অ্যালার্জি হতে পারে।
এ ছাড়া চিয়ায় থাকা ক্যালসিয়াম, আয়রন বা জিংকের মতো খনিজ উপাদান শরীরে পুরোপুরি শোষিত না-ও হতে পারে। কারণ, এতে থাকা ফাইটিক অ্যাসিড নামের একটি উপাদান এসব খনিজকে আটকে রাখে।
আবার চিয়ায় অসম্পৃক্ত চর্বি বেশি থাকায় সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে তা জারিত হয়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
কাদের চিয়া সিড খাওয়া উচিত নয়, চিকিৎসক কী বলছেনভবিষ্যতে আরও গবেষণা দরকার
গবেষকেরা বলছেন, চিয়া বীজের ‘ন্যাটিভ মাইক্রোবায়োম’ (চিয়া বীজের গায়ে বা ভেতরে স্বাভাবিকভাবে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য অণুজীবের সমষ্টি) এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি নিয়ে এখনো যথেষ্ট গবেষণা হয়নি।
এসব নিয়ে আরও কাজ হলে চিয়ার উপকারী উপাদানগুলো আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
চিয়া সিড শুধু একটি ‘ট্রেন্ডি’ সুপারফুড নয়, এর পুষ্টিগুণের পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণও রয়েছেশেষ কথা
এ গবেষণা বলছে, চিয়া সিড শুধু একটি ‘ট্রেন্ডি’ সুপারফুড নয়, এর পুষ্টিগুণের পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণও রয়েছে। তবে কোনো খাবারই একা অলৌকিক ফল দেয় না। তাই চিয়াকে সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে খাওয়াই সবচেয়ে ভালো।
নতুন কোনো খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় যোগ করার আগে নিজের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ।
সূত্র: মাতোন্দো, জে ডি ও আবিহুদি, এস এ (২০২৬)। চিয়া সিডস: আ নিউট্রিয়েন্ট-ডেন্স ফাংশনাল ফুড ফর হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন। কোজেন্ট ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার
ফুটবলাররা কেন পানি মুখে নিয়ে কুলি করে ফেলে দেন, জানলে অবাক হবেন