‘সিক্স প্যাক’: পেশির মোহে নষ্ট যখন আল্লাহর আমানত

· Prothom Alo

জিম–সংস্কৃতির গ্ল্যামারের আড়ালে একটা মারাত্মক হুজুগ তৈরি হয়েছে, তা হলো, স্বল্প সময়ে নাটকীয়ভাবে পেশিবহুল শরীর বানানোর তাড়না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম উপায়ে গড়া অবয়ব প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় পড়ে হাজার হাজার তরুণ এখন অ্যানাবলিক স্টেরয়েড আর ক্ষতিকর হরমোন বুস্টারের দিকে ঝুঁকছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এর ফলে লিভার নষ্ট, কিডনি বিকল, বন্ধ্যত্ব, আকস্মিক হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

এটাকে স্রেফ একটা স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা বোঝা যায় না। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে স্টেরয়েড–সংস্কৃতি আসলে একটা বিশ্বাসঘাতকতা নয়, এটা একই সঙ্গে তিনটা ভিন্ন স্তরে আমানত ভাঙে। নিচে সেই তিনটা স্তর দেখানো হলো।

মানুষের শরীর তার নিজস্ব সম্পত্তি নয়, এটা আল্লাহর দেওয়া একটা আমানত। শরীরকে কৃত্রিম রাসায়নিক দিয়ে জোর করে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বিকৃত করার চেষ্টা সরাসরি এই আমানতের খেয়ানত।

প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা: শরীরের প্রতি

ইসলামে মানুষের শরীর তার নিজস্ব সম্পত্তি নয়, এটা আল্লাহর দেওয়া একটা আমানত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে।’ (সুরা ত্বিন, আয়াত: ৪)

এই সুনির্মিত শরীরকে কৃত্রিম রাসায়নিক দিয়ে জোর করে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বিকৃত করার চেষ্টা সরাসরি এই আমানতের খেয়ানত।

আর এই আমানত নিয়ে জবাবদিহিও অনিবার্য। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দাকে নিয়ামত সম্পর্কে প্রথম যে প্রশ্নটি করা হবে, তা হলো, আমি কি তোমার শরীরকে সুস্থ রাখিনি?’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৫৮)

নিজের যত্নও একটি ইবাদত

লক্ষণীয়, এটা কোনো সাধারণ প্রশ্ন নয়, এটা কেয়ামতের দিনের প্রথম প্রশ্ন। যে তরুণ লোকদেখানো পেশির মোহে নিজের সুস্থ শরীরকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়, সে এই প্রথম প্রশ্নেই আটকে যাবে।

দ্বিতীয় বিশ্বাসঘাতকতা: বিধানের প্রতি

শরীরকে আমানত মানার পরের ধাপ হলো, সেই আমানতকে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার ওপর ইসলামের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা মানা। পবিত্র কোরআন দুটি জায়গায় এই নিষেধাজ্ঞা স্পষ্ট করেছে।

প্রথমত, ‘আর তোমরা নিজেদের হাত দিয়ে নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫)

দ্বিতীয়ত, ‘আর তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)

সুস্থ শরীরে কেবল পেশি ফোলানোর জন্য উচ্চমাত্রায় স্টেরয়েড নেওয়া মানে জেনে–বুঝে এমন কিছু শরীরে প্রবেশ করানো, যা যেকোনো মুহূর্তে অঙ্গ বিকল বা স্ট্রোকের কারণ হতে পারে। এমন হলে তা হবে এই দুই আয়াতের নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন।

যে ১০ কারণে আত্মার মৃত্যু হয়

আর ইসলামি ফিকহের একটা মৌলিক নীতিও এখানে প্রযোজ্য। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিজের ক্ষতি করা যাবে না এবং অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০)

এই ক্ষতি শুধু নিজের সীমায় থাকে না, পরিবারও এর মাশুল দেয়।

তৃতীয় বিশ্বাসঘাতকতা: নিয়তের প্রতি

সবচেয়ে গভীর বিশ্বাসঘাতকতাটা ঘটে সবচেয়ে ভেতরে—নিয়তে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফোলা পেশির ছবি তুলে ‘বাহবা’ কুড়ানোর এই মোহের নাম রিয়া।

মহানবী (সা.) এটাকে ‘ছোট শিরক’ বলেছেন, তাঁর সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করে। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, ছোট শিরক কী?’ তিনি বললেন, ‘রিয়া।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৩০)

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার যে শরীরচর্চা নিজে পাপ নয়, বরং প্রশংসনীয়। মহানবী (সা.) নিজেই বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৬৪)

সমস্যাটা শরীরচর্চায় নয়। যে চর্চা মানুষকে আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতার দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা, স্টেরয়েড-নির্ভর সংস্কৃতি সেটাকেই ঘুরিয়ে দেয় লোকদেখানোর অহংকারের দিকে।

অথচ আমাদের উচিত ছিল শরীরকে আমানত হিসেবে যত্ন নেওয়া, প্রাকৃতিক ও নিরাপদ উপায়ে শক্তি অর্জন করা, আর সেই শক্তিকে লোকদেখানোর বদলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম বানানো।

বাহ্যিক প্রদর্শনীর চেয়ে ভেতরের আত্মিক ও চারিত্রিক শক্তিই হওয়া উচিত আসল লক্ষ্য।

কেন শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর বেশি প্রিয়

Read full story at source