চট্টগ্রাম অঞ্চলে পানি কমছে, বাঁশখালীর আট ইউনিয়নে এখনো দুর্ভোগ

· Prothom Alo

টানা কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পর আজ শুক্রবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অনেক এলাকায় রোদ উঠেছে। পানি নামতে শুরু করেছে চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, হাটহাজারীসহ বেশির ভাগ এলাকায়। তবে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে পানি কমলেও উপকূলের আটটি ইউনিয়নে বেড়েছে। এদিকে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার বিভিন্ন সড়ক এখনো পানিতে তলিয়ে থাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।

বাঁশখালীতে সোমবার থেকে টানা বৃষ্টির পর মঙ্গলবার পাহাড়ি ঢল নামে। এতে উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে কয়েকটি ইউনিয়নে পানি কমছে। তবে খানখানাবাদ, বাহারছড়া, কাথারিয়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, ছনুয়া, সরলসহ আটটি ইউনিয়নে পানি বেড়েছে।

Visit rouesnews.click for more information.

গতকাল বিকেলে উপজেলার বাহারছড়া, শেখেরখীল ও পুঁইছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বসতভিটায় দুই থেকে তিন ফুট পর্যন্ত পানি। শুকনা খাবারের ওপর নির্ভর করে দিন কাটাচ্ছেন এলাকার মানুষ। অনেক পরিবার শিশু ও নারীদের স্বজনের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবে ঘরে মালামাল থাকায় পুরুষ সদস্যরা বাড়িতেই অবস্থান করছেন। তাঁরা জানান, গত চার দিন রান্না পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে তাঁদের।

বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসন জানায়, উপজেলার ২১২টি গ্রামের মধ্যে অন্তত ১৫০টি গ্রাম পানির নিচে রয়েছে। ওই সব গ্রামের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। উপজেলায় সব মিলিয়ে এক লাখের বেশি ঘর প্লাবিত রয়েছে।

পুঁইছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, ঘর তলিয়ে যাওয়ায় তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বাড়িতে ফিরবেন। একই এলাকার মোহছেনা খাতুন বলেন, ‘১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়েও এমন কষ্ট পাইনি। জানি না ছেলেমেয়েদের নিয়ে কীভাবে থাকব।’

খানখানাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম সিকদার বলেন, স্লুইসগেট দিয়ে পানি নামলেও অতিরিক্ত পানির কারণে পুরো ইউনিয়ন এখনো প্লাবিত। সরকারিভাবে আড়াই টন চাল ও ৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

পানিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়ন ২ নং ওয়ার্ড এলাকা

গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ওসমান গনী বলেন, তাঁর ইউনিয়নের এক হাজারের বেশি পরিবার এখনো পানিবন্দী। তিন দিন ধরে অনেক পরিবারের চুলা জ্বলেনি। সরকারিভাবে পাওয়া দুই টন চাল ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৪ টন চাল এবং আড়াই হাজার পরিবারের মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ত্রাণ আরও বাড়ানো হবে।

এদিকে চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, ভাঙা সড়ক ও সেতু এবং মাছের খামারের ক্ষয়ক্ষতি এখন সামনে আসছে। হাটহাজারীর শিকারপুর ইউনিয়নে এখনো পানি নামেনি। জানতে চাইলে ওই ইউনিয়নের বাসিন্দা লোকমান হাকিম বলেন, পরিবার নিয়ে তিন দিন ধরে রাউজানে মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। উপজেলার দক্ষিণ বুড়িশ্চর, দক্ষিণ মাদার্শা ও উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নেও জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

খাগড়াছড়িতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দীঘিনালা-লংগদু ও খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে টানা তৃতীয় দিনের মতো যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাঘাইহাট-মাচালং-সাজেক সড়কের বিভিন্ন অংশও এখনো পানির নিচে। মহালছড়ির একটি সেতু ডুবে যাওয়ায় কয়েকটি এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

রাঙামাটি থেকে খাগড়াছড়িতে আসা অনিমেষ চাকমা বলেন, পথে চারটি স্থানে পানি থাকায় তাঁকে পাঁচবার যানবাহন পরিবর্তন করতে হয়েছে। কয়েকটি স্থানে হাঁটুপানি পেরিয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে তাঁকে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, খাগড়াছড়ির চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি কমতে শুরু করায় জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নেমেছে। এ কারণে অনেকই আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরছেন। তবে নিম্নাঞ্চলে এখনো পানি রয়েছে।

দীঘিনালার ইউএনও তানজিল পারভেজ বলেন, উপজেলায় ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৭ হাজারের বেশি পরিবার রয়েছে। তাদের জন্য খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাত থেকে পানি কমতে শুরু করায় কিছু সড়কে যান চলাচলও স্বাভাবিক হচ্ছে।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষ ও পানিবন্দী পরিবারগুলোর জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সড়কেই চলাচল করছে নৌকা। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা-লংগদু সড়কের মেরুং এলাকা থেকে তোলা ছবি

বান্দরবানেও বৃষ্টি কমে যাওয়ায় সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি নামতে শুরু করেছে। এতে বন্যা পরিস্থিতিরও ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। তবে নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকা এখনো প্লাবিত। বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কে পানি থাকায় শুক্রবারও যান চলাচল বন্ধ ছিল। জেলা সদরের সঙ্গে রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি ও রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

বান্দরবান আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনাতন মণ্ডল বলেন, বৃষ্টি আগের তুলনায় কমেছে। তবে ১২ জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন প্রথম আলোর বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, আনোয়ারা ও রাউজান প্রতিনিধি]

Read full story at source