পুকুরভরা দেশি মাছ, সাঁতরাচ্ছে হাঁস, পাশে ৭৫ প্রজাতির আমের বাগান

· Prothom Alo

বাড়ির সামনে দুটি পুকুর। পুকুর দুটি ভরা বিভিন্ন জাতের দেশি জাতের মাছে। সেই পানিতে সাঁতার কাটছে হাঁস। পুকুরপাড় এবং পাশের জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে সমৃদ্ধ এক আমবাগান। আমগাছের প্রতিটি ডালে ঝুলছে বাহারি রঙের আম। কোনোটি গাঢ় লাল, কোনোটার ওপরে হালকা লাল, নিচে সবুজ। কোনেটি গাঢ় সবুজ, কোনোটি আবার ম্লান হলুদ। আবার কোনোটি বেগুনি রঙের। বাগানে অন্যান্য ফলের গাছও রয়েছে। বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশি জাতের মুরগি। এই চিত্র যশোর সদর উপজেলার ধর্মতলা এলাকায়।

Visit tr-sport.click for more information.

আমগুলো শুধু রঙেই আলাদা নয়, আকারেও বৈচিত্র্যময়। বড়, ছোট, লম্বা, গোল কিংবা পাতলা—একেকটা আম একেক ঢঙের। আমের স্বাদ ও গন্ধেও রয়েছে ভিন্নতা। এক বাগানেই দেশি-বিদেশি নানা জাতের আমের এমন সমাহার। এ দৃশ্য যশোর শহরের গা–ঘেঁষা সদরের ধর্মতলা এলাকায় ‘অ্যাডামস অ্যাগ্রো ফার্ম’ নামের এক বাগানের।

চা উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পরামর্শক আবদুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদের স্বপ্নের ফসল এই বাগান ও পুকুর। শখের বশেই ২০২৩ সালে শুরু হয়েছিল সাত বিঘা জমিতে গড়া এই বাগান ও মাছ চাষের পথচলা। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বাগানটি ছেয়ে গেছে সবুজে। পুকরটি ভরে উঠেছে দেশি প্রজাতির মাছে। নিরুপদ্রব বাগান এবং পুকুর ঘিরে গড়ে উঠেছে পাখিদের অভয়ারণ্য। শখের এই বাগান হয়েছে শ্রমিকদের জীবিকার উৎস। বাগানটি পরিচালনার জন্য স্থায়ীভাবে নিয়োজিত আছেন দুজন শ্রমিক। অস্থায়ীভাবে আরও তিনজন শ্রমিক এখানে কাজ করেন।

গতকাল সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, দুই পাশে আমের বাগান, মাঝখানে দুটি পুকুর। বাগানটি বিভিন্ন রকমের ফলগাছ দিয়ে সাজানো। ফলদ গাছের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে আমগাছ। বেশির ভাগ আমগাছে ফলের ভারে ডাল নুইয়ে পড়েছে। বিদেশি জাতের অনেক আম আকার, আকৃতি ও রঙের দিক থেকে প্রচলিত জাতের আমের চেয়ে বেশ আলাদা। বাগানের সীমানায় রয়েছে নারকেল, খেজুর, জাম, লিচু, কলা, আখসহ নানা জাতের ফলদ উদ্ভিদ। বাগানের মধ্যে চরে বেড়াচ্ছে অনেকগুলো দেশি মোরগ-মুরগি। পুকুর দুটির পানিতে কিলবিল করছে দেশি প্রজাতির মাছ। পানিতে সাঁতার কাটছে অনেকগুলো পাতি ও রাজহাঁস। গাছগাছালিতে বসে পাখি ও কাঠবিড়ালি।

আব্দুল্লাহ মো. হোসেনের পুকুরে সাঁতার কাটছে হাঁস

বাগান ঘুরে দেখাতে দেখাতে আবদুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ জানান, প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে রয়েছে বাগান। এই বাগানে ৭৫ প্রজাতির সাড়ে ৮০০ আমগাছ আছে। জাপানের বিখ্যাত মিয়াজাকি, থাইল্যান্ডের চিয়াংমাই, ডকমাই, কিউজাই, হোয়াইট ম্যাংগো, চিলি ম্যাংগো, থাই কাঁচামিঠা ও ব্যানানা ম্যাংগো, আমেরিকান সুপার কেন্ট ও আমেরিকান রেড, আমেরিকান রেড পালমার, অস্ট্রেলিয়ান কেনসিংটন প্রাইড, আরটুইটু অস্ট্রেলিয়ান হাইব্রিড, মেক্সিকান পালমার, তাইওয়ান রেড জাতের পাশাপাশি দেশি হিমসাগর, বারি-৪, বারি-৬, বারি-১১, বারি-১৩, ল্যাংড়া, ফজলি, হাঁড়িভাঙা, আম্রপালিসহ দেশি-বিদেশি ৭৫ ধরনের আমের গাছ আছে বাগানে।

এ ছাড়া বাগানে আছে আট প্রজাতির লিচুগাছ, তিন প্রজাতির সফেদাগাছ। খেজুরগাছ আছে ২০০টি, রেজিনা চেরিগাছ ৩টি, তালগাছ ৩টি, নারকেলগাছ ৩৫টি, শরিফা ১টি, মিসরীয় লেবু ১টি, ১টি মিসরীয় জাতসহ পেয়ারাগাছ ৬টি, জামগাছ ৬টি, কতবেল ২টি, কাঁঠালগাছ ৬টি, ফলসা ১টি, জলপাই ১টি, বরই ১০টি, কুল ৪টি, বেল ১টি, তেঁতুল ১টি, করমচা ১টি, গাব ১টি এবং সুপারিগাছ রয়েছে ২৫০টি। এ ছাড়া রয়েছে ফলিরেড বা ফিলিপাইন ব্ল্যাক আখ। রয়েছে অনেকগুলো কলাগাছ, আছে আপেল গাছও।

পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ জানান, পুকুর দুটির আয়তন দুই বিঘার বেশি। পুকুরে চাষ করা হচ্ছে দেশি মাছ। রুই, কাতলা, মৃগেলের পাশাপাশি কার্প–জাতীয় মাছ রয়েছে। এ ছাড়া পুকুরে দেশি পুঁটি, খলসে, শিং, কই, মাগুর, টেংরা, বাইন, চিতল, পাঙাশ, থাই সরপুঁটি রয়েছে। আছে ১২০টি পাতিহাঁস, ১৯টি রাজহাঁস আর প্রায় সাড়ে ৩ শ দেশি মুরগি। এ ছাড়া রয়েছে ১৮টি অস্ট্রেলিয়ান ঘুঘু।

আবদুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে ১৯৮৮ সালে স্নাতকোত্তার পাস করেন। ওই বছর তিনি একটি চা–বাগানে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৯৭ সালে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ‘টি কন্সালট্যান্সি’ শুরু করেন।

আলাপচারিতায় আবদুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ বলেন, ১৯৯৬ সালে সিলেটের একটি চা–বাগানে চাকরি করার সময় তিনি প্রচুর গাছ লাগান। ওই সময় তাঁর মনে হয়, তিনি এত গাছ লাগাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর নিজস্ব কিছু নেই। নিজের জন্য গাছ লাগানো দরকার। তখন তিনি ঝুঁকি নিতে পারেননি। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি এলজি বাটারফ্লাই গ্রুপে চাকরি করেন। ওই সময় তাঁর কর্মরত প্রতিষ্ঠানের পাশে ব্র্যাকের নার্সারিতে নানা জাতের ফলের চারা দেখেন। সে সময়ই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, গাছ লাগাবেন। তখন থেকে নার্সারি, বৃক্ষমেলা এবং অনলাইন থেকে বিভিন্ন জাতের আমের চারা সংগ্রহ করে রোপণ শুরু করেন। ওই মাতৃগাছ থেকে এখন বহু গাছের জন্ম হয়েছে। গাছ থেকে তিনি নিজেই কলম তৈরি করেন।

আমবাগানে চরে বেড়াচ্ছে দেশি মুরগি

আবদুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদের বাবার নাম আবুল হোসেন, মা বেগম জাহান আরা। বাবা যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামে রেখে তিনি শহরে ফেরেন। এই শহরেই হানাদার পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গুলিবিদ্ধ ও গুম হন। তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়নি। ওই দম্পতির ছয় ছেলে। বড়জন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য উদ্যানতত্ত্ববিদ আবদুল্লাহ মো. ফারুক, মেজো ছেলে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী কোল্ড চেইন বিশেষজ্ঞ এস এম হোসেন শহীদ, সেজো ছেলে ডা. কর্নেল (অব.) এস এম হোসেন শহীদ, চতুর্থজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. এস এম হোসেন সা’দ, পঞ্চমজন ব্যবসায়ী এস এম হোসেন সাঈদ এবং শেষেরজন চা–উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পরামর্শক আবদুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ।

আবদুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ জানান, তাঁদের পৈতৃক জমি ছিল প্রায় ২৫ কাঠার মতো। পরে সব ভাই মিলে আরও জমি ক্রয় করেন। জমির পরিমাণ দাঁড়ায় সাত বিঘায়। জমিতে বর্তমানে আমবাগান ও দুটি পুকুর রয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ কাঠা জমির ওপর একতলা বাড়ি রয়েছে। বাকি জায়গায় ৭৫ প্রজাতির আম রয়েছে।

পুকুরে আছে দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছ

উদ্যোক্তা আবদুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ জানান, তাঁর মূল উদ্দেশ্য ফলদ উদ্ভিদের দেশি-বিদেশি জাত ও প্রজাতি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, শিক্ষামূলক প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ, নির্বাচিত জাতের নার্সারি উন্নয়ন ও চারা বিপণন এবং উৎপাদিত ফল অভ্যন্তরীণ বাজার ও বিদেশে রপ্তানি। এ জন্য ভবিষ্যতে তিনি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তাঁর দুই একর জমিতে রাম্বুটান এবং চা–বাগান করতে চান। তা ছাড়া পুকুর দুটিতে আরও বেশি দেশি প্রজাতির মাছের চাষ করে বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।

যশোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক দীপঙ্কর দাশ বলেন, ‘যশোরে অ্যাডামস অ্যাগ্রো ফার্মের মতো বৈচিত্র্যময় আমের জাতের বাগান আর নেই। এই আমের বাগানে ৭৫ প্রজাতির আমগাছ আছে, আমাদের সেন্টারে আছে ৫৩ প্রজাতি। আবদুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ বিভিন্ন নার্সারি, বৃক্ষমেলা থেকে এসব প্রজাতির আমের চারা সংগ্রহ করেছেন। আমরা তাঁকে গ্রাফটিং, পেস্টিসাইড ব্যবহার, সার প্রয়োগ ইত্যাদি প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকি।’

Read full story at source