জর্জ অরওয়েল: ‘বড় ভাই’ কি আজও আমাদের নজরে রাখছে
· Prothom Alo

জর্জ অরওয়েল (২৫ জুন ১৯০৩—২১ জানুয়ারি ১৯৫০) তাঁর দুটি কাজের জন্য বিখ্যাত। একটি রূপকাশ্রয়ী উপন্যাস অ্যানিমেল ফার্ম। এটি স্তালিনবাদের সিস্টেমের বিরুদ্ধে লেখা। অন্যটি ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস নাইনটিন এইটি ফোর। এ দুটি উপন্যাসেই লেখক ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করেছেন ও দেখিয়েছেন ‘ক্ষমতা’ কীভাবে নিপীড়ক সংস্থার হয়ে কাজ করে। ক্ষমতাবান (বিগ ব্রাদার বা বড় ভাই) কীভাবে নজরদারিতে রাখে সাধারণ মানুষকে শাসন করার জন্য।
Visit grenadier.co.za for more information.
অরওয়েল ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে যে ‘সত্য’র চেয়ে ‘মিথ্যা’র গুরুত্ব অনেক বেশি—সেসব বিভিন্ন চরিত্রের ভেতর দিয়ে বলেছেন। মজার বিষয়, তাঁর এ দুটি উপন্যাসই খুব সহজে পাঠ করা যায়—দুর্বোধ্য নয়। এমনকি কিশোর বয়সেও পাঠ করলে বুঝতে কোনো সমস্যা হয় না।
জর্জ অরওয়েল সম্পর্কে এতকাল বলা হতো তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক। কিন্তু সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে তাঁর লেখা নিয়ে অন্য বিশ্লেষণও করা হচ্ছে। এই বিশ্লেষকদের একজন অশোক সুব্রামানিয়ান। তিনি একজন উত্তর কাঠামোবাদী বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত। তাঁর একটি লেখা চলতি বছরই ‘মিডিয়াম’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ লেখার শুরুতেই তিনি লিখেছেন, ‘কেউ হয়তো তর্ক করতে পারেন, অ্যানিমেল ফার্ম তার পাঠকদের “ফ্যাসিবাদ”-এর সংঘাত ও ফাটল সম্পর্কে সতর্ক করার ক্ষেত্রে একটি মাস্টারপিস। কিন্তু এখন উপলব্ধি করলাম, সমাজ সব সময়ই ক্ষমতার দ্বারা চালিত হয় এবং ক্ষমতাই নিয়মকানুন নির্ধারণ করে। ক্ষমতা মানুষের দুটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এ দুটি স্তম্ভ হলো ভয় ও লোভ। আমরা যে পরিবর্তন চাই তা কখনো কখনো কিঞ্চিৎ ঘটে কিন্তু বড় রকমের পরিবর্তন কখনো হয় না। এ সত্যটা আমরা স্বীকার করতে ভয় পাই। সব সময়ই স্বৈরাচার আমাদের “অদৃশ্য শত্রু”র ভয় দেখায় এবং শাসন করে। আর শাসক মানেই স্বৈরাচারী যে হয়ে ওঠে সেটি দেখা যায় যে কোনো রাষ্ট্রক্ষমতার দিকে তাকালেই। সবখানেই জোন্স আর স্নোবলদের (অ্যানিমেল ফার্মের চরিত্রের নাম) দেখতে পাওয়া যায়। জোন্স হচ্ছে দমনকারী আর স্নোবল আদি বিদ্রোহকারী। কিন্তু যা কিছুই ঘটুক না কেন, সব আগেরই মতো থেকে যায়।’
অশোক সুব্রামানিয়ানের মতে, ক্ষমতা মানুষের সভ্যতায় থাকবেই।
এ ক্ষমতার প্রশ্নে জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটি ফোর উপন্যাস নিয়ে এক আলোচনা লেখেন এডমন্ড ভ্যান ডেন বসশে। এ লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে। ফরাসি দার্শনিক মন্তেস্কু বলেছিলেন, ‘একটি মুক্ত সমাজে ব্যক্তিরা ভালোভাবে যুক্তি দিতে পারে কি না, কথা বলতে পারে কি না, তা সব সময় গুরুত্বপূর্ণ নয়, তারা যে যুক্তি দেয় সেটাই যথেষ্ট, তাদের ব্যক্তিচিন্তা থেকেই স্বাধীনতার জন্ম হয়।’
জর্জ অরওয়েলউপন্যাসে উইনস্টন যে মন্ত্রণালয়ে কাজ করে সে মন্ত্রণালয়ের নাম ‘সত্য মন্ত্রণালয়’। অতীতের সব সত্যকে মিথ্যায় রূপান্তর করাই তার কাজ। তাকে পার্টির পক্ষ থেকে শেখানো হয়, ২ ও ২ যোগ করলে ৪ হয় না, হতে হবে ৫। শেখানো হয়, সে যা দেখছে, তাই একমাত্র সত্য নয়। যা শুনছে, তা সঠিক নয়। তাকে পার্টির পক্ষ থেকে (ক্ষমতাশীল শক্তি) যা বলা হয় সেটিই সত্য। এসবে হাঁপিয়ে ওঠে উইনস্টন।
মন্তেস্কুর এ কথার ঠিক দুই শতাব্দী পরে জর্জ অরওয়েল নাইনটিন এইটি ফোর উপন্যাস লেখেন ১৯৪৯ সালে। তিনি এ উপন্যাসে দেখান, উইনস্টন এমন একটি দেশে বাস করে যেখানে ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা নিষিদ্ধ। রাষ্ট্র যেভাবে চিন্তা করতে শেখাবে, তাকে সেভাবেই চিন্তা করতে হবে।
ব্র্যাকেটে বলি, আমাদের স্টেট আইডোলজিক্যাল অ্যাপারেটস-এর কথা এখানে মনে রাখতে হবে।
এ উপন্যাসে উইনস্টন তার স্বাধীন চিন্তাকে ব্যবহার করতে চায় কিন্তু পারে না ‘বড় ভাইদের’ (ক্ষমতাশালী চরিত্র) জন্য। প্রতিরোধ করতে গিয়ে উইনস্টন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং তার স্বাধীন সত্তার মৃত্যু ঘটে। আর সে সময়েই আরেক দাসের জন্ম হয়।
এডমন্ড ভ্যান ডেন বসশেও দেখিয়েছেন, ক্ষমতা মূলত চিরস্থায়ী হতে চায় এবং তার প্রকৃতি নিপীড়নমূলক।
উপন্যাসে উইনস্টন যে মন্ত্রণালয়ে কাজ করে সে মন্ত্রণালয়ের নাম ‘সত্য মন্ত্রণালয়’। অতীতের সব সত্যকে মিথ্যায় রূপান্তর করাই তার কাজ। তাকে পার্টির পক্ষ থেকে শেখানো হয়, ২ ও ২ যোগ করলে ৪ হয় না, হতে হবে ৫।
শেখানো হয়, সে যা দেখছে, তাই একমাত্র সত্য নয়। যা শুনছে, তা সঠিক নয়। তাকে পার্টির পক্ষ থেকে (ক্ষমতাশীল শক্তি) যা বলা হয় সেটিই সত্য।
এসবে হাঁপিয়ে ওঠে উইনস্টন।
মূলত এ উপন্যাসের দুটির পরই কর্তৃত্ববাদ, সমগ্রবাদ, ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ, মিথ্যাচারের মতো বিষয়গুলোও সারা বিশ্বে একটি বিশেষ তকমা পায়, যেটিকে বলা হয়, ‘অরওয়েলিয়ান’।
অ্যানিমেল ফার্মেও আমরা দেখি, সত্যের চেয়ে মিথ্যা বলায় জোর দেওয়া হচ্ছে বেশি।
১৯১৭ সালে লেনিনের নেতৃত্বে যে বলশেভিক বিপ্লব ঘটে স্তালিনের শাসনামলে এটি যেন সমাজবাদী একনায়কতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। যারা সাম্যের কথা বলত, তারা জোরজবরদস্তি করে। স্তালিনের সেই অসংগতিপূর্ণ কর্মকাণ্ডকেই সার্বিকভাবে ব্যঙ্গ করা হয়েছে এই উপন্যাসে। বইটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে লেখা। এখানেও স্কুয়েলার নামের এক শূকর। তার দায়িত্ব ছিল খামারের নতুন নেতা নেপোলিয়নকে নিয়ে সত্য-মিথ্যা গল্প বানিয়ে অন্য শূকরদের প্রভাবিত করা।
ম্যানর ফার্মের মালিক মি. জোন্স। তার ফার্মে পশুদের ওপর চলে দিনের পর দিন অবিচার নির্যাতন। একদিন ফার্মের সবচেয়ে জ্ঞানী এবং বয়স্ক শূকর ‘বৃদ্ধ মেজর’ শোনায় মুক্তির কথা। এই বৃদ্ধ মেজর চরিত্রে কার্ল মার্ক্স ও ভ্লাদিমির লেনিন—উভয়েরই প্রতীকী ছায়া দেখা যায়। বৃদ্ধ মেজর ফার্মের পশুদের এমন এক ফার্মের স্বপ্ন দেখায়, যে ফার্মে থাকবে না জোন্সের মতো অত্যাচারী প্রভু। কাউকে হতে হবে না দাসের মতো। সবাই সমান অধিকার পাবে। সবাই একতাবদ্ধ হয়। এর মধ্যে একদিন মারা যায় বৃদ্ধ মেজর। কিন্তু শূকরদের নেতৃত্বে বিপ্লব সাধিত হয়।
‘ম্যানর ফার্মের’ নাম পাল্টে রাখা হয় ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’। নতুন ইশতেহার তৈরি হয়। এসব ইশতেহারের কথাগুলো মেধাবী স্নোবল দেয়ালে লিখে রাখে।
এগুলো এ রকম:
১. দুই পায়ে হাঁটা প্রাণী আমাদের শত্রু।
২. যেসব প্রাণী চার পায়ে চলাফেরা করে অথবা যাদের দুটো ডানা আছে তারাই বন্ধু।
৩. কোনো প্রাণী পোশাক পরবে না।
৪. কোনো প্রাণী বিছানায় ঘুমাবে না।
৫. কোনো প্রাণী মদ্যপান করবে না।
৬. কোনো প্রাণী অন্য কোনো প্রাণীকে হত্যা করবে না।
৭. সব প্রাণীই সমান।
‘অ্যানিমেল ফার্ম’ উপন্যাসের প্রচ্ছদব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েল সম্পর্কে জীবনীকার মাইকেল শেলডেন লিখেছেন, অরওয়েল শৈশব থেকেই স্বাধীনচেতা ছিলেন। লন্ডনের সেন্ট সাইপ্রিয়ান’স স্কুলে পড়ার সময়েই অরওয়েল তাঁর এক সহপাঠীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কেন তারা শুধু স্কুলের সিলেবাসের বই পড়ে? এই সিলেবাসের বইগুলো কারা নির্ধারণ করে? কেন করে? এসব নির্ধারণ করার মানদণ্ড কী?
এসব থেকেই বোঝা যায় ‘প্রাণীবাদ’-এর মোড়কে আসলে ‘স্তালিনবাদ’কে কটাক্ষ করেছেন অরওয়েল অ্যানিমেল ফার্মে।
কিন্তু শেষের দিকে স্নোবল ও নেপোলিয়নের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। স্কুয়েলার নেপোলিয়নের পক্ষ নেয়। সত্যের মতো শোনালেও মিথ্যা বলতে থাকে অন্য শূকরদের কাছে। প্রপাগান্ডা। তারপর একদিন নেপোলিয়ন এক নৈশভোজে পিলকিংটন নামে একজন মানব কৃষককে আপ্যায়ন করলে মানব ও পশু উভয় সম্প্রদায়ের শ্রমিকদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। নেপোলিয়ন ঘোষণা করে যে ফার্মের নাম আবার ‘ম্যানর ফার্ম’ হবে।
ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েল সম্পর্কে জীবনীকার মাইকেল শেলডেন লিখেছেন, অরওয়েল শৈশব থেকেই স্বাধীনচেতা ছিলেন। লন্ডনের সেন্ট সাইপ্রিয়ান’স স্কুলে পড়ার সময়েই অরওয়েল তাঁর এক সহপাঠীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কেন তারা শুধু স্কুলের সিলেবাসের বই পড়ে? এই সিলেবাসের বইগুলো কারা নির্ধারণ করে? কেন করে? এসব নির্ধারণ করার মানদণ্ড কী? তিনি তরুণ বয়সে তাই ভারতীয় পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। এরপর বার্মায় যান পুলিশ সদস্য হিসেবে। বার্মায় গিয়েও সহিংসতা দেখেছেন। দেখেছেন নিজের দেশ ব্রিটেনে বৈষম্য। পরবর্তী সময়ে কাজ করেছেন বিবিসিতে। সবখানেই দেখেছেন ক্ষমতাশালীদের কর্তৃত্ববাদ ও নিজেদের মতো সেন্সরশিপ। এসবই তাঁকে দ্রুত ‘সমগ্রবাদ’-এর বিপরীতে দার্শনিক অবস্থান নিতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে ‘নিউইয়র্ক টাইমসের’ লেখায় এডমন্ড ভ্যান ডেন বসশে নাইনটিন এইটি ফোর উপন্যাসের প্রাসঙ্গিকতার বিষয়ে বলেছেন, ‘এখনো বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যকার সম্পর্কেরও একটি অরওয়েলীয় দিক রয়েছে। বিশ্বনেতাদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে সর্বোত্তম প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আমরা কি শুনিনি যে আরও বেশি ও উন্নত অস্ত্র মানেই আরও সুরক্ষিত বিশ্বশান্তি? আজকের বিশ্ব কি বিগ ব্রাদারের স্লোগানের মতো “যুদ্ধই শান্তি”র পরিবর্তে “পারমাণবিক শক্তিই শান্তি” বলছে না? অস্ত্রভান্ডারের জবাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ চলছে না? তার মানে এই বিশ্ব পাল্টাল কখন? সভ্যতার নামে আদৌ কি আমরা পাল্টিয়েছি?’
লরা বিয়ার্স সিএনএনে একটি লেখায় নাইনটিন এইটি ফোর উপন্যাস সম্পর্কে লেখেন, বিশ্বে এখনো যে রকম নির্যাতন হচ্ছে দেশে দেশে তারই প্রতিচ্ছবি এ উপন্যাসে আগাম এঁকেছেন অরওয়েল। স্বৈরাচারী পুলিশের এজেন্টরা বিশ্বাসঘাতকতার মিথ্যা মামলা দিয়ে উইনস্টন স্মিথ ও জুলিয়া নামের এক দম্পতিকে আটক করে। কারণ তারা শাসকের পক্ষের না এমন সন্দেহ করা হচ্ছিল। উইনস্টন স্মিথ, যিনি সত্য মন্ত্রণালয়ে জাল খবর তৈরিতে কাজ করেন কিন্তু তার প্রেমিকা জুলিয়া রাজনীতিতে আগ্রহী নন। এক রাতে উইনস্টন জুলিয়ার সঙ্গে সরকারের কাজের ব্যাপারে আলাপ করতে গেলে দেখে যে জুলিয়া এসব আলাপে আগ্রহী না, সে ঘুমিয়ে পড়েছে। এই ঘুমিয়ে পড়াও যেন অপরাধ। কারণ তারা সরকারি নজরদারিতে ছিল। ফলে তাদের গ্রেপ্তারের পর চলে অত্যাচার।
অরওয়েল ‘বিগ ব্রাদার’ চরিত্রে এমন একজন স্বৈরশাসককে তাঁর উপন্যাসে তুলে এনেছেন, যাঁর মধ্যে জার্মানির হিটলার এবং সোভিয়েতের স্তালিন—দুজনেরই বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
এই ‘বিগ ব্রাদার’ মদ, অর্থ, নারী ও ক্ষমতা ভালোবাসে। এই বিগ ব্রাদারই শাসকের প্রতিমূর্তি, ক্ষমতার সর্বব্যাপী প্রতীক।
‘নাইনটিন এইটি ফোর’ উপন্যাসের প্রচ্ছদআরেক জায়গায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একজন মুখপাত্র হিসেবে ১৯৪৩ সালের পদত্যাগের সময়ের স্মৃতিচারণা করে লিখেছেন, ‘আমার নিজের সময় আর সরকারের অর্থ—দুটিই অহেতুক নষ্ট করছিলাম। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করছিলাম না। কারণ, যুদ্ধের বিবরণ লেখা, হিসাব রাখা আমার কাজ নয়। ব্রিটিশদের রাজনৈতিক চালগুলো বাস্তবায়ন করা আমার কাজ না। অযথা সময় নষ্ট করছিলাম।’
এ উপন্যাসের একটি বিখ্যাত সংলাপ ছিল—‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ’, অর্থাৎ বড় ভাই তোমাকে নজরে রাখছে। উপন্যাসে দেখানো হয় প্রতিটি বাড়ির ভেতরে একটা দেয়ালে একটি যন্ত্র বসানো রয়েছে। সেই যন্ত্রের রয়েছে একটি পর্দা। আর এই যান্ত্রিক পর্দার মাধ্যমে বিগ ব্রাদার বা বড় ভাই (সরকার) বাসিন্দাদের ওপর চাইলেই নজর রাখতে পারছে। এই গণনজরদারি কি এখন বিশ্বে পাল্টেছে? মোটেও নয়। দেশে দেশে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নজরদারির অভিযোগ এখনো আলোচিত। যেমন উইনস্টন স্মিথকে টর্চার সেলে নির্যাতন করা হয়।
এ উপন্যাসে দেখা যায়, বিশ্ব তখন তিন ভাগে বিভক্ত—ওশেনিয়া, পূর্ব এশিয়া ও ইউরেশিয়া। এই তিন সাম্রাজ্য একে অপরের সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে এক অমীমাংসিত যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এখনো অনেকটা সে রকমই। প্রথম বিশ্ব, উন্নত বিশ্ব (ইউরোপ) ও তৃতীয় বিশ্ব।
আমরা মূলত অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম-এ দেখি সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থাকে প্রহসন করেছেন, কিন্তু নাইনটিন এইটি ফোর-এ লেখক প্রতিটি হাসির পেছনে প্রকাশ করেছেন প্রচণ্ড হতাশা। অবশ্য ব্যক্তিজীবনেও অরওয়েল তখন হতাশ ছিলেন।
উপন্যাসে উইন্সটনের শীর্ণ দেহের বর্ণনার সঙ্গে জর্জ অরওয়েলের অসুস্থ দৈহিক গড়নের অনেকটা মিল পাওয়া যায়। সেন্ট এলিজাবেথ মেডিক্যাল সেন্টারের জন রস জানান, ‘অরওয়েল তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক থেকেও সে সময় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, এ বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা কখনোই পাল্টাবে না। এটি যেন একধরনের চক্রবিশেষ।’
অরওয়েল জানিয়েছিলেন, ‘তিনি অসুস্থ না থাকলে হয়তো উপন্যাসটি এত বিষণ্ন হতো না। তাঁর মতে, পুরো কাজটি ছিল বিরক্তিকর এবং হতাশাপূর্ণ!’ কিন্তু জন রসের মতে—‘অসুস্থতা যেন তাঁর সেরা কাজটি বের করে এনেছিল।’
তবে অরওয়েল তাঁর ডায়েরিতে বিক্ষিপ্ত বেশ কিছু কথা লিখেছিলেন।
যেমন, ‘একাকী এবং অসহায় শিশুর যেমন মাঝে মাঝে কিছুই করার থাকে না এলোমেলো স্বপ্ন সাজানো ছাড়া, আমিও তেমনই গল্প বানাতাম। ক্রমেই এটি আমার অভ্যাসে পরিণত হয়। আমি সব জায়গাতেই একা ছিলাম। বার্মায় পুলিশের চাকরি করার সময়। সাংবাদিকতা করার সময়। এমনকি কলেজে যখন পড়তাম তখনো আমি অভিজাত সন্তানদের বহরে মিশতে পারতাম না।
আমি মনে করি, আমার সাহিত্যের শুরুতে মিশে আছে সবার থেকে আলাদা হয়ে একা বাস করা এবং এক শিশুর মতো অবাক বিস্ময়ে সবকিছু পরখ করা।’
আরেক জায়গায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একজন মুখপাত্র হিসেবে ১৯৪৩ সালের পদত্যাগের সময়ের স্মৃতিচারণা করে লিখেছেন, ‘আমার নিজের সময় আর সরকারের অর্থ—দুটিই অহেতুক নষ্ট করছিলাম। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করছিলাম না। কারণ, যুদ্ধের বিবরণ লেখা, হিসাব রাখা আমার কাজ নয়। ব্রিটিশদের রাজনৈতিক চালগুলো বাস্তবায়ন করা আমার কাজ না। অযথা সময় নষ্ট করছিলাম।’
অন্য জায়গায় লিখেছিলেন, ‘শাসক ও জনগণের কি চরিত্র পাল্টায়? হয়তো পাল্টায় না। মুখ পাল্টায় শুধু।’