কেন নাক ডাকে

· Prothom Alo

রাতে নাক ডাকার শব্দে রীতিমতো ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠার দশা! এমনটা কারও কারও সম্পর্কে শোনা যায়। যিনি নাক ডাকেন, তিনি বুঝতে না পারলেও পাশের মানুষটির ঘুমের দফারফা হয়ে যায় তাঁর নাক ডাকার শব্দে। এ থেকে কি রেহাই নেই? কেনই-বা নাক ডাকে?

আসলের ঘুমানোর পর আমাদের শরীরের প্রায় সব মাংসপেশিই কিছুটা শিথিল হয়ে আসে। তেমনি শিথিল হয় গলার মধ্যের টিস্যু ও পেশিগুলোও। ফলে গলবিল বা শ্বাসনালিতে কিছুটা ব্লকের সৃষ্টি হয়। যখন ঘুমের মধ্যে নাক দিয়ে শ্বাসের সঙ্গে বাতাস প্রবেশ করে, তখন সেই বাতাস এই শিথিল টিস্যুগুলোয় কম্পন বা ভাইব্রেশন তৈরি করে। এটাই নাক ডাকার শব্দ সৃষ্টি করে। এই জিনিস সবার ক্ষেত্রেই ঘটে। গবেষণা বলে, ৪০ শতাংশ পুরুষ আর ২৪ শতাংশ নারীর ঘুমের মধ্যে নাক ডাকার প্রবণতা রয়েছে; কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে এই শব্দ বেশ জোরালো হয়ে দেখা দেয়।

Visit h-doctor.club for more information.

নিজের নাক ডাকার শব্দে নিজের ঘুম ভাঙে না কেন
আসলের ঘুমানোর পর আমাদের শরীরের প্রায় সব মাংসপেশিই কিছুটা শিথিল হয়ে আসে। তেমনি শিথিল হয় গলার মধ্যের টিস্যু ও পেশিগুলোও। ফলে গলবিল বা শ্বাসনালিতে কিছুটা ব্লকের সৃষ্টি হয়।

কাদের বেশি নাক ডাকে

নাকের অ্যানাটমি: কারও কারও সফট প্যালেট বা নাকের পেছনের নরম তালুর মাংস মোটা বা পুরু থাকে। কারও আবার উভুলা বা তালু থেকে ঝুলন্ত ছোট্ট বাড়তি অংশটুকু লম্বা থাকে। এর ফলে ঘুমের মধ্যে বাতাস ঢোকার সময় বেশি কম্পনের সৃষ্টি হয়।

স্থূলতা: যাঁরা স্থূল বা মোটা তাঁদের গলার পেছনে, তালুতে চর্বি জমে ও পুরু হয়ে থাকে। এর ফলে শ্বাসনালি সরু হয়ে পড়ে। বাতাস ঢোকার সময় বাধা পায় ও কম্পনের সৃষ্টি করে বেশি। তাই ওজন বেশি এমন মানুষদের বেশি নাক ডাকার প্রবণতা দেখা দেয়।

নাকের সমস্যা: সব সময় নাক বন্ধ থাকলে বা দুই নাকের মধ্যবর্তী সেপটাম বা পর্দা বাঁকা থাকলে কিংবা জিবের আকার, টনসিল বা অ্যাডিনয়েড বড় থাকলে শ্বাসে বাধা বেশি হয় এবং নাক ডাকে বেশি।

ঘুমের পজিশন: চিত হয়ে ঘুমানোর সময় শ্বাসনালি সবচেয়ে বেশি সরু হয়ে থাকে। তাই যাঁরা চিত হয়ে ঘুমান, তাঁদের নাক ডাকে।

মদ্যপান, ধূমপান, ওষুধ: অ্যালকোহল এবং ধূমপান নাক ও শ্বাসনালির টিস্যু ও পেশিকে রিলাক্স বা শিথিল করে। এ ছাড়া কিছু ওষুধও এর জন্য দায়ী।

স্লিপ অ্যাপনিয়া: অতিরিক্ত নাক ডাকা একটি গুরুতর রোগের লক্ষণ হতে পারে। এর নাম অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া। সাধারণত স্থূল ব্যক্তিদের এ সমস্যা হয় বেশি। এ কারণে রাতে ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালিতে বাধা থাকার কারণে শ্বাসে বারবার ব্যাঘাত ঘটে এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়।

নিজেদের নাক সব সময় দেখতে পাই না কেন
সব সময় নাক বন্ধ থাকলে বা দুই নাকের মধ্যবর্তী সেপটাম বা পর্দা বাঁকা থাকলে কিংবা জিবের আকার, টনসিল বা অ্যাডিনয়েড বড় থাকলে শ্বাসে বাধা বেশি হয় এবং নাক ডাকে বেশি।

নাক ডাকা কি খারাপ কিছু

সামান্য নাক ডাকা খুবই সাধারণ একটি বিষয়। পাশের ব্যক্তির ঘুমের ব্যাঘাত ও বিরক্তি সৃষ্টি ছাড়া এটি তেমন ক্ষতিকর নয়; কিন্তু অতিরিক্ত নাক ডাকা যদি স্লিপ অ্যাপনিয়ার জন্য হয়, তবে তা একটি জটিল সমস্যা। স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে রাতে ঘুমের মধ্যে সহস্রাধিকবার মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব ঘটার কারণে ঘুম ভেঙে যায়, যা হয়তো আক্রান্ত ব্যক্তি টেরও পান না। ফলে দিনের বেলায় বারবার ঘুম পায়, মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে, মাথাব্যথা ও স্মরণশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। স্লিপ অ্যাপনিয়া উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে কি না, জানতে চিকিৎসকেরা স্লিপ স্টাডি বা পলিসমনোগ্রাফি নামে একটি পরীক্ষা করে থাকেন।

নাক ডাকা বন্ধ করতে কী করা যায়

ওজন কমানো খুবই কার্যকর উপায়। বেশির ভাগ নাক ডাকার কারণ অতিরিক্ত ওজন। ওজন কমালে শ্বাসনালি ও গলার চর্বি কমে, ফলে বাতাস প্রবেশে বাধা কম পায়। নাক বন্ধ বা অ্যালার্জি থাকলে তার চিকিৎসা নিতে হবে। নাকের ড্রপ, সারাল স্প্রে বা অ্যান্টিহিস্টামিন নাক খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে, যে কারণে শ্বাস নিতে সুবিধা হয়। ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলতে হবে। নাসাল স্ট্রিপ বা মুখে লাগানোর মাউথ গার্ড নামের ডিভাইস ব্যবহার করা যায়। যদি বড় টনসিল বা অ্যাডিনয়েড সমস্যা হয়ে থাকে, তবে তা অস্ত্রোপচার করে ফেলে দেওয়া যায়। নাকের মধ্যকার পর্দা বা সেপটাম বাঁকা থাকলেও তা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ঠিক করা সম্ভব। যদি নাকের পেছনের নরম তালু বা সফট প্যালেট পুরু থাকে, তবে লেসার এসিসটেড উভুলোপ্যালাটোপ্লাস্টি করা যায়।

নাক ও মুখ কেন একসঙ্গে থাকে
বেশির ভাগ নাক ডাকার কারণ অতিরিক্ত ওজন। ওজন কমালে শ্বাসনালি ও গলার চর্বি কমে, ফলে বাতাস প্রবেশে বাধা কম পায়। নাক বন্ধ বা অ্যালার্জি থাকলে তার চিকিৎসা নিতে হবে।

ঘুমের পজিশন পরিবর্তন করেও কিছুটা উপকার মেলে। যাঁরা নাক ডাকেন, তাঁরা পাশ ফিরে ঘুমালে নাক ডাকা কমে। মাথার দিকটা বা বালিশ একটু উঁচু করেও সুফল মেলে। ঘুমের আগে পেট পুরে খাওয়া ভালো নয়। ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে খাওয়া শেষ করতে হবে।

কোনো কোনো বিজ্ঞানী শ্বাসনালির পেশি নমনীয় ও শক্ত করতে থ্রোট এক্সারসাইজের কথা বলেন। এই ব্যায়ামের কয়েকটি ধরন হলো—মুখ বন্ধ করে ঠোঁট গোল করে ৩০ সেকেন্ড শ্বাস নেওয়া, জিব দিয়ে তালু স্পর্শ করার ব্যায়াম করা, ইংরেজি স্বরবর্ণগুলো তিন মিনিট ধরে শব্দ করে উচ্চারণ করা দিনে কয়েকবার, মুখ খুলে চোয়াল এদিক–ওদিক করা ইত্যাদি।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগীদের রাতে ঘুমানোর সময় সিপ্যাপ যন্ত্র ব্যবহার করতে বলা হয়। সিপ্যাপ মানে কনটিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার। এতে একটি মাস্কের মাধ্যমে প্রেশারাইজিড এয়ার নিশ্বাসের সঙ্গে দেওয়া হয়, যাতে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ ঠিক থাকে।

লেখক: অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিতআমাদের চোখ–কান দুটি, কিন্তু নাক কেন একটি

Read full story at source