যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য ‘রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন’ হয়ে এসেছে
· Prothom Alo

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন হয়ে এসেছে। এই চুক্তি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের তিনটি মূল ভিত্তিকে ভেঙেচুরে দিয়েছে এবং তাঁকে একটি নতুন নিরাপত্তা সংকটে ফেলে দিয়েছে।
যে ব্যক্তি নিজেকে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরামর্শক হিসেবে উপস্থাপন করতেন এবং আমেরিকান রাজনীতিবিদদের ওপর যাঁর প্রকৃত প্রভাব ছিল বলে মনে করা হতো, তিনি কীভাবে তাঁর প্রধান মার্কিন মিত্রের দ্বারা এতটা উপেক্ষিত এবং প্রকাশ্যে এত অপমানিত হতে পারেন?
Visit bettingx.bond for more information.
যে ব্যক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রে ইরানকে মোকাবিলার বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি কীভাবে এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ শেষ করেন, যেখানে অনেকের মতে ইরান আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে?
এবং ইসরায়েলের ‘মি. সিকিউরিটি’ (নিরাপত্তার প্রতীক) হিসেবে তাঁর যে পুরোনো রাজনৈতিক পরিচিতি, তা ইতিমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ। এখন ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চাপের মুখে যদি ইসরায়েলকে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ করতে হয়, তাহলে তাঁর সেই ভাবমূর্তি কীভাবে টিকবে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এই ভালোবাসায় ফাটল দেখা দিয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেনএখন নেতানিয়াহুর সামনে যেসব পথ খোলা রয়েছে, সেগুলো তাঁর জন্য সুখকর নয়। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ গতকাল সোমবার নেসেটে (পার্লামেন্ট) সংক্ষেপে সেই পথগুলো তুলে ধরেছেন। আর তা হলো, হয় ইসরায়েলের সর্বশ্রেষ্ঠ মিত্রের (যুক্তরাষ্ট্র) সঙ্গে সরাসরি ও ধ্বংসাত্মক বিরোধে যাওয়া অথবা নতমস্তকে ইসরায়েলের স্বার্থগুলোকে বিসর্জন দেওয়া।
গত রোববার বৈরুতে হামলার নির্দেশ দেওয়ার সময় নেতানিয়াহু কোনো বিবেচনার পরিচয় দেননি বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কটূক্তিপূর্ণ মূল্যায়নকে ইতিমধ্যে হাতিয়ার করেছেন তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা। আগামী অক্টোরের শেষ নাগাদ অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে এটাকে ইতিমধ্যে সামনে নিয়ে আসছেন তাঁরা।
সেই সঙ্গে নেতানিয়াহুর নিজের দল লিকুদ পার্টির সদস্য এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের বক্তব্যেও নিজের শিবির থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর চাপে থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে লেবাননসহ সব জায়গায় সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে যে দাবি করা হয়েছে, তা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইসরায়েলের কট্টরপন্থীরা।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন– গভিরইসরায়েলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভির গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি মানতে আমরা বাধ্য নই। আমরা এই চুক্তির অংশীজন নই, যে চুক্তি আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।’
লিকুদ পার্টির সংসদ সদস্য অ্যারিয়েল কালনার বিবিসিকে বলেছেন, ‘ইসরায়েল নিজেকে সুরক্ষিত করে যাবে।’ তবে এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রাখবে তা বোঝানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেননি।
নেতানিয়াহুর দলের এই নেতা বলেন, ‘আমাদের যেটা করা দরকার, সেটা আমরা করব। আমরা আশা করি, আমাদের বন্ধুরা আমাদের বুঝতে পারবে।’ তিনি আরও বলেন, কখনো কখনো মিত্রদের মধ্যে মতভিন্নতা তৈরি হতে পারে এবং মিত্রদেরও তাদের সেই মিত্রদের বোঝা উচিত, যখন তারা বিপদে থাকে।
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা ও ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শিনে বলেন, মার্কিনরা কেন এটা মেনে নিচ্ছেন, সেটা বোঝা কঠিন হচ্ছে। লেবাননে কী ঘটবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা ইরানকে দেওয়ার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে হিজবুল্লাহকে সমর্থন অব্যাহত রাখার সুযোগ করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে লেবানিজ অঙ্গনে হিজবুল্লাহ যে একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি, সেটা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইসরায়েল এটা নিয়ে খুশি নয়, সেটা নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক যেকোনো ক্ষেত্রের জন্যই।
রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পক্ষ থেকে সমালোচনা ও ক্ষোভের তীব্র কোলাহলের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নিজে এখন পর্যন্ত নীরব রয়েছেন। সাধারণত কোনো সাফল্যের কৃতিত্ব নিতে তিনি দ্রুত এগিয়ে আসেন। কিন্তু এবার তাঁর এই নীরবতাকে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে তিনি যে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, সেটারই ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে।
নেতানিয়াহু কয়েক দশক ধরে ভোটারদের যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন, সেগুলোর কেন্দ্রে থাকে নিরাপত্তা। কিন্তু এবার তাঁর জন্য সেই বার্তা নিয়ে যাওয়াটা ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে পরিচালিত হামলার পর নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া ছিল ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতিকে আরও আক্রমণাত্মক পথে নিয়ে যাওয়া—হুমকি সৃষ্টি হওয়ার পর তা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে আগেভাগেই সম্ভাব্য হুমকিকে প্রতিহত করার কৌশল গ্রহণ করা।
ইসরায়েলের সামনে থাকা হুমকিগুলো নির্মূল করে মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দেওয়াকেই নেতানিয়াহু সেই সংকটের সমাধান হিসেবে দেখেছিলেন।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এখনো গাজার প্রায় অর্ধেক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেতবে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা উপত্যকার অনেক এলাকা ধ্বংস এবং ৭৩ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করলেও হামাস এখনো ভূখণ্ডটির প্রায় অর্ধেক অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং সেখানে আবার নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তা ছাড়া ইসরায়েল ও হামাস যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার আট মাস পরও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা এবং গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-নিযুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থাও এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে রয়েছে।
নেতানিয়াহুর নতুন নিরাপত্তা কৌশলের কারণে ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমানে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে রেখেছে। অনেক ইসরায়েলি এই দখলদারিকে ভালোভাবে দেখছেন এবং নির্বাচনের আগে এর অবসান হওয়ার সম্ভাবনাও কম। তবে একই সঙ্গে এটি ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা ও রিজার্ভ বাহিনীর ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কোনো সুস্পষ্ট কূটনৈতিক পথও এখনো দৃশ্যমান নয়।
হিজবুল্লাহ ও ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে বারবার সংঘাতের পরও ইসরায়েলের প্রধান প্রতিপক্ষগুলো নির্মূল হয়নি; বরং তেহরানের ক্ষমতা আরও কঠোরপন্থী নেতাদের হাতে চলে গেছে, যারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক শক্তিকে আগের তুলনায় কম ভয় পায় এবং হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে আরও বেশি কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে ইসরায়েলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকেই ইসরায়েলের প্রধান মিত্রের ওপর প্রভাবশালী অবস্থানে দেখা যাচ্ছে।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (আইএনএসএস) জ্যেষ্ঠ ইরান-বিষয়ক গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেছেন, ইসরায়েলের এই ব্যর্থতা তেহরান বিষয়ে তার কৌশল পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। তাঁর মতে, ইসরায়েলকে আরও বাস্তববাদী ও সংযমী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।
ইসরায়েল হায়োম নামের একটি পত্রিকায় ড্যানি সিট্রিনোভিচ লিখেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর যেকোনো পদক্ষেপকে ওয়াশিংটনে চুক্তি ভন্ডুলের একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর কঠোর প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। ওবামা প্রশাসনের সময় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কংগ্রেস ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে সমর্থন আদায় করে হোয়াইট হাউসকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এখন সেই সুযোগ তাঁর নেই বললেই চলে।
লুসি উইলিয়ামসন বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।