ফাঁদে ফেলে বাবাকে খুন করেন ছেলে, লাশ ফেলা হয় জঙ্গলে

· Prothom Alo

এক নারী বন্ধুর মাধ্যমে ফাঁদে ফেলা হয় বাবাকে। এরপর কৌশলে ওই নারী বন্ধুর বাসায় ডেকে আনা হয়। সেখানে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় বাইরে। পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে বাবাকে খুন করে লাশ জঙ্গলে ফেলে দেন ছেলে। পুলিশ লাশটি উদ্ধারের পর দাফন করে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে।

Visit esporist.com for more information.

গতকাল রোববার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিকের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বাবাকে খুনের এই বিবরণ দেন ছেলে। তাঁর নাম বেলাল হোসেন। গত শনিবার নগরের মইজ্জারটেক এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একই সময়ে খুনের ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে বেলালের এক স্বজনকেও (ভায়রা) মিরসরাই উপজেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর নাম আবদুল জলিল।

ছেলে বেলাল হোসেন একদিন জমির দালাল সেজে বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলে ভিটেমাটি বিক্রির চেষ্টার বিষয়ে নিশ্চিত হন। এরপর সম্পত্তি বিক্রি বন্ধে বাবাকে খুনের পরিকল্পনা করেন।

পিবিআই জানায়, খুনের ঘটনাটি দুই বছর আগের। নগরের হালিশহর রিংরোড এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় মীর মুজিবুর রহমান (৬০) নামের এক ব্যক্তির লাশ। তবে তখন ওই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে লাশটি দাফন করা হয়।

মীর মুজিবর রহমান পেশায় বাবুর্চি ছিলেন। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পূর্ব চাম্বল এলাকায়। তিনি চারটি বিয়ে করেন। এর মধ্যে প্রথম স্ত্রী রোকেয়া বেগমের ঘরে দুই সন্তান রয়েছে। তাঁদেরই একজন বেলাল হোসেন। অপর সন্তানের নাম আনোয়ার হোসেন। এ ছাড়া বাকি তিন স্ত্রীর মধ্যে দ্বিতীয় স্ত্রীর একটি মেয়ে এবং তৃতীয় স্ত্রীর ঘরে একটি মেয়ে রয়েছে। গ্রেপ্তার বেলাল হোসেন পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। তবে বিভিন্ন সময় মাইক্রোবাসও চালাতেন তিনি।

পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, মুজিবুরের বাড়ি বাঁশখালী হলেও তিনি ফটিকছড়ি উপজেলায় তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নানাবাড়িতে থাকতেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। তাই চিকিৎসার প্রয়োজনে মুজিবুর তাঁর মালিকানায় থাকা ৪০ শতক জমি বিভিন্ন সময়ে বিক্রি করেছেন। পরে বাঁশখালীতে থাকা ভিটেবাড়িও বিক্রি করতে শুরু করেন। এতে ক্ষুব্ধ হন তাঁর প্রথম স্ত্রীর দুই সন্তান।

বিক্রির এক পর্যায়ে মুজিবুরের মালিকানায় কেবল সামান্য ভিটেমাটি অবশিষ্ট ছিল। তিনি সেটিও বিক্রির চেষ্টা করছিলেন। ছেলে বেলাল হোসেন একদিন জমির দালাল সেজে বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলে ভিটেমাটি বিক্রির চেষ্টার বিষয়ে নিশ্চিত হন। এরপর সম্পত্তি বিক্রি বন্ধে বাবাকে খুনের পরিকল্পনা করেন।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বেলাল তাঁর বাবাকে খুনের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন বলে জানান পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, জমির দালাল সেজে বেলাল যে মুঠোফোন নম্বর থেকে তাঁর বাবাকে ফোন করেছিলেন, ওই নম্বরে একদিন ভুলবশত ফোন করে এক নারীর সন্ধান করেন মুজিবুর। তখন বেলাল চিন্তা করেন, কোনো নারীর সহযোগিতায় তাঁর বাবাকে ফাঁদে ফেলা যাবে। এরপর বাবার মুঠোফোন নম্বর নিজের এক নারী বন্ধুকে দেন বেলাল। ওই নারী মুঠোফোনে কথা বলে মুজিবুরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন।

পিবিআইয়ের কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, সম্পর্কের এক পর্যায়ে মুঠোফোনে পরিচয় হওয়া নারীর সঙ্গে দেখা করতে চট্টগ্রাম নগরে আসেন মুজিবুর। তিনি ওঠেন দ্বিতীয় স্ত্রীর মেয়ে সালমা বেগমের আন্দরকিল্লা এলাকার বাসায়। সেখান থেকে ২০২৪ সালের ৭ জুন মুঠোফোনে পরিচয় হওয়া ওই নারীর বাসায় যান। নগরের বাকলিয়া এলাকায় অবস্থিত ওই বাসায় পরিকল্পনা অনুযায়ী আগে থেকেই অবস্থান নেন বেলালের ভায়রা জলিল। সেখানে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে মুজিবুরকে অচেতন করে ফেলা হয়।

অচেতন অবস্থায় মুজিবুরকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রথমে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নগরের সিআরবি এলাকায় নেওয়া হয় বলে জানান পিবিআই পরিদর্শক মোস্তাফিজুর। তিনি জানান, মুজিবুরকে সিআরবিতে নেওয়ার পর সেখানে যান বেলাল। নগরের লালদিঘির পাড় এলাকা থেকে একটি হাইয়েস মাইক্রোবাস নিজে চালিয়ে সিআরবিতে যান তিনি। এরপর হাইয়েস মাইক্রোবাসটিতে তোলা হয় মুজিবুরকে। পরে নগরের আউটার রিংরোডে নিয়ে জলিলের সহায়তায় গলায় গামছা পেঁচিয়ে বাবাকে খুন করেন বেলাল। লাশটি সড়কের পাশের জঙ্গলে ফেলে দেন।

পিবিআই জানায়, লাশটি উদ্ধারের সময় মুজিবুরের পরনে লুঙ্গি, পাঞ্জাবি ছিল। একই সঙ্গে গামছাটিও তাঁর শরীরে পাওয়া যায়। হালিশহর পুলিশ লাশটি উদ্ধার করলেও পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি। যার কারণে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে দাফন করেন।

এদিকে মুজিবুরের খোঁজ না পেয়ে তাঁর মেয়ে সালমা বেগম ২০২৪ সালের ১০ জুলাই আদালতে একটি মামলার আবেদন করেন। এতে তাঁর বাবাকে অপহরণের অভিযোগ আনা হয় বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে। আদালত বাদীর অভিযোগ মামলা হিসেবে রেকর্ড করার জন্য কোতোয়ালি থানাকে নির্দেশ দেন। শুরুতে মামলাটি তদন্ত করে কোতোয়ালি থানা–পুলিশ। পরে আদালতের নির্দেশ পিবিআই মামলার তদন্ত শুরু করে।

পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পর থেকে বেলাল পলাতক ছিলেন। একপর্যায়ে বেলালের অবস্থান শনাক্ত করে পিবিআই তাঁকে গ্রেপ্তার করে। জলিলকেও গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযুক্ত নারীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, মূলত সম্পত্তি রক্ষার জন্যই বাবাকে খুন করেছেন বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বেলাল।

পিবিআইয়ের আরেক পরিদর্শক মর্জিনা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, বেলাল যেদিন তাঁর বাবার লাশ জঙ্গলে ফেলে দেন, পরের দিন সেটি উদ্ধার হয়। বেলালের তথ্যের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন ও মেয়ে সালমা বেগমের তথ্য মিলিয়ে রোববার মুজিবুরের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

নিহত মুজিবুরের মেয়ে সালমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘জন্মদাতা বাবাকে যে সন্তান খুন করেছে, আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, যাতে আর কোনো সন্তান তার বাবাকে খুন না করে।’

Read full story at source