আমাদের ক্যাশিয়ারদের চেনা রূপ, অচেনা যাপন
· Prothom Alo

একচিলতে সরকারি ক্যাশ কাউন্টার। ভেতরে বসা গম্ভীর ক্যাশিয়ার, বাইরে দাঁড়িয়ে চটপটে দালাল। এক ভুক্তভোগী ফির এক শ টাকা জমা দিতেই ভেতরের বাবু বললেন, ‘ফাইল আটকে আছে, সময় লাগবে।’ বাইরে থেকে দালাল এসে ফিসফিসাল, ‘ভাই, উনি এক শ টাকার নোট চোখে দেখেন না। পাঁচ শ টাকা দেন, আমি ওনার চোখের ডাক্তার।’ নিরুপায় লোকটা টাকা দিতেই ভেতরের বাবু চশমা ঠিক করে বললেন, ‘এই তো ফাইল ভেসে উঠেছে, কাজ শেষ!’ ভুক্তভোগী অবাক হয়ে দালালকে শুধাল, ‘তুমি কি বড় ডাক্তার?’ দালালের হাসিমুখের জবাব, ‘আরে না! আমি হলাম ওনার চাকা। উনি ভেতরের ইঞ্জিন। চাকা ছাড়া কি গাড়ি চলে?’
Visit milkshake.it.com for more information.
এক আড্ডায় বলা বন্ধুর এই কৌতুক আজ দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্যাশপয়েন্ট ব্যবস্থাপনার সফেদ চিত্র। সাধারণ মানুষ এই অনৈতিকতার জাল সহজেই টের পায়। ‘ইঞ্জিন আর চাকার’ অলিখিত নিয়মে চলছে দেশের সরকারি দপ্তরগুলো। বিশেষ করে ইউনিয়ন থেকে উপজেলার ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস বা সরকারি বিল পেমেন্টের বুথ—সর্বত্রই অসৎ ক্যাশিয়ারদের প্রচণ্ড দাপট।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্যাশিয়ার পদের বেতন সীমিত। কিন্তু কাউন্টারের বাইরে ওত পেতে থাকা এই দালাল ও বাটপারদের সহযোগিতায় সেখানে অসৎ মানুষের সংখ্যা ব্যস্তানুপাতিক হারে বাড়ছে। সাধারণ মানুষ নিয়মকানুনের জটিলতা এড়াতে এই মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারস্থ হয়, আর সেই সুযোগে গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা ‘স্পিড মানি’ ভাগ হয়ে যায় ভেতরের চেইনে। প্রাতিষ্ঠানিক নীতিনির্ধারণী ফোরামে যখন বড় বড় সংস্কারের লেকচার দেওয়া হয়, মাঠপর্যায়ের এই অদৃশ্য সিন্ডিকেট তখন আড়ালে থেকে হাসে। কারণ তারা জানে, সাধারণ মানুষের পকেট কাটার আসল চাবিকাঠি কাউন্টারের এই অলিখিত লেনদেনের ওপরই বেশি নির্ভরশীল।
তবে এই ঘন অন্ধকারের মধ্যেও যে সততার প্রদীপ একবারে নিভে গেছে, তা কিন্তু নয়। অসৎ ব্যক্তির এই বিশাল ভিড়েও সরকারি দপ্তরগুলোয় এখনো কিছু সৎ ক্যাশিয়ার বুক চিতিয়ে টিকে রয়েছেন।
সরকারি ব্যাংকে অফিসার পদে নিয়োগ, পদ ৭২৫সরকারি দপ্তরের এই মিশ্র বাস্তবতার ঠিক বিপরীত পিঠে দাঁড়িয়ে আছে গুলশানের এক বহুজাতিক শোরুমের ক্যাশ টেবিল। এখানকার কাউন্টার সামলান আল–আমিন ইসলাম (ছদ্মনাম)। তাঁর পরিপাটি টেবিলে এক পাশে হালকা নীল একটি ফোল্ডার, অন্য পাশে কাচের পাত্রে তাজা লাল গোলাপ। ল্যাপটপের কিবোর্ডে তাঁর আঙুল চলে নিঃশব্দে। হিসাবের খাতায় কোনো কাটাকাটি নেই। অফিসের ক্লিনার থেকে শীর্ষ কর্মকর্তা, সবার বিপদে আল–আমিনই প্রথম ভরসা। পিয়ন রফিকের মায়ের চিকিৎসার জরুরি ফান্ড ক্লিয়ার করা কিংবা সহকর্মীদের অগ্রিম টাকা দেওয়া—সবই তিনি হাসিমুখে সামলান।
আল–আমিনের এই যাপনের সূত্র ধরেই যেন উঠে আসে দেশের সরকারি–বেসরকারি ব্যাংকের ক্যাশিয়ারদের কঠিন বাস্তবতার কথা। তাঁরাও প্রতিদিন এমন এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই পার করেন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শত শত মানুষের ভিড়, কোটি কোটি টাকার নিখুঁত হিসাব আর কাউন্টারের ওপার থেকে ধেয়ে আসা মানুষের মেজাজ সামলানো—সব মিলিয়ে এটি এক চরম ‘টাফ জব’। একটু ভুল হলেই নিজের পকেট থেকে টাকা মেলানোর দায়। এত বড় ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা প্রতিদিন দেশের অর্থ সচল রাখেন। অথচ দিন শেষে পলিসি মেকিং বা বড় সিদ্ধান্তের টেবিলে এই ক্যাশ টেবিলের কোনো চেয়ার নেই। বড় কর্তাদের নেওয়া সিদ্ধান্তের ফাইলে শুধু সই করার জন্য কাগজটি তাঁদের ডেস্কে আসে। অফিস শেষে ঘরে ফিরলে বাড়ির লোকেরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘একটু এদিক–ওদিক করলেই তো নিজেদের একটা ফ্ল্যাট হতো’, আল–আমিন কিংবা ব্যাংকের সেই সৎ ক্যাশিয়াররা তখন নীরব থাকেন। তাঁরা শুধু আলমারির ড্রয়ারে রাখা বাবার পুরোনো চশমাটার দিকে তাকান।
অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতে যাচ্ছেন, নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য ৭ করণীয়এই নীরব যন্ত্রণার আরও এক চরম রূপ দেখা যায় পুরান ঢাকার এক পাইকারি কাপড়ের দোকানে। ধুলা ও কাপড়ের রোঁয়ায় ভারী বাতাসে, এক এলোমেলো টেবিলে ভারী লোহার ক্যাশবাক্স নিয়ে বসেন ৪৫ বছর বয়সের রফিকুল (ছদ্মনাম)। মলিন সুতির পাঞ্জাবি পরা রফিকুলের হাত দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ঘোরে। দোকানের কর্মচারীদের বেতন থেকে দুপুরের খাবারের বিল—সব তাঁকেই মেলাতে হয়। কিন্তু নিজের বেতন বাড়ে না। গত মাসে দোকানে চুরি হলে মালিক সিসিটিভি ক্যামেরা দেখার আগেই প্রথম রফিকুলকে জেরা করেন। রফিকুল চুপ ছিলেন, কারণ তিনি জানেন, এই পেশায় অবিশ্বাসটাই সবচেয়ে সস্তা। ভুলটা খোদ মালিকের হলেও তিনি দুঃখ প্রকাশ করেননি, উল্টো কাল রাতে ক্যাশে তিন হাজার টাকা কম হওয়ায় রফিকুলের চলতি মাসের বেতন থেকে তা কেটে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রফিকুল রাতে বাড়ি ফেরার পথে ভাবছিলেন, পরদিন সকালে মেয়ের স্কুলের বেতন কীভাবে দেবেন।
বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের প্রাণ ক্যাশিয়ার পদটি। আর্থিক লেনদেনের মূল চাবিকাঠি ক্যাশিয়ারদের হাতে থাকলেও প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মিটিংগুলোয় তাঁরা অদৃশ্য থাকেন। দিন শেষে এ দেশের প্রত্যেক সৎ ক্যাশিয়ার এক অদ্ভুত একাকিত্বকে সঙ্গী করে ধূসর পথে বাড়ি ফেরেন।
সরকারি ব্যাংকে ৯০৩ সিনিয়র অফিসার পদে চাকরি, জেনে নিন সব তথ্য