শুধু রোপণ নয়, গাছ বাঁচিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

· Prothom Alo

বনভূমির ঘাটতি, জলবায়ু সংকট ও দ্রুত নগরায়ণের চাপে বাংলাদেশে এখন শুধু গাছ লাগানো নয়, সঠিক জায়গায় দেশি প্রজাতির গাছ লাগিয়ে তা টিকিয়ে রাখার জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে প্রথম আলো বন্ধুসভার ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভায় অতিথিদের বক্তব্যে এ কথা বারবার উঠে এসেছে। ৫ জুন রাত রাত আটটায় এটি অনুষ্ঠিত হয়।

Visit amunra.qpon for more information.

বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টির সঞ্চালনায় সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, বাংলাদেশ সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের জাতীয় সেলের সদস্য ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ জামাইল বশীর জেবি, ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের সহযোগী পরিচালক বেলায়েত হোসেন, উদ্ভিদ, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন এবং বৃক্ষবন্ধু শাহ সিকান্দার শাকির। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক।

শুরুতেই সবাইকে সবুজের শুভেচ্ছা জানিয়ে কবি ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা বন্ধুসভা সারা বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করি। লক্ষ লক্ষ গাছের চারা নিজেরা লাগিয়েছি, বিতরণ করেছি। এবারের স্লোগানটা খুব ভালো—“বৃক্ষ শুধু রোপণ নয়, যত্ন নিয়ে বাঁচাতে হয়”। পৃথিবীটাকে আমাদের বাঁচাতে হবে। বাংলাদেশটাকে বাঁচাতে হবে। ঢাকা শহরটাকে বাঁচাতে হবে। গাছ লাগানো শুধু পরিবেশের না, জলবায়ুর জন্যও খুব জরুরি।’

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির জাতীয় সেলের সদস্য ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ জামাইল বশীর জেবি পরিবেশ দিবসে এমন একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করায় বন্ধুসভাকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা এমন একটি অঙ্গীকার নিয়ে কথা বলছি, যেটা শুধু রাজনীতি নয়, শুধু স্লোগান নয়, বরং বাংলাদেশের পরিবেশগত অস্তিত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বেঁচে থাকার প্রশ্ন।’

কীভাবে সরকার বৃহৎ আকারে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা শুরু করেন, সেই প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে জামাইল বশীর জেবি বলেন, ‘অপরিকল্পিত বৃক্ষনিধন যেমন অপরাধ, তেমনি অপরিকল্পিত বৃক্ষরোপণও একটি অপরাধ। কারণ, আমরা যদি পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ না করতে পারি, তাহলে একটা সময় গিয়ে সেই গাছ কেটে ফেলতে হবে। আমরা কোনো বিদেশি গাছ লাগাব না। সব দেশি গাছের চারা রোপণ করা হবে। বেশির ভাগ গাছ থাকবে বীজ থেকে উৎপাদিত।’
সরকারের এই বৃহৎ কর্মসূচিতে বন্ধুসভার মতো যেসব সামাজিক সংগঠন বৃক্ষরোপণ করে, তারা কীভাবে যুক্ত হতে পারবে, সে ব্যাপারেও ধারণা দেন তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সারা বাংলাদেশে ব্র্যাক উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করে থাকে। বিগত দুই বছর ধরে প্রথম আলো বন্ধুসভার সঙ্গেও তারা বিষয়টা নিয়ে কাজ করছে। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের সহযোগী পরিচালক বেলায়েত হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবার আগে ভালো চারা নিশ্চিত করায় গুরুত্ব দিই। বাংলাদেশে যে দরিদ্র জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের আমরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চারা উৎপাদনের জন্য তৈরি করি, উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করি এবং তাদের কাছ থেকে সেই চারাগুলো নিয়ে আবার দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে দিই। আমরা দুইটা কাজ করি। দরিদ্র মানুষের জীবিকা উন্নয়নে গাছটা কীভাবে ভূমিকা রাখছে, সেটা নিয়ে যেমন কাজ করি, আবার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমরা বৃক্ষরোপণটা করে যাচ্ছি।’

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে প্রথম আলো বন্ধুসভার ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভা।

‘দুই বছর ধরে বন্ধুসভার সঙ্গে আমরা শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, পাশাপাশি আরও অনেক কাজ করছি। বন্ধুসভা ব্র্যাকের সঙ্গে যেভাবে কাজ করে, তা খুবই অনুপ্রেরণামূলক। ঈদুল আজহার সময় পল্লবীতে যে আগুন ধরেছিল, সেখানে আমরা এবং বন্ধুসভা একসঙ্গে ত্রাণ দিয়েছি, খাদ্যসহায়তা প্রদান করেছি, পুরোটা কাজে বন্ধুসভা আমাদের পাশে ছিল। বন্ধুসভার মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে এই কাজটা সামনের দিকে আমরা আরও এগিয়ে নিতে চাই,’ যোগ করেন বেলায়েত হোসেন।

‘বন্ধুসভার মাধ্যমে তরুপল্লব থেকে যখন আমরা বিভিন্ন জায়গায় বৃক্ষরোপণ করতে গিয়েছি, প্রতিটি জায়গায় বন্ধুসভার অকৃত্রিম সহযোগিতা পেয়েছি। এ জন্য বন্ধুসভার প্রতি আমার বিশেষ কৃতজ্ঞতা।’ বলছিলেন উদ্ভিদ, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন। তিনি বলেন, ‘পরিবেশ কিন্তু শুধু উদ্ভিদ নয়, এখানে বন, পাহাড়, অরণ্য, সাগর, নদী—সবকিছুই আছে। অনেকেই উদ্ভিদের কথা বলছি, উদ্ভিদ রোপণের কথা বলছি। সেটা কেন বলছি? কারণ, আমাদের দেশে জনসংখ্যার বিপরীতে যত উদ্ভিদ দরকার, তার ঘাটতি রয়েছে। শহরে বনভূমি থাকার কথা ২৫ ভাগ, কিন্তু আছে ৭–৮ ভাগের মতো।’

মোকারম হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশে জায়গা কম। জনসংখ্যা বেশি। শালবন প্রায় ধ্বংস। পাহাড়ের ইকোলজি ধ্বংস হয়েছে, এগুলো আমরা জানি। তার বিপরীতে বর্তমানে মুষ্টিমেয় মানুষ বিশেষ করে বন্ধুসভাসহ কিছু সংগঠন, ব্যক্তি বৃক্ষরোপণসহ পরিবেশ রক্ষায় কাজ করার চেষ্টা করছে। তরুপল্লব থেকেও আমরা ১৭ বছর ধরে উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি।’ এ সময় তিনি বৃক্ষরোপণের জায়গা নির্বাচন, কোন জায়গার জন্য কী ধরনের গাছ উপযুক্ত—এসব নিয়ে আলোচনা করেন।

গাছ রোপণ করতে গিয়ে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, সেসব বিষয় নিয়ে নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন বৃক্ষবন্ধু শাহ সিকান্দার শাকির।

এর আগে শুভেচ্ছা বক্তব্যে বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক বলেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে—পরিবেশকে বাঁচানো এবং পরিবেশের জন্য আমাদের জায়গা থেকে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে যা যা করা দরকার তা করা। পৃথিবীকে আমরা যতটুকু পেয়েছি, তার থেকে আরেকটু ভালো রেখে যাওয়াটাই আমাদের কাজ। সেই দায়িত্ববোধের অংশ হিসেবে বন্ধুসভা এই কাজগুলো করছে।’

Read full story at source