পাকিস্তানে এই জ্বালানি–বিপ্লব কীভাবে ঘটল
· Prothom Alo

চলতি বছরের শুরুর দিকে যখন মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ল এবং হরমুজ প্রণালি হুমকির মুখে পড়ল, তখন জ্বালানি আমদানিকারক অধিকাংশ দেশ বড় ধরনের সংকটে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে তাদের মধ্যে পাকিস্তান ছিল ব্যতিক্রম। দেশটিতে জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি সংকট দেখা দেয়নি, এমনকি ২০২২ সালের মতো ভয়াবহ লোডশেডিংয়েও ফিরে যেতে হয়নি। এমন নয় যে সরকারের পূর্বপ্রস্তুতি ছিল বা কোনো কূটনীতি এখানে কাজ করেছিল। এর নেপথ্যে ছিল সাধারণ নাগরিকদের সেট করা লাখ লাখ সোলার প্যানেল। সরকারি কোনো সহায়তা ছাড়াই এসব সোলার প্যানেল সেট করেছিল দেশটির নাগরিকেরা। সরকারি নথিপত্রেও এর কোনো হিসাব নেই।
Visit rouesnews.click for more information.
২০২১ সাল থেকে পাকিস্তান চীন থেকে ৫০ গিগাওয়াটের বেশি সোলার মডিউল আমদানি করেছে, যার মধ্যে ৩০ গিগাওয়াটের বেশি ইতিমধ্যে সচল বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাড়ির ছাদে উৎপাদিত প্রতিটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ মানেই হলো আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এক ইউনিট কমানো।
২০২৫ সালে এ বিষয়টিই বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। তবে পরিকল্পনা ছাড়া অর্জিত এই ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বেশ ভঙ্গুর। কারণ, এই সফলতার গল্পের আড়ালে লুকিয়ে আছে নীতিগত চরম ব্যর্থতা, যা পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থান ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিকল্পনা নয়, প্রয়োজনই যখন চালিকাশক্তি
পাকিস্তানের সোলার প্যানেলের এই জয়জয়কার কোনো নীতিগত সাফল্য ছিল না; বরং এটি ছিল ভুল নীতির বিপরীতে বাজার সংশোধনের ফলাফল। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গ্রিড বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৫৫ শতাংশ—করাচি ও লাহোরে বিদ্যুৎ বিল মাসের বাড়িভাড়াকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে।
দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলত। ঠিক সেই সময়েই বিশ্বজুড়ে গত এক দশকে সোলার প্যানেলের দাম ৮৭ শতাংশ এবং ব্যাটারির দাম ৯০ শতাংশ কমে আসে। চীনের সঙ্গে অনুকূল বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় পাকিস্তানি গ্রাহকেরা সরাসরি সেই কম দামের সুবিধা পান। ফলে সোলার ব্যবহারের অঙ্কটা সাধারণ মানুষের কাছে অনিবার্য হয়ে ওঠে।
অন্যান্য দেশের তুলনায় পাকিস্তানের চিত্র ছিল ভিন্ন। পাকিস্তানের মতো সোলার বাফার না থাকায় ফিলিপাইন এ বছর দেশটিতে জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়, যেখানে রাতারাতি জ্বালানির দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। বিপরীতে বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল থাকায় পাকিস্তানি পরিবারগুলো তুলনামূলক সহজভাবে এই সংকট মোকাবিলা করতে পেরেছে।
প্রস্তাবিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি আইন টেকসই হবে কিক্যাপাসিটি চার্জের কাঠামোগত ফাঁদ
গ্রিড বিদ্যুতের যে আকাশচুম্বী দামের কারণে মানুষ সোলারের দিকে ঝুঁকেছে, তা মূলত আগের নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের ফসল। ১৯৯৪ সালে পাকিস্তান স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) জন্য ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ (ক্যাপাসিটি চার্জ) ব্যবস্থা চালু করে, যার অর্থ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরকারকে দিতেই হবে।
তখনকার প্রেক্ষাপটে এটি যৌক্তিক মনে হলেও এখন তা ধ্বংসাত্মক নীতি বলে প্রমাণিত হয়েছে। ২০২৩-২৪ সাল নাগাদ বিদ্যুৎ–শুল্কের ৬১ দশমিক ৫ শতাংশই চলে যায় এই ক্যাপাসিটি চার্জের পেছনে, যা মাত্র দুই বছর আগেও ছিল ৪১ শতাংশ। এখন বিদ্যুৎ বিলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থই ব্যয় হয় এমন সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য, যেগুলো চালানোর আর প্রয়োজন নেই।
দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) চুক্তিগুলো ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়িয়েছে। ‘টেক-অর-পে’ চুক্তির কারণে চাহিদা থাকুক বা না থাকুক, নির্ধারিত পরিমাণ কার্গোর মূল্য পরিশোধ করতে হয়। ২০২৫ সাল নাগাদ পাকিস্তান বছরে ১২০টির মধ্যে প্রায় ৪৫টি চুক্তিবদ্ধ কার্গো বাতিল করছে। কারণ, গ্রিড বিদ্যুতের চাহিদা কমে গেছে। এলএনজি চুক্তির এই বাধ্যবাধকতার কারণে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সোলার–বিপ্লব যে চাহিদার চিত্র পুরোপুরি বদলে দেবে, তা বোঝার আগেই এসব চুক্তি করা হয়েছিল।
অন্ধকারে পরিকল্পনা বিভাগ
যখন বাসাবাড়ি ও কলকারখানা পর্যায়ে এই রূপান্তর ঘটছিল, তখন পরিকল্পনা বিভাগ তা বুঝতেই পারেনি। সরকারি তথ্যে মাত্র ৭ গিগাওয়াট নিবন্ধিত ‘নেট-মিটারিং’ সোলারের হিসাব আছে। কিন্তু বাস্তবে স্থাপিত সোলারের পরিমাণ ১৯ থেকে ৩১ গিগাওয়াট—যার অধিকাংশেরই কোনো নিবন্ধন নেই এবং পরিকল্পনাবিদদের কাছেও যার হিসাব নেই।
পাকিস্তানই প্রথম দেশ, যারা একটি কেন্দ্রীয় গ্রিড থেকে বিকেন্দ্রীভূত গ্রিডের দিকে যাচ্ছে, যেখানে মোট সরবরাহের ২৫ শতাংশই আসছে সোলার থেকে। কিন্তু এই পরিবর্তন সামলানোর মতো কোনো নিয়ন্ত্রক কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। ২০২৫ সালে গ্রিড বিদ্যুতের বাণিজ্যিক ব্যবহার ২৩ শতাংশ এবং শিল্প খাতে ব্যবহার ১১ শতাংশ কমেছে। পাকিস্তানের প্রধান বিদ্যুৎ–পরিকল্পনা দলিলে এ পরিবর্তনের ক্ষুদ্র একটি অংশ প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থাৎ দেশ এখন একটি ভুল গ্রিডের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করছে।
ইতিমধ্যেই পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। গত দু-তিন বছরে ব্যাটারি আমদানি বেড়েছে আট গুণ। সোলারের মালিকেরা এখন হাইব্রিড সিস্টেমের দিকে ঝুঁকছেন। পাকিস্তানের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎকে ছয়টি অধ্যায়ে ভাগ করা যায়—গণ-সোলারাইজেশন (যা চলছে), স্টোরেজ ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) বিপ্লব, মাইক্রোগ্রিডের উত্থান, ডিজিটাল ও এআইভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং ব্যাটারি রিসাইক্লিং। চীন প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত—প্রযুক্তি সরবরাহকারী, খরচ হ্রাসকারী এবং উদ্ভাবনী অংশীদার হিসেবে।
জ্বালানিসংকটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুযোগ কেন নয়নীতিমালায় যা করা জরুরি
সংস্কারের একটি স্পষ্ট রূপরেখা এখন হাতের নাগালে। প্রথমত, ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝা গ্রাহকের বিল থেকে সরিয়ে সরকারি বাজেটের মাধ্যমে মেটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব গ্রাহক পর্যায়ে ‘ফ্ল্যাট’ রেট বাদ দিয়ে সময়ভিত্তিক (টাইম অব ইউজ) শুল্কব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে সোলার না থাকা সময়ে গ্রিড বিদ্যুৎ প্রতিযোগিতামূলক হয়। ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানির জন্য আর কোনো ‘টেক-অর-পে’ চুক্তি করা যাবে না। একটি ডিজিটাল ও সহজ জাতীয় সোলার রেজিস্ট্রি তৈরি করা জরুরি। এ ছাড়া গ্রিড–ব্যবস্থাকে পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যার অর্থায়ন হবে বাজেট থেকে, গ্রাহকের বিলের ওপর বাড়তি সারচার্জ চাপিয়ে নয়।
জনগণের বিপ্লব
পাকিস্তানের এই সোলার–বিপ্লব গড়ে তুলেছে সেই পরিবারগুলো, যারা বিল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল; সেই কারখানাগুলো, যারা লোডশেডিংয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল এবং সেই ছোট ব্যবসাগুলো, যারা নিজেরাই নিজেদের পথ খুঁজে নিয়েছে। সরকারের এক পয়সা ভর্তুকি ছাড়াই এবং নীতিনির্ধারকদের অলক্ষ্যে এটি এগিয়েছে। এটাই এর শক্তি, আবার এটাই এর দুর্বলতা।
নাইজেরিয়া থেকে বাংলাদেশ কিংবা ফিলিপাইন—উন্নয়নশীল বিশ্বে এখন একই চিত্র—সস্তা সোলার প্যানেল, অনির্ভরযোগ্য গ্রিড এবং ক্রমবর্ধমান শুল্ক। পাকিস্তান এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া প্রথম দেশ। তথ্য অবকাঠামো, শুল্ক সংস্কার এবং গ্রিডে বিনিয়োগের মাধ্যমে এটি ভালোভাবে সামলানো অসম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক স্পষ্টতা—পাকিস্তান আসলে কোন ধরনের জ্বালানিব্যবস্থা গড়তে চায়, তা ঠিক করা এবং পরবর্তী বড় কোনো ভুল হওয়ার আগেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া।
সাকিব উর রেহমান মুঘল গবেষক, সিপিইসি সেন্টার অব এক্সিলেন্স, পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকনোমিকস (পিআইডিই)
পাকিস্তানের অর্থনীতিবিষয়ক ইংরেজি পত্রিকা বিজনেস রিকরডার থেকে নেওয়া। সংক্ষেপিত অনুবাদ: রাফসান গালিব