নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ার আসল কারণ কী

· Prothom Alo

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও অন্যান্য নিগ্রহ যেন এই সমাজের গভীরে প্রোথিত একটি বিষয়। আমাদের সামাজিক পরিসরে এই সমস্যাগুলো কেন বাড়ছে এবং কেন কোনো সরকার এর প্রতিকার করতে পারছে না, সে বিষয়ে আমরা যথাযথ ও সুনির্দিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেখি না।

Visit moryak.biz for more information.

যে ব্যাখ্যাগুলো আমরা সচরাচর দেখে থাকি, তার মধ্যে দুটি বড় প্রবণতা দেখা যায়। এক পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ধর্ষণ ও নিগ্রহের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা।

বিশেষ করে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অধিকাংশ সময় নির্যাতিত ব্যক্তি বা পরিবার বুঝে যায় যে ধর্ষণের প্রকৃত বিচার পাওয়া খুব একটা সহজ কাজ নয়। যার ফলে বিচার না পাওয়া বা না হওয়ার প্রবণতাকে একপর্যায়ে সমাজের মানুষের মেনে নিতে বাধ্য হওয়া।

তাইতো পল্লবীতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশুটির বাবা আক্ষেপ নিয়ে বলেছেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ, আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই।’

শিশুটির বাবার এই আহাজারিই নিশ্চিত করে মানুষের মধ্যে বিচার চাওয়ার এবং প্রতিকারের তাগিদ থাকলেও সেটি যে তারা পাবে তা তাদের কাছে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।

নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য অবসানে আমাদের যা করতে হবে

একটা সময় ধর্ষণ এবং নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতনসহ হত্যার মতো সব হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো আরও নানা ঘটনার আড়ালে চাপা পড়ে যায় এবং দোষী ব্যক্তির শাস্তিও আমরা খুব একটা দেখতে পাই না।

আর যতটুকু বিচার আমরা হতে দেখি, সেটি তাদেরই হয় যাদের ক্ষমতা কম বা নেই এবং যারা তুলনামূলকভাবে দুর্বল সামাজিক বর্গে অবস্থান করে। বিগত সময়ে আমরা এ–ও দেখেছি, সব ঘটনা তথাকথিত ভাইরাল হয় এবং রাষ্ট্রপ্রধানের দৃষ্টিগোচর হয়, সেই ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়া সহজ হয়, যা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।

ফলে কার বিচার হবে বা না হবে তা মূলত নির্ভর করে কার ক্ষমতার বলয় ও ব্যাপ্তি কতটা। তাই বিচারহীনতা ও বিচার প্রাপ্যতার বিষয়টি শ্রেণিগত বিষয়ও বটে। ফলে আইনের তার নিজস্ব গতিতে চলার মাধ্যমে বিচারের নিশ্চয়তা এই রাষ্ট্র এখনো দিতে পারেনি।

তাহলে কি আমরা ধরে নেব, পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো বেড়ে চলছে?

এর পেছনে যে আরও জটিল মনস্তত্ত্ব এবং সামাজিক ও ধর্মীয় পরিসরের নৈতিক শিক্ষার অকার্যকর ব্যবস্থা দায়ী, সেটিও আমাদের বিবেচনায় নিয়ে আসতে হবে। নৈতিক শিক্ষা আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করার কথা। কেননা এই দুই পরিসরই আমাদের নৈতিক শিক্ষার অন্যতম দুটি পরিক্ষেত্র।

সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা যায়, নৈতিক শিক্ষাই একজন নাগরিককে তার সমাজে বসবাসের জন্য যোগ্য করে তোলে।

নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সামাজিক ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ, কেননা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (বা সোশ্যাল কন্ট্রোল) আইনের প্রয়োগ থেকেও অনেক সময় কার্যকর একটি ব্যবস্থা হতে পারে।

তাই এখানে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব অনেক বেশি, মিশেল ফুকো যেমন করে বলেছিলেন, শাস্তির বিধানের চেয়ে আধুনিক সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তির আচরণকে একটি নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারে।

নারীর অগ্রগতি ও সহিংসতার বাস্তবতা

যে নিয়মানুবর্তিতা কেবল সামাজিক পরিসরের নৈতিক শিক্ষাই দেয় সেটি নয়, বরং ধর্মীয় শিক্ষাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও আমরা সেটা পারছি না।

কারণ, আমাদের মতো শ্রেণিবিভক্ত সমাজে নৈতিক শিক্ষার চেয়ে ক্ষমতার বলয় তৈরির মধ্য দিয়ে সামাজিক পুঁজি গড়ে তোলার (সোশ্যাল ক্যাপিটাল) প্রবণতাই অধিক গুরুত্ব বহন করে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনের বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জ করে, যা রাষ্ট্রের অপরাপর নাগরিকদের জন্য হতাশার।

এর সঙ্গে রয়েছে ধর্মীয় পরিসরকে সামাজিক পরিসর থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা করে দেখার প্রবণতা। আমরা যদি সামাজিক ও ধর্মীয় পরিসরের নৈতিক শিক্ষাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখি, তাহলে সেই বিচ্ছিন্নতা আমাদের সমাজে দুই ধরনের মেরুকরণ তৈরি করে।

যদিও আমরা বুঝতে পারি যে একটি সমাজে নানা পোলারাইজেশন থাকবে, কিন্তু সামাজিক ও ধর্মীয় পরিসর যদি একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় তখন একটি সমাজে দীর্ঘ সংকট তৈরি হয়।

যেমন নারীর প্রতি সহিংসতা এবং ধর্ষণ নিয়ে সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা একই হওয়ার কথা হলেও, এই দুই পরিসরের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যকার বিচ্ছিন্নতা ও সমন্বয়হীনতার ফলে ধর্ষণের কারণ খুঁজতে গিয়ে অধিকাংশ সময় ভিকটিমকেই দোষী সাব্যস্ত করার (ভিকটিম ব্লেমিং) প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে তার পোশাক ও চলাচলের ওপর ধর্মীয় প্রতীকের অভাবকে টার্গেট করার মাধ্যমে সামাজিক পরিসরে ধর্ষণের আলোচনাকে গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়।

কেবলমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা যে যথাযথ নৈতিকতার শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই দিতে পারছে না, সেটিও আমরা অনুধাবন করতে পারি যখন দেখি অনেক ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষক হয়ে ওঠেন একজন নিপীড়ক।

যাঁদের হাতে আমার সন্তান ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা শিখবে, তাঁরাই যখন নিপীড়কের ভূমিকায় আবির্ভূত হন, তার চেয়ে হতাশা ও আশঙ্কার আর কিছু হতে পারে না। মাদ্রাসায় মেয়ে ও ছেলেশিশুদের যৌন ও অন্যান্য নির্যাতনের মতো ক্রমবর্ধমান বিষয়গুলোও এখানে উদাহরণ হিসেবে আমরা নিয়ে আসতে পারি।

নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতা দেশের অগ্রগতির অন্তরায়

তবে নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা আমরা তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায়ও দেখতে পাই, যে মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ অনেক বেশি থাকে।

এমন ব্যর্থতার কারণে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও অকার্যকর হয়ে ওঠে, যার ফলে আমাদের সামাজিক জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে।

আমরা ধরেই নিই যে ধর্মীয় কিংবা তথাকথিত আধুনিক শিক্ষা আমাদের এমন একটি বিধান দেবে, যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবন পরিচালনায় কার্যকর একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

কিন্তু বাস্তবতা আমাদের ভিন্ন চিত্র দেখায়, যেখানে আমরা পুঁথিগত শিক্ষা দেখতে পেলেও নৈতিক শিক্ষার তীব্র অভাব দেখতে পাই। যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকটকে আরও দৃশ্যমান করে।

অথচ ইসলামিক ও স্থানীয় সামাজিক ব্যবস্থার একটা দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই আমাদের সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যার একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া রয়েছে, যাকে বিখ্যাত গবেষক অসীম রায় ‘ইসলামিক সিনক্রিটিস্টিক ট্র্যাডিশন’ বলে অভিহিত করেছেন।

জনপরিসরে তখন এই ধরনের অপরাধ ধীরে ধীরে নরমালাইজেশনের একটি রূপে রূপান্তরিত হয়। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম এমন পরিস্থিতিকে সামাজিক ও নৈতিকতার ভাঙনের (অ্যানোমি) একটি অন্যতম লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

ফলে ধর্মীয় বিষয়াবলি আমাদের সামাজিক বিষয় থেকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন নয়। এখানে নিশ্চিত করেই ধর্মীয়, সামাজিক ও প্রথাগত শিক্ষাপ্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে, সেটি না থাকা একধরনের সংকট তৈরি করে, যা আমরা বর্তমান সময়ে দেখি।  

দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে ওঠা সামাজিক ব্যবস্থাকে আমরা ধীরে ধীরে অকার্যকর একটি ব্যবস্থায় পরিণত হতে দেখছি, কেননা তা প্রয়োজনীয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে।

যে ব্যবস্থায় সমাজের মানুষ ধর্ষণের বিচার পায় না ও লিঙ্গীয় বিষয়গুলোর মতো জরুরি বিষয় সামাজিক বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক পরিসরে সহজভাবে আলোচনা করতে পারে না। এ ধরনের আলোচনা আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় উভয় পরিসরে একধরনের নিষিদ্ধ আলোচনা বা ট্যাবু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই প্রক্রিয়া সমাজের একাংশকে বিশেষ করে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে ধীরে ধীরে নীরবতার দিকে ঠেলে দেয়। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক পিয়েরে বুর্দো যাকে নীরবতার সংস্কৃতি বলে অভিহিত করেছেন, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনাচরণের মাধ্যমে পুনরুৎপাদিত হয়।

এভাবে সামাজিকভাবে তৈরি হওয়া নীরবতাই একসময় ধর্ষণের মতো অপরাধ ও নিগ্রহকে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গড়ে উঠতে দেয় না এবং প্রতিবাদের প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।

জনপরিসরে তখন এই ধরনের অপরাধ ধীরে ধীরে নরমালাইজেশনের একটি রূপে রূপান্তরিত হয়। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম এমন পরিস্থিতিকে সামাজিক ও নৈতিকতার ভাঙনের (অ্যানোমি) একটি অন্যতম লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

তাই ধর্ষণ থেকে শুরু করে নারী ও শিশুর প্রতি অন্যান্য নিগ্রহের বিষয়গুলোকে সামাজিক ও ধর্মীয় পরিসরের মাধ্যমে গড়ে ওঠা নৈতিকতার সাপেক্ষেই বিশ্লেষণ করতে হবে।

এখানে সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থাপনাকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় না করিয়ে এ দুইয়ের সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে নৈতিকতার একটি ইতিবাচক প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে।

এর সঙ্গে ধর্ষণ ও অন্যান্য নিগ্রহের বিচারহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ব্যর্থতার দিকেও আমাদের জরুরি ভিত্তিতে নজর দিতে হবে, যেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

  • বুলবুল সিদ্দিকী নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source