বাংলাদেশ ‘মারল’ পাকিস্তানকে, টের পেল ভারত
· Prothom Alo

২১ আগস্ট ২০২৪। সেদিন রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট শুরুর আগে কেউ যদি বলতেন, বাংলাদেশ পাকিস্তানকে টানা চার টেস্টে হারাবে, তবে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিশ্চিত প্রশ্ন উঠত।
Visit afnews.co.za for more information.
২০ মে ২০২৫। সিলেট টেস্টে পাকিস্তানকে ৭৮ রানে হারাল বাংলাদেশ। সেদিনের সেই রাওয়ালপিন্ডি আর আজকের এই সিলেটের মধ্যে পাকিস্তানের বিপক্ষে আরও দুটি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জিতেছে চারটি টেস্টেই। তাতে কলকাতার কিংবদন্তি অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীর সিনেমার একটি সংলাপ মনে পড়তে পারে, ‘মারব এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে।’
সিলেট টেস্ট জয়ের পর বাংলাদেশের সমর্থকেরাও এখন মিঠুনের সংলাপের আদলে বলতে পারেন, ‘মারব পাকিস্তানকে, টের পেতে হবে ভারতকে।’
সিলেট টেস্ট জয়ের পর এ সংস্করণে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ টেবিলে যে ভারতকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। ভারত নেমে গেছে ছয়ে, বাংলাদেশ উঠেছে পাঁচে। পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করার পর ৫৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ উঠেছে পাঁচে, ৪৮.১৫ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে ছয়ে ভারত। বাংলাদেশের কাছে ধবলধোলাই হওয়া পাকিস্তান ৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে আছে ৯ দলের মধ্যে আটে।
সিলেট টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯ উইকেট নেন তাইজুল। পুরস্কার হিসেবে পাওয়া স্কুটিটা মাঠেই চালিয়ে দেখলেনশুধু পয়েন্ট তালিকাতেই ওঠা কি, বলতে পারেন টেস্টে নবজাগরণ ঘটেছে বাংলাদেশের। সেই জাগরণের একটা পটভূমিও আছে। কিছুদিন আগপর্যন্তও বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে খুব হতাশ ছিলেন বেশির ভাগ সমর্থক। মাঠের চেয়ে ক্রিকেট বোর্ডে ‘খেলাধুলা’ হচ্ছিল বেশি। ওদিকে হামজা চৌধুরীর কল্যাণে ফুটবল এগিয়ে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কমছিল ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা। চায়ের দোকানেও ক্রিকেট নিয়ে আলাপ-আলোচনায় সেই ঝাঁজটা আর ছিল না। মনে হচ্ছিল, ব্যাট-বলের খেলায় চারপাশে শুধু হতাশা আর হতাশা।
পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয় সেই হতাশার মাঝে প্রস্ফুটিত পদ্মফুল—যার সুবাসে আবারও ক্রিকেট নিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ঝড় উঠেছে টংদোকানগুলোর চায়ের কাপেও। মুঠোফোনে অনেকেই হয়তো স্কোর দেখছেন বারবার, এ–ও সম্ভব!
যে বাংলাদেশকে টেস্টে একসময় বড় দলগুলো গোনায় ধরত না, সেই দলই কিনা টানা চার টেস্টে হারাল পাকিস্তানকে! গোনায় যে এখন ধরতে হবে, সেটা বোঝা যায় এক্সে অস্ট্রেলিয়ান এক সংবাদমাধ্যমের করা পোস্টে। পাকিস্তান আজ হেরে যাওয়ার আগে তাদের পোস্ট, ‘টেস্টে আমাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের বিপক্ষে ২-০ তে জয়ের কিনারায়।’
অর্থাৎ, অস্ট্রেলিয়াও চোখ রেখেছে এই সিরিজে। কারণ, আগামী মাসে সংক্ষিপ্ত সংস্করণে সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে আসবে তারা। আগস্টে বাংলাদেশ যাবে অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ খেলতে। চোখ না রেখে তাই উপায় নেই। আজ থেকে বছর দশেক আগে হলে হয়তো এমনটা দেখা যেতে না। কিন্তু এখন এমন হওয়ার কারণটাও স্পষ্ট—বাংলাদেশ দল টেস্টে আসলেই উন্নতি করেছে।
টেস্ট র্যাঙ্কিংয়েও ইতিহাস, প্রথমবার সাতে বাংলাদেশনইলে এই সিলেট টেস্টে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর ২৭৮ করতে পারত না। কিংবা ৪৩৭ রান তাড়া করতে নেমে ভয় ধরিয়ে দেওয়া পাকিস্তানকে আজ সকালের সেশনে ১৩ বলের (৯৫.২ থেকে ৯৭.২ ওভার) মধ্যে অলআউট করতে পারত না। আপনি বলবেন, পেস বোলিংয়ে উন্নতি করেছে বাংলাদেশ, তা তো বটেই। তবে আরও গভীরে তাকালে বোঝা যায়, পদ্মা সেতুর স্প্যানের মতো সব বিভাগেই উন্নতি দৃশ্যমান। আজ সকালের সেশনেই যেমন বাউন্ডারি বাঁচাতে অবিশ্বাস্য ডাইভে রান সেভ করেন শরীফুল। এই যে নিবেদন কিংবা মিডল অর্ডারে ব্যাটিংয়ে কারও না কারও দাঁড়িয়ে যাওয়া—এই সবই আসলে বাংলাদেশের খেলাপ্রেমীদের আবারও ক্রিকেটে ফিরিয়ে এনেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুলনাজমুল বলেছেন পরিবর্তনের কথা। দলটাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে খেলোয়াড়দের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনেছেন। বিশ্ব–ক্রিকেটের বয়ে চলা বাতাসের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতেই এই সিদ্ধান্ত। সেটা বোঝা যায় ব্যাটসম্যানদের খেলার ধরনে, পেসারদের আগ্রাসী মনোভাবে এবং টেস্টে ফল বের করতে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে ইনিংস ঘোষণার সাহসিকতায়। একটা সময় ছিল, যখন পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে তাদের পেসারদের নিয়ে আলোচনা হতো বেশি। কিন্তু এখন দিন পাল্টেছে। এখন সিরিজ চলাকালে পাকিস্তানেই বাংলাদেশের পেসারদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশি। এটাও কি ভাবা যায়!
বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা আসলে এভাবে ভাবতে বাধ্য করেছেন। সে জন্য টুপিখোলা অভিনন্দন তাঁরা পেতেই পারেন।
পাকিস্তানকে হারিয়ে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়