নতুন চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক

· Prothom Alo

ঢাকার শেরাটন হোটেলে ১৮ মে অ্যামচেম আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক সংলাপে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত ‘রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এআরটি)’ নিয়ে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। সে বক্তব্যটি প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো

শুরু করার আগে আমরা একটু সময় নিয়ে ফরেস্ট কুকসনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তিনি গত সপ্তাহে মারা গেছেন। ফরেস্ট আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট। তিনি বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আমি এখানে আমার আগে কাটানো সময়েও তাঁকে ভালোভাবে চিনতাম। সে সময়কার আমাদের প্রাণবন্ত আড্ডাগুলো আমি ভীষণ মিস করব।

Visit saltysenoritaaz.org for more information.

আজ এখানে আমি থাকতে পেরে সত্যিই আনন্দিত। কারণ, আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের এক অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় সময়ের মধ্যে আছি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অংশীদার। কিন্তু এখন আমরা, মানে আমেরিকান ও বাংলাদেশিরা এক অভূতপূর্ব সুযোগের মুখোমুখি হয়েছি। এর মাধ্যমে এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পথকে নতুনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমরা অতীতের সেই ব্যর্থ নীতিগুলো থেকে সরে আসছি, যেগুলো বিকৃত বাণিজ্য সম্পর্ককে জিইয়ে রাখত, রেন্ট-সিকিং বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর অনিয়মকে উৎসাহিত করত এবং অস্বচ্ছ বাজারব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখত। এখন আমরা এমন একটি মডেলের দিকে এগোচ্ছি, যা আমাদের দুই দেশের মানুষের জন্যই লাভজনক ফল দেবে।

এই নীতি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে, যেখানে সহায়তার চেয়ে বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যেখানে সাহায্যের চেয়ে বিনিয়োগকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং যেখানে এমন একটি সত্যিকারের অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হয়, যা দুই দেশকেই সুযোগ তৈরি করে দেয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যেমন বলেছেন, আমরা এখন এমন একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে সহায়তানির্ভর কাঠামো থেকে বিনিয়োগনির্ভর কৌশলের দিকে যাওয়া হচ্ছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি এটি স্বীকার করে যে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই সম্ভব, যখন দেশগুলোর মধ্যে এমন অংশীদারত্ব তৈরি হয়, যা ভালো চর্চাকে উৎসাহিত করে এবং সবার জন্য লাভজনক বাণিজ্যিক সুযোগকে উন্মুক্ত করে।

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা

এ মুহূর্তটি বাংলাদেশের জন্য এক অসাধারণ সুযোগের সময়। ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার এই দেশ এ অঞ্চলের সবচেয়ে গতিশীল (এবং তরুণ) শ্রমশক্তিগুলোর একটি। দক্ষিণ এশিয়ায় এর কৌশলগত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একুশ শতকে একটি বড় উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে ওঠার বিশাল সম্ভাবনা রাখে।

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ সম্প্রতি একটি পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন করেছে। এটিকে ‘এআরটি’ বলা হচ্ছে। যদি এই চুক্তি পুরোপুরি গ্রহণ করা হয় এবং বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এটি শুধু দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যই বাড়াবে না বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও উঁচু স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

এআরটি একটি অত্যন্ত ভালো চুক্তি। এটি বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাজারে ১৯ শতাংশ প্রতিযোগিতামূলক শুল্কহারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে সাহায্য করবে। চুক্তি না থাকলে এই হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারত। একই সঙ্গে এই চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ তার শুল্কহার এবং অ-শুল্ক বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতায় কিছু পরিবর্তন আনবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ে এবং দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যপূর্ণ হয়। এটি আসলে খুবই সাধারণ যুক্তিবোধের বিষয়।

যদি কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে খুব কম আমদানি করে এবং অন্য দেশ থেকে বেশি আমদানি করে, তাহলে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব হয় না। বরং এর ফলে বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যঘাটতি তৈরি হয়। আর সেই ঘাটতি সে বাজারকেই দুর্বল করে, যেটির ওপর আপনি নির্ভর করছেন।

যদি আপনি আমাদের কাছে বিক্রি করতে চান, তাহলে আপনাকে আমাদের কাছ থেকেও কেনার চেষ্টা করতে হবে। আপনাদের উচিত নয় এত বেশি শুল্ক আরোপ করা বা এমন জটিল ও অযৌক্তিক নিয়ম করা—যেমন আমাদের গমে বিকিরণ পরীক্ষা বা এমন কীটনাশকের পরীক্ষা করা, যা আমরা ব্যবহারই করি না। এসব কারণে আমাদের রপ্তানির ওপর কর অনেক বেড়ে গিয়ে প্রায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

এখন বাংলাদেশ যে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয়েছে, তা আমি তুলে ধরছি। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে আছে গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা। এগুলো উচ্চমানের মার্কিন পণ্য, যেগুলো বাংলাদেশ সরকারের এবং বেসরকারি ক্রেতারা অত্যন্ত মানসম্পন্ন বলে নিশ্চিত করেছেন। এগুলো উচ্চমূল্যের ক্রয় হিসেবে বিবেচিত হবে।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা

সাধারণত গণমাধ্যম এবং বিশ্লেষকেরা শুধু দামের ওপর জোর দেন; কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মান ও প্রোটিনের পরিমাণের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেন। আপনি যা মূল্য দেন, তা-ই পান। অন্যান্য দেশ থেকে খাদ্য অধিদপ্তর যে গম কিনেছে, সেখানে নষ্ট হওয়ার হার ছিল ২০ শতাংশ পর্যন্ত। অথচ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা গমে এই নষ্ট হওয়ার হার মাত্র ২.৫ শতাংশ। এ ছাড়া প্রোটিনের মাত্রা ১১.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এটাকেই বলা যায় উচ্চমূল্যের পণ্য এবং আমি গর্বিত যে এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ উচ্চমানের মার্কিন কৃষিপণ্য ভোগ করতে পারবে।

এই চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কিনবে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি বর্তমান হারে অব্যাহত রাখলেই পূরণ হয়ে যাবে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিবেচনায় নিলে এটি এমন একটি প্রতিশ্রুতি, যা বাজারের স্বাভাবিক প্রবণতার কারণেই সম্ভবত ছাড়িয়ে যাবে। একই সঙ্গে তা বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ আরও সহজ করবে।

এগুলো কোনো সাহায্য নয়, এগুলো ব্যবসার চুক্তি, যা দুই দেশেই কাজের সুযোগ বাড়াবে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি করতে পারবে, যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশে সহজে পণ্য বিক্রি করতে পারবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার ব্যবসার পরিবেশ আরও ভালো করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা দেশের ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের জন্যই ভালো। এটি বাংলাদেশের নিজের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর বিষয়।

এটা কোনো গোপন কথা নয় যে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবসা করার জন্য একটি কঠিন জায়গা হিসেবে পরিচিত। আপনারা প্রতিদিনই এটি অনুভব করেন। এখানে শুধু আমেরিকান বা বিদেশি কোম্পানির কথাই বলা হচ্ছে না। দেশীয় কোম্পানিগুলোও দীর্ঘদিন ধরে সেসব সংস্কারের কথা বলে আসছে। সেগুলো এআরটি চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এআরটি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো দাবি তালিকা নয়। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি যৌথ প্রতিশ্রুতি। যুক্তরাষ্ট্র এ দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী এবং এআরটি দুই দেশের জন্যই একটি অসাধারণ ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা দেয়।

একসঙ্গে কাজ করা: সফলতার জন্য যা প্রয়োজন

এখন আমি খোলাখুলিভাবে বলছি—বাংলাদেশের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এবং আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে দেখাতে যে বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, আমাদের কী কী বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

প্রথম বিষয়: পূর্বানুমানযোগ্যতা ও চুক্তির নিশ্চয়তা

ব্যবসায়িক সম্পর্কের ভিত্তি হলো আস্থা আর আস্থা নির্ভর করে চুক্তি বাস্তবায়নের ওপর। আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে নিশ্চিত হতে হবে যে বাংলাদেশি কোম্পানি ও সরকার—উভয়ের সঙ্গে করা চুক্তিকে সম্মান করা হবে এবং নিয়মিত বাস্তবায়িত হবে। যখন চুক্তি মানা হয়, তখন বিনিয়োগ আসে। আর যখন মানা হয় না, তখন বিনিয়োগকারীরা অন্য দেশে চলে যায়। এটি এমন একটি বিষয়, যা আমরা একসঙ্গে কাজ করে বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে পারি।

দ্বিতীয় বিষয়: স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ নীতি পরিবেশ

বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন পূর্বানুমানযোগ্যতা। তাদের জানতে হবে, আজ যে নিয়ম আছে, কালও সেই একই নিয়ম থাকবে। তারা যেন অন্যায্য করের চাপ বা পুঁজি ও তথ্য (ডেটা) চলাচলে বাধার মুখে না পড়ে। আমাদের বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশকে স্বচ্ছ এবং বৈষম্যহীন আমদানি লাইসেন্সিং ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ যে পদক্ষেপ নিচ্ছে তা উৎসাহব্যঞ্জক এবং এই অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে আমি সমর্থন দিতে চাই।

তৃতীয় বিষয়: ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার আধুনিকীকরণ

খোলাখুলি বললে, কিছু ব্যবসায়িক পদ্ধতি—যেমন অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা বা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া—বড় আকারের আমেরিকান বিনিয়োগের পথে বাধা সৃষ্টি করে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সত্যিকারভাবে বদলে দিতে পারত। আমেরিকান কোম্পানিগুলো কঠোর কমপ্লায়েন্স বা নিয়ম মেনে চলে। তাদের দরকার স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, পরিষ্কার নিয়ন্ত্রক–কাঠামো এবং সবার জন্য সমান সুযোগ।

এ চুক্তির মধ্যে রয়েছে—

ব্যবসা নিবন্ধন ও লাইসেন্স সহজ করা;

শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা;

নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত যেন নিরপেক্ষ মানদণ্ডের ভিত্তিতে হয় তা নিশ্চিত করা;

বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করা;

আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শ্রম ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা।

আমাদের চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করা এবং শ্রম আইন প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করা। এগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দাবি নয়; এগুলো এমন মানদণ্ড, যা বাংলাদেশকে বৈশ্বিকভাবে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে এখানে উপস্থিত দূতাবাসের পুরো টিমের সঙ্গে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে আমরা এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করব, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রকৃত সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়।

মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি: বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সামনে অশনিসংকেত

কেন যুক্তরাষ্ট্রকে অংশীদার হিসেবে বেছে নেবেন

আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, কেন দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো বাণিজ্যিক অংশীদার।

প্রথমত, আমরা স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতায় বিশ্বাস করি। আমেরিকান কোম্পানিগুলো আইনের শাসনের অধীন কাজ করে, যেখানে চুক্তি পরিষ্কার এবং ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া পূর্বানুমানযোগ্য। আমরা এমন অংশীদারত্ব দিই, যা পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। আমরা এমন অংশীদারি দিই, যা কোনো আড়াল-আবডাল চুক্তি নয়, কোনো বাস্তব ব্যবসা পরিকল্পনা ছাড়া প্রকল্প নয়, কোনো অকার্যকর ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট’ প্রকল্প নয় এবং কোনো ঋণের ফাঁদ কূটনীতি নয়। আমরা আমাদের প্রকল্পগুলোতে গভীরভাবে যাচাই করি এবং বাংলাদেশকে এমন কোনো প্রকল্পের দায়ে ফেলে যাই না, যা কোনো লাভই দেয় না—যেমন এক বিলিয়ন ডলারের ‘টানেল টু নোহোয়ার’।

দ্বিতীয়ত, আমরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসি। উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি থেকে ডিজিটাল অবকাঠামো, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সব ক্ষেত্রেই আমেরিকান কোম্পানিগুলো বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে।

তৃতীয়ত, আমরা সক্ষমতা গঠনে গুরুত্ব দিই। আমেরিকান বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামো তৈরি করে না; এটি শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয়, দক্ষতা স্থানান্তর করে এবং এমন টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করে, যা পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বাংলাদেশে থাকা আমেরিকান কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা এটি সবচেয়ে ভালো জানেন।

এখন আমি কিছু খাতের সুযোগ নিয়ে কথা বলছি। আজ আমি কয়েকটি খাতে গুরুত্ব দিতে চাই।

জ্বালানি: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শক্তি গঠন

প্রথমে জ্বালানি খাত। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে আনুমানিক ১৮০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। আমেরিকান জ্বালানি কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। শেভরন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের অর্ধেক দেয় এবং আরও উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

একসিলারেট এনার্জি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির আরও এক-তৃতীয়াংশ সহজ করে এবং আরও বাড়াতে আগ্রহী। জিই ভেরনোভা কম্বাইন্ড-সাইকেল গ্যাস টারবাইন বাজারে বড় ভূমিকা রাখছে। এটি এবং অন্যান্য যুক্তরাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো আরও জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকীকরণের জন্য প্রস্তুত।

সব মিলিয়ে এই যুক্তরাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুতের অর্ধেকের বেশি সরবরাহে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু আমরা একসঙ্গে আরও অনেক কিছু করতে পারি। আমার টিম বাংলাদেশ সরকারকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যবসার জন্য নতুন ও নমনীয় ব্যবস্থা তৈরিতে কাজ করছে এবং বাংলাদেশে সুযোগ ও জ্বালানির জরুরি চাহিদা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করছে।

আমরা ইতিমধ্যে কিছু ঘাটতি পূরণে সহায়তা করেছি, যার মধ্যে রয়েছে এলপিজির নতুন উল্লেখযোগ্য আমদানি। যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ এবং আমরা বাংলাদেশের জ্বালানি উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করতে, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে এবং উন্নত পারমাণবিক শক্তিসহ সব ধরনের জ্বালানি প্রযুক্তিতে আমাদের অগ্রসর প্রযুক্তি ও দক্ষতা দিতে প্রস্তুত।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে অংশীদার এবং আমরা বহু বছর ধরে দেশের শিল্প ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তুলতেও প্রস্তুত।

প্রযুক্তি: বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি খাত।

১০ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, ১৬ কোটি মোবাইল ফোন সাবস্ক্রাইবার এবং সারা দেশে হাইটেক পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশকে তার ডিজিটাল অবকাঠামো আরও বড় পরিসরে উন্নত করতে হবে। এটি মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার বাস্তব সুযোগ তৈরি করছে, যারা এই খাতের বৈশ্বিক নেতা। স্টারলিংক, গুগল পে, ওরাকল, মাইক্রোসফট ও অগমেডিক্সের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বাংলাদেশে তাদের সেবা চালু করতে শুরু করেছে।

আমরা একসঙ্গে কাজ করে বাংলাদেশকে এমন একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারি, যা গ্রামীণ অঞ্চলকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করবে, ই-কমার্সকে সক্ষম করবে এবং প্রযুক্তি স্টার্টআপ ও উদ্ভাবকদের জন্য সুযোগ তৈরি করবে। এটি এমন ধরনের উচ্চ বেতনের চাকরি সৃষ্টি করবে, যা আধুনিক অর্থনীতির জন্য এবং তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সঠিক অবকাঠামো ও উপযুক্ত নিয়ন্ত্রক পরিবেশ থাকলে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে পারবে, উচ্চমূল্যের চাকরি তৈরি করবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেবে।

আমাদের বাণিজ্যচুক্তিতে ডিজিটাল বাণিজ্য–সম্পর্কিত ধারা রয়েছে, যাতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে পূর্ণভাবে অংশ নিতে পারে এবং আমরা চাই আমেরিকান জ্ঞান ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য আরও বড় সুযোগের পথ তৈরি করুক।

প্রধানমন্ত্রী প্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ নতুন চাকরির আহ্বান জানিয়েছেন—এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে যদি না যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তারা বিনিয়োগ করবে তখনই যখন তারা অবকাঠামো, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে আস্থা পাবে। এর মধ্যে আর্থিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ আর্থিক লেনদেন এখনো নগদে হয়। এটি এমন একটি সুযোগ, যা আমাকে সত্যিই উৎসাহিত করে। এটি বিশাল একটি প্রবৃদ্ধির সুযোগ। এই সুযোগ শুধু দেশের আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার জন্য নয়, বরং পুরো দেশকে রূপান্তর করার জন্যও। ভিসা ও মাস্টার কার্ডের মতো আমেরিকান কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের আর্থিক পরিষেবা খাতে বিশাল সম্ভাবনা দেখছে।

যখন মানুষ ডিজিটালভাবে আর্থিক সেবা ব্যবহার করতে পারবে, তখন ছোট ব্যবসাগুলো সীমান্ত পেরিয়ে ব্যবসা করতে পারবে, কৃষকেরা ঋণ পেতে পারবে এবং পরিবারগুলো আরও ভালোভাবে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করতে পারবে। একসঙ্গে আমরা বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবাকে আরও আধুনিক, আরও কার্যকর এবং আরও নিরাপদ করতে পারি।

আধুনিক অবকাঠামোর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা

বাংলাদেশের দ্রুত প্রবৃদ্ধি এখন আধুনিক ও কার্যকর অবকাঠামোর নতুন চাহিদা তৈরি করছে এবং এই চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্র একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে প্রস্তুত। রেল খাতে, মার্কিন কোম্পানিগুলো লোকোমোটিভ, সিগন্যালিং এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিকীকরণে সহায়তা করতে পারে, যাতে মানুষ ও পণ্য আরও দক্ষভাবে চলাচল করতে পারে।

বন্দর খাতে, লজিস্টিকস, অটোমেশন ও কার্গো ব্যবস্থাপনায় আমেরিকান দক্ষতা ব্যবহার করে যানজট কমানো এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে শক্তিশালী করা সম্ভব। এ ছাড়া বেসামরিক বিমান চলাচলে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও পরিচালনায় বিশ্বমানের সক্ষমতা রাখে। এটি নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও কর্মী দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করবে।

এর বাইরে মার্কিন কোম্পানিগুলো সড়ক, সেতু ও নগর পরিবহন ব্যবস্থার জন্য প্রকৌশল, নকশা ও নির্মাণে বিশ্বনেতা—যা উচ্চমান, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অধ্যায় গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।

ফ্রেমওয়ার্ক থেকে বাস্তবায়ন: একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া

এখন পরিস্থিতি হলো—আমাদের কাছে এআরটি চুক্তির একটি শক্তিশালী কাঠামো আছে এবং বিভিন্ন খাতে বিশাল সুযোগ রয়েছে; এখন প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। আমি আবারও জোর দিয়ে বলছি—আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিটি ধাপে কাজ করতে প্রস্তুত।

যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যে দেখিয়েছে। আমরা সদিচ্ছার সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমরা আমাদের বাজার উন্মুক্ত করেছি। আমরা বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত। এখন প্রয়োজন এমন পদক্ষেপ নেওয়া, যা বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করবে।

এর মধ্যে রয়েছে—

প্রয়োজনীয় আইন পাস করা, যাতে বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়ন করা যায়;

নিয়মকানুন সংস্কার করা, যা যুক্তরাষ্ট্রীয় কোম্পানির জন্য অপ্রয়োজনীয় বাধা তৈরি করে;

কাস্টমস কর্মকর্তা ও নিয়ন্ত্রকদের নতুন প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া;

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ওয়ান–স্টপ’ সেবাকেন্দ্র তৈরি করা;

অনুমোদন ও পারমিটের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা।

বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার চ্যালেঞ্জপূর্ণ পরিবেশে কাজ করা আমেরিকান কোম্পানিগুলোর প্রতি আমি আহ্বান জানাই—আপনারা যোগাযোগ রাখুন, সমস্যাগুলো শেয়ার করুন এবং সমাধান খুঁজে বের করা ও বাস্তবায়নে আমাদের সঙ্গে কাজ করুন।

শেষে আমি একটি ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ জানাতে চাই। এ বছর আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপন করছি। আপনারা কেউ কেউ হয়তো ইতিমধ্যে লক্ষ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ভবনে বড় বড় ব্যানার ঝুলছে। আরও অনেক আয়োজন আসছে, বিশেষ করে জুলাই মাসে ‘আমেরিকা উইক’ সামনে রেখে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবময় মুহূর্ত উদ্‌যাপনে আমাদের অংশীদার হতে আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। এতে অংশ নেওয়ার অনেক উপায় আছে এবং যদি আপনারা কোনো অনুষ্ঠান স্পনসর বা সহায়তা করতে আগ্রহী হন, আমার টিম আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে আনন্দিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কখনোই এত শক্তিশালী ছিল না এবং আমাদের সামনে সুযোগও কখনো এত বড় ছিল না। কিন্তু সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন দৃষ্টি, অঙ্গীকার ও অংশীদারত্ব।

যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। আমি প্রস্তুত। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশও প্রস্তুত।

চলুন আমরা একসঙ্গে এই মুহূর্তকে কাজে লাগাই এবং যৌথ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি নতুন পথ তৈরি করি।

ধন্যবাদ।

Read full story at source