অন্ধকারে কি ভূত থাকে!

· Prothom Alo

মানুষ অন্ধকারে ভয় পায়। কখনো ভূতের ভয়, কখনো এমনিতেই গা ছমছম করে। সবাই তো ভূতে বিশ্বাস করে না। তাই বলে কি মানুষ অন্ধকারে ভয় পাবে না! ভূতে যার বিশ্বাস নেই, তার কথা আলাদা। কিন্তু যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁরা কেন করেন? আসলেই কি ভূত বলে কিছু আছে?

Visit newsbetting.bond for more information.

এ প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দিলে চলে না, দরকার বিস্তারিত ব্যাখ্যা। তাই আমাদের আগে জানতে হবে অন্ধকারের সঙ্গে ভয়ের কী সম্পর্ক!

ভয় মানুষের মজ্জাগত ব্যাপার। আধুনিক বিজ্ঞান একে জেনেটিক উত্তরাধিকার বা বংশগত বৈশিষ্ট্য বলে। ভয় কখনো মারাত্মক রূপ নিতে পারে, অসুস্থ করে তুলতে পারে মানুষকে। এ ধরনের ভয়কে বলে ফোবিয়া। তার মানে এই নয় যে, ভয় ভীষণ ক্ষতিকর কোনো ব্যাপার। বরং এটি আত্মরক্ষার অন্যতম কৌশল।

নানা কিছুতেই মানুষ ভয় পেতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি ভয় পায় অন্ধকারে। অপরিচিত কোনো জায়গায় আলো না থাকলে অনেকে ভয় পায়। অনেকে নিজের বাড়িতেও অন্ধকারে ভয় পায়। সামান্য শব্দও অন্ধকারে ভয় হতে পারে। আবার খুব সাধারণ কিছু জিনিসের আকারও অন্ধকারে বিকৃত হয়, মানুষ তা দেখে ভয় পায়।

অন্ধকারে কি মানুষ আসলেই ভূত দেখে, নাকি পুরোটাই চোখের ভ্রম
আধুনিক বিজ্ঞান ভয়কে জেনেটিক উত্তরাধিকার বা বংশগত বৈশিষ্ট্য বলে। ভয় কখনো মারাত্মক রূপ নিতে পারে, অসুস্থ করে তুলতে পারে মানুষকে। এ ধরনের ভয়কে বলে ফোবিয়া।

অন্ধকারে দুর্বলচিত্তের মানুষেরা ভয় পায়। অনেক সময় সাহসী মানুষের রোমকূপেও ভয়ের কাঁপন ওঠে। কিন্তু কেন?

শরীরের আঘাত এড়ানোর সহজাত ক্ষমতা থাকে। কোনো ভারী বস্তু বা শব্দ যদি এগিয়ে আসে, মানুষের অবচেতন মনই শরীরকে তাগাদা দেয় সেখান থেকে সরে যেতে। তখন মানুষ দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়ার চেষ্টা করে। এটা আসলে মস্তিষ্কের বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা মানুষকে দিয়ে করিয়ে নেয়। তেমনি অন্ধকারের প্রতিও মস্তিষ্কের একধরনের সংবেদনশীলতা আছে। তাই অন্ধকারে একধরনের ভীতিকর অনুভূতি তৈরি করে মস্তিষ্ক। এ কারণেই মানুষ অন্ধকারে ভয় পায়।

অন্ধকারে মানুষের চেয়ে অনেক দুর্বল প্রাণী কিন্তু ভয় পায় না; বিশেষ করে নিশাচর প্রাণীরা। তারা স্বচ্ছন্দে অন্ধকারে চলাফেরা করে। তাদেরও সহজাত ভয় আছে। তবে সেই ভয় অন্ধকারকে নয়, বরং শিকারি প্রাণীর ভয়। এসব শিকারি প্রাণী তাদের জীবন কেড়ে নিতে পারে।

অনেকে মনে করেন, মানুষ ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করে বলেই হয়তো অন্ধকারে ভয় পায়। হ্যাঁ, এটি একটি কারণ বটে, কিন্তু মূল কারণ নয়। খুব ছোট্ট শিশুও অন্ধকারে ভয় পায়। ছোট্ট শিশুরা তো ভূত-প্রেতের গল্প শোনা বা বোঝার সুযোগই পায়নি। তবু কেন তারা ভয় পায়? এই ব্যাপারটাই বলে দেয়, অন্ধকারে ভয় পাওয়াটা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ মানুষের জেনেটিক কোডের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ব্যাপারটা। এ নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন গবেষণাও করেছেন। এসেছে নানা তত্ত্ব ও প্রমাণ।

রাতের বেলা টিনের চালে লাফালাফি করে কে? ভূত না অন্যকিছু?
অন্ধকারের প্রতিও মস্তিষ্কের একধরনের সংবেদনশীলতা আছে। তাই অন্ধকারে একধরনের ভীতিকর অনুভূতি তৈরি করে মস্তিষ্ক। এ কারণেই মানুষ অন্ধকারে ভয় পায়।

মানুষের চোখ অন্ধকারে খুব বেশি কার্যকর নয়। কুকুর-বিড়াল এমনকি ইঁদুরের মতো প্রাণীরাও মানুষের চেয়ে অন্ধকারে অনেক ভালো দেখে। ব্রিটিশ সাইকোলজিস্ট ডেভিড লুইসের মতে, ‘মানুষের চোখ দিনের বেলায় ভালো দেখে। তখন অত সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় অন্ধকারে বা রাতে। এ সময় চোখ কম দেখে। ফলে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা তৈরি হয় মস্তিষ্কে। সম্ভাব্য হুমকির ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে মস্তিষ্ক, ভয়ের অনুভূতি তৈরি করে মস্তিষ্কে।’

প্রশ্ন হলো, সেই সম্ভাব্য হুমকিটা কী?

এসব হুমকি হয়তো আপনার চারপাশে এখন নেই। কিন্তু দূর অতীতে ছিল। সভ্যতার জন্মের আগে মানুষ আর দশটা সাধারণ প্রাণীর মতোই বাস করত বনে-জঙ্গলে। বন থেকে ফলমূল শিকার করে খেত। প্রকৃতির কাছে সেকালের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিহীন মানুষ ছিল অসহায়। শিকারি প্রাণীদের কাছে মানুষ ছিল সহজ শিকার। আবার এক গোত্রের মানুষ আরেক গোত্রের মানুষকে শত্রু মনে করত। অর্থাৎ নিজেদের মধ্যেও লড়াই চলত। এসব আক্রমণের বেশির ভাগই হতো রাতের বেলা। অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা শত্রু অতর্কিতে মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। সুতরাং সেকালেই মানুষের জিনের ভেতর ভয়টা ঢুকে যায়—অন্ধকারে বিপদ আছে!

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাচারাল হিস্ট্রির গবেষক এলিজাবেথ হাওয়ার্ড বলেন, ‘মানুষের জিনে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এগুলো অন্ধকারে মানুষকে সতর্ক করে। এই সতর্কতা আসলে ভয় হিসেবে প্রকাশ পায়।’ এলিজাবেথের মতে, এই ভয় আসলে মানুষের টিকে থাকার জন্যই প্রয়োজন। শহরে কিংবা বাড়িতে হয়তো ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু মানুষ কখনো কখনো কোনো ভীষণ অরণ্যে বা প্রতিকূল কোথাও রাত্রিবাস করে। মস্তিষ্কের এই সুরক্ষাব্যবস্থা তখন দরকার হয়।

বট গাছে ভূত থাকে?
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাচারাল হিস্ট্রির গবেষক এলিজাবেথ হাওয়ার্ড বলেন, ‘মানুষের জিনে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এগুলো অন্ধকারে মানুষকে সতর্ক করে। এই সতর্কতা আসলে ভয় হিসেবে প্রকাশ পায়।’

আরও কিছু কারণে মানুষ অন্ধকারে ভয় পায়। এর মধ্যে অন্যতম কারণ কল্পনাশক্তি। মানুষের মস্তিষ্ক অজানা বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন চিত্র বা গল্প তৈরি করে। রাতের নৈঃশব্দ্যে সাধারণ ছায়া ও শব্দকেই মানুষ অতিমাত্রায় ভয়ংকর ভাবতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সাইকোলজির অধ্যাপক রবার্ট মিলার দীর্ঘদিন মানুষের ভয় নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, মানুষ যা দেখতে পায় না, তা নিয়ে কাল্পনিক গল্প তৈরি করে মস্তিষ্ক। এসব গল্পে শঙ্কা ও ভয় লুকিয়ে থাকে। মানুষ তখন অজানা কোনো সত্তার উপস্থিতি কল্পনা করে। এই অজানা সত্তা স্থান-কাল ও সংস্কৃতিভেদে নানারকম হতে পারে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অন্ধকারে মানুষ শয়তানের উপস্থিতি কল্পনা করে। আমাদের উপমহাদেশের মানুষ ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানোকে কল্পনায় নিয়ে আসে অন্ধকার সত্তা হিসেবে।

অধ্যাপক মিলার মনে করেন, অন্ধকারে ভয় পাওয়া বা ভূত দেখার অনুভূতির সঙ্গে মানসিক অসুস্থতাও অনেক সময় বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা, সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক সমস্যাগুলো মানুষের মনে ভয়ের অনুভূতি তৈরি করে। অনেক সময় মানসিকভাবে অসুস্থ রোগী অন্ধকারে বা নির্জন জায়গায় নানারকম কাল্পনিক সত্তাকে দেখতে পায়। অর্থাৎ হ্যালুসিনেট করে।

আধুনিক কিছু গবেষণা বলছে, অন্ধকারের মধ্যে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা অঞ্চল সক্রিয় হয়ে ওঠে। ওই অংশটা ভয় ও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির অধ্যাপক সারা জেনকিনস বলেন, ‘অন্ধকারে মানুষের মন বুঝতে পারে না কোনটা সত্যি বিপদ, কোনটা কল্পনা। তাই অ্যামিগডালা অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ভয়ের অনুভূতি তীব্র হয়।’

ল্যাপলাসের দৈত্য: বিজ্ঞান ও দর্শনের সবচেয়ে রহস্যময় ভূত
অধ্যাপক রবার্ট মিলারের মতে, মানুষ যা দেখতে পায় না, তা নিয়ে কাল্পনিক গল্প তৈরি করে মস্তিষ্ক। এসব গল্পে শঙ্কা ও ভয় লুকিয়ে থাকে। মানুষ তখন অজানা কোনো সত্তার উপস্থিতি কল্পনা করে।

অন্ধকারে ভয় পাওয়ার আরেকটি কারণ হলো একাকিত্ব বা নির্জনতা। গভীর রাতে চারপাশে নিঝুম-নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। এ সময় বেশির ভাগ মানুষই ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু কিছু মানুষের ঘুম আসে না। সেই সব মানুষের মন তখন নানারকম নেতিবাচক কল্পনার দিকে মনোযোগ দেয়। মানুষ ভূত-প্রেতের কথা ভাবতে থাকে।

কেন ভূত-প্রেতের কথাই ভাবে মানুষ? কারণ, সামাজিক বাস্তবতা। এ দেশের বেশির ভাগ শিশুই ভূত-প্রেতের গল্প শুনে শুনে বড় হয়। এসব গল্প স্রেফ ফিকশন নয়, মানুষের মুখে মুখে ফেরা অন্ধবিশ্বাসের গল্প। সেসব গল্পের সঙ্গে রংচং চড়িয়ে নিজের ভয়ের অভিজ্ঞতা মিশিয়ে বলতে ভালোবাসে মানুষ। সেই গল্প ছোটরা শোনে, ফলে ভূত-প্রেতের বিশ্বাস তাদের মনেও গেঁথে যায়। অনেক বড় হওয়ার পরও এই গল্পের রেশ কাটে না। এমনকি ভূত-প্রেতে অবিশ্বাসী হয়ে উঠলেও ভয় মানুষকে ছাড়ে না।

আসল কথা হলো, অন্ধকারে ভূত-প্রেত থাকে না। ভয়ের জন্ম মানুষের মগজে। ভয়ের অনুভূতি উসকে দিতে কাল্পনিক ভূতের গল্পগুলো অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্টরোবট ভূত

Read full story at source