ডেভিড বেকহাম: হিরো থেকে ভিলেন, আবার হিরো
· Prothom Alo

ডেভিড বেকহাম শুধু ফুটবলের জন্যই বিখ্যাত নন, ফ্যাশন আইকন হিসেবেও তুমুল জনপ্রিয় তিনি। ফুটবলের ইতিহাসে একই সঙ্গে ফ্যাশন আর খেলার জগৎ দাপিয়ে বেড়ানো সুপারস্টার আগে কখনো ছিল না। বেকহাম যেন ফুটবল স্টার ছিলেন কম, মডেল ছিলেন বেশি। এমনটাই দাবি ছিল তাঁর নিন্দুকদের। সেই বেকহামের এক বিশ্বকাপের ভিলেন থেকে আরেক বিশ্বকাপের হিরো হওয়ার গল্প এটা।
Visit sport-tr.bet for more information.
১৯৯৮ বিশ্বকাপ: ‘ভিলেন’ বেকহাম
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯৮ বিশ্বকাপে। বেকহাম তখন ২৩ বছর বয়সেই ইংল্যান্ডের অন্যতম বড় সুপারস্টার। ইংল্যান্ডের ভরসার পাত্র। কিন্তু মিডিয়ার এত মাতামাতি পছন্দ ছিল না কোচ গ্লেন হডলের। গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচেই বসিয়ে রাখলেন বেকহামকে। শেষ ম্যাচে যখন বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার শঙ্কা মাথায়, হডল বাধ্য হলেন বেকহামকে নামাতে। এক ফ্রি–কিকে বেকহাম দলকে নিয়ে গেলেন নকআউট পর্বে। নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি ইংল্যান্ড। শেষ তাদের মধ্যে দেখা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে, ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’-এর দিনে। ইংল্যান্ড মত্ত প্রতিশোধের নেশায়। আর বেকহাম তাদের স্বপ্ন সারথি।
সিমিওনেকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখেছিলেন বেকহাম।কিন্তু সেই বেকহামই করে বসলেন ভুল। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক ডিয়েগো সিমিওনের ট্যাকলে মাটিতে লুটিয়ে ছিলেন বেকহাম। সিমিওনে তাঁকে ওঠাতে গেলে উল্টো সিমিওনের পায়েই আঘাত করে বসেন বেকহাম। রেফারির চোখের সামনেই ঘটছিল সবকিছু। ফলাফল? লাল কার্ড। ২-২ গোলের সমতায় থাকা সেই ম্যাচ গড়াল পেনাল্টিতে। অবশেষে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড। ডেভিড বেকহাম পরিণত হন ইংল্যান্ডের এক নম্বর ভিলেনে।
ইংল্যান্ডের ‘প্রিন্স’ থেকে আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলতে এক দিনও লাগে না মিডিয়ার। ট্যাবলয়েডের পাতায় শিরোনাম হয়েছে, ‘১০টি সিংহ ও একজন বোকা বালক’। চার্চের সামনে বিশাল ইলেকট্রিক বোর্ডে লেখা উঠেছে, ‘ঈশ্বর সবাইকে ক্ষমা করেন, এমনকি বেকহামকেও’। সেই বেকহামকে বছরের পর বছর মাঠে দুয়ো দিয়েছে ভক্তরা, এক লাল কার্ডের জন্য।
২০০১ বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব: ‘হিরো’ বেকহাম
এই ঘটনার বছর দুই পর, ইংল্যান্ডের দায়িত্বে এসেছেন পিটার টেইলর। এসেই দলের অধিনায়কত্ব তুলে দিলেন বেকহামের হাতে। ‘ভিলেন’ বেকহামের ওপর দায়িত্ব পড়ল দলকে বিশ্বকাপে নেওয়ার। ইংল্যান্ডকে নিয়ে রীতিমতো উড়ছিলেন তিনি। শেষ দিনে এসে বাধল বিপত্তি, কঠিন হয়ে দাঁড়াল সমীকরণ। শেষ দিনে জার্মানি আর ইংল্যান্ডের সমান ১৬ পয়েন্ট, গোল ব্যবধানে এগিয়ে ইংল্যান্ড। অর্থাৎ বিশ্বকাপে সরাসরি যেতে হলে শেষ ম্যাচে জার্মানির থেকে ভালো করতে হবে ‘থ্রি লায়ন্স’দের।
দলকে বিশ্বকাপে নেওয়ার পর বেকহামের আনন্দ।গ্রিসের বিপক্ষে সেদিনের ম্যাচ নিয়ে একটা উপন্যাস রচনা করলেও কম হয়ে যাবে। সেদিন মাঠে ৯০ মিনিটে ১৬ কিলোমিটার দৌড়ে রেকর্ড বুকে জায়গা করে নিয়েছিলেন বেকহাম। পুরো মাঠে সবই হচ্ছিল, শুধু গোল আসছিল না। ৯০ মিনিটের খেলা ততক্ষণে শেষ, চলছে তিন মিনিটের অতিরিক্ত সময়। ইংল্যান্ড পিছিয়ে ২-১ গোলে। জার্মানি থেকে খবর এসেছে, ড্র করেছে তারা। অর্থাৎ একটা গোল হলেই বিশ্বকাপে পৌঁছে যাবে ইংল্যান্ড। এমন সময়ই গোলবার থেকে ঠিক ৩০ গজ দূরে একটা ফ্রি-কিক পেলেন বেকহাম।
যে ফ্রি–কিক বেকহামের কাছে ডালভাত, পুরো ম্যাচে সেই ফ্রি–কিক কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। ১০টি ফ্রি–কিকের একটিও জালে জড়ায়নি, যেন ভুলেই গিয়েছেন কীভাবে গোল করতে হয় ফ্রি–কিক থেকে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আর কোনো ভুল করলেন না বেকহাম। গোলপোস্টের কানা ছুঁয়ে বল জড়িয়ে গেল জালে। ২০০২ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিল ইংল্যান্ড।
তিন বছর যে লাল কার্ড কুরে কুরে খেয়েছে বেকহামকে। এক মুহূর্তের জন্য ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলো ভুলতে দেয়নি সেই ভুলের কথা, তারাই ইংল্যান্ডের অবিসংবাদিত রাজা ঘোষণা করল বেকহামকে।
২০০২ বিশ্বকাপ: বেকহামের প্রতিশোধ
আর্জেন্টিনাকে বিদায় করার পর বেকহাম।বেকহামের প্রতিশোধের মঞ্চটা তৈরি করে দিল ২০০২ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনার জায়গা হলো একই গ্রুপে। আর সেটাকে কাজে লাগাতে একটুও ভুল করলেন না বেকহাম। যার অপেক্ষায় ছিলেন গত চার বছর, ঠিক সেটাই করে দেখালেন। ৪৪ মিনিটে পেলেন পেনাল্টি। মাথা ঠান্ডা রেখে প্রবেশ করিয়ে দিলেন জালে। বেকহামের এক গোলই যথেষ্ট ছিল টুর্নামেন্টের ফেবারিট আর্জেন্টিনাকে ছুড়ে ফেলতে। গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথ ধরল আর্জেন্টিনা। আর বেকহাম নিজেকে প্রমাণ করলেন আরেকবার।
দুটি বিশ্বকাপ আর তার মাঝের ভিলেন থেকে হিরো হওয়ার গল্প। ইংলিশ প্রিন্সের রাজা হওয়ার গল্প। বেকহাম নিজহাতে লিখেছিলেন, দেখিয়ে দিয়েছিলেন কীভাবে নিজেকে প্রমাণ করতে হয় বিশ্বের সামনে। ফিরে আসার গল্প লিখে।