ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ কি থামছে, কী বলছে দুই দেশ
· Prothom Alo
ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি স্থায়ী চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এখন পর্যালোচনা করছে তেহরান। সবশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সব ঠিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত সমঝোতা হতে পারে। তবে দুই দেশের অবস্থান, দাবিদাওয়ার ভিন্নতা এবং আঞ্চলিক সমীকরণ এখনো চুক্তির পথে বড় বাধা।
Visit rhodia.club for more information.
চুক্তিতে রাজি না বলে তীব্র বোমাবর্ষণ বলে ট্রাম্প হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান নিজেই এখন চুক্তিতে আসতে আগ্রহী। তাদের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবেই এগোচ্ছে।
আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল বুধবার ফক্স নিউজের সাংবাদিক ব্রেট বায়ার এক লাইভ অনুষ্ঠানে জানান, ইরানের সঙ্গে এক সপ্তাহের মধ্যেই একটি সমঝোতা বা চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ব্রেট বায়ার বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে তিনি বেশ আশাবাদী। আমি তাঁকে সময়সীমার কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, সব ঠিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যেই এটি চূড়ান্ত হতে পারে।’
তবে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সময়ে ট্রাম্প তাঁর নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ইরানকে হুমকিও দিয়েছেন। তেহরান চুক্তিতে রাজি না হলে দেশটিতে আগের চেয়েও তীব্র বোমাবর্ষণ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইরানের সতর্ক অবস্থান
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবটি এখনো বিবেচনাধীন। পর্যালোচনা শেষে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরান তাদের অবস্থান জানাবে।
তবে ইরানের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি মার্কিন প্রস্তাবকে নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা দাবিদাওয়ার তালিকা ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইব্রাহিম রেজায়ি আরও বলেন, রণক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যা অর্জন করতে পারেনি, তা আলোচনার টেবিলে আদায়ের অপচেষ্টা করছে। ইরান কোনো ‘চাপের মুখে’ নতি স্বীকার করবে না। প্রয়োজনে পাল্টা আঘাতের জন্য দেশটির সেনারা প্রস্তুত আছেন।
অন্যদিকে গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে ফোনে আলাপে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, কূটনৈতিক পথে যুদ্ধ বন্ধে ইরান প্রস্তুত। তবে ইরানের জনগণের অধিকার রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না বলে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
ফোনে আলাপে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাসও প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলাকালেই ইরানকে লক্ষ্য করে দুবার হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা পেছন থেকে ছুরি মারার শামিল।
সমঝোতা স্মারকে কী থাকছে
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমঝোতার খসড়া অনুযায়ী, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে এবং আটকে থাকা কয়েক শ কোটি ডলার অর্থ ছাড় দেবে। এ ছাড়া উভয় পক্ষই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর থাকা সব বিধিনিষেধ তুলে নেবে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার মেয়াদ নিয়ে এখন মূল দর–কষাকষি চলছে। তিনটি সূত্র বলছে, এই মেয়াদ হবে অন্তত ১২ বছর। তবে একটি সূত্র জানায়, এটি ১৫ বছর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ইরান পাঁচ বছরের প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের দাবিতে অটল ছিল।
ইরানের এক হামলার পর সৌদি আরবের রিয়াদ শহরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে। ৫ মার্চ, ২০২৬সূত্রটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে এমন একটি শর্ত যুক্ত করতে চায়, যাতে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের নিয়ম ভাঙলে স্থগিতাদেশের মেয়াদ আরও বেড়ে যাবে। আর এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ইরান ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত নিম্নমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে।
সমঝোতা স্মারকে ইরান অঙ্গীকার করবে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এ–সংক্রান্ত কোনো কর্মকাণ্ডেও জড়াবে না তারা। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরান যেন কোনো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পরিচালনা না করে, এমন একটি ধারা নিয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করছে।
ওই কর্মকর্তার মতে, ইরানকে কঠোর তদারকি ব্যবস্থার আওতায় থাকতেও রাজি হতে হবে। ফলে জাতিসংঘের পরিদর্শকেরা যেকোনো সময় ইরানি স্থাপনায় আকস্মিক পরিদর্শন করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র দাবি করেছে, ইরান তাদের কাছে থাকা উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে নিতে রাজি হতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল। তবে তেহরান এত দিন সেটা মানতে চায়নি। একটি সূত্রের দাবি, এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস মনে করছে ইরানের নেতৃত্ব এখন বিভক্ত, ফলে দেশটির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি কঠিন হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের কিছু শীর্ষ নেতাকে উন্মাদ বলে মন্তব্য করে শেষ পর্যন্ত চুক্তি হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।