ব্যক্তিগত নোটে অমূল্য ইতিহাস

· Prothom Alo

স্বাধীন একটি ভূখণ্ডের জন্য শত বছর ধরে সংগ্রামরত বাঙালি জাতির জন্য ১৯৭১ একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এ পর্বে রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। বাঙালির গৌরবজনক এই রাজনৈতিক অধ্যায়ের অন্যতম প্রধান চরিত্র তাজউদ্দীন আহমদ, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে ১৯৭১ সালের জনযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। অস্থির ও উত্তাল সেই সময়ে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাও তাঁর জন্য সহজ ছিল না। তীব্র অন্তর্দলীয় কোন্দল, মতবিরোধ, বিভিন্ন পক্ষের অসহযোগিতা, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও মতাদর্শগত বিভক্তি মোকাবিলা করেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। বন্ধুর এ যাত্রাপথে তাঁকে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেক সময় হয়ে পড়েছেন একান্ত একা। এ কারণে অনেক ইতিহাস বিশ্লেষক তাঁকে ১৯৭১ সালের নিঃসঙ্গ সারথি হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।

যুদ্ধদিনের এই নিঃসঙ্গ সারথির এক দারুণ অভ্যাস ছিল। তিনি বিভিন্ন আলোচনার নোট নিতেন, ডায়েরি লিখতেন। তাজউদ্দীন আহমদের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশে ব্যক্তিগত নোট নিয়েই এ গ্রন্থ। মেধাবী, দূরদর্শী ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিনিয়ত তাজউদ্দীন আহমদকে নানা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে হতো। যোগ দিতে হতো গুরুত্বপূর্ণ নানা বৈঠকে। এসব ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ও বৈঠকের নোটই এ গ্রন্থের প্রধান আধেয়, যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু অন্ধকার অধ্যায় সম্পর্কে অতিগুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে।

Visit tr-sport.bond for more information.

যুদ্ধদিনের একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে আলাপচারিতায় তাজউদ্দীন আহমদ বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ নোট নিয়েছিলেন। তাতে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ লিখছেন, ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পরও, অগ্রিম আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও সেক্টর কমান্ডার-২ আসেননি।

`মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশ’ বইয়ের প্রচ্ছদ

তাঁর উসকানিতে ভাষণ দেওয়ার সময় জওয়ানরা এ প্রশ্ন করেছেন? আওয়ামী লীগ তাঁদের জন্য কী করেছে, একই আলোচনায় তাজউদ্দীন আরও নোট নিয়েছেন, ক্যাপ্টেন হায়দারের প্রশিক্ষণার্থীরা, তাঁদের অর্ধেকই আওয়ামী লীগের নামে স্লোগান দেননি।—তাজউদ্দীনের নোটের এই দুটো বাক্য খুবই সাদামাটা ও সাধারণ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে ইতিহাসের গভীর অনুষঙ্গ ও যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। একটু খতিয়ে দেখা যাক। ১৯৭১ সালে সেক্টর-টু–এর অধিনায়ক ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ আর তাঁর অধীনে গেরিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতেন ক্যাপ্টেন হায়দার। মুক্তিযুদ্ধে এই দুই মুক্তিযোদ্ধার অবদান নিয়ে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু যুদ্ধদিনে তাঁদের সঙ্গে মুজিবনগর সরকারের দ্বন্দ্ব ছিল। একটু মনে করিয়ে দিই, ১৯৭১ সালে রাজধানী ঢাকা ছিল সেক্টর টু–এর অধীনে। আর এই সেক্টরে যোগ দিতে চিন্তাচেতনায় অগ্রগামী বা কিছুটা বামঘেঁষা ছাত্র-যুবারা সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছিলেন। রুমী, বদি, আজাদরা এই দলেই ছিলেন। মুক্তিকামী এসব তরুণের অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রতি অনুরক্ত ছিলেন না। তাই মুক্তিবাহিনীতে তাঁদের যোগদান ও পরের দিকে নানা বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তাঁদের দ্বন্দ্ব ছিল। যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত যুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশেও অব্যাহত ছিল।

সাজ্জাদ শরিফের সম্পাদনায় বইটি মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম পর্বে আছে তাজউদ্দীনের যুদ্ধকালীন নোট, পরের অংশে যুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশের। স্বাধীন বাংলাদেশের পর্বটি শুরু হয়েছে ১৯৭২ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে।

ফেনী জেলার এক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে আলাপচারিতায় তাজউদ্দীন নোট নিয়েছেন, ছাত্ররা দুই ভাগে বিভক্ত—মুজিববাদ ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। (পৃষ্ঠা: ৬৭) নিশ্চিতভাবেই ইঙ্গিতপূর্ণ ও অর্থবহ নোট। এ অংশেই কুষ্টিয়ার এক নেতার সঙ্গে আলাপচারিতায় তাজউদ্দীন তাঁর নোট খাতায় লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট কোলাবরেটরদের ঘাঁটি’। (পৃষ্ঠা: ৬৭)

ফেনী জেলার এক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে আলাপচারিতায় তাজউদ্দীন নোট নিয়েছেন, ছাত্ররা দুই ভাগে বিভক্ত—মুজিববাদ ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। (পৃষ্ঠা: ৬৭) নিশ্চিতভাবেই ইঙ্গিতপূর্ণ ও অর্থবহ নোট। এ অংশেই কুষ্টিয়ার এক নেতার সঙ্গে আলাপচারিতায় তাজউদ্দীন তাঁর নোট খাতায় লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট কোলাবরেটরদের ঘাঁটি’। (পৃষ্ঠা: ৬৭)

১৯৭৩ সালের নোটগুলোয় আরও বিস্তারিতভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বিভক্ত ও ব্যর্থ হতে যাওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার চিত্র। আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলামের সঙ্গে আলাপচারিতার নোট নিতে গিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ লিখেছেন, স্বাধীনতাবিরোধীরা এখন বঙ্গবন্ধুকে মালা দিচ্ছেন। এ অংশেই তিনি নোট নিয়েছেন, বাংলাদেশবিরোধী শক্তি প্রচারে সফল হচ্ছে: ভারতবিরোধী, হিন্দুবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মনোভাব জাগাতে সমর্থ হচ্ছে। (পৃষ্ঠা: ৮৯)

পরবর্তী অংশেও এ ধরনের অনেক নোট রয়েছে, যেগুলো রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী পাঠকদের জন্য এসব নোট নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগাতে পারে। গ্রন্থটির শেষ অংশে তাজউদ্দীনের তিনটি ভাষণ বিশেষ সংযোজন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধদিনের এই তিনটি ভাষণ সত্যিই সুলিখিত, মুক্তিসংগ্রামের অনবদ্য দলিল।

গ্রন্থটির টীকা অংশে আছে বিভিন্ন ব্যক্তির পরিচয়। কিন্তু ঘটনা বা প্রেক্ষাপটভিত্তিক কোনো টীকা নেই। যদি ঘটনার প্রেক্ষাপটভিত্তিক টীকা সংযোজিত হতো, তাহলে অনেকের কাছে তাজউদ্দীনের নেওয়া নোটগুলোর যথার্থতা পাঠক সহজে বুঝতে পারতেন। আশা রাখছি, গ্রন্থটির সম্পাদক আগামী সংস্করণে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।

...

মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশ

তাজউদ্দীন আহমদ

সম্পাদনা: সাজ্জাদ শরিফ

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন

প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল

মূল্য: ৪২৫ টাকা; পৃষ্ঠা: ১৬৭

Read full story at source