বগুড়ায় সুর আর অভিনয়ে এক ‘অন্যরকম’ যাত্রা
· Prothom Alo

সেই সন্ধ্যায় হালকা বৃষ্টি ছিল। তার মধ্যেও বগুড়া শহরের নওয়াববাড়ি সড়কে মানুষের ভিড়। সেই বৃষ্টি-ভিড় পেরিয়ে বগুড়া ইয়ুথ কয়্যারের কার্যালয়ের পেছনের এক পুরোনো ভবনে ঢুকে পড়ি। দরজার কাছে যেতেই কানে আসে ঢোল, বাঁশি আর হারমোনিয়ামের সুর।
ভেতরে ঢুকে দেখি একটি বড় ঘরের মধ্যে গোল হয়ে বসে নানা বয়সের একদল শিল্পী অনুশীলনে ব্যস্ত। সামনে ছড়ানো ঢোল, তবলা, খমক, মন্দিরা, হারমোনিয়াম, খোল, গিটার, কাহন—আরও কত যন্ত্র! শিল্পীদের চোখেমুখে একাগ্রতা। বোঝাই যায়, সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁদের। সবাই বগুড়া থিয়েটারের নাট্যকর্মী। নাটকের পাশাপাশি গান ও কবিতার ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে করতে তৈরি করে ফেলেছেন একটা দল—‘দল অন্যরকম’।
Visit syntagm.co.za for more information.
সে সন্ধ্যায় তাদের সঙ্গেই গানে–গল্পে কিছুটা সময় কাটল। ‘মহারাজা তোমাদের সালাম’ দিয়ে শুরু, এরপর ‘দেখা না দিলে বন্ধু কথা কইও না’, ‘মা লো মা’, ‘সাদা সাদা কালা কালা’, ‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে’। আবার তালির তালে কাওয়ালি! গজলও শোনায়, তুমে দিল লাগি হে জানি পারে গি...। কোনো পরিবেশনায় কোথাও তাল হারায় না, সুর ফসকে যায় না। জমিয়ে গান করে।
শুধু ‘গানের দল’ বললে তাদের পরিচয় পুরোটা ধরা পড়ে না। পরিবেশনায় কখনো যুক্ত হয় কবিতা, কখনো গল্প, কখনো রম্যকথা। একটি গানের রেশ ধরে একজন অভিনয় করে পরের গানের সূত্র ধরিয়ে দেন—এভাবেই তৈরি হয় কথা ও গানের সেতুবন্ধ।সে সন্ধ্যায় তাদের সঙ্গেই গানে–গল্পে কিছুটা সময় কাটল
মুগ্ধ হয়ে শুনলাম, দেখলাম। মনে হলো শুধু ‘গানের দল’ বললে তাদের পরিচয় পুরোটা ধরা পড়ে না। পরিবেশনায় কখনো যুক্ত হয় কবিতা, কখনো গল্প, কখনো রম্যকথা। একটি গানের রেশ ধরে একজন অভিনয় করে পরের গানের সূত্র ধরিয়ে দেন—এভাবেই তৈরি হয় কথা ও গানের সেতুবন্ধ। মনে হলো এই কিছুক্ষণ আগে কোনো মুহূর্ত ধরে তাঁরা গানটি বুনেছেন বা বেছে নিয়েছেন। শ্রোতার সঙ্গে সুরে সুরে চললে অন্যরকম কথোপকথন। অভিনব সে পরিবেশনা, হয়তো এ কারণেই নাম—‘দল অন্যরকম’।
দলের সদস্যরা যেহেতু নাট্যকর্মী, তাই তাঁদের পরিবেশনায় স্বাভাবিকভাবেই থাকে নাট্যরস। অনেক সময় তাৎক্ষণিক ইম্প্রোভাইজেশনে দর্শকের সঙ্গে তৈরি হয় সরাসরি যোগাযোগ। স্থান, কাল ও পাত্রভেদে কথক বুনে চলেন গল্প। ফলে একসঙ্গে গান, কবিতা ও অভিনয়ের স্বাদ পান দর্শক।
দলের সদস্যরা যেহেতু নাট্যকর্মী, তাই তাঁদের পরিবেশনায় স্বাভাবিকভাবেই থাকে নাট্যরস। অনেক সময় তাৎক্ষণিক ইম্প্রোভাইজেশনে দর্শকের সঙ্গে তৈরি হয় সরাসরি যোগাযোগ। স্থান, কাল ও পাত্রভেদে কথক বুনে চলেন গল্প। ফলে একসঙ্গে গান, কবিতা ও অভিনয়ের স্বাদ পান দর্শক।
এই দলের জন্ম অনেকটা হঠাৎ করে। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙ্গায় নাটক করতে গিয়েছিল বগুড়া থিয়েটার। আয়োজকদের অনুরোধে দলটিকে সেখানে নাটকের পাশাপাশি গান পরিবেশন করতে হয়। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই কবিতা ও গানের সংমিশ্রণে তারা একটি পরিবেশনা করে। হাজারখানেক দর্শকের ভালোবাসায় ভেসে যান সদস্যরা। সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই দেশে ফিরে শুরু হয় ‘দল অন্যরকম’। অল্প সময়েই বগুড়া ও আশপাশের এলাকায় দলটি সাড়া ফেলেছে, জানান স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা।
২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙ্গায় নাটক করতে গিয়েছিল বগুড়া থিয়েটার। আয়োজকদের অনুরোধে দলটিকে সেখানে নাটকের পাশাপাশি গান পরিবেশন করতে হয়। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই কবিতা ও গানের সংমিশ্রণে তারা একটি পরিবেশনা করে।‘দল অন্যরকম’–এর শিল্পীরা। ছবি: প্রথম আলো
কথা হলো বগুড়ার সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গানের দল ‘বিবর্তন বগুড়া’র সভাপতি জি এম সাকলাইনের সঙ্গে। ‘আঞ্চলিক গানকে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করে একসময় বাজিমাত করেছিল বগুড়া ইয়ুথ কয়্যার। সাম্প্রতিক সময়ে কথামালা ও গানের মিশেলে নতুনভাবে সাড়া ফেলেছে “দল অন্যরকম”। জনপ্রিয় গানগুলোকে দলগত পরিবেশনা ও অভিব্যক্তির সূক্ষ্মতায় নতুনভাবে তুলে ধরছে। নামের মতোই তাদের পরিবেশনা সত্যিই অন্যরকম।’ স্থানীয় কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মীর মন্তব্যও একই রকম।
দলের গানের অংশের দায়িত্বে আছেন সোবহানী বাপ্পী আর কবিতা ও কথার অংশে কনক কুমার পাল। তাঁদের সঙ্গে বায়েজিদ নিবিড়, আমিনুল রকি, স্মরণ, আল গালিব, রবিউল করিম, মো. সানা—সবাই মিলে হারমোনিয়াম, ঢোল, তবলা, কলস, ডারবুকা, খমক, নাকাড়া, মাদল, কাহন, করতাল, অ্যাকুয়াস্টিক ও ইলেকট্রিক গিটারে বাজিয়ে জমিয়ে তোলেন আসর।
বগুড়ায় তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুরুঅনুষ্ঠানভেদে গান নির্বাচনেও থাকে ভিন্নতা। গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে বিয়ের গীত, আবার স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোক ও ব্যান্ড গানের মিশেল—সব জায়গাতেই নিজেদের মতো করে পরিবেশনা সাজিয়ে নেন তাঁরা।
অনুষ্ঠানভেদে গান নির্বাচনেও থাকে ভিন্নতা। গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে বিয়ের গীত, আবার স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোক ও ব্যান্ড গানের মিশেল—সব জায়গাতেই নিজেদের মতো করে পরিবেশনা সাজিয়ে নেন তাঁরা। দলটির একটি স্লোগানও আছে—‘কবিতা আর বাংলা গানে, মন ভাসুক ভাটি কিংবা উজানে’।
দলের মূল ভোকালিস্ট সোবহানী বাপ্পী বলেন, ‘অন্যরকম কিছু করতে চেয়েছি আমরা। প্রতিনিয়ত ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের তৈরি করছি। এখন পর্যন্ত দর্শকের যে সাড়া পাচ্ছি, তা আমাদের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক। আমাদের কয়েকটি মৌলিক গান রয়েছে, সংখ্যাটা বাড়ানোর চেষ্টা করছি।’
দলের অন্যতম সদস্য কনক কুমার পাল বলেন, ‘এটা সত্যি যে এক শ্রেণির মানুষ ছাড়া সাধারণ দর্শক কবিতা শুনতে খুব একটা আগ্রহী নয়। কিন্তু আমাদের পরিবেশনায় কবিতাও দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এ কাজটা দেশ-বিদেশের আরও দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।’ শেষে জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা সবাই বগুড়া থিয়েটার ও কলেজ থিয়েটারের নাট্যকর্মী—থিয়েটারই আমাদের মূল পরিচয়।’
যে ঘরে মহড়া চলছিল, সেটিই নাট্যদলের কার্যালয়। দেয়ালে সেলিম আল দীনের বড় প্রতিকৃতি আর নানা নাটকের পোস্টার যেন জায়গাটিকে আলাদা আবহ দিয়েছে। মহড়া দেখতে এবং দিনের কাজ শেষে এই সাংস্কৃতিক আড্ডায় সময় কাটাতে সেদিন এসেছিলেন দলের প্রবীণ সদস্যরাও। পরিচয় হলো সংগঠনের সদস্যসচিব দ্বীন মোহাম্মদ দীনু, পাঁপড়ি ইসলাম, খন্দকার এনাম, নজরুল ইসলাম, শহীদুর রহমান, কবির রহমান, গাজী আশাসহ নানা প্রজন্মের এক ঝাঁক নাট্যকর্মীর সঙ্গে। বগুড়া থিয়েটারের আহ্বায়ক পলাশ খন্দকার জানান, ১৯৮০ সালের ২৯ মে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু। ‘ঝড়ঝঞ্ঝা পেরিয়ে বসন্তের মুকুল যেমন জ্যৈষ্ঠে পাকা ফলে রূপ নেয়, তেমনি দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ ৪৬ বছরের এক শক্ত সাংস্কৃতিক বৃক্ষে পরিণত হয়েছে বগুড়া থিয়েটার,’ বলেন তিনি।
যে ঘরে মহড়া চলছিল, সেটিই নাট্যদলের কার্যালয়এ পর্যন্ত বগুড়া থিয়েটারের প্রযোজনা ৬৫টি, মঞ্চায়নের সংখ্যা দেড় সহস্রাধিক। বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে একাধিকবার মঞ্চস্থ হয়েছে তাঁদের নাটক। ‘ইঙ্গিত’, ‘যে গল্পের শেষ নেই’, ‘কথা পুণ্ড্রবর্ধন’, ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’, ‘কোর্ট মার্শাল’, ‘দ্রোহ’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’—এমন অনেক উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা রয়েছে তাদের।
পলাশ খন্দকার জানান, এ পর্যন্ত বগুড়া থিয়েটারের প্রযোজনা ৬৫টি, মঞ্চায়নের সংখ্যা দেড় সহস্রাধিক। বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে একাধিকবার মঞ্চস্থ হয়েছে তাঁদের নাটক। ‘ইঙ্গিত’, ‘যে গল্পের শেষ নেই’, ‘কথা পুণ্ড্রবর্ধন’, ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’, ‘কোর্ট মার্শাল’, ‘দ্রোহ’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’—এমন অনেক উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা রয়েছে তাদের। পাশাপাশি টানা ৪৪ বছর ধরে বৈশাখী মেলা আয়োজন করে আসছে দলটি।
দলের গানের অংশের দায়িত্বে আছেন সোবহানী বাপ্পী আর কবিতা ও কথার অংশে কনক কুমার পালবৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় ‘দল অন্যরকম’-এর মহড়া দেখতে দেখতে কখন যে সময় পেরিয়ে গেল, টেরই পাইনি। বলা যায়, একধরনের ঘোরের মধ্যে ছিলাম। তাদের গায়কি যেমন দারুণ, তেমনি বাদনেও স্পষ্ট দক্ষতা। পুরোনো গানগুলোও যেন নতুন হয়ে ফিরে আসে। পুরো পরিবেশনাটা মনে হয় নানা ফুলের মালা—একটির সঙ্গে আরেকটির মেলবন্ধন। সব মিলিয়ে এক পরিপূর্ণ উপস্থাপনা—এখানেই তাদের মুনশিয়ানা, এখানেই তারা সত্যিই অন্যরকম।
অটোরিকশায় নওয়াববাড়ি সড়ক থেকে চেলোপাড়ার মধুবনের পথে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল, ক্রমশ স্ক্রিননির্ভর হয়ে ওঠা প্রজন্মের ডিজিটাল সামাজিক মাধ্যমের এই সময়েও ঢাকা থেকে দূরের একটি জেলা শহরে এমন প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চা দেখা সত্যিই ভিন্ন অভিজ্ঞতা। এ অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়—সময় এখনো ফুরোয়নি, জেলা শহরগুলোতে সংস্কৃতি এখনো নিজের মতো করে বেঁচে আছে। মানুষের ভেতরে সংস্কৃতির স্পন্দন এখনো টিকে আছে। হয়তো রাজধানীর বাইরে, এমন চর্চাই টিকিয়ে রাখবে আমাদের সাংস্কৃতিক প্রাণ।