বিশ্বের শীর্ষ ১০ আমদানিকারক দেশ কারা, কী আমদানি করে তারা
· Prothom Alo
বিশ্ব অর্থনীতিতে সব সময় এক অদৃশ্য স্রোত বয়ে যায়—পণ্য চলাচলের স্রোত। অর্থাৎ এক দেশের উৎপাদিত পণ্য আরেক দেশে যায়। অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। কেননা, সব দেশ সব পণ্য উৎপাদন করতে পারে না।
Visit sport-tr.bet for more information.
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক বাজারের মূল ক্রেতা, অর্থাৎ সবচেয়ে বড় আমদানিকারক। এক বছরে ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে তারা। এ ক্ষেত্রে তারা অদ্বিতীয়-দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের তুলনায় প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার বেশি। বৈশ্বিক মোট আমদানির ১৩ শতাংশের বেশি করছে তারা। জ্বালানি থেকে শুরু করে কাঁচামাল, প্রস্তুত পণ্য—সবকিছুর জন্যই বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের ভোগ ও উৎপাদন কাঠামো।
অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের এই আমদানিনির্ভরতা। ট্রিলিয়ন ডলার বা এক লাখ কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্যঘাটতি তাদের, সেটাও বিশ্বে নজিরবিহীন। তা নিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আপত্তির শেষ নেই। তবে এই ঘাটতি আবার অন্যদিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি। সেটা হলো ডলার শক্তিশালী হওয়ার কারণে আমদানি তুলনামূলক সস্তা। ফলে বিশ্ববাজারে দেশটি সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে। দেখা যাক, বিশ্বের শীর্ষ আমদানিকারক ১০টি দেশ কোনগুলো। ২০২৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে এই তালিকা প্রণয়ন করেছে ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট।
মেক্সিকো, আমদানির পরিমাণ: ৬৮৩ বিলিয়ন ডলার, হিস্যা: ২ দশমিক ৬ শতাংশ
মেক্সিকো উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি। ফলে দেশটির উৎপাদনের সঙ্গে আমদানি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দেশটি মূলত যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিকস উপাদান, গাড়ির যন্ত্রাংশ, জ্বালানি ও শিল্প কাঁচামাল আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে সীমান্তজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে উঠেছে। মেক্সিকোর উৎপাদন খাত, বিশেষ করে অটোমোবাইল ও অ্যাসেম্বলি শিল্প, এই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আমদানি ও রপ্তানি মিলেই দেশটির শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।
ভারত, আমদানির পরিমাণ: ৭৫৩ বিলিয়ন ডলার, হিস্যা: ২ দশমিক ৮ শতাংশ
ভারত দ্রুত বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতি। ফলে দেশটির প্রবৃদ্ধি আমদানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দেশটি মূলত জ্বালানি—বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল, সোনা, ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক পণ্য আমদানি করে। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে জ্বালানিনির্ভরতা বেশি। চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব তাদের আমদানির প্রধান উৎস। উচ্চ আমদানির কারণে চলতি হিসাবে চাপ তৈরি হলেও শিল্পোৎপাদন ও ভোগ চাহিদা পূরণে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জাপান, আমদানির পরিমাণ: ৭৫৬ বিলিয়ন ডলার, হিস্যা: ২ দশমিক ৮ শতাংশ
জাপান উন্নত দেশে হলেও তার সম্পদ সীমিত। ফলে আমদানি একধরনের অপরিহার্য বাস্তবতা। দেশটি প্রধানত জ্বালানি তেল ও গ্যাস, খাদ্যশস্য, কাঁচামাল ও শিল্প উপকরণ আমদানি করে। অভ্যন্তরীণ সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে এই নির্ভরতা বেড়েছে। অন্যদিকে উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ও গাড়ি উৎপাদনে জাপান এগিয়ে। ফলে দেশটির রপ্তানি খাত শক্তিশালী। আমদানি ও রপ্তানি মিলেই জাপান স্থিতিশীল, যদিও তার প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেছে।
ফ্রান্স, আমদানির পরিমাণ: ৭৮৬ বিলিয়ন ডলার, হিস্যা: ৩ শতাংশ
ফ্রান্স বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উন্নত অর্থনীতি। দেশটির ভোগ ও শিল্প কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে আমদানি। তারা মূলত জ্বালানি, যন্ত্রপাতি, গাড়ির যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক পণ্য, খাদ্য ও প্রযুক্তিপণ্য আমদানি করে। শক্তিশালী কৃষি ও শিল্প খাত থাকলেও জ্বালানিনির্ভরতার কারণে আমদানি গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য নেটওয়ার্কের কারণে জার্মানি, বেলজিয়াম ও স্পেন থেকে বিপুল পণ্য আমদানি করে ফ্রান্স। বাণিজ্যঘাটতি থাকলেও আমদানির কারণে ভোগভিত্তিক অর্থনীতি সচল আছে।
হংকং, আমদানির পরিমাণ: ৮৩২ বিলিয়ন ডলার, হিস্যা: ৩ দশমিক ১ শতাংশ
হংকং উন্মুক্ত ও বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি। দেশটির অর্থনৈতিক কাঠামোর মূলে আছে আমদানি। তারা মূলত ভোক্তা পণ্য, ইলেকট্রনিকস, খাদ্য, ফ্যাশনের সামগ্রী ও বিলাসবহুল পণ্য আমদানি করে। স্থানীয় উৎপাদন সীমিত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় সবটাই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে হংকং গুরুত্বপূর্ণ পুনঃরপ্তানি কেন্দ্র, চীনসহ আঞ্চলিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। শক্তিশালী সেবা খাত ও বৈশ্বিক আর্থিক সংযোগের কারণে হংকং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নেদারল্যান্ডস, আমদানির পরিমাণ: ৮৭০ বিলিয়ন ডলার, হিস্যা: ৩ দশমিক ৩ শতাংশ
নেদারল্যান্ডস ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও লজিস্টিক কেন্দ্র; আমদানির ক্ষেত্রে ‘পুনঃরপ্তানি কেন্দ্র’ হিসেবে বিশেষ পরিচিত। দেশটি মূলত জ্বালানি, কাঁচামাল, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি ও খাদ্যপণ্য আমদানি করে। রটারডাম বন্দরের মাধ্যমে এসব পণ্য ইউরোপের অন্যান্য দেশে পুনরায় রপ্তানি করা হয়। উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর লজিস্টিক ব্যবস্থা ও উন্মুক্ত বাণিজ্যনীতির কল্যাণে নেদারল্যান্ডস বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে আমদানি শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা নয়, আঞ্চলিক বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাজ্য, আমদানির পরিমাণ: ৯৪৯ বিলিয়ন ডলার, হিস্যা: ৩ দশমিক ৬ শতাংশ
যুক্তরাজ্য বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ আমদানিনির্ভর উন্নত অর্থনীতি। দেশটি মূলত ভোক্তা পণ্য, গাড়ি, যন্ত্রপাতি, ওষুধ, খাদ্য ও জ্বালানি আমদানি করে। শিল্প উৎপাদন নয়, দেশটি বরং সেবা খাতনির্ভর হওয়ায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি। ইউরোপ ও বৈশ্বিক সরবরাহ নেটওয়ার্ক থেকে যুক্তরাজ্য পণ্য আমদানি করে। বাণিজ্যঘাটতি থাকলেও শক্তিশালী আর্থিক খাত ও বৈশ্বিক সংযোগের কল্যাণে দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আছে।
জার্মানি, আমদানির পরিমাণ: ১ হাজার ৫৪৩ বিলিয়ন ডলার, হিস্যা: ৫ দশমিক ৮ শতাংশ
জার্মানি ইউরোপের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আমদানিকারক দেশ। দেশটি মূলত জ্বালানি, কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক পণ্য ও মধ্যবর্তী শিল্পপণ্য আমদানি করে থাকে। শক্তিশালী উৎপাদন খাত ও রপ্তানিনির্ভর শিল্প কাঠামোর কারণে আমদানি উৎপাদন শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউরোপীয় সরবরাহ নেটওয়ার্কের কেন্দ্র হিসেবে জার্মানি আমদানি করা উপকরণ ব্যবহার করে উচ্চমূল্য সংযোজন করে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করে। ফলে আমদানি ও রপ্তানি—উভয়ই তার অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
চীন, আমদানির পরিমাণ: ২ হাজার ৫৮৩ বিলিয়ন ডলার, হিস্যা: ৯ দশমিক ৭ শতাংশ
চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ। দেশটি মূলত কাঁচামাল, জ্বালানি (তেল ও গ্যাস), লোহা, আকরিক, সয়াবিন ও উচ্চপ্রযুক্তির উপাদান, যেমন সেমিকন্ডাক্টর আমদানি করে। এই আমদানি চীনের বিশাল শিল্প ও রপ্তানিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা সচল রেখেছে। বিশ্বের কারখানা হিসেবে পরিচিত চীন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্রীয় অংশ। দেশটির উৎপাদনসক্ষমতা ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমদানির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র, আমদানির পরিমাণ: ৩ হাজার ৫০৭ বিলিয়ন ডলার, হিস্যা: ১৩ দশমিক ২ শতাংশ
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ। দেশটি মূলত ভোক্তা পণ্য, ইলেকট্রনিকস, গাড়ির যন্ত্রাংশ, যন্ত্রপাতি ও জ্বালানি আমদানি করে। শক্তিশালী ডলার ও উচ্চ ভোগক্ষমতার কারণে আমদানি সহজ ও সস্তা হয়েছে। ফলে পৃথিবীতে যত আমদানি বাণিজ্য হয়, তার ১৩ দশমিক ২ শতাংশই করে যুক্তরাষ্ট্র। চীন, মেক্সিকো, কানাডা ও জার্মানি তাদের আমদানির প্রধান উৎস। দেশটির মানুষের উচ্চ ক্রয়ক্ষমতার কারণে তারা সারা বিশ্বের বাজারে পরিণত হয়েছে। ফলে তাদের বাণিজ্যঘাটতি বেড়েছে। এই বাণিজ্যঘাটতি পূরণ করতেই দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন।