জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য কেন আছে, সরিয়ে নিলে কী হতে পারে

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জার্মানিতে মোতায়েন থাকা ৩৬ হাজার ৪০০ মার্কিন সেনাসদস্যের মধ্য থেকে ৫ হাজার সেনা সরিয়ে নিচ্ছেন। ইরানের চলমান যুদ্ধে তেহরানের কৌশলের কাছে যুক্তরাষ্ট্র হেরে গেছে এবং অপদস্থ হয়েছে বলে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎসের মন্তব্যের কয়েক দিন পরই এই সিদ্ধান্ত জানান তিনি।

জার্মানিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতিকে সামরিক জোট ন্যাটোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের জন্যও জরুরি।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

এখন দেখা যাক—যুক্তরাষ্ট্র কেন জার্মানিতে সামরিক ঘাঁটি রেখেছে, সেগুলোর ভূমিকা কী এবং জার্মানি থেকে সেনা কমানোর সিদ্ধান্ত কেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র কেন জার্মানিতে সামরিক ঘাঁটি রেখেছে

জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির শুরুটা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৪৫ সালে। তখন জার্মানিতে নাৎসি শাসনের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৬ লাখ সেনা দেশটিতে মোতায়েন করা হয়। এক বছরের মধ্যে এ সংখ্যা কমে ৩ লাখের নিচে নেমে আসে। তখন তারা মূলত জার্মানির দখলকৃত অংশ পরিচালনা করত।

এরপর ধীরে ধীরে সেনার সংখ্যা আরও কমে যায়।

স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল জার্মানি পুনর্গঠন ও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে শক্তপোক্ত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।

ওই সময় থেকেই জার্মানিতে মার্কিন ঘাঁটিগুলো স্থায়ী হয়ে যায়, বিশেষ করে ১৯৪৯ সালে পশ্চিম জার্মানি ও সামরিক জোট ন্যাটো প্রতিষ্ঠার পর।

জার্মানির হোহেনফেলসে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আয়োজিত মহড়ায় সেনারা

স্নায়ুযুদ্ধের সময় জার্মানিতে প্রায় ৫০টি বড় ঘাঁটি এবং ৮০০টির বেশি সামরিক স্থাপনা পরিচালনা করত যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ছিল বিমানঘাঁটি, সেনা ব্যারাক ও গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং দুই বছর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এসব ঘাঁটির অনেকগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৬০ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত বেশির ভাগ সময় জার্মানিতে অবস্থানকারী যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ছিল। তখন তাদের পরিবারও সেখানে থাকত। অনেক ঘাঁটি এলাকা যুক্তরাষ্ট্রের ছোট শহরের মতো হয়ে গিয়েছিল। সেখানে তাদের নিজস্ব স্কুল, দোকান, এমনকি সিনেমা হল পর্যন্ত ছিল।

মোট কত সেনা, তাদের কী কাজ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শেষ নাগাদ ইউরোপে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে অবস্থানকারী যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসংখ্যা ছিল প্রায় ৬৮ হাজার। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৪০০ জন বা অর্ধেকের বেশি জার্মানিতে।

এ সেনারা জার্মানির ২০ থেকে ৪০টি ঘাঁটিতে ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে আছে স্টুটগার্টে অবস্থিত ইউরোপীয় কমান্ড ও আফ্রিকা কমান্ডের সদর দপ্তর। এখান থেকে ইউরোপ ও আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক অভিযানের সমন্বয় করা হয়।

ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ৭টি স্থায়ী সেনাঘাঁটির মধ্যে ৫টিই জার্মানিতে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোর একটি হলো রামস্টেইন বিমান ঘাঁটি, যা ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর প্রধান কেন্দ্র। এখানে বিমানবাহিনীর প্রায় ৮ হাজার ৫০০ জন সদস্য কাজ করেন।

আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হলো—গ্রাফেনভোর, ভিলসেক এবং হোহেনফেলস। বাভারিয়ার এই ঘাঁটিগুলো ইউরোপের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া ভিজবাডেন ঘাঁটি ইউরোপ ও আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর প্রধান সদর দপ্তর হিসেবে কাজ করে। আর ল্যান্ডস্টুল রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টার হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক হাসপাতাল।

স্নায়ুযুদ্ধের পর এই ঘাঁটিগুলোর ভূমিকা অনেক বদলে গেছে। এখন এগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের জন্য সামনে থেকে সমন্বয় ও সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। সেখান থেকে ইরাক, আফগানিস্তান ও সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের মতো অঞ্চলে অভিযান পরিচালনায় সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প কি আগে এমন হুমকি দিয়েছেন

হ্যাঁ, ট্রাম্প আগে একাধিকবার এমন হুমকি দিয়েছেন।

২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদকালে ট্রাম্প জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয় কম থাকা এবং নর্ড স্ট্রিম ২ পাইপলাইনের প্রতি সমর্থনের কারণে জার্মানিকে ‘অবাধ্য’ বলেছিলেন। এরপর তিনি বলেন, জার্মানিতে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনার সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দেবেন।

তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় বিস্তারিত কোনো তথ্য ছিল না। এটি এমনভাবে দেওয়া হয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর, পররাষ্ট্র দপ্তর, বার্লিনের জার্মান কর্মকর্তা ও ন্যাটোর শীর্ষ কর্মকর্তারাও পুরোপুরি অবাক হয়ে যান। বলা হয়, এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে কাউকেই আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি।

ট্রাম্পের পরিকল্পনা ছিল কিছু সেনাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া এবং কিছু সেনাকে পোল্যান্ড ও ইতালির মতো দেশে স্থানান্তর করা। তবে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দুই দল থেকেই বিরোধিতা আসে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ধরনের সরঞ্জামগত সমস্যাও ছিল। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালে এই পরিকল্পনা স্থগিত করেন এবং পরে সেটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা মূল্য চুকাতে হবে

যুক্তরাষ্ট্রের জার্মানি থেকে বড় পরিসরে সেনা কমানোর পথে এখনো অনেক বাধা রয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র আনিতা হিপার বলেছেন, ইউরোপের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। একই সঙ্গে ইউরোপে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। কারণ, এটি তাদের বৈশ্বিক ভূমিকাকে সহায়তা করে।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে আমেরিকান–জার্মান ইনস্টিউটের বিশ্লেষক জেফ রাটকে বলেছেন, জার্মানির রামস্টেইন বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি তাদের জন্য অনেক সুবিধা তৈরি করে। এই সেনারা ছাড়া অনেক সামরিক অভিযান চালানো কঠিন হয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, ইউরোপে মার্কিন সেনা মোতায়েন রাখাটা কোনো দাতব্য কাজ নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। সহজভাবে বললে, চুক্তিটা এমন যে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে প্রতিরক্ষা দেয়, আর ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক সামরিক কার্যক্রম চালানোর অবকাঠামো দেয়।

নীতিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মোতায়েন থাকা সেনাদের পুনর্বিন্যাস করতে পারে। বর্তমানে ইতালিতে তাদের প্রায় ১৩ হাজার সেনা, যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার এবং স্পেনে ৪ হাজার সেনা রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের মার্কিন প্রতিরক্ষা আইন অনুযায়ী, ইউরোপে মোতায়েন থাকা সেনাদের মোট সংখ্যা স্থায়ীভাবে ৭৫ হাজারের নিচে নামানো যাবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, স্টুটগার্ট ও রামস্টেইন বিমানঘাঁটির মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি থেকে বিপুলসংখ্যক সেনা কমানো হলে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক সক্ষমতা বা প্রভাব বজায় রাখাটা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।

Read full story at source