ব্যাংকের এত মুনাফা হলো কীভাবে
· Prothom Alo

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে থেকেই অর্থনীতিতে ভঙ্গুর দশা ছিল। তখন অর্থনীতির সূচকগুলো ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে দেখানো হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা ফুটে উঠতে থাকে।
আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় কিংবা নামমাত্র চালু থাকে। আবার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগেও উদ্যোক্তারা সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে ব্যবসা–বাণিজ্য অনেকটাই স্থবির হয়েছে। শুল্ক–কর আদায়ে ঘাটতি বাড়তে খাকে।
Visit newssport.cv for more information.
যখন এমন অর্থনৈতিক ও ব্যবসা–বাণিজ্য পরিস্থিতি, তখন দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো ২০২৫ সালে নিট মুনাফায় যে উল্লম্ফন দেখিয়েছে, তা সাধারণ অর্থনৈতিক সমীকরণে মেলানো কঠিন।
তিনটি ব্যাংক গত বছর এক হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে। ব্যাংকগুলো হলো ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক। আর ডাচ্–বাংলা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক ৯০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে।
কীভাবে এত মুনাফা
ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন—সবাই যখন লোকসানে, ব্যাংকগুলো কীভাবে এত টাকা আয় করছে? বাস্তবতা হলো অর্থনীতি খারাপ হলেও কাগজে–কলমে ব্যাংকের আয় হতেই থাকে। এই সময়ে ঋণ না থাকায় ব্যাংকগুলো সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করে। এতে কোনো ঝুঁকি নেই।
অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢালাওভাবে ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ ব্যাংকগুলোর আয়ের পথ বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে খরচ কমে যায়, যা ব্যাংকগুলোর মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করেছে।
দেখা গেছে, যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যত কমেছে, সেই ব্যাংকের মুনাফা তুলনামূলক ততই বেড়েছে। সেই ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা কমে গেছে। আবার ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি ব্যবসা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে ভালো আয় করেছে, যা মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করেছে। ঋণ আদায়ে প্রকৃত অর্থে সাফল্য নেই এমন ব্যাংকেরও মুনাফা বেড়েছে। যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তিন রহস্য
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এত বিপুল মুনাফার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন ব্যাংকগুলোর প্রধান আর্থিক কর্মকর্তারা। এগুলো হলো—
১. বর্তমানে সরকার ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছে।
২. ট্রেজারি বিল ও বন্ডে সুদের হার অনেক বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো সেখানে বিনিয়োগ করে নিশ্চিত ও ঝুঁকিমুক্ত মুনাফা তুলে নিচ্ছে।
৩. খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে বিশেষ ছাড় দিয়েছে, তা ব্যাংকগুলোর জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক মন্দ ঋণকে কাগজে-কলমে ‘নিয়মিত’ দেখানো সম্ভব হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে আগের মতো কড়াকড়ি না থাকায় এবং নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাওয়ায় নিট মুনাফা বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতেই মুনাফা বেড়েছে।
মুনাফায় শীর্ষ পাঁচে কোন ব্যাংক
দেশীয় ব্যাংক হিসেবে মুনাফায় সর্বোচ্চ স্থানে উঠেছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটি ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। ২০২৪ সালে ব্র্যাক ব্যাংকে মুনাফা ছিল ১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ৮১৯ কোটি টাকা বা ৫৭ শতাংশ। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে ২ দশমকি ২৮ শতাংশ হয়।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিটি ব্যাংকের মুনাফার পরিমাণ ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা, যা ওই ব্যাংকের রেকর্ড। এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ৩১০ কোটি টাকা বা প্রায় ৩১ শতাংশ। এই ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণ কমেছে।
অন্যদিকে পূবালী ব্যাংক প্রথমবারের মতো হাজার কোটি টাকার মুনাফার ক্লাবে যোগ দিয়েছে। ব্যাংকটির মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। এক বছরে মুনাফা বেড়েছে ৩১১ কোটি টাকা বা ৪০ শতাংশ। এই ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণ কমেছে।
পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকের প্রধান শক্তি সুশাসন। বাজারে আমাদের যত ঋণ বা সম্পদ রয়েছে, তার বিপরীতে কমবেশি আয় যুক্ত হয়েছে ব্যাংকের হিসাবের খাতায়। এতে মুনাফা হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।’
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৯৬৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১০৪ শতাংশ বা প্রায় ২ দশমিক ০৪ গুণ বেশি।
প্রাইম ব্যাংকের মুনাফা ২০২৪ সালে ছিল ৭৩২ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৯১০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে।
ফলে শীর্ষ মুনাফা অর্জনকারী পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে চারটিরই খেলাপির হার ২ শতাংশের ঘরে, একটির ৫ শতাংশের নিচে, যা তাদের মুনাফা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
মুনাফার প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে যারা
সাউথইস্ট ব্যাংকের মুনাফায় বিশাল প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪ সালে মুনাফা ছিল মাত্র ৪৩ কোটি টাকা, যা গত বছরে বেড়ে হয়েছে ৩৩৬ কোটি টাকা।
সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালিদ মাহমুদ খান প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ আদায় হয়েছে। আবার অবলোপন করা ঋণ থেকে ১০০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। অনেক খেলাপি ঋণ নিয়মিত হয়েছে। ফলে নিরাপত্তা সঞ্চিতি কমে এসেছে। পাশাপাশি ট্রেজারি ব্যবসা থেকে ভালো আয় হয়েছে। এতে মুনাফা বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তা খেলাপি ঋণ কমাতে সহায়তা করেছে।
এনসিসি ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে দ্বিগুণে বেশি। এই ব্যাংকটির মুনাফার পরিমাণ ৪৭৬ কোটি টাকা। যমুনা ব্যাংকের মুনাফা ২৭৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫৫৬ কোটি টাকা হয়েছে।
ব্যাংক এশিয়া গত বছর ৪০৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছর ছিল ২৫০ কোটি টাকা। উত্তরা ব্যাংক ২০২৪ সালের ৪৭৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল, যা গত বছর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯০ কোটি টাকা।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৩৪০ কোটি টাকা, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ৩৬৮ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে।
এমনকি ইসলামী ব্যাংক বিশেষ ছাড় নিয়ে ব্যাংকটি ১৩৭ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছর ছিল ১০৯ কোটি টাকা। ব্যাংকটি এই মুনাফা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে বিশেষ ছাড় নিয়ে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে এস আলম গ্রুপের লুটপাটের কারণে ব্যাংকটির ৫০ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে।